৩০ সেপ্টেম্বর ২০২২, শুক্রবার,
1
2
3
4
5
6
7
8
9
10
11
12
K T V Clock
নতুন চিত্রনাট্য লেখা হচ্ছে কাশীধামে
চতুর্থ স্তম্ভ : অযোধ্যা থেকে এবার রাজনীতি কাশী, মথুরা
কলকাতা টিভি ওয়েব ডেস্ক
কলকাতা টিভি ওয়েব ডেস্ক Edited By: 
  • আপডেট সময় : ১৬-০৯-২০২২, ৯:১০ অপরাহ্ন
চতুর্থ স্তম্ভ : অযোধ্যা থেকে এবার রাজনীতি কাশী, মথুরা
জ্ঞানবাপি মসজিদ

দেশজুড়ে প্রবল অর্থনৈতিক সমস্যা, বেকারত্বের সমস্যা, মূল্যবৃদ্ধির সমস্যা, বিজেপির আগ্রাসী রাজনৈতিক ভূমিকা৷ অন্যদিকে বিরোধীদের মধ্যে বোঝাপড়ার প্রথম ধাপ, বিহারে নীতীশ তেজস্বী সমঝোতা আর কংগ্রেসের ভারত জোড়ো যাত্রার ফাঁকে রাজনীতির নতুন খেলা শুরু হয়েছে, নতুন চিত্রনাট্য লেখা হচ্ছে কাশীধামে।  আসুন প্রথমে চিত্রনাট্যের দিকে নজর দেওয়া যাক, তারপর বোঝা যাবে এই চিত্রনাট্যের উদয় কেন হল? ঔরঙ্গজেব কাশীতে এক শিবের মন্দির ভেঙে এক মসজিদ তৈরি করিয়েছিল৷ তা ছিল ওই মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা দুই রাজপুত ভাইদের সঙ্গে শত্রুতার জবাব।  কারণ ওই ঔরঙ্গজেবই আবার কামাক্ষার মন্দিরের জন্য জমি টাকা দিয়েছিলেন, এটাও সত্য।  সে যাই হোক, তাই বলে মন্দির ভেঙে মসজিদ তৈরি করা তো খুব সভ্য ব্যাপার নয়৷ এক জঘন্য সাম্প্রদায়িক কাজ।  তার আগে ওখানে কাশী বিশ্বনাথ মন্দির ছিল, তা বেশ কয়েকবার ভাঙা হয়, তৈরিও হয়৷ এখনকার কাশী বিশ্বনাথ মন্দিরের পাশেই জ্ঞানবাপি মসজিদের গায়েই যে মন্দিরের অংশ দেখা যায় সে মন্দির সম্রাট আকবরের সময়ে তাঁর সেনাপতি মান সিং তৈরি করেন।  সব ছেড়ে দিয়ে ঔরঙ্গজেব ওই মন্দির ভাঙলেন কেন?

১৬৬৯ সালে রাজা মান সিং এর নাতি জয় সিং প্রথম, ঔরঙ্গজেবের রাজত্বকালে ওই মন্দিরের দেখরেখ করতেন৷ সেই সময়ে ঔরঙ্গজেব শিবাজিকে বন্দি করেন৷ ওই জয় সিং প্রথম, শিবাজিকে পালিয়ে যেতে সাহায্য করেন।  আর্ক রাইভাল শিবাজিকে হাতে পেয়েও রাখা গেল না, এই রাগে ঔরঙ্গজেব মন্দিরটা ভাঙেন, সম্রাটের খেয়াল।  আবার এই ঔরঙ্গজেবই কামাখ্যার মন্দিরে অর্থ এবং জমি দিয়েছিলেন, তা কামাখ্যা মন্দিরের এক স্তম্ভে সংস্কৃত ভাষায় ১৫ টা বাক্যে লেখা আছে।  লেখা আছে,  ‘The ruler of the country visited the temple in 1674 and gave heavy grants to the temple, both in form of land and money’,” দেশের শাসনকর্তা, ১৬৭৪ এ মন্দিরের জন্য জমি এবং অর্থ প্রদান করেছিলেন।  এই মন্দির ভাঙা, মসজিদ ভাঙা, অন্য ধরণের উপাসনালয় ভাঙা এসবই ছিল এক ধরণের স্বৈরতান্ত্রিক কাজ কারবার৷ এর সঙ্গে ধর্মের যোগাযোগ কম, অর্থ, প্রতিপত্তি এবং স্বৈরাচারের যোগাযোগই বেশি। 

