৩০ সেপ্টেম্বর ২০২২, শুক্রবার,
1
2
3
4
5
6
7
8
9
10
11
12
K T V Clock
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তৃণমূল সংসদীয় দলের নেতা নির্বাচিত হলেন
চতুর্থ স্তম্ভ: এবার মুখোমুখি মমতা
  • আপডেট সময় : সেপ্টেম্বর
চতুর্থ স্তম্ভ: এবার মুখোমুখি মমতা

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তৃণমূল সংসদীয় দলের নেতা নির্বাচিত হলেন। আপাতত সংসদের দুই কক্ষ মিলিয়ে তৃণমূল দলের সদস্য সংখ্যা ৩৩, বৃহত্তম বিরোধী দল কংগ্রেসের পরেই তৃণমূল দল, সেই দলের সদস্যরা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে তাঁদের নেতা হিসেবে নির্বাচিত করলেন, বলতেই পারেন, এ আর নতুন কী? তৃণমূল দল মানেই তো মমতা, তাঁকে সংসদীয় দলের নেতা করাটা নতুন কিছু নয়, তৃণমূল নেত্রী চেয়েছেন, তাই হয়েছে।

দিলীপ ঘোষ, শুভেন্দু অধিকারী ইত্যাদিদের মত নাদান পলিটিসিয়ানরা হেসেছেন, না উনি এমপি, না উনি এমএলএ, সংসদীয় দলের প্রধান হয়ে করবেনটা কী? দিলীপ ঘোষ আর একধাপ এগিয়ে বলেছেন, উনি বাংলা সামলান, মোদিজি দিল্লি সামলাবেন, সুজন চক্রবর্তী কী বলেছেন, তা নিয়ে আলোচনা একটু পরে করছি, কেবল একটা তথ্য দিয়ে রাখি, এমপি বা এমএলএ না হয়েও সংসদীয় দলের প্রধান হওয়াটা এই প্রথম নয়, এর আগে ১৯৯৮ এ সোনিয়া গান্ধী, কংগ্রেস সংসদীয় দলের চেয়ারপারসন হয়েছিলেন, এবং সংসদীয় আইনে এমনটা কোথাও লেখাও নেই যে সংসদীয় দলের প্রধানকে এমপি বা এমএলএ হতেই হবে, কাজেই আইনত, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সংসদীয় দলের প্রধান হওয়াটা জায়জ। তিনটে কারণে এই ঘটনা জাতীয় রাজনীতিতে খুব গুরুত্বপূর্ণ, প্রথম হল সময়, কোন সময়ে তিনি সংসদীয় দলের নেতা হলেন? এর আগেও হতে পারতেন, ইন ফ্যাক্ট এর আগে তৃণমূলের সাংসদ সংখ্যা আরও বেশীই ছিল, তখন হননি, এখন হলেন কেন? তার কারণ বলার আগে শোলের সেই মারাত্মক ডায়ালগটা মনে করিয়ে দিই, লোহা গরম হ্যায়, মার দো হথোড়া, সঞ্জীব কুমারের মানে ঠাকুরসাবের মুখের ডায়ালগ, লোহা গরম হ্যায়, মার দো হথোড়া। দিল্লির রাজনীতি এখন গরম, বিভিন্ন ইস্যুতে মোদি নাজেহাল, সেই অস্বস্তি আরও বাড়ানোর জন্য মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় হলেন সংসদীয় দলের প্রধান।

