২১ মে ২০২২, শনিবার,
1
2
3
4
5
6
7
8
9
10
11
12
K T V Clock
দেশ স্বাধীন হল ৪৭ এ
চতুর্থ স্তম্ভ: ভারতবর্ষের বদলে যাওয়া রাজনীতি
কলকাতা টিভি ওয়েব ডেস্ক
কলকাতা টিভি ওয়েব ডেস্ক
  • আপডেট সময় : ২৫-০৪-২০২২, ৫:৪৯ অপরাহ্ন
চতুর্থ স্তম্ভ: ভারতবর্ষের বদলে যাওয়া রাজনীতি
মনমোহন-নেহরু-মোদি

দেশ স্বাধীন হল ৪৭ এ৷ প্রথম প্রধানমন্ত্রী জহরলাল নেহরু৷ স্বাধীনতার বহু আগে থেকেই কংগ্রেসের মধ্যে সমাজতান্ত্রিক চিন্তাভাবনার মানুষ৷ স্পেনের স্বৈরাচারী ফ্রাঙ্কোর বিরুদ্ধে তৈরি হয়েছিল পপুলার ফ্রন্ট৷ ছিল স্প্যানিস কমিউনিস্ট পার্টি, অন্যান্য সমাজতান্ত্রিক দল৷ তৈরি হয়েছিল ইন্টারন্যাশন্যাল ব্রিগেড, যোগ দিয়েছিলেন লোরকা, জর্জ অরওয়েল, সমর্থন জানিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর৷ সেই রণক্ষেত্রে পৌঁছেছিলেন মুলকরাজ আনন্দ, ভি কে কৃষ্ণমেনন, জহরলাল নেহরু। ইন্দিরা গান্ধী তখন লন্ডনে৷ ফিরোজ গান্ধীও৷ ওঁরা ইন্টারন্যাশন্যাল ব্রিগেডকে সাহায্য করার কাজ করছিলেন৷ সেদিন স্পেনের পপুলার ফ্রন্টের সমর্থনে ছিল সোভিয়েত রাশিয়া। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে, নেহরু ডাক দিলেন সমাজতান্ত্রিক ধাঁচের সমাজ তৈরির৷ রাশিয়ার সঙ্গে হাত মিলিয়ে দেশে পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা চালু করলেন৷ রাশিয়ার সাহায্যে ইস্পাত কারখানা তৈরি হল৷ দেশের সংবিধানে তখনও সমাজতান্ত্রিক শব্দটা নেই৷ কিন্তু সারা সংবিধান জুড়েই সেই সমাজতন্ত্র, কল্যাণকামী রাষ্ট্র, রাষ্ট্রের ছত্রছায়ায় শিল্প গড়ে ওঠা সবই ছিল। এবং নেহরুর ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে কেউ কোনওদিন কোনও প্রশ্নও তোলেননি৷ তাঁর আরএসএস বিরোধিতা ছিল নিখাদ৷ বহু লেখায় তিনি আরএসএস এবং তাদের সাম্প্রদায়িক রাজনীতির স্বরূপের কথা, জোর দিয়ে বলেছেন৷ তাঁদের তীব্র বিরোধিতা করেছেন সারা জীবন।

