Friday, August 29, 2025
HomeScrollঅদিতির সঙ্গে সাদা কালো | কারাতের কথা সেলিমের জবাব

অদিতির সঙ্গে সাদা কালো | কারাতের কথা সেলিমের জবাব

যেমনটা রোজ করে থাকি, একটা বিষয়ের অবতারণা আর সেই বিষয়কে নিয়ে অন্তত দুটো ভিন্ন মতামতকে এনে হাজির করা, যাতে করে আপনারা আপনার মতটাকে শানিয়ে নিতেই পারেন আবার আপনার বিরুদ্ধ মতটাকেও শুনে নিতে পারেন।

কারাত সাহেব, হ্যাঁ প্রকাশ কারাতের কথা বলছি, যিনি ওই আমেরিকার সঙ্গে পরমাণু চুক্তি হলে দেশ যে বিক্রি হয়েই যাবে তা নিয়ে বিস্তর বক্তৃতার পরে কংগ্রেসের উপর থেকে সমর্থন তুলে নিয়েছিলেন। তার আগে পর্যন্ত এক সুন্দর ব্যবস্থা ছিল, দিল্লিতে সোনিয়া, চিদম্বরম ইত্যাদি বা ওভার অল কংগ্রেসের সঙ্গে এক অলিখিত অনাক্রমণ চুক্তি ছিল, যার বেসিসে তাঁরা কংগ্রেসকে ইউপিএ সরকারে সমর্থনও করেছিলেন, আপনারা দিল্লি চালান, আমরা বাংলা চালাব। কেরালা তো ডিং ডং, একবার এদিকে একবার ওদিকে। আর সেই চুক্তি মতো এই বাংলার কংগ্রেস ভাষণের শেষে লাল হটাও দেশ বাঁচাও বলেও ১০-১৪ শতাংশ ভোট পেতেন, যা মমতার নতুন দল তৃণমূলকে ক্ষমতা থেকে দূরে রাখার জন্য যথেষ্ট ছিল। চলছিল বেশ, তো কারাত সাহেব পমাণু চুক্তি নিয়ে পড়লেন, চুক্তি হলেই আমরা সমর্থন তুলে নেব। বুদ্ধবাবু জনসভাতেই বললেন, বসতে বললে বসবে, উঠতে বললে উঠবে। কিন্তু আমাদের মনে হয়েছিল, সেটা ছিল কেবল চমকানো। তো কারাত সাহেব শেষমেশ সমর্থন তুলে নিলেন। এ রাজ্যে কংগ্রেস তৃণমূলের সঙ্গে হাত মেলালো, এবং ২৩৫ থেকে ৩৫-এর গপ্পো আপনারা জানেন। সেই প্রকাশ কারাত, সীতারাম ইয়েচুরি মারা যাওয়ার পরে আপাতত দলের কর্ণধার, তিনি এলেন সিপিএমের রাজ্য সম্মেলনে, বললেন এ বাংলার ছাত্র যুবরা সেভাবে দলে আসছে না, হিসেব তাই বলছে। সে এক দিন ছিল, সব মিলিয়ে, মানে গণসংগঠন এসএফআই, ডিওয়াইএফআই, কৃষক সভা, সিআইটিইউ আরও কত শত, তাদের সংখ্যা আর পার্টি সদস্যের সংখ্যা মেলালে সে এক বিরাট সংখ্যা। তা যোগ করলে রাজ্যের ৭০ শতাংশ মানুষ এক ছাতার তলায়, এরকমটাও বলেছেন অনেকে। কেবল কারাত সাহেবের এক বিশাল তত্ত্বের মুখ রক্ষা করতে গিয়ে সরকার গেছে, আর দল, গণসংগঠন, সব জায়গাতেই সদস্য সংখ্যাতে ধস নেমেছে। কারাত সাহেব বলেননি যে সেই আমেরিকার সঙ্গে চুক্তির পরে কীভাবে দেশ বিকিয়ে গেছে বা সেই একই দেশ বিক্রির চুক্তি করনেওয়ালাদের সঙ্গে এমন হদহদ সম্পর্কই বা কেমন করে সম্ভব? কিন্তু তিনি বলেছেন যে সদস্য কমছে, ছাত্র যুবরা আসছেন না। পরদিনই সেলিম সাহেব, মুহতোড় জবাব দিয়ে দিয়েছেন, প্রেস কনফারেন্সে বসেই বলেছেন যে আমাদের দলে তো মিস কল দিয়ে মেম্বার হয় না, অনেক লড়াই সংগ্রামের মধ্য দিয়ে সদস্য হয়। যেটা বলেননি তা হল, সেই সংগ্রামও নেই, অতএব সদস্যও নেই। যাই হোক কারাতের কথা আর সেলিমের জবাবের বাইরেও কিছু কথা আছে, আসুন সেটাও দেখে নেওয়া যাক

আরও পড়ুন: অদিতির সঙ্গে সাদা কালো | মহাকুম্ভের আর্তনাদ

এমনিতে এ রাজ্যে কেন গোটা দেশেই সিপিএম দল তার রেলেভেন্স, তার প্রাসঙ্গিকতা হারিয়েছে। কেন? কারণ সিপিএম এর পুরো রাজনীতিতাই তো সংসদীয় গণতন্ত্রের রাজনীতি, তাই। একটু বুঝিয়ে বলি, ধরুন ওই মাওবাদীরা, একটাও এমপি নেই, একটাও এমএলএ নেই, কিন্তু মাঝে মধ্যেই খবরের শিরোনামে, হয় মারা যাচ্ছে, আজ ৩৬ তো কাল ২৭ তো পরশু ১৮। আবার কখনও সখনও মারছেও, ৮ জন জওয়ান নিহত, তিন জন জওয়ান নিহত ইত্যাদি খবরও আসে। দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী থেকে থেকেই হুঙ্কার দেন, এই বছরেই শেষ হবে মাওবাদীরা।

সেই কবে চিদম্বরম, বুদ্ধবাবুর যৌথ বাহিনী রওনা হবার সময়েও এই একই কথা শোনা গিয়েছিল। কিন্তু তারা দেশের এক বিরাট মানুষের খিদের জ্বালা, দারিদ্র আর সামাজিক অন্যায়ের প্রেক্ষাপটে ভেসে ওঠেন। প্রাসঙ্গিকতা থাকে, থেকে যায় কারণ খিদে আছে, শোষণ আছে, অত্যাচার আছে। কিন্তু সিপিএমের প্রাসঙ্গিকতা? ২০০৪-এ ৪৩ জন লোকসভার সদস্য জিতে এসেছিলেন মূলত বাংলা আর কেরালা থেকে। সেটাই ২০২৪-এ চারজন। দুজন তামিলনাডু থেকে জিতেছেন, ডিএমকে-র সঙ্গে জোটে, জোট না থাকলেই হারবেন, আগে হেরেছেন। একজন বিহারে, আবার সেই জোটের হিসেবে, জোট না থাকলেই আসন থাকে না। একজন কেরালা থেকে, হ্যাঁ এই আসনে তাঁরা নিজেদের জনসমর্থনেই জিতেছেন, কিন্তু লড়েছেন কংগ্রেসের বিরুদ্ধে। বাংলার ফলাফল আমরা জানি। এখন এই সংসদীয় রাজনীতিই যদি এক দলের মূল ভিত্তি হয়, তাহলে তাকে ওই এমপি এমএলএ-র সংখ্যার ভিত্তিতেই মাপা হবে। তো সেই মাপে সিপিএম প্রাসঙ্গিকতা সত্যিই হারিয়েছে