০৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৩, বুধবার,
1
2
3
4
5
6
7
8
9
10
11
12
K T V Clock
১৯৯৮ সালের ১ জানুয়ারি এই বাংলায় জন্ম নিয়েছিল তৃণমূল দল
Fourth Pillar: ২৫ বছর তৃণমূলের, ২৫ বছর বিজু জনতা দলের, পর্ব - ১
কলকাতা টিভি ওয়েব ডেস্ক
কলকাতা টিভি ওয়েব ডেস্ক Published By:  কৃশানু ঘোষ
  • আপডেট সময় : ১০-০১-২০২৩, ১০:৩০ অপরাহ্ন

১৯৯৮ সালের ১ জানুয়ারি এই বাংলায় জন্ম নিয়েছিল তৃণমূল দল, এখন তার নাম অল ইন্ডিয়া তৃণমূল পার্টি। ১৯৯৭-এর ২৬ ডিসেম্বর ওড়িশায় জন্ম নিয়েছিল বিজু জনতা দল। দুটো আলাদা প্রেক্ষিতে, দুটো আলাদা রাজনৈতিক অবস্থান থেকে। ২৫ বছর পার করল দুটো দলই, আসুন দেখা যাক দুই দলের ইতিহাস। আসলে এই দুটো দল তৈরি হয়েছিল তাদের নিজেদের রাজ্যের রাজনীতির পথ ধরেই, কিন্তু এই দুটো কেন? সেই সময়ের প্রত্যেক আঞ্চলিক দল, তাদের জনপ্রিয়তা, তাদের কংগ্রেস বিরোধিতা, কমিউনিস্ট বিরোধিতাকে কাজে লাগিয়েই বিজেপির উত্থান। বিজেপির উঠে আসাকে সুনিশ্চিত করার এক নীল নকশা কাজ করছিল, এক গোপন ষড়যন্ত্র, দীর্ঘ সময় ধরে সে পরিকল্পনায় বহু মানুষ শামিল ছিলেন, ছিল আরএসএস। ছিল বিজেপির প্রমোদ মহাজনের মতো নেতারা, যারা সাংগঠনিক, আর্থিক সাহায্য নিয়ে হাজির ছিলেন। কিন্তু সে নীল নকশা মাঝপথেই কীভাবে ভেঙে পড়ল, কেন ভেঙে পড়ল, তা নিয়েও আলোচনা করব। প্রথমে দেখা যাক, সেই সময়ে দেশের কোন আঞ্চলিক শক্তির সঙ্গে কেমন সম্পর্ক ছিল জনতা দলের। তাদের পাশে পূর্ণ সমর্থন নিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন চন্দ্রবাবু নাইডু, ৯৮ এর সাত মাসের, ৯৯ এ পাঁচ বছরের অটল বিহারী সরকারকে বাইরে থেকে, কিন্তু প্রায় নিঃশর্ত সমর্থন দিয়েছিল তেলুগু দেশম, শর্ত একটাই, রাজ্যের জন্য টাকা চাই, প্রকল্প চাই। কমিউনিস্ট পার্টিগুলোর বাইরে থেকে সমর্থন তাঁর মনে ধরেছিল, এবং মন্ত্রিত্ব চাই না, কারণ কেন্দ্রে ক্ষমতাবান মন্ত্রী হয়ে তাঁর নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করবে, এটাও চন্দ্রবাবু নাইডু চাননি। ওধারে এআইডিএমকে, পরে ডিএমকে, তাদের নিজেদের রাজনৈতিক বিরোধিতা তো রাজ্যের রাজনৈতিক সমীকরণ মেনেই চলে, কাজেই ৯৮-এ জয়ললিতা সমর্থন তুলে নেবার পরে ৯৯তে বিজেপি সমর্থন পেল করুণানিধির, সমর্থন ছিল দেশের সবথেকে পুরনো ধর্মীয় ভিত্তিতে কংগ্রেস বিরোধিতার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা দল, শিরোমণি অকালি দলের। স্বাভাবিক সমর্থন ছিল শিবসেনার। সমর্থন ছিল জেডিইউ, সমতা পার্টির। এবং এসব আঞ্চলিক দলগুলোর সমর্থনের ভিত্তি গড়ে উঠেছিল ৯৮-এর ঢের আগে থেকে। সেই সময় থেকেই আরএসএস–বিজেপির