০৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৩, বুধবার,
1
2
3
4
5
6
7
8
9
10
11
12
K T V Clock
রক্তে যাদের দেশদ্রোহিতা
চতুর্থ স্তম্ভ: বিগ বস, সব দেখছে
  • আপডেট সময় : সেপ্টেম্বর
চতুর্থ স্তম্ভ: বিগ বস, সব দেখছে

রক্তে যাদের দেশদ্রোহিতা। যাদের হাতে জাতির জনকের রক্তের দাগ। যাদের এন্টায়ার পলিটিকাল সায়েন্স পাশ করা মিথ্যেবাদীই সর্বোচ্চ নেতা। যিনি প্রতিদিনই অজস্র মিথ্যে বলেন, যে দল দেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির কাছে এক বিপদজনক সংগঠন। যে দল দেশের সংবিধানকে তছনছ করতে চায়। কয়েকজন ফড়ে শিল্পপতির কাছে বিক্রি করে দিতে চায় দেশের জল জঙ্গল, জমিন, নদী বন্দর থেকে এয়ারপোর্ট, সেই দলের কাছে নৈতিকতার ন্যূনতম আশা আমাদের নেই। থাকার কথাও নয়। কিন্তু এটাও সত্যি যে, আমরা কেউই ঘূর্ণাক্ষরেও ভাবিনি যে দেশের রাজনৈতিক নেতা, শিল্পপতি, সাংবাদিক, সমাজকর্মী, এমন কি নিজের দলের নেতা মন্ত্রীদের ওপরেও নজরদারি চলবে। আর ক্রমশঃ দাড়ি বাড়িয়ে চলা এক চায়ওয়ালা কাম চৌকিদার, দেশের পয়সা খরচ করে সেই নজরদারির ব্যবস্থা করবে! না এতটা আমাদের কল্পনাতেও ছিল না। জানা ছিল নজরদারি চলছে, সে তো সরকারি ব্যবস্থাই আছে, আইবি আছে, ইন্টলিজেন্স বিভাগ, যারা প্রতিদিন বিভিন্ন নেতাদের কাজ কর্মের ওপর নজর রাখে। বিভিন্ন দলের রাজনৈতিক কর্মসূচির ওপর নজরদারি করে। এসব তো ছিলই। কিন্তু মোবাইল দখল করে, একটা মানুষের ব্যক্তিগত মুহূর্তগুলোর ওপরেও, নজরদারি চালাচ্ছেন দেশের প্রধানমন্ত্রী, এতটা আশা বোধহয় কেউ করেননি।
কিন্তু সেটা হচ্ছে, এদিকে সরকার বাহাদুর সঙ্গে সঙ্গে বিরোধীদের দেশবিরোধী বলা শুরু করে দিয়েছে। তাদের বক্তব্য, বে আইনী ভাবে কোনও নজরদারি হয়নি। খেয়াল করুন, দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আইটি মিনিস্টার, প্রধান সেবক কেউই বলছেন না যে পেগাসাস কেনা হয়নি। বলছেন না যে তাই দিয়ে নজরদারি হয়নি। বলছেন, বে আইনীভাবে নজরদারি হয়নি। তার মানে যা হয়েছে সেটা সরকারিভাবেই হয়েছে, এবং জোর দিয়েই সরকার বলছে, বিরোধীরা সরকারকে কাজ করতে দিতে চায় না, তাই এইসব অভিযোগ করছে।
এদিকে বিশ্বের, হ্যাঁ কেবল আমাদের দেশের নয়, সারা বিশ্বের ৪০টা সংবাদ সংস্থা, দ্য গার্ডিয়েন, লা মঁদ, ওয়াশিংটন পোস্ট, ভারতের দ্য ওয়ার ইত্যাদি মিলে এই খবরের পেছনে লেগেছিল, তারা বেশ কিছুদিন ধরে তদন্ত চালিয়েছে, এবং তারপর তারা এই তথ্য বের করেছে। তারা যা বলছে তাতে, ২০১৬ থেকে ইজরায়েলের এনএসও গ্রুপ থেকে পেগাসাস সফটওয়ার কিনেছে আজারবাইজান, কাজাকিস্তান, বাহারিন, মেক্সিকো, মরোক্কো, রোয়ান্ডা, সৌদি আরব, হাঙ্গেরি, ইউনাইটেড আরব এমিরেটস এবং ভারত, কে বলছে? ভারতের বিরোধী দল নয়, ভারতের কোনও নিউজ মিডিয়া নয়, সারা বিশ্বের তাবড় সংবাদপত্র, তাদের সাংবাদিকরা। তারাই জানাচ্ছে বিশ্বের প্রায় ৫০ হাজার ফোন নম্বর এভাবেই হ্যাক করা হয়েছে, তারাই জানাচ্ছে, তাদেরকে, এনএসও’র তরফে জানানো হয়েছে যে তারা কোনও ব্যক্তি বা সংস্থাকে পেগাসাস বিক্রি করে না। ওই সংস্থা আরও জানিয়েছে যে কোন নম্বর হ্যাক করা হবে, কোন নম্বরের ওপর কতদিন নজরদারি চলবে, সেটা সেই দেশের সরকার ঠিক করে। এদিকে আমাদের সরকার বলছে তারা করেনি, অথচ ফরেন্সিক প্রমাণ বলছে হ্যাক হয়েছে। আমাদের দেশের অন্তত ৪০ জন সাংবাদিক, উল্লেখযোগ্য বিরোধী নেতা, নির্বাচন কমিশনের সদস্য, বিচারপতি, শিল্পপতি, এমনকি নিজেদের দলের মন্ত্রীরাও ছাড় পাননি।তাহলে আসুন নাম ধরে ধরে দেখা যাক, এই মানুষজনকে নজরদারিতে রাখাটা কার উদ্দেশ্য হতে পারে, মানে অপরাধবিজ্ঞানের ভাষায় লাভ কার? এই অপরাধের ফায়দা কার?