বৌদ্ধ রাজারা হিন্দু মন্দির ভেঙেছেন, হিন্দু রাজারা গুঁড়িয়ে দিয়েছে বৌদ্ধ মঠ, মন্দিরে থাকত রাশি রাশি সোনা, সম্পদ, তা লুঠ করতে এসে মন্দির ভেঙেছে বহু মুসলমান সম্রাট।  এসবই মধ্যযুগীয় ইতিহাস।  হ্যাঁ মধ্যযুগ। আধুনিক শাসন ব্যবস্থা নয়, গণতান্ত্রিক কাঠামো নয়, মধ্যযুগে ঘটেছে এসব।  আজ আমাদের প্রায়োরিটি স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল, চাকরি, শিল্প, বিদ্যুৎ।  তার মধ্যে আরএসএস – বিজেপি অযোধ্যা চেয়ে বসল।  ঐখানেই রাম জন্মেছিলেন, ঐখানেই হবে রাম মন্দির, মন্দির ওঁহি বনায়েঙ্গে।  এই দাবি নিয়ে সারা দেশে আগুন লাগানো হল।  সেই সময় আমাদের সংসদ এক আইন পাস করল, ১৯৯১ সালে দেশের উপাসনাস্থল নিয়ে এক আইন। তাতে বলা হল ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট যেখানে মন্দির ছিল, সেটা মন্দিরই থাকবে, যেটা মসজিদ ছিল সেটা মসজিদ থাকবে, যেটা চার্চ ছিল সেটা চার্চ।  মোদ্দা কথা হল মন্দির মসজিদ চার্চ যা ছিল সেটাই থাকবে কেবল অযোধ্যাকে বাদ দিয়ে৷ ওটা নিয়ে আদালতে মামলা চলছে, আদালত যা বলবে, সেটাই মেনে নেওয়া হবে। 

কেন এমন আইন আনা হল? কারণ আরএসএস – বিজেপির স্লোগান ইয়ে তো পহলি ঝাঁকি হ্যায়, কাশী মথুরা বাকি হ্যায়।  তার ও পরে স্লোগান এসেছে ৩ নহি ইয়ে তিশ হাজার, তেতিশ করোড় হিন্দু অবতার।  মানে অযোধ্যাই শেষ নয়, এরপরে আরও আছে।  আসলে তো এটা মন্দির বানানো, হিন্দু ধর্মের বিষয় ছিল না, এটা ছিল আরএসএস–বিজেপির রাজনীতি, কাজেই ইস্যুকে জিইয়ে রাখতেই হবে।  সেই জন্যেই কাশী মথুরা কেবল নয় আরও নাকি ৩০ হাজার এমন মন্দির ভাঙা হয়েছে, আরএসএস – বিজেপি সেগুলোর ইস্যু তুলেছিল।  দেশের সরকার সেটাকে আটকাতেই আইন এনেছিল, বেশ অযোধ্যা ইস্যু নিয়ে আইনি লড়াই চলুক কিন্তু আর কোনও মন্দির মসজিদ ঝালা বরদাস্ত করা হবে না।  ৪৭ থেকে যেখানে যা ছিল, সেরকমই থাকবে দেশের উপাসনালয়।  এবার হঠাৎই কাশীতে ওই জ্ঞানবাপি মসজিদের সামনে কিছু মহিলা জড়ো হল, তারা প্রতিদিন সেখানে, মানে মসজিদের ভেতরে পুজো করবে।  কেন? কারণ সেখানেই তাঁদের দেবী আছেন।  এদিকে ৯১ এর উপাসনালয় আইন আছে, কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট এই মহিলাদের আবেদন সরাসরি খারিজ না করে বলল, নিম্ন আদালতে বিষয়টির বিচার হোক।  নিম্ন আদালতের রায় এল৷ রায়ে বলা হল, ৯১ এর উপাসনালয় আইনে মন্দিরকে মসজিদ বা মসজিদকে মন্দির করা যাবে না বলা হয়েছে৷ কিন্তু মসজিদে পুজো করা যাবে না এমন তো বলা হয়নি।  অতএব ওই মহিলারা পুজো করবেন, ব্যস হর হর মহাদেও।  আবার একটা ইস্যু সামনে এসে গেল৷

