২৭ জুন ২০২২, সোমবার,
1
2
3
4
5
6
7
8
9
10
11
12
K T V Clock
জেগে উঠছে নতুন ভারত, আদিত্যনাথ যোগী বলছেন
চতুর্থ স্তম্ভ : প্রাপ্তি কেবল অযোধ্যা, কাশি, মথুরা, বিন্দবাসিনী ধাম, নৈমিষ ধাম
কলকাতা টিভি ওয়েব ডেস্ক
কলকাতা টিভি ওয়েব ডেস্ক
  • আপডেট সময় : ০২-০৬-২০২২, ১০:১৮ অপরাহ্ন
চতুর্থ স্তম্ভ : প্রাপ্তি কেবল অযোধ্যা, কাশি, মথুরা, বিন্দবাসিনী ধাম, নৈমিষ ধাম
অযোধ্যা

জেগে উঠছে নতুন ভারত, আদিত্যনাথ যোগী বলছেন। তো জেগে উঠে কী দেখছেন? কী পাচ্ছেন? প্রাপ্তির ঝোলায় কী এল? অযোধ্যাতে মন্দির তৈরি শুরু হয়ে গিয়েছে, কাশী করিডোর তৈরি, জ্ঞানবাপি মসজিদ নিয়ে হাঙ্গামা চালু হয়ে গিয়েছে, মথুরা, বিন্দ্যবাসিনী ধাম, নৈমিষ ধাম ইত্যাদি ইত্যাদি ইত্যাদি প্রাচীন তীর্থক্ষেত্র থেকে বেরিয়ে আসছে নতুন ভারত, নয়া ভারত অংগড়াই লে রহি হ্যায়। ১০০ বছর আগে, আরেক গেরুয়া পরা সন্ন্যাসী নতুন ভারতের স্বপ দেখিয়েছিলেন, “তোমাদের পূতিগন্ধ শরীরের আলিঙ্গনে পূর্বকালের অনেকগুলি রত্নপোটকা রক্ষিত রয়েছে, এতদিন দেবার সুবিধা হয় নাই। এখন ইংরেজ রাজ্যে—অবাধ বিদ্যাচর্চার দিনে, উত্তরাধিকারীদের দাও, যত শীঘ্র পার দাও । তোমরা শূন্যে বিলীন হও, আর নূতন ভারত বেরুক । বেরুক লাঙল ধরে, চাষার কুটির ভেদ করে, জেলে মালা মুচি মেথরের ঝুপড়ির মধ্য হতে। বেরুক মুদির দোকান থেকে, ভুনাওয়ালার উনুনের পাশ থেকে। বেরুক কারখানা থেকে, হাট থেকে, বাজার থেকে, বেরুক ঝোপ জঙ্গল পাহাড় পর্বত থেকে । এরা সহস্ৰ সহস্ৰ বৎসর অত্যাচার সয়েছে, নীরবে সয়েছে,—তাতে পেয়েছে অপূর্ব সহিষ্ণুতা। সনাতন দুঃখ ভোগ করেছে,—তাতে পেয়েছে অটল জীবনীশক্তি। এরা এক মুঠো ছাতু খেয়ে দুনিয়া উলটে দিতে পারবে ; আধখানা রুটি পেলে ত্ৰৈলোক্যে এদের তেজ ধরবে না ; এরা রক্তবীজের প্রাণ-সম্পন্ন। আর পেয়েছে অদ্ভূত সদাচারবল, যা ত্ৰৈলোক্যে নাই। এত শাস্তি, এত প্রীতি, এত ভালবাসা, এত মুখটি চুপ করে দিনরাত খাটা, এবং কার্যকালে সিংহের বিক্ৰম! অতীতের কঙ্কালচয় । এই সামনে তোমার উত্তরাধিকারী, ভবিষ্যৎ ভারত। ওই তোমার রত্নপেটিকা, তোমার মানিকের আংটি—ফেলে দাও এদের মধ্যে, যত শীঘ্র পার ফেলে দাও ; আর তুমি যাও হাওয়ায় বিলীন হয়ে, অদৃশ্য হয়ে যাও, কেবল কান খাড়া রেখে ; তোমার যাই বিলীন হওয়া, অমনি শুনবে, কোটি জীমূতস্তন্দী ত্ৰৈলোক্যকম্পনকারী ভবিষ্যৎ ভারতের উদ্বোধন-ধ্বনি— ‘ওয়াহ গুরু কি ফতে’।

স্বামী বিবেকানন্দ এই কথা বলেছিলেন৷ ভারতের তীর্থক্ষেত্র তিনি পায়ে হেঁটে ঘুরেছিলেন৷ হ্যাঁ অযোধ্যাতেও দিন দুই কাটিয়েছেন, আমাদের হিন্দুত্বের পোস্টার বয় যোগী আদিত্যনাথের চেয়ে কিছুটা বেশিই ঘুরেছেন, অথচ তাঁর লেখার সংকলন বার করুন, তাঁর বক্তৃতামালা পড়ুন, দু’একবার উল্লেখ পাবেন মাত্র৷ তার চেয়ে অনেক বেশিবার তিনি শিক্ষার কথা বলছেন৷ শরীর, স্বাস্থের কথা বলছেন৷ গরিবস্য গরিব মানুষের পাশে দাঁড়ানোর কথা বলছেন৷ শিবজ্ঞানে জীবসেবার কথা বলছেন। নয়া ভারত যে কোনও তীর্থক্ষেত্র থেকে জন্ম নেবে না, তা তিনি জানতেন৷ আর জানতেন বলেই বলছেন, ওসব মুক্তি টুক্তি নয়, তুমি তোমার স্বধর্ম পালন করো৷ “তুমি গেরস্থ মানুষ, তোমার ওসব কথায় বেশি আবশ্যক নাই, তুমি তোমার স্বধর্ম করো, এক হাত লাফাতে পারো না, লঙ্কা পার হবে? কাজের কথা? দুটো মানুষের মুখে অন্ন তুলে দিতে পারো না, দুটো লোকের সঙ্গে একবুদ্ধি হয়ে, একটা সাধারণ হিতকর কাজ করতে পারো না, মোক্ষ নিতে দৌড়চ্ছ?” যে রাজ্যের ৩৭.৭৯ % মানুষ দারিদ্র সীমারেখার নীচে, অশিক্ষা, কুসংস্কারে ভুগছে সাধারণ মানুষ, মহিলাদের ওপর সংগঠিত অপরাধের তালিকায় যে রাজ্য দেশের সবথেকে ওপরে, সেই উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী বলছেন ধর্মের কথা, তীর্থের কথা, পূণ্যের কথা? এক মুখ্যমন্ত্রী, এক দলের নেতা, যারা একজন সংখ্যালঘু মানুষকে তাদের দলের তরফে, বিধানসভা নির্বাচনে টিকিটও দেন না, সেই দল বলছে হিন্দুত্বের কথা।

শিকাগো ধর্মসভায় প্রথমদিন, অভ্যর্থনা ভাষণের জবাবে স্বামী বিবেকানন্দ বলেছিলেন, বিশ্বে অনেক ধর্ম আছে, যারা পরধর্মসহিষ্ণু, মানে আমার ধর্মই সঠিক, কিন্তু আপনি আপনার ধর্ম পালন করলে আমার কোনও অসুবিধে নেই. এরকমটা মনে করে। আমার ধর্ম, হিন্দু ধর্ম কেবল পরধর্ম সহিষ্ণুই নয়, আমরা অন্য প্রত্যেক ধর্মকে সঠিক বলেই মনে করি, হ্যাঁ তিনি ঠিক এই কথাই বলেছিলেন। আসুন একবার সেই ভাষণের খানিকটা পড়ে নেওয়া যাক, “যে ধর্ম জগৎকে চিরকাল পরমতসহিষ্ণুতা ও সর্বাধিক মত স্বীকার করার শিক্ষা দিয়া আসিতেছে, আমি সেই ধর্মভুক্ত বলিয়া, নিজেকে গৌরবান্বিত মনে করি। আমরা শুধু সকল ধর্মকেই সহ্য করিনা, সকল ধর্মকেই আমরা সত্য বলিয়া বিশ্বাস করি। যে ধর্মের পবিত্র সংস্কৃত ভষায়, ইংরেজী ‘এক্সক্লুশন’ শব্দটি অনুবাদ করা যায় না, অমি সেই ধর্মভুক্ত বলিয়া গর্ব অনুভব করি। যে জাতি, পৃথিবীর সকল ধর্মের ও সকল জাতির নিপীড়িত ও আশ্রয়প্রার্থী জনগণকে চিরকাল আশ্রয় দিয়া আসিয়াছে, আমি সেই জাতির অর্ন্তভুক্ত বলিয়া, নিজেকে গৌরবান্বিত মনে করি। আমি আপনাদের এ-কথা বলিতে গর্ব অনুভব করিতেছি যে, আমরাই ইহুদীদের খাঁটি বংশধরগণের অবশিষ্ট অংশকে, সাদরে হৃদয়ে ধারণ করিয়া রাখিয়াছি; যে বৎসর রোমানদের ভয়ংঙ্কর উৎপীড়নে তাহদের পবিত্র মন্দির বিধ্বস্ত হয়, সেই বৎসরই তাহারা দক্ষিণভারতে আমাদের মধ্যে, আশ্রয়লাভের জন্য আসিয়াছিল। জরথুষ্ট্রের অনুগামী মহান্ পারসীক জাতির অবশিষ্টাংশকে, যে ধর্মাবলম্বিগণ আশ্রয় দান করিয়াছিল এবং আজ পর্যন্ত, যাহারা তাঁহাদিগকে প্রতিপালন করিতেছে, আমি তাঁহাদেরই অন্তর্ভুক্ত। কোটি কোটি নরনারী যে-স্তোত্রটি প্রতিদিন পাঠ করেন, যে স্তবটি আমি শৈশব হইতে আবৃত্তি করিয়া আসিতেছি, তাহারই কয়েকটি পঙক্তি উদ্ধৃত করিয়া আমি আপনাদের নিকট বলিতেছি, 