আসুন এই বিষয়টা আরও একটু ভাল করে আলোচনা করা যাক, কারণ ভারতীয় রাজনীতির ইতিহাসে, এই ঘটনা এক টার্নিং পয়েন্ট, এক নতূন সূচনা। কেন? তার তিনটে কারণের প্রথমটা হল সময়। অর্থনীতি, কোভিড এবং পেগাসাস নিয়ে নাজেহাল মোদি সরকার। যাবতীয় আর্থিক প্রতিষ্ঠানের আগাম হিসেব নিকেশ বলছে, খুব তাড়াতাড়ি অর্থনীতির হাল ফিরবে তেমন তো নয়ই, বরং তৃতীয় ওয়েভ যদি লাগামছাড়া হয়, বা তৃতীয় ওয়েভ আটকাতে আবার বড়সড় লকডাউনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়, তাহলে অর্থনীতি আরও বাজে চেহারা নেবে, এবং মাথায় রাখুন সেই একই কোভিডের মধ্যেই বাংলাদেশ থেকে শ্রীলঙ্কার মানুষজনের মাথাপিছু রোজগার, আমাদের চেয়ে বেশী, এবং এটাও মাথায় রাখতে হবে যে কেবল এই কোভিডের জন্যই অর্থনীতির অধঃপতন, তাও নয়, ইনফ্যাক্ট ২০১৬র ডিমনিটাইজেশনের পর থেকেই দেশের অর্থনীতির নীচে নামা শুরু, পরবর্তীতে তাড়াহুড়ো করে জিএসটি লাগু করা, দেশের সম্পদ বিক্রি করতে থাকা, ব্যাঙ্কিং ঘোটালা ইত্যাদি মিলিয়ে অর্থনীতি নেমেছে, নামছে। কোভিড নিয়ে শুরু থেকেই বালখিল্যপনা, ইনফ্যান্টাইল ডিসঅর্ডার, দেশে কোভিড এসে গেছে, উনি ট্রাম্পকে সম্বর্ধনা দিচ্ছেন, যখন ট্রাম্পের নিজের দেশের মানুষ, ট্রাম্পের বিদায় ঘোষণা করছেন, তখন তিনি শ্লোগান দিচ্ছেন অব কি বার ট্রাম্প সরকার, কোভিড বাড়ছে, উনি মধ্য প্রদেশে সরকার ওলটাতে ব্যস্ত। তারপর থালা বাজানো, এবং দুম করে লকডাউন, লক্ষ লক্ষ মানুষের দুর্গতি, মৃত্যু।

কোভিডের দ্বিতীয় ওয়েভ আসছে, স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঘোষণা করছেন, আমরা কোভিড জয় করেছি। দ্বিতীয় কোভিডে মানুষ দেখল গঙ্গার জলে লাশ ভাসছে, প্রধান সেবকের নমামি গঙ্গে প্রকল্পে তখন মানুষের লাশ পচা গন্ধ, অক্সিজেন নেই, মৃত্যু সংখ্যা লুকোনও হচ্ছে। এরমধ্যে আমেরিকা আফগানিস্তান ছেড়ে ঘরের পথে, তালিবানরা হু হু করে এগোচ্ছে, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ভারত একলা, ইউকে থেকে আরব এমিরেটস নিজের স্বার্থ বুঝে ইউ টার্ন নিয়েছে, তালিবানরা আফগানিস্তান দখল করলে, কাশ্মীর পরিস্থিতি ঘোরালো হবে, পাকিস্তান সুযোগ বুঝে গলা চড়াচ্ছে। আর পেগাসাস। দেশ জুড়ে বিভিন্ন স্তরের মানুষের ওপর নজরদারি, রাজনৈতিক নেতা, মন্ত্রী, সমাজকর্মী, মানবাধিকার আন্দোলনের নেতা, বিচারপতির নাম তো আছেই, এবার বার হচ্ছে আরও বড় প্যান্ডোরার বাক্স, নাম বের হচ্ছে বিভিন্ন রাষ্ট্রদূত আর দূতাবাসের কর্মীদের নাম, সবমিলিয়ে ২০১৯ এর প্রবল ক্ষমতাশালী মোদি সরকার আপাতত ল্যাজে গোবরে, সংসদের অধিবেশনে বিরোধী তো বটেই, এমন কি বিহারের মুখ্যমন্ত্রীও এই সুযোগে এক হাত নিয়েছেন, এই আড়িপাতার তীব্র নিন্দা করেছেন। সামনেই ইউপি, পঞ্জাব, হিমাচল প্রদেশ গুজরাট, গোয়ার নির্বাচন। কেবল জিতলেই হবে না, আগের বারের চেয়ে ভালো ফলাফল করতে হবে, না হলে শনি নাচছে কপালে। কেন? একটু পরেই আসছি সেই কথায়, সেই প্রেক্ষাপটে দিল্লিতে মমতা। লোহা গরম হ্যায়, মারদো হথোড়া।

