ওয়েব ডেস্ক: রবির সকালে ভারতীয় সঙ্গীতজগতের এক যুগের অবসান। প্রয়াত কিংবদন্তি গায়িকা আশা ভোঁসলে (Asha Bhosle Passes Away)। এদিন মুম্বইয়ে ৯২ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। গায়িকার পুত্র আনন্দ ভোঁসলে তাঁর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছেন। তাঁর প্রয়াণে শোকের ছায়া নেমে এসেছে গোটা দেশজুড়ে। শিল্পীর প্রয়াণে শোকস্তব্ধ বলিউড থেকে টলিউড। কয়েক দশক ধরে তাঁর কণ্ঠে তৈরি হয়েছে অসংখ্য হিট গান। রোম্যান্স, গজল, ক্যাবারে থেকে আধুনিক বিট—সব ধারাতেই সমান সাবলীল তিনি। সঙ্গীত পরিচালক ও. পি. নায়ারের সঙ্গে আশার জুটি উপহার দিয়েছিল ‘আও হুজুর তুমকো’র মতো গানহ আবার আর. ডি. বর্মণের সুরে তাঁর কালজয়ী গান ‘চুরা লিয়া হ্যায় তুমনে জো দিল কো’ আজও রোমান্টিকতার এক অদ্বিতীয় মানদণ্ড হয়ে আছে।বিগত কয়েকমাস ধরেই বার্ধক্যজনিত নানা সমস্যায় ভুগছিলেন গায়িকা। শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় শনিবার তাঁকে মুম্বইয়ের ব্রিচ ক্যান্ডি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই সঙ্গীত শিল্পী।

নস্টালজিয়ার (Nostalgia) নাকি আজকাল আর আগের মতো টান নেই। সময় দ্রুত বদলাচ্ছে, আর ফিকে হচ্ছে স্মৃতি। তবু বলিউডের (Bollywood) ইতিহাসে কিছু কণ্ঠ আছে, যাঁদের এড়িয়ে যাওয়া যায় না। যাঁদের কথা বারবার ফিরে ফিরে আসে। আশা ভোঁসলে (Asha Bhosle) সেই বিরল ব্যতিক্রম। তাঁর গান যেমন বহুরূপী, তেমনই তাঁর জীবনও এক অনবরত লড়াইয়ের কাহিনি। সঙ্গীত বিশারদ রাজু ভরতের বিশ্লেষণে উঠে আসে সেই অন্য ইতিহাস, যেখানে ‘প্রথম’ না হয়েও একজন শিল্পী হয়ে ওঠেন অনন্য।
পঞ্চাশের দশকের শুরুতে আশা ভোঁসলে ছিলেন প্রান্তিক। লতা মঙ্গেশকর ইন্ডাস্ট্রিতে ক্রমশ শীর্ষে উঠছেন, গীতা দত্ত ও শমশাদ বেগমের জনপ্রিয়তা তুঙ্গে। সেই ভিড়ে আশার নাম ছিল প্রায় শেষের দিকে। ‘সেকেন্ড বেস্ট’ তো দূরের কথা, তিনি যেন তালিকার বাইরেই। উপরন্তু, ব্যক্তিগত জীবনেও টানাপোড়েন, অনিশ্চয়তা, সব মিলিয়ে পথ মোটেই মসৃণ ছিল না।

এক যুগের অবসান ঘটল। প্রয়াত হয়েছেন কিংবদন্তী সঙ্গীতশিল্পী আশা ভোঁসলে (Asha Bhosle)। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৯২ বছর। মুম্বই একটি বেসরকারি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। কিংবদন্তী সঙ্গীতশিল্পীর প্রয়াণে শোকজ্ঞাপন করলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee)।
এক্স হ্যান্ডেলে তিনি লিখেছেন, “মহান সঙ্গীত প্রতিভা আশা ভোঁসলের প্রয়াণে আমি গভীরভাবে শোকাহত। তিনি ছিলেন একজন অনুপ্রেরণাদায়ী ও মুগ্ধকর গায়িকা। যিনি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে আমাদের হৃদয়ে রাজত্ব করেছেন। তিনি অনেক বাংলা গানও গেয়েছেন। সেগুলি বাংলাতেও অত্যন্ত জনপ্রিয়। ২০১৮ সালে আমরা তাঁকে আমাদের সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার ‘বঙ্গবিভূষণ’ প্রদান করতে পেরেছিলাম। তাঁর পরিবার, সঙ্গীত জগৎ এবং বিশ্বজুড়ে তাঁর কোটি কোটি ভক্তদের প্রতি আমার আন্তরিক সমবেদনা।” এদিকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও (Narendra Modi) শোকজ্ঞাপন করেছেন।