এরাজ্য থেকে শুরু করা যাক, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। নির্বাচনের বহু আগে থেকেই, বিজেপির সঙ্গে মুখোমুখি সংঘাতে নেমেছিলেন তিনি। ২০২১ এ এরাজ্যে নির্বাচনের যাবতীয় স্ট্রাটেজি, সাংগঠনিক কাজ তিনি দেখছিলেন। প্রচার, তহবিল থেকে শুরু করে বিভিন্ন কাজে এক মুখ্য ভূমিকা। তাঁর ওপর নজরদারি করবে কাজাকিস্তানের সরকার? না সৌদি আরব? তাঁর ফোন ট্যাপ করবে মেক্সিকোর সরকার? সিপিএম এর সুজন চক্রবর্তী বা সূর্যকান্ত মিশ্র? ভাঙা কংগ্রেসের অধীর চৌধুরি? এক শিশুও বলে দেবে বিজেপি ছাড়া আর কেউ নয়, আবার কেবল অভিষেকের ফোনই নয়, ওনার আপ্ত সহায়কের ফোনও হ্যাক করা হয়েছে। দ্বিতীয় নাম, পিকে, প্রশান্ত কিশোর। ধর হাল শক্ত হাতে বলে দাঁড়িয়েছিলেন। বিজেপির সংগঠন, পয়সা আর ক্ষমতার বিরুদ্ধে, তাঁর ফোন হ্যাক করা হয়েছে, কে করবে? আজারবাইজানের রাষ্ট্রপ্রধান? হ্যাক করা হয়েছে রাহুল গান্ধীর টেলিফোন, কার লাভ? রাহুল গান্ধী কোথায় যাচ্ছেন, কার সঙ্গে কথা বলছেন, এসব জেনে কি মরোক্কোর রাষ্ট্রপ্রধানের লাভ হবে? দ্য ওয়ার, ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যম, শুরু থেকেই প্রতিষ্ঠান বিরোধী, সম্পাদক সিদ্ধার্থ বরদারাজন, আগে কংগ্রেস বিরোধী হিসেবে পরিচিত ছিলেন, এখন বিজেপি বিরোধী। ওনার ভাষায়, যে ক্ষমতায় আছে তাকে প্রশ্ন না করে অন্য কাউকে প্রশ্ন করা মানে আর যাই হোক সাংবাদিকতা নয়। তো সেই সিদ্ধার্থ বরদারাজন শুধু নয়, দ্য ওয়ারের আরও চারজনের মোবাইল হ্যাক করা হয়েছে, কেন? কার লাভ? আজ এটা পরিস্কার যে সরকার, আমাদের ভোটে নির্বাচিত সরকার, দেশের মানুষের ওপর, সংবাদ মাধ্যমের ওপর, বিরোধী দলনেতাদের ওপর নজরদারি করছেন। এমনিতে তো, দেশের সবকটা সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের কিছুই বাকি নেই, প্রধান বিচারপতি অবসর নিয়ে রাজ্যসভায় মনোনীত হয়ে যাচ্ছেন। নির্বাচন কমিশনের দেওয়ালে এইচ এমভি’র লোগো লাগানো বাকি, তার মধ্যেও এক নির্বাচন কমিশনার অশোক লাভাসা, যিনি নাকি নরেন্দ্র মোদীকেও নির্বাচনী বিধি লঙ্ঘন করার দায়ে অভিযুক্ত করেছিলেন, তাঁরও নাম আছে। মানে সরকারের সামান্যতম বিরোধিতাও যেখান থেকে এসেছে বা আসা সম্ভব তাঁদের প্রত্যেকের নাম আছে। তাঁদের মোবাইল ফোন হ্যাক করা হয়েছে, সরকার বলছে তাঁরা নাকি কিছুই জানেন না। আচ্ছা যদি তর্কের খাতিরে, ধরেও নেওয়া যায় যে সরকার কিছুই জানে না, তাহলে জয়েন্ট পার্লমেন্টারি কমিটি তৈরি হোক, জেপিসিতে খুঁটিয়ে দেখা হোক, কারা এই মোবাইল হ্যাক করলো? কারণ শুধু সাংবাদিক বা সাংসদ নয়, দেশের অন্তত দু’জন মন্ত্রীরও মোবাইল হ্যাক করা হয়েছে, সে বিষয়েও সরকার চুপ। মজা দেখছেন প্রাক্তন আইটি মিনিস্টার রবিশঙ্কর প্রসাদ, তাঁকে রাজ্যপাল করে অবস্থার সামাল দেওয়ার চেষ্টা চলছে। কিন্তু এভাবে কি সত্যকে চাপা