এসব পড়লে, শুনলে মনেই হবে যে তাহলে নিশ্চই দেশের কমিউনিস্টরা, সোশ্যালিস্টরা জহরলাল নেহরুকে পূর্ণ সমর্থন দিয়েছিলেন৷ কিন্তু বাস্তব ছিল এক্কেবারে উলটো৷ যার মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে আজকের পরিবর্তিত ভারতীয় রাজনীতির শিকড়৷ দেশের কমিউনিস্টরা, বামপন্থীরা, সোশ্যালিস্টরা, লোহিয়াইটসরা প্রতিদিন নিয়ম করে নেহরুর বিরোধিতা করেছেন, কমিউনিস্ট পার্টি সেদিনের কংগ্রেসকে চরম দক্ষিণপন্থী দল বলেই মনে করতেন৷ টাটা বিড়লা ইত্যাদি একচেটিয়া পুঁজিপতি, দেশের সামন্ততান্ত্রিক অবশেষের প্রতিনিধি হিসেবেই চিহ্নিত করেছিলেন। দেশের রাজনীতির মধ্যে, এমনকি কংগ্রেস দলের মধ্যেও যে দক্ষিণপন্থা কাজ করছিল৷ তাকে বামপন্থীরা, কমিউনিস্টরা, সোশ্যালিস্টরা যথেষ্ট গুরুত্ব দেননি৷ একধারে দেশের সঙ্গে, নেহরুর সঙ্গে সোভিয়েতের দারুণ সম্পর্ক৷ আবার সেই সোভিয়েত রাশিয়ার নেতৃত্বে, কমিনটার্ন রাজনীতির নির্দেশে চলছে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি৷ অথচ সেই দলই দেশে নেহরুকে, কংগ্রেসকে দক্ষিণপন্থী বলে চলেছেন৷ এই স্ববিরোধিতা বজায় ছিল বছরের পর বছর। ১৯৬৪তে কমিউনিস্ট পার্টি ভাগ হল৷ শ্রীপাদ অমৃত ডাঙ্গের নেতৃত্বে চলল সিপিআই, ই এম এস নাম্বুদ্রিপাদ, প্রমোদ দাশগুপ্ত ইত্যাদির নেতৃত্বে তৈরি হল নতুন দল সিপিআইএম৷ নতুন দল সিপিআইএম শুরু থেকেই সিপিআই -কে দক্ষিণপন্থী কমিউনিস্ট পার্টি বলত৷ যদিও ভাগ হওয়ার পরেই কেরালা বা এই বাংলায়, সেই দক্ষিণপন্থী কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গেই তারা সরকার তৈরি করেছে, একবার নয়, বহুবার।

এরপর জরুরি অবস্থা, কংগ্রেস দলের মধ্যে সমাজতান্ত্রিক আদর্শের বিরুদ্ধে, বহু লোকজন ছিলেন, বাইরে ছিল জনসংঘ, স্বতন্ত্র দল, কংগ্রেসের বিরুদ্ধে সরাসরিই ছিল সিপিআইএম, সোশ্যালিস্ট পার্টি ইত্যাদিরা। সিপিআই সমর্থন করেছিল ইন্দিরা গান্ধীকে, জরুরি অবস্থাকে। দেশের রাজনীতির এক আমুল বদল হল ১৯৭৭ এ৷ একধারে কংগ্রেস, অন্যধারে বাম, কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে আসা নেতারা৷ লোকদল, জনসঙ্ঘ। ইন্দিরার এবং কংগ্রেসের বিরাট পরাজয়ের কিছুদিনের মধ্যেই সিপিআই, ১৮০ ডিগ্রি টার্ন নিয়ে আবার বিরোধিতায় নামল৷ শুরু হল ভারতের রাজনীতির আর এক অধ্যায়৷ যেখানে এই বিরোধিতার মধ্যে দিয়েই চরম দক্ষিণপন্থী দল জনসংঘ জায়গা করে নিতে থাকল৷ বিজেপি তৈরি হল, রামমন্দির মুদ্দা, হয়ে উঠছে রাজনীতির সেন্টার স্টেজ ইস্যু। তখন ভিপি সিং এর সরকার৷ সমর্থনে বিজেপি এবং বাম৷ কারণ তারা প্রত্যেকেই কংগ্রেস বিরোধী। দেশের সংসদে, ২ থেকে বেড়ে বিজেপি যখন অটল বিহারী সরকার তৈরি করল, তখন থেকে বামেদের টনক নড়ল৷ তারা এবার বিজেপির বিরদ্ধে কংগ্রেসকে সমর্থন করা শুরু করল, এবং শেষমেষ নরেন্দ্র মোদির সরকার।