মাত্র ১৬ বছর বয়সে গণপতরাও ভোঁসলের (Ganpatrao Bhosle) সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন আশা ভোঁসলে। প্রেমের সম্পর্ক থেকেই এই বিয়ে হলেও, পরিবার তা মেনে নেয়নি। বিশেষ করে তাঁর দিদি, কিংবদন্তি গায়িকা লতা মুঙ্গেশকর (Lata Mangeshkar) এই সম্পর্কের বিরোধিতা করেছিলেন বলে এক সাক্ষাৎকারে জানান আশা। ফলে পরিবারের সঙ্গে তাঁর দূরত্ব তৈরি হয় এবং দীর্ঘদিন যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল।
বিয়ের পর শ্বশুরবাড়ির পরিবেশও ছিল তাঁর পক্ষে প্রতিকূল। একজন গায়িকাকে পুত্রবধূ হিসেবে মেনে নিতে পারেনি পরিবারের সদস্যরা। স্বামী গণপতরাও ভোঁসলের সঙ্গে সম্পর্কেও ছিল জটিলতা। দাম্পত্য জীবনে মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ তুলেছিলেন তিনি। এমনকি অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় তাঁকে ঘর ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছিল। পরবর্তীতে তিনি ফিরে আসেন নিজের মা ও ভাইবোনদের কাছে।প্রথম বিয়ে ভেঙে যাওয়ার পর তাঁর জীবনে নতুন অধ্যায় শুরু হয় সুরকার আরডি বর্মনের (RD Burman) সঙ্গে সম্পর্কের মাধ্যমে। পরবর্তীতে তাঁরা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। যদিও এই সম্পর্কেও টানাপড়েন ছিল, তবুও একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালবাসা অটুট ছিল আজীবন।

আশা ভোঁসলের প্রয়াণে শোকস্তব্ধ শিল্পীমহল। শোকপ্রকাশ করেছেন প্রবীণ সঙ্গীতশিল্পী হৈমন্তী শুক্লা থেকে শুরু করে অনুপম রায়, রাঘব চট্টোপাধ্যায়-সহ আরও অনেকে। প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন অভিনেতা প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়। আশার এই চলে যাওয়া যেন ভারতীয় সঙ্গীত ইতিহাসের একটি স্বর্ণযুগের সমাপ্তি। এই শোক সংবাদে ভেঙে পড়েছেন বাংলা তথা ভারতের প্রবীণ সঙ্গীতশিল্পী হৈমন্তী শুক্ল।আশা ভোঁসলের প্রয়াণে নিজের শোকবার্তা জানাতে গিয়ে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন হৈমন্তী শুক্লা। তিনি বলেন, ‘ভাবতেই পারছি না আশাদি আর নেই। এই তো সেদিন বিদেশ থেকে অনুষ্ঠান করে এলেন। জানি বয়সটা বড় ফ্যাক্টর। তবুও... লতাদির চলে যাওয়ার পর আশাদি-ই ছিলেন আমাদের সবার মাথার ওপর একটা বড় ভরসা। আজ মনে হচ্ছে মাথা থেকে ছাতাটা সরে গেল।’

প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের একাধিক ছবিতেও রয়েছে তাঁর বহু জনপ্রিয় গান। আশা ভোসলের মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর থেকে শোকাচ্ছন্ন প্রসেনজিৎ।অভিনেতা প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় বলেছেন, আশাজির সঙ্গে আমার একটা ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিল। আশাজি প্রচুর গান আমাদের বাংলায় গেয়েছেন। ছোটবেলার থেকে শুনেছি। আমি আমার মায়ের কথা বলি। আমার মা পাগলের মতো ভক্ত ছিলেন। আশা ভোঁসলের যা গান আছে, সব ভাষায় সেটা আজীবন থেকে যাবে।গানের জগতে এক নতুন ধারা তৈরি করেছিলেন আশা, মনে করেন অভিনেতা। তিনি বলেন, “ওঁর গাওয়া প্রতিটি গান আজও আমরা গাই। সেটা বাংলাই হোক, বা হিন্দি। বহু দূর থেকে শুনলেও ওঁর গান বোঝা যেত। অদ্ভুত একটা ব্যাপার ছিল ওঁর কণ্ঠে।

স্বরসম্রাজ্ঞী আশা ভোসলে-র প্রয়াণে শোকস্তব্ধ সঙ্গীতজগৎ। উষা উথ্থুপ জানালেন তাঁর গভীর শোকপ্রকাশ। তিনি বলেন, আশা ভোঁসলে সিনেমা থেকে সঙ্গীতের দুনিয়া – সবক্ষেত্রকে সমৃদ্ধ করেছেন। শুধু বলিউডের ছবিতেই নয়, বাংলাতেও প্রচুর গান গেয়েছেন। ওঁর পুজোর গান আজও লোকমুখে ফেরে। আমরা প্রত্যেকে আশা ভোঁসেলের অন্ধ ভক্ত। ওঁর মতো একজন বহুমুখী প্রতিভাসম্পন্ন শিল্পীকে হারানো সঙ্গীতের দুনিয়ায় বিরাট ক্ষতি। গানের মাধ্যমেই তিনি আমাদের মধ্যে চিরদিন বেঁচে থাকবেন। ওঁর আত্মার শান্তি কামনা করছি।”