কংগ্রেসের পক্ষে বিরোধী দলকে একজোট করা অসম্ভব, একথা কংগ্রেসও জানে, রাহুল গান্ধী না জানলেও, সোনিয়া গান্ধী তো জানেন। এটাও জানেন যে, বিজেপিকে হঠাতে না পারলে কংগ্রেসের কোনও ভবিষ্যত নেই, তাই কংগ্রেসের টুইটারে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছবি, এ বাংলার আধুলি সিকি কংগ্রেস নেতা, মান্নান সাহেব বা প্রদীপ ভট্টাচার্য বুঝুন বা না বুঝুন, সোনিয়া গান্ধী বুঝেছেন মমতাকে গুরুত্ব দিতে হবে, ২১ জুলাইয়ের ভাষণ শুনতে চলে এলেন চিদম্বরম, তা তো এমনি এমনি নয়। মিলিয়ে নেবেন, ভবানীপুরের উপনির্বাচন, সে যখনই হোক, সূর্য মিশ্র, সুজন ভট্টাচার্যের ইচ্ছে যাই থাকুক, কংগ্রেস ওই আসনে লড়বে না, গান গেয়েই রেখেছেন অধীর চৌধুরি, মানে বলতে চাইছি মমতা সেই বিরোধী জোটের সলতে পাকাতেই দিল্লিতে, বিরোধী প্রত্যেক নেতার সঙ্গে দেখা করবেন, আগামী লড়াইয়ের ছক কষা শুরু।

আর তিনি এখন তৃণমূল সংসদীয় দলের প্রধান, মানে হল এবার থেকে নরেন্দ্রভাই দামোদরদাস মোদিজি, সংসদীয় দলগুলোর বৈঠক ডাকলেই, সেখানে হাজির থাকতেই পারেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, মার্চ এপ্রিল জুড়ে মোদিজি বাংলায় ডেলি প্যাসেঞ্জারি করেছেন, এবার তার উলটো চাল, তৃতীয়বারের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধায় থাকবেন সেই বৈঠকে, তিনি বলে যাবেন, বাকিরা শুনে যাবে যে প্রথা তিনি চালু করেছিলেন, সেই প্রথার দফারফা। চোখে চোখ রেখে সামনে বাংলার মেয়ে, লড়াই এবার সমানে সমানে। আর বলেছিলাম এ নিয়ে সুজন চক্রবর্তী কী বলছেন, কী ভাবছেন, তা নিয়েও দুটো কথা বলবো, আসুন সেই কথায়।