চোখ ওড়িশার দিকে, সেখানে আদিবাসী অঞ্চলে আরএসএস-এর ভাল প্রভাবও ছিল, কিন্তু কংগ্রেসের বিরোধিতায় বিজু পট্টনায়কের উৎকল কংগ্রেস, এবং রাজ্যে তেমন নেতা না থাকায়, বিজেপি বিজু পট্টনায়কের পেছনেই থাকত। পরে জনতা দল তৈরি হবার পরে বাজপেয়ী, বিজু সখ্য বজায় ছিল।। বিজু পট্টনায়ক মারা গেলেন ৯৭-এর জুলাই, কেবল ৬ ফুট চার ইঞ্চির মানুষ নন, ইনিই নিজে প্লেন চালিয়ে ইন্দোনেশিয়ার সামরিক অভ্যুত্থানের মধ্যেই রাষ্ট্রপতি সুকর্ণকে রাজধানী জাকার্তা থেকে উড়িয়ে নিয়ে চলে এসেছিলেন দিল্লিতে, কো পাইলটের আসনে বসেছিলেন বিজুবাবুর স্ত্রী। আমাদের এখানে যেমন জ্যোতিবাবু, ওড়িশায় তেমনই বিজুবাবু, কাকা নয়, দাদা নয়, জেঠু নয়, স্রেফ বাবু। এক লিজেন্ড, এক রূপকথা। বিজু পট্টনায়ক যখন মারা গেলেন তখন তাঁর উৎকল কংগ্রেসে, পরে জনতা দলের বড় বড় সব নেতা, শ্রীকান্ত জেনা, দিলীপ রায়, বিজয় মহাপাত্রেরর মতো নেতারা। নবীন পট্টনায়ক, বিদেশে মানুষ, ওড়িয়া ভাষাতে এখনও, হ্যাঁ এখনও স্বচ্ছন্দ নন।  দিল্লিতে সাইকোডেলহি নামে এক ফ্যাশন ব্যুটিক চালাতেন, তাঁর বন্ধু রোলিং স্টোনের মিক জাগার, জ্যাকলিন কেনেডি, অভিনেতা রবার্ট ডি নিরো, তিনি বছরে তিন চার বার বিদেশে যেতেন, ঘুরতে ভালোবাসতেন, বই পড়তে ভালবাসেন, বই লিখেছেন। গুজরালের মন্ত্রিসভা পড়ে গেল, এরাপল্লি প্রসন্নের মতো রাজনীতির বল ঘুরছে। নবীন পট্টনায়কের দিদি, দাদা কেউই রাজনীতিতে আসতে চাইছিলেন না। ওদিকে দলে বিজুবাবু নেই, কিছু লোক বিজেপির সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন, শ্রীকান্ত জেনা, বিজয় মহাপাত্র, দিলীপ রায়ের মতো নেতারা চাইছেন বিজেপির সঙ্গে যোগ না দিয়ে আঞ্চলিক দল হোক। বিজুবাবুর ছোট ছেলেকে সামনে রাখা হোক, পরে ক্ষমতা হাতে নেওয়া যাবে। ইতিমধ্যে বিজুবাবুর আসন আস্কা থেকেই লোকসভার আসন জিতেছেন নবীনবাবু। বিজেপিতে যোগ না দিয়ে বিজেডি তৈরি হল, নেতা নবীন পট্টনায়ক, নতুন দল তৈরির পয়সা জোগালেন প্রমোদ মহাজন। কংগ্রেসের বিরুদ্ধে আঞ্চলিক দলের থিওরি। দলের প্রথম দিনের বৈঠকে হাজির থাকলেন বিজেপি নেতা সাংসদ শত্রুঘ্ন সিনহা। বিজু পট্টনায়ক এমনিতে ওড়িশার এক লিজেন্ড ফিগার বটে, কিন্তু তাঁর নির্বাচনী সফলতা তেমন কিছু ছিল না, ৫০ বছরের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে তিনি ৪০ বছরই বিরোধী নেতা ছিলেন, ১০ বছর মূখ্যমন্ত্রী। উল্টোদিকে শিল্পপতি বিজু পটনায়কের ছেলে হিসেবে নবীন পট্টনায়ক জন্মেছিলেন রুপোর চামচ মুখে নিয়েই। রাজনীতিতে এসেই আস্কা থেকে বিপুল মার্জিনে জেতা, অটল বিহারী মন্ত্রিসভায় মন্ত্রী হওয়া, এবং ২০০০ সালেই ১৪৭-এর মধ্যে ৬২টা বিধানসভার আসন জিতলেন, বিজেপির সমর্থনে মুখ্যমন্ত্রী হলেন, এক সোশালাইট নবীন পট্টনায়ক মানুষকে বললেন, ‘আপনাকারা জবরদস্ত সাপোর্ট লাগি মুই আপনাকারা আভারি’-- তিনি এইটুকু ওড়িয়া বলতেও দু’বার কাগজ দেখেছিলেন। এখনও ভুবনেশ্বরে বিজু পট্টনায়কের তৈরি বিশাল প্যালেসে থাকেন, ডানহিল সিগারেট খান, ২২০০০ টাকা দামের ফেমাস গ্রাউজ হুইস্কি খান। কিন্তু মজার কথা সেই থেকে আজ অবধি তিনি ওড়িশার আম আদমির হৃদয় সম্রাট, তিনি ক্ষমতায় এসেই পেয়েছিলেন এক আমলা প্যারিমোহন মহাপাত্র, তিনি প্রায় হাতে ধরে শিখিয়েছিলেন রাজনীতির জটিল ছক। প্রথমেই ওইসব বিরাট নাম, যারা নবীনবাবুকে সামনে রেখে ক্ষমতার স্বাদ পেতে চেয়েছিলেন, তাঁরা একে একে শুধু বাদই গেলেন না মুছে গেলেন। তখনও বিধানসভায় নবীনবাবুর বিজেপির সমর্থন দরকার কাজেই উনি বিজেপির সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখলেন। ২০০৪-এও আবার বিজেপির সঙ্গেই বিধানসভা দখল এবং মুখ্যমন্ত্রিত্ব। এরমধ্যে দুটো ঘটনা ওড়িশার রাজনীতিকে পালটে দিল, প্রথমটা ছিল আরএসএস আর আগ্রেসিভ পলিসি, তাঁরা খুব দ্রুত আদিবাসীদের মধ্যে ছড়িয়ে যেতে চাইছিলেন, তাদের সমর্থনে সরকার চলছিল, কাজেই সরকার প্রশাসনের সুযোগও তারা পাচ্ছিলেন। কিন্তু ক্রিস্টান মিশনারি আর মাওয়িস্ট মুভমেন্ট, এই দুটো ছিল তাদের সামনে বড় সমস্যা। তারা প্রশাসনকে দিয়ে মাওয়িস্ট মুভমেন্ট আর বজরং দল, বনবাসী আদাবাসী সমিতি ইত্যাদিদের দিয়ে ক্রিস্টান মিশনারিদের সামলানোর ছক কষলেন। এই প্রেক্ষিতেই ২০০৮-এ বিজেপির সঙ্গে তিক্ততা শুরু হল, ২০০৮ এই কান্ধামাল রায়ট, এবং ২০০৯-এ লোকসভা এবং বিধানসভার নির্বাচনে বিজেডি, বিজেপি জোট ভেঙে গেল। বিজেডি একাই ১৪টা লোকসভা আসন পেল আর বিধানসভা সুইপ করল, ১৪৭ এর মধ্যে ১০৩, তৃতীয়বারের জন্য মুখ্যমন্ত্রী হলেন নবীনবাবু। কিন্তু এরমধ্যেই ওড়িশাতে তাদের সংগঠন বাড়িয়েছে বিজেপি। কিন্তু নবীন পট্টনায়ক বা বিজেডি কেউই কেন্দ্রে থাকা সরকারের সঙ্গে খুব বিরোধের রস্তায় গেলেনও না। কেন্দ্রে কংগ্রেস সরকার, ইউপিএতেও নেই, এনডিএতেও নেই বিজেডি। ২০১৪, আবার খেল দেখালেন নবীনবাবু, লোকসভায় ২১টার মধ্যে ২০টা আসন, বিধানসভায় ১৪৭-এ ১১৭, আবার সুইপ। ওদিকে ২০১২তেই প্যারিমোহন মহাপাত্র নাকি তাঁর ঘুঁটি সাজাচ্ছিলেন, মুখ্যমন্ত্রী হওয়া ইস্তক নবীনবাবুর প্রথম বিদেশ যাত্রা, ইংল্যান্ড ভ্রমণের মাঝপথেই সেই খবর এল, তিনি দেশে ফিরলেন এবং প্যারিমোহন মহাপাত্রকে দল থেকে বের করে দিলেন। অনেকে বলে প্যারিমোহন মহাপাত্র বিজেপির সঙ্গে মিলে অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা করেছিলেন, এটাও একটা বড় কারণ ছিল বিজেডি-বিজেপি সম্পর্ক খারাপ হবার। এরপর থেকে বেশ চলছিল, নবীনবাবু রাজ্যের জন্য টাকা চান, বিরোধ চান না, কাজেই এনডিএ ক্ষমতায়, নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী, কিন্তু তেমন বিরোধিতা নেই। ২০১৯-এ কিন্তু লোকসভায় আগের ৮টা আসন খুইয়ে বিজেডি, ২১ এ ১২, যদিও বিধানসভায় যাবতীয় অ্যান্টি ইনকমব্যান্সির তত্ত্ব ছুড়ে ফেলে ১৪৭-এ ১১২টা আসন পেল বিজেডি, আবার মুখ্যমন্ত্রী আপাতত বয়স ৭৬। কিন্তু এই ২০১৯-এই তিনি টের পেলেন ঘাড়ের ওপর বিজেপি নিঃশ্বাস ফেলছে, কংগ্রেস নয়। বিজেপি ঠিক করেছিল আঞ্চলিক দলগুলোকে দিয়ে কংগ্রেস হাটাও, কমিউনিস্ট হাটাও, তারপর সেই বিরোধিতার জায়গা দখল করো, তারপর ক্ষমতা। সেই নীল নকশার গোপন ষড়যন্ত্র আজ নবীন পট্টনায়কের সামনে, সামনে বলেই নবীনবাবু তাঁর বিজেপি বিরোধিতার সুর চড়াচ্ছেন, ক্রমশ আরও তীব্র বিরোধিতা, যা তিনি করতেন না এতদিন, খুব বেশি জেলায় জেলায় ঘোরা ইত্যাদি। সে নিয়ম পালটে তিনি জেলায় জেলায় যাচ্ছেন, রাজ্যের ক্ষমতা ধরে রাখতেই নয়, সাংসদ সংখ্যাও বাড়ানো তাঁর নজরে আছে। আগামী ২০২৪, বিধানসভা এবং লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির চোখ ওড়িশার দিকে আছে, গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীপদ দেওয়া হয়েছে ওড়িশার সাংসদদের, রাষ্ট্রপতি ওই রাজ্য থেকেই। এ বাংলার মুখ্যমন্ত্রীর এক্কেবারে বিপরীত চরিত্র নবীনবাবুর, অনেক বেশি আমলা-নির্ভর, জাতীয় রাজনীতিতে অন্তত এতদিন খুব কম ভূমিকা নেওয়া, অত্যন্ত সফটস্পোকেন, এবং দুর্নীতির থেকে নিজেকে ১০০ হাত দূরে রাখা নবীনবাবুর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার কার? কে নেবেন জায়গা? আপাতত তাও ধোঁয়াশার মধ্যে, অকৃতদার স্বল্পবাক নবীন পট্টনায়কের মন্ত্রিসভায় দুর্নীতি নেই তা নয়, কিন্তু তিনি মিঃ ক্লিন, এটা মানুষ জানেন। কিন্তু ২০২৪-এ পাঁচ টার্মের এক ৭৮ বয়সী মুখ্যমন্ত্রী বিজেপির বিরুদ্ধে অল আউট খেলে যদি আবারও ফিরে আসেন, তাহলে কি ওড়িশা ছেড়ে তাঁর জাতীয় রাজনীতিতে ভূমিকা নেবার ইচ্ছে থাকবে? উনি এগোবেন? লাখ টাকার এ প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে সময়ের কাছে, কিন্তু আলোচনা এখানেই শেষ নয়, এবার তুলনা তো আসবেই আরেক ২৫ বছর পার করা তৃণমূল দলের সঙ্গে, তা নিয়ে আলোচনা আগামিকাল।           

Tags : TMC BJD Naveen Pattanayak Odisha তৃণমূল বিজেডি নবীন পট্টনায়ক ওড়িশা

0     0
Please login to post your views on this article.LoginRegister as a New User

শেয়ার করুন


© R.P. Techvision India Pvt Ltd, All rights reserved.