না ফেরার দেশে পাড়ি দিলেন আশা ভোঁসলে। তাঁর প্রয়াণে শোকস্তব্ধ গোটা দেশ।এদিন শোকপ্রকাশ করলেন গায়িকা অনুরাধা পড়ওয়াল।অনুরাধা পড়ওয়াল এদিন আশা ভোঁসলের প্রসঙ্গে বলেন, "খুবই কষ্টের দিন। একটা যুগের অবসান। ভাষা খুঁজে পাচ্ছি না কী বলব। ভীষণ ভাল শিল্পী ছিলেন, ভাল মানুষ ছিলেন। জীবনের শেষ শ্বাস পর্যন্ত গান গেয়ে গেলেন।"

রবিবার না ফেরার দেশে চলে গেলেন আশা ভোঁসলে।তাঁর প্রয়াণে শোকের ছায়া গোটা বিশ্বে। প্রবাদপ্রতিম শিল্পীকে হারিয়ে শোকস্তব্ধ উদিত নারায়ণ। এদিন উদিত নারায়ণ বলেন, আমি স্তম্ভিত। খবরটা পেয়ে খুব খারাপ লাগছে। বিশ্বাস করতে পারছি না। ওনার মতো শিল্পী আর হবে না। বিশ্বজুড়ে তাঁর গান, গানের স্টাইল সবই অনন্য ছিল। উনি যে আর নেই ভাবতেই পারছি না।গায়কের সংযোজন, “আমি দেখলাম উনি সোমবার পারফরম্যান্স করেছেন। ওনার মতো কেউ হবে না। মহিলা গায়িকা হিসেবে তিনি ভারতীয় সিনেমার ইতিহাস।

প্রয়াত কিংবদন্তী সঙ্গীতশিল্পী আশা ভোঁসলে (Asha Bhosle)। ৯২ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন তিনি। যার কারণে গোটা দেশে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। এদিকে কিংবদন্তী সঙ্গীতশিল্পীর প্রয়াণে ‘মা’ হারালেন ক্রিকেট ঈশ্বর শচীন তেন্ডুলকর (Sachin Tendulkar)। কারণ একসময় মা-ছেলের সম্পর্ক ছিল দু’জনের মধ্যে। ভারতের দুই তারকার সেরকম কোনও যোগ নেই। কারণ একজন সঙ্গীতজগতের কিংবদন্তী, অন্য জন ক্রিকেটের ঈশ্বর। কিন্তু, বিশ্ববিখ্যাত দুই তারকা একে অপরের পরিবারের সদস্য হয়ে উঠেছিলেন। মূলত, শচীনের নাম দেওয়া হয়েছিল সুরকার শচীন দেব বর্মনের নাম অনুসারে। আর শচীন দেব বর্মনের পূত্রবধূ হলেন আশা ভোঁসলে (Asha Bhosle)। এ থেকেই মা ছেলের এক গল্প তৈরি হয়েছিল।

কিংবদন্তী! লেজেন্ড! ভার্সাটাইল সিঙ্গার! সব কিছুকে ছাপিয়ে তিনি আশা ভোঁসলে (Asha Bhosle) । তাঁর সুরের মূর্চ্ছনায় দুলেছে তরুণ হৃদয় থেকে আপামরভারতবাসী। শুধু দেশের মধ্যেই তিনি সীমাবদ্ধ ছিলেন না। তাঁর কন্ঠ সাত সমুদ্র তেরো নদী পার করেছিল। মারাঠি পরিবারে (Marathi Family) জন্ম হওয়া অত্যন্ত গরীব পরিবারে মেয়ে গানকে ভালোবেসেন ছিলেন। ছোট থেকে দারিদ্র্যের সঙ্গে সংগ্রাম, মাথার পাশে দুদিকে দুটি বেনী ঝুলিয়ে দিদি সুর সম্রাজ্ঞী লতা মঙ্গেশকরের (Lata Mangeshkar) ছত্রছায়ায় বেড়ে ওঠা। আর এক সময় তিনি নিজে একটি আলাদা আইডেন্টিটি, আশা ভোঁসলে। মঙ্গেশকর পরিবারটিই ছিল সঙ্গীত অনুরাগী। সেই সঙ্গীতের প্রতি ভালোবাসা, গানের প্রতি গভীর অনুরাগ, শ্রদ্ধা, কঠোর সাধনা, নিয়মানুবর্তিতা আজ তাঁকে পরিণত করেছিল এক কিংবদন্তী শিল্পীতে।