২৫ জুলাই, রবিবার পানিহাটি লোকসংস্কৃতি ভবনের বাতানুকূল অডিটোরিয়ামে তিনি ভাষণ দিচ্ছিলেন, তিনি বললেন, ‘আরএসএস নিয়ন্ত্রিত বিজেপি চলছে সাম্প্রদায়িক ও ফ্যাসিবাদী কৌশলে, প্রধান শত্রু হিসেবে বিজেপিকে চিহ্নিত করে সংগ্রাম জারি রেখেছে, সিপিআইএম এবং বামপন্থীরা। কিন্তু মমতা ব্যানার্জিকে সামনে রেখে, বিজেপি বিরোধী ফ্রন্ট মানে আসলে বিজেপিকে সুবিধে করে দেওয়া’, হ্যাঁ হুবহু এই কথা তিনি বলেছেন, গণশক্তিতে ছাপাও হয়েছে। তিনি আরও বলেন, ‘সারা বিশ্বে দক্ষিণপন্থার প্রভাব বেড়েছে, ভারতেও তার প্রতিক্রিয়া পড়েছে, যার দরুণ কেন্দ্রে বিজেপি সরকার, আর রাজ্যে আসীন তৃণমূল কংগ্রেস সরকার।’ তাঁর ভাষায়, ‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আসলে সমঝোতাকারী শক্তি।’ তিনি যা বললেন, সেটাই রাজ্য নির্বাচনের আগে সিপিআইএম বলেছিল, সেই বিজেমূলের তত্ত্ব তিনি রবিবার সন্ধ্যেয় আবার সদস্যদের সামনে আওড়ালেন মাত্র, যদিও ক’দিন আগেই রাজ্য সম্পাদক, পলিটব্যুরো সদস্য সূর্যকান্ত মিশ্র বলেছিলেন, বিজেমূল তত্ত্ব ঠিক নয়, ওটা বলা আমাদের উচিত হয়নি, মানুষ তা বিশ্বাস করেনি। ওদিকে আবার প্রবীণ সিপিএম নেতা, পলিটব্যুরো সদস্য বিমান বসু, পূর্ব মেদিনীপুরে রাজ্য কমিটি সদস্য, নির্মল জানার শোকসভায় গিয়ে বললেন, ‘কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী, কচ্ছ থেকে কোহিমা পর্যন্ত কোনও আন্দোলন সংগ্রামের প্রশ্ন দেখা দিলে বিজেপি বিরোধী সব শক্তির সঙ্গে, আমরা কিন্তু একজোট হয়ে কাজ করতে প্রস্তুত।’ এসবের থেকে প্রমাণিত হয়, রাজ্য সিপিএম দল এখন গড়াগাছা সংসদ ক্লাবের চেয়েও অগোছালো ভাবে চলছে, কে যে কী বলছেন, কেন বলছেন তা কারোরই জানা নেই। আচ্ছা সুজনবাবু, এটা দেশের একটা মানুষকেও বিশ্বাস করাতে পারবেন যে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দিল্লি যাচ্ছেন, বিজেপির সঙ্গে সমঝোতা করার জন্য। তৃণমূল দল দিল্লিতে যা করছে, বা মমতা ওখানে গেলে যে বৈঠক করবেন, তা বিজেপিকে সুবিধে করে দেবার জন্য করবেন, এটা মানুষ বিশ্বাস করবে? সুজনবাবু নিজেও জানেন, এটা সত্যি নয়। তাহলে বলছেন কেন? আসলে এ রাজ্যে সিপিএমের রাজনীতি টিঁকেই রয়েছে তীব্র মমতা বিরোধীতাকে সম্বল করে, আর কিচ্ছু নয়। কোনও বাম রাজনীতি নয়, কোনও আদর্শ নয়, কোনও সুস্থ চিন্তাও নয়, এক এবং একমাত্র সম্বল চূড়ান্ত ও তীব্র মমতা বিরোধিতা। আর সেই বিরোধিতার চেহারা আমরা গত রাজ্য নির্বাচনে দেখেছি, তারপরে নির্মম হার, এবং তার থেকে তৈরি ডিপ্রেসন, হতাশা গ্রাস করেছে সুজনবাবুদের। খুব তাড়াতাড়ি এর থেকে তাঁরা মুক্তি পাবেন বলেও মনে হয় না। এরপর কবীর সুমনের গানের সেই গানের লাইনের মত,

এক মুখ দাড়ি গোফ,

অনেক কালের কালো ছোপ ছোপ,

জট পরা চুল এ তার উকুনের পরিপাটি সংসার,

পিচুটি চোখের কোনে দৃষ্টি বিস্মরণে মগ্ন,

বাবু হয়ে ফুটপাথে একা একা দিন রাত রঙ্গে,

দেখা যাবে ওনাদের, ওনারা তখন, সাপলুডো খেলবেন বিধাতার সঙ্গে।

Tags :

শেয়ার করুন


© R.P. Techvision India Pvt Ltd, All rights reserved.