‘রুচীনাং বৈচিত্র্যাদৃজুকুটিলনানাপথজুষাং, 

নৃণামেকো গম্যস্ত্বমসি পয়সামর্ণব ইব।।

বিভিন্ন নদীর উৎস বিভিন্ন স্থানে, কিন্তু তাহারা সকলে যেমন এক সমুদ্রে তাহাদের জলরাশি ঢালিয়া মিলাইয়া দেয়, তেমনি হে ভগবান্, নিজ নিজ রুচির বৈচিত্র্যবশতঃ, সরল ও কুটিল নানা পথে যাহারা চলিয়াছে, তুমিই তাহাদের সকলের একমাত্র লক্ষ্য।

পৃথিবীতে এযাবৎ অনুষ্ঠিত সন্মেলনগুলির মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ মহাসন্মেলন এই ধর্ম-মহাসভা গীতা-প্রচারিত সেই অপূর্ব মতেরই সত্যতা প্রতিপন্ন করিতেছি, সেই বাণীই ঘোষণা করিতেছিঃ ‘যে যথা মাং প্রপদ্যন্তে, তাংস্তথৈব ভজাম্যহম্। মম বর্ত্মানুবর্তন্তে মনুষ্যাঃ পার্থ সর্বশঃ।।’–যে যে-ভাব আশ্রয় করিয়া আসুক না কেন, আমি তাহাকে সেই ভাবেই অনুগ্রহ করিয়া থাকি। হে অর্জুন মনুষ্যগণ সর্বতোভাবে আমার পথেই, চলিয়া থাকে।

সাম্প্রদায়িকতা, গোঁড়ামি ও এগুলির ভয়াবহ ফলস্বরূপ ধর্মোন্মত্ততা এই সুন্দর পৃথিবীকে, বহুকাল অধিকার করিয়া রাখিয়াছে। ইহারা পৃথিবীকে হিংসায় পূর্ণ করিয়াছে, বরাবার ইহাকে নরশোণিতে সিক্ত করিয়াছে, সভ্যতা ধ্বংস করিয়াছে এবং সমগ্র জাতিকে হতাশায় মগ্ন করিয়াছে। এই-সকল ভীষণ পিশাচগুলি যদি না থাকিত, তাহা হইলে মানবসমাজ আজ, পূর্বাপেক্ষা অনেক উন্নত হইত।’’