আবার এই জ্ঞানবাপি মসজিদ ভাঙার স্লোগান উঠবে, আবার করসেবা, আবার রথযাত্রা, আবার দেশ জুড়ে আগুন।  ৫/৭/৮ বছর পর আবার অন্য কোনও মন্দিরের ইস্যু সামনে আসবে, আসবেই।  কারণ এটা তো ধর্মের বিষয় নয়, এটা আরএসএস–বিজেপির রাজনীতি।  এই ইস্যুতে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো যদি বিরোধিতা করে, তাহলে বলা হবে দেখুন ওরা হিন্দু বিরোধী, ওরা মুসলমান তোষণ করছে, যদি না করে তাহলে তো আরও মজা।  এবং কী আশ্চর্য তাকিয়ে দেখুন এই মহান গণতান্ত্রিক দেশের দিকে, এখনও কোনও বিরোধী দলের ঘুম ভাঙেনি, এখনও কেউ সোচ্চারে প্রতিবাদে মাঠে নামেননি, হিন্দু ভোট হারানোর ভয়ে তাদের অসহায়তা মুসলমান মৌলবাদকে বাড়তে সাহায্য করবে, মুসলমান বন্ধু নাগরিকরা ভাববেন তাঁদের পাশে তো রয়েছে আসাউদ্দিন ওয়েইসি।  অতএব এইটা হল নবতম চিত্রনাট্য৷ দেশজোড়া আগুন লাগাবার ব্যবস্থা মোটামুটি পাকা এবং সেই আগুনে প্রথম ঘৃতাহুতি দিল দেশের জুডিসিয়ারি, বিচার ব্যবস্থা।

এবার আসুন আলোচনা করা যাক কেন এই চিত্রনাট্য, কারণ বেশ তো চলছে দেশ, বিজেপির জয়জয়কার সর্বত্র, গোয়াতেও কংগ্রেস ভেঙে গেল। তাহলে? না এমনি এমনি নয়, কোথাও একটা অন্য সুর বাজছে, বেসুরো সেই সুর শুনেছেন নাগপুরের গুরুজীও। ২০২৪ এ  বাংলা, বিহার, ঝাড়খন্ড, কর্ণাটক থেকে যে জমি হারাচ্ছে বিজেপি, সেই জমি উদ্ধার হবার বিশেষ কোনও জায়গা নেই৷ এক তেলেঙ্গানা ছাড়া বিজেপির আসন বাড়তে পারে এমন কোনও রাজ্য নেই, কাজেই পশ্চিম আকাশে আসন্ন ঝড়ের ইঙ্গিত তাঁরা পেয়েছেন।  বুঝেছেন বাংলায় ১৮ দুরস্থান ৩ পেলেও হয়, বিহারে ভরাডুবি হবেই, আরজেডি, জেডিইউ, বাম কংগ্রেস মিলত জোট বিহারের  ৯০% আসন পাবে।  দিল্লি এবার সাতে সাত হবে না, ঝাড়খন্ডে আসন কমবেই, কেওলমাত্র আঞ্চলিক দলগুলোর কাছে কমবেশি ৮০/৯০ টা আসন খোয়াবে বিজেপি।  আর সেটাকে রুখতে হলে, আবার দেশজোড়া দাঙ্গা চাই, লাশ চাই, আগুনে পোড়া ঘর চাই, হিন্দু মুসলমান তীব্র মেরুকরণ চাই, আর কোন ইস্যুতে ভোট পাবে বিজেপি? অর্থনীতি বেহাল, বেকারত্ব আকাশ ছুঁয়েছে, মুল্যবৃদ্ধি মানুষের নাভিশ্বাস তুলে দিচ্ছে, সম্পদ, আয়ের এমন পাহাড় প্রমাণ বৈষম্য আগে কোনওদিন ছিল না।  এমন কি দেশপ্রেমের আধুলিও চালানো সম্ভব নয়, চীনের সামনে হাঁটু মুড়ে বসে থাকা সরকার দেশপ্রেমের কথা বলতে পারে না, ইংলন্ডের মহারানীর মৃত্যুতে দেশে জাতীয় শোক ঘোষণা করার পরে দেশপ্রেমের মেকি স্লোগান কাজে দেবে না।  কেবল একটাই উপায় দেশকে হিন্দু মুসলমানে ভেঙে দাও৷