আমাদের দেশের সংসদীয় রাজনীতিতে, শুরু থেকেই ছিল হিন্দু মহাসভা, জনসংঘ, স্বতন্ত্র দল, তারাই ছিল প্রকৃত অর্থে চরম দক্ষিণপন্থী৷ অন্যদিকে ছিল সংসদীয় রাজনীতি বর্জন করা চরম বাম, নকশাল দল আর গোষ্ঠী৷ তারপর সিপিএম, সি পি আই, সোশ্যালিস্ট পার্টি। মধ্যে কংগ্রেস, আর জেডি ইত্যাদি ধর্মনিরপেক্ষ দল, ছিল রিজিওনাল বা আঞ্চলিক দল, যারা তাদের সুবিধে মত কখনও বিজেপি, কখনও কংগ্রেস এর সঙ্গে জোট বেঁধেছে৷ আবার কখনও স্বাধীন সত্তা নিয়ে রাজনীতি করেছে, করছে। এবার আসুন ৪৭ থেকে দেশের পরিবর্তিত রাজনীতির মূল সূত্রটা ধরা যাক৷

কংগ্রেস চিরটাকাল হিন্দু মহাসভা, জনসংঘ, বিজেপির বিরোধিতা করেছে৷ যদিও দলের মধ্যেই কিছু নেতা ছিলেন দক্ষিণপন্থী, তবুও মোটের ওপরে লেফট টু সেন্টার, বা বাম ঘেঁষা মধ্যপন্থার রাজনীতিই করেছে কংগ্রেস৷ যদিও নরসিমা রাও, বা মনমোহন সিং এর সময় অর্থনৈতিকভাবে বিশ্বায়ন, রাষ্ট্রায়ত্ব শিল্প বেচে দেওয়া ইত্যাদি সেই নীতির সঙ্গে একেবারেই মানানসই ছিল না, এখন সেই ভুল তাঁরা বুঝতে পারছেন বটে৷ কিন্তু তাঁদের জনভিত্তি কমেছে উল্লেখযোগ্য ভাবে। আরএসএসের নেতৃত্বে হিন্দু মহাসভা, জনসংঘ, বিজেপি বিভিন্ন সময় বিভিন্ন দলের সঙ্গে আঁতাত করেছে, নিজেদের গুরুত্ব আর প্রভাব বাড়িয়েছে৷ সব থেকে উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, তারা তাদের মূল দর্শন, মূল লক্ষ থেকে এক ফোঁটাও সরেনি৷ সময় মত চুপ করে থেকেছে৷ ক্ষমতা বাড়তেই নিজেদের এজেন্ডা গুলোকে সামনে নিয়ে এসেছে। বাম দল, কমিউনিস্ট পার্টি, সোশ্যালিস্ট পার্টি ৯০ এর দশক পর্যন্ত, তাদের চুড়ান্ত কংগ্রেস বিরোধিতার রাজনীতি করেও কংগ্রেসের বিকল্প হয়ে উঠতে পারেনি৷ বরং তাদের কংগ্রেস বিরোধিতার সুযোগ নিয়েছে হিন্দু মহাসভা, জনসংঘ, আরএসএস – বিজেপি।