সেদিন দেশীয় রাজাদের কিছু সাহায্য নিয়ে সন্ন্যাসী বিবেকানন্দ গিয়েছিলেন আমেরিকা, সেদেশ শুধু নয়, ইউরোপের প্রত্যন্ত অঞ্চলে নিজের ধর্মের কথা বলেছেন, ভারতবর্ষের কথা বলেছেন, বলেছেন আমাদের ধর্ম অনেক, অনেক আছে, আমাদের শিক্ষা চাই, খাদ্য চাই৷ যদি পারেন তাহলে সেগুলোই দিন৷ ইউরোপ আমেরিকার ভক্তরা উজাড় করে দিয়েছিল তাদের সঞ্চয়৷ রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের সেবামূলক কাজের ভিত্তি সেখান থেকেই, এদেশেই চলে এলেন নিবেদিতা, সিস্টার নিবেদিতা, কলকাতায় প্লেগ আক্রান্ত বস্তিতে ময়লা সাফ করার কাজ করছেন আইরিস ভদ্রমহিলা৷ বিবেকানন্দকে সেই সনাতন হিন্দু ধর্ম প্রচারের জন্য পয়সা খরচ করতে হয়নি, মানুষ পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন, আর আজ? যোগী, মোদি, শাহ, আরএসএস, বিজেপির হিন্দুত্ব প্রচারের জন্য কোটি কোটি টাকা খরচ হচ্ছে, আমেরিকাতে হিন্দু আমেরিকান ফাউন্ডেশন গড়ে তোলা হয়েছে, বিভিন্ন হিন্দু সংগঠন গত কিছু বছরে ১২৩১ কোটি টাকা খরচ করেছে, এই সব এর মাথায় আছে বিভিন্ন ব্যবসায়ীরা, হিন্দু স্বয়ংসেবক সংঘ, রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ, আমেরিকার বিভিন্ন প্রান্তে তাদের দফতর খুলেছে। এক রিপোর্ট থেকে জানা যাচ্ছে, মোদি সরকার, ২০১৭-২০ র মধ্যে এই বিভিন্ন সংস্থাকে গড়ে ১১.৬৩ লক্ষ থেকে ৪৪.৯৮ লক্ষ টাকা দিয়েছে, এই গোষ্ঠীগুলো আমেরিকার রাজনৈতিক মহলেও কাজ করছে, অল ইন্ডিয়া মুভমেন্ট ফর সেবা, একল বিদ্যালয় ফাউন্ডেশন অফ আমেরিকা, ইন্ডিয়া ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড রিলিফ ফান্ড, পরম শক্তিপীঠ, বিশ্ব হিন্দু পরিষদ অফ আমেরিকা ইত্যাদি নামে বিভিন্ন সংগঠন হিন্দু লবি তৈরি করছে, এবং প্রত্যেকটার মাথায় রয়েছে ভারতীয় ব্যবসায়ীরা৷ বলা বাহুল তারা প্রত্যেকেই আরএসএস, বিজেপি ঘনিষ্ঠ। এক বিদ্যালয়ের কথা নিশ্চয়ই মনে আছে? উড়িষ্যাতে এই সংগঠন তৈরি করেছেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী প্রতাপ চন্দ্র সাড়ংগী, যে সংগঠনের বিরুদ্ধে ফাদার গ্রাহাম স্টুয়ার্ট স্টাইন, তার দুই সন্তানকে জ্যান্ত পুড়িয়ে মারার অভিযোগ আছে, এই সংগঠন থেকে দাবি করা হয়েছিল, ফাদার গ্রাহাম স্টুয়ার্ট স্টাইন জবরদস্তি ধর্মান্তরণ করাচ্ছেন।  ধর্মনিরপেক্ষ দেশের সরকার, দেশের পয়সায়, বিদেশে হিন্দুত্বের প্রচারের কাজ করছেন, হিন্দু লবিকে পয়সা যোগাচ্ছেন।  

হ্যাঁ বিবেকানন্দ বলেছিলেন, গর্বের সঙ্গে বলো আমি হিন্দু, এই কথাটাকে স্লোগান বানিয়ে তুলেছেন ওই আদিত্যনাথ যোগী, মোদি অ্যান্ড কোম্পানি, কিন্তু বিবেকানন্দ কোন হিন্দু ধর্মের কথা বলেছিলেন? সেই সনাতন হিন্দু ধর্ম, যা উদ্ভবের কালেই বলে রেখেছিল, 

“অয়ং নিজঃ পরোবেতি গণনা লঘুচেতসাম।

উদার চরিতানাম তু বসুধৈব কুটুম্বকম।।“

– “এটা আমার, ওটা অন্যের – এই ভাব শুধু এক ক্ষুদ্র স্বার্থবাদী মানুষের। এক উদার চেতনা সম্পন্ন মানুষ, এই পৃথিবীর সবাইকে একই পরিবারভুক্ত ভাবে।“ যদি হিন্দুই হতে হয়, তাহলে আমরা সেই হিব্দু ধর্মের কথা কার কাছ থেকে শুনবো? এই যোগী, মোদি, শাহ, আর এস এস, বিজেপির কাছ থেকে না স্বামী বিবেকানন্দের কাছ থেকে? ৫ বছর রাজ্য চালিয়েছেন, আবার ৫ বছর রাজ্য চালানোর দায় পেয়েছেন, কিন্তু প্রাপ্তি কী? অযোধ্যা? কাশি? মথুরা? বিবেকানন্দই বলেছিলেন, খালি পেটে ধর্ম হয় না, উপনিষদ বলছে, শরীরম আদ্যম, খলু ধর্ম সাধনম। দেশের ২৩ কোটি মানুষ দু’বেলা খেতে পায় না, মোদি, যোগী, শাহ ধর্ম প্রচার করছেন।

Tags : 4th Pillar of Democracy, PM Modi, Amit Shah, RSS, Swami Vivekananda

শেয়ার করুন


© R.P. Techvision India Pvt Ltd, All rights reserved.