দেওয়া যায়? বিভিন্ন তথ্য এখনও আসছে, আরও নাম, আরও নম্বর। আমরা এক বিরাট নজরদারির মধ্যে রয়েছি, আজ তা স্পষ্ট। ৪৫ টা দেশ, ৪ টে মহাদেশের ৫০ হাজার মানুষের ওপর নজরদারি চলছিল, আর যারা চালাচ্ছিল, সেই দেশগুলোর দিকে তাকিয়ে দেখুন, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার তালিকায় তারা সব থেকে নীচে, ভারত ১৪২ এ। বিকশিত গণতন্ত্রে সবার সমান অধিকার আছে? না নেই। সেখানে কি সম্পদের সাম্য আছে? না নেই। কিন্তু এতটা বৈষম্য নেই, এতজন ফড়ে পুঁজিপতি নেই, এত দালাল শিল্পপতি নেই, দরিদ্র মানুষের অবস্থা এতটা খারাপ নয়।
অমর্ত্য সেন বহু আগেই তাঁর গবেষণায়, তাঁর লেখায় বলেছিলেন, উন্নয়নের প্রথম শর্ত গণতন্ত্র, গণতন্ত্র না থাকলে সেখানে দুর্নীতির জন্ম হয়। সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা না থাকলে, ফড়ে শিল্পপতিদের রমরমা বাজার চলে। গণতন্ত্র না থাকলে আর্থিক বৈষম্য বাড়ে। গণতন্ত্র না থাকলে দুর্ভিক্ষ, মহামারী নেমে আসে, তার ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অনেক বেশি হয়। আজ আমাদের দেশের ছবি সেই তত্ত্বকেই আমাদের সামনে তুলে ধরেছে। সেই অবর্ণনীয় দুর্দশাকে, বৈষম্যকে, লুঠতরাজকে লুকিয়ে রাখার জন্যই রাষ্ট্রকে পুলিশি রাষ্ট্র হয়ে উঠতে হয়। আসলে আরএসএস – বিজেপির মস্তিষ্কে আছে এক মধ্যযুগীয় রাষ্ট্র চেতনা, যে রাষ্ট্র রাজার, যে রাষ্ট্রে প্রজা রাজাকে ভগবান বা ভগবানের প্রেরিত দূত বলেই মনে করে, যে রাষ্ট্রে রাজার বিরুদ্ধতা মানেই রাষ্ট্রদ্রোহিতা। যে রাষ্ট্র শাসন হত সৈন্য, সামন্ত, কোতোয়াল দিয়ে। যে রাষ্ট্রে রাজদ্রোহিতার শাস্তি ছিল প্রকাশ্যে কোতল করা। যে রাষ্ট্রে আর যাই থাকুক, গণতন্ত্র ছিল না। যে কল্পিত রাজ্যের অধিপতি তাঁর স্ত্রীকে কেবল অপবাদের জন্য ত্যাগ করেন। বনবাসে পাঠান, যেখানে কেবল ব্রাহ্মণদেরই শিক্ষার অধিকার থাকে। শুদ্রদের কাজ হয় কেবল উচ্চ তিন বর্ণের সেবা, নরেন্দ্র মোদী সেই রাষ্ট্রের কথাই জানেন। যে রাজ্যের প্রধানমন্ত্রী চাণক্য, রাজমহিষীর পেছনেও গুপ্তচর লাগিয়ে রাখার কথা বলেছেন। বলে গেছেন গুপ্তচরেরাই হল রাজার কান এবং চোখ, তাদের কড়া নজর থাকবে প্রতিটি অমাত্য, পাত্র, মিত্রের ওপর, প্রতিটা রাজপুরুষ, প্রতিটা আশ্রম থেকে খবর আসা চাই, রাজাকে জানতে হবে কে কোথায়, কোন ষড়যন্ত্রে লিপ্ত আছে।

এই মধ্যযুগীয় নোংরামিকেই আরএসএস বিজেপি ভারতের স্বর্ণযুগ বলে। সেই তথাকথিত স্বর্ণযুগ তারা ফিরিয়ে আনতে চায়। তাই ব্রাহ্মমুহূর্ত থেকে মধ্যরাতে, ২৪ ঘন্টা আপনার ওপর নজরদারির ব্যবস্থা। আপনাকে বেছে নিতে হবে আপনি কী চান? আপনাকেই রুখতে হবে এই নজরদারি, এই পাহাদারি, রাতবিরেতে চৌকিদার আমার বাড়িতে উঁকি দেবে, এটা আমি মেনে নিচ্ছিনা, নেবও না।

Tags :

শেয়ার করুন


© R.P. Techvision India Pvt Ltd, All rights reserved.