কেবল কাশী কেন? মথুরা সমেত ৩০ হাজার মন্দিরের কথা মনে করাও হিন্দুদের, স্লোগান দাও অভি না জিসকা খুন না খৌলে, খুন নহিঁ ওহ পানি হ্যায়।  আছে মথুরা।  ১০১৬-১৭ তে মথুরার মন্দির ধ্বংস করেছিলেন মাহমুদ গজনি।  প্রচুর সোনা রুপো লুঠ করে নিয়ে গিয়েছিলেন ওই মন্দির থেকে।  আবার মন্দির তৈরি হয়, আবার সে মন্দির ভাঙে, লুঠপাট করে দিল্লির সুলতান সিকন্দর লোদী, ষোড়শ শতাব্দীর কথা।  এরপর আবার মন্দির তৈরি হয়।  ফরাসি পর্যটক টাভের্নিয়র লিখছেন ১৬১৮তে বুন্দেলার রাজা বীর সিং প্রচুর টাকা খরচ করে বিরাট মন্দির আবার তৈরি করেন।  মুঘল রাজসভাতেও এই মন্দিরের চর্চা হত  শাহজাহান সেই সময়ে করমুক্ত করেন ওই এলাকার মানুষকে শুধু তাই নয় তিনি ওই এলাকায় শিকারের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেন, তাঁর বড় ছেলে দারাশুকো এই মন্দিরের জন্য এক বিরাট সুন্দর রেলিং তৈরি করে দেন।  দারাশুকোকে হত্যা করে ঔররঙ্গজেব ক্ষমতায় বসেই ওই রেলিং ভেঙে দেন, তাঁর সেনাপতি আবদুল নবি খান ওই রেলিং ভাঙার পর জাঠ হিন্দুরা খেপে গিয়ে আবদুল নবি খানকে হত্যা করে।  ১৬৬৯ এ।  এরপর ঔরঙ্গজেব ওই মন্দির ভেঙে সেখানে শাহী ইদগাহ বানান।  এটা ইতিহাস।  তারপরে ওই মথুরা তে বহু মন্দির তৈরি হয়েছে, কিন্তু এখন বিশ্ব হিন্দু পরিষদ বজরং দলের চোখ ওই মসজিদের দিকে, তারা  ঔরঙ্গজেবের মত হিংস্র, সাম্প্রদায়িক হয়ে উঠতে চান।  আমরা শুনেছিলাম, যখনই প্রশ্ন ওঠে বস্ত্র কি খাদ্য, সীমান্তে বেজে ওঠে যুদ্ধের বাদ্য।  এখন তার সঙ্গে যোগ হয়েছে এই মন্দির পুনরুদ্ধারের হুঙ্কার, অপেক্ষা করুন এখানেও বিজেপির নজর পড়বে ঠিক সময়ে।  এবং তারপর পরিচিত জায়গা তো আছেই, ফিফথ কলামনিস্টরা আছে, শিরদাঁড়া বিকিয়ে দেওয়া গোদি মিডিয়া আছে, এমন কি হাতে এসে গেছে বিচার ব্যবস্থাও।  সমস্ত দেশটাকে এক নরকে পরিণত না করা পর্যন্ত আরএসএস – বিজেপি ছাড়বে না।  আর ঠিক এই জায়গাতেই সমস্ত আপাত বিরোধ ভুলে গণতান্ত্রিক ধর্মনিরপেক্ষ মানুষজনকে ঐক্যবদ্ধ হতেই হবে, এটাই সময়ের দাবি।

Tags : 4th Pillar Of Democracy Ayodhya Mathura Kashi BJP জ্ঞানবাপি মসজিদ

0     0
Please login to post your views on this article.LoginRegister as a New User

শেয়ার করুন


© R.P. Techvision India Pvt Ltd, All rights reserved.