মজার কথা হল,যখন কংগ্রেস তার বাম ঘেঁষা মধ্যপন্থা থেকে সরে এসে খোলা বাজার, রাষ্ট্রায়ত্ব শিল্পের বিলোপ ইত্যাদি করছে, ঠিক সেই সময়ে বিজেপিকে আটকাতে, বামেরা কংগ্রেসকে সমর্থন করেছে, বা করতে বাধ্য হয়েছে। অন্যদিকে, দেশের কোনও আঞ্চলিক দলই কোনও বিশেষ রাজনৈতিক আদর্শ নয়, বরং তারা গড়ে উঠেছে আঞ্চলিক পরিচিতি, আঞ্চলিক চাহিদা আর কংগ্রেস বিরোধিতার থেকে৷ কাজেই তাদের টিঁকে থাকার জন্য তারা যে কোনও দিকে গিয়েছে, যে কোনও সময়ে। কিন্তু এখনও বিজেপি দেশের ৫০% বা তার বেশি মানুষ কে তাদের সমর্থনে আনতে পেরেছে এমন নয়৷ এমনকি তাদের হিন্দুত্বের এজেন্ডা, দেশের হিন্দুদের প্রতি দুজনের একজন সমর্থন করলেও, অন্যজন তা মেনে নেয়নি৷ এটাও বাস্তব, তারা এখনও মাত্র ৩৭.৩৬% ভোট পেয়ে ক্ষমতায়৷ এটা কেবল দেশের সংখ্যালঘুদের বিরোধিতার জন্য হয়নি৷ দেশের হিন্দু জনসংখ্যার অর্ধেক, হিন্দুত্বের নামে ভোট দেয়নি। কারণ কংগ্রেসের ধর্মনিরপেক্ষ অবস্থান, বামেদের আর এস এস – বিজেপি বিরোধিতা এবং আঞ্চলিক দলগুলোর বিজেপি বিরোধিতা, এই বিরাট অংশের কাছেই এখনও আছে ৬০% এর কিছু বেশি ভোট। যে অংক আর এস এস – বিজেপিও বোঝে, তারাও ভালো করেই জানে দেশের রাজনীতির চাবিকাঠি ক্রমশ ক্রমশ আঞ্চলিক দলগুলোর কাছে চলে যাচ্ছে৷ তাকিয়ে দেখুন তামিলনাড়ু, উড়িষ্যা, বাংলা, অন্ধ্রপ্রদেশ, তেলেঙ্গানা, মহারাষ্ট্র, পঞ্জাব, দিল্লি, ঝাড়খন্ড, বিহার, উত্তরপ্রদেশের দিকে, উত্তর পূর্বাঞ্চল, গোয়া, কাশ্মীর, হরিয়ানার দিকে, এই প্রত্যেক রাজ্যে শক্তিশালী আঞ্চলিক দলগুলোকে হয় বিজেপি নিজেদের সঙ্গে নিয়েছে৷ নাহলে তাদের কাছে হেরেছে, বিজেপি হয় এই শক্তিগুলোকে নিজেদের সঙ্গে পেতে চাইছে, নাহলে সর্বশক্তি দিয়ে তাদের উৎখাত করতে চাইছে।

মাঝে মধ্যেই প্রশ্ন উঠছে, কংগ্রেস ছাড়া নাকি বিজেপি বিরোধী কোনও কার্যকরী ফ্রন্ট গড়ে উঠতে পারে না৷ বিষয়টাকে উলটোদিক থেকে ভাবুন৷ ডিএমকে, বিজেডি, ওয়াইএসআর কংগ্রেস, তেলেঙ্গানা রাষ্ট্রীয় সমিতি, তৃণমূল, ঝাড়খন্ড পার্টি, আরজেডি, সমাজবাদী পার্টি, লোকদল, এনসিপি, শিবসেনা ইত্যাদিদের বাদ দিয়েও কি কোনও ন্যাশন্যাল অলটারনেটিভ সম্ভব? এই সত্যিটা কংগ্রেসকেও বুঝতে হবে, এই সত্যিটা বামেদেরও বুঝতে হবে। রাজনীতির ইতিহাসকে সামগ্রিকতায় বোঝা যায়, খন্ডিত সময়ে নয়। সেদিন যদি নিছক কংগ্রেস বিরোধিতার বদলে, সমূলে উৎখাত করা যেত দেশের সাম্প্রদায়িক চরম দক্ষিণপন্থী রাজনীতি কে, তাহলে আজ বাম বা কংগ্রেস, কারোরই এই দুরবস্তার মধ্যে পড়তে হত না, সামগ্রিকতার বিচারে সেদিন ভুল হয়েছিল, সেই ভুল যেন আবার না হয়, সে ভুলের খেসারত দেবার সময়ও থাকবে না, সুযোগও থাকবে না।

Tags : 4th pillar of democracy, Indian Politics, BJP, Congress, CPM

শেয়ার করুন


© R.P. Techvision India Pvt Ltd, All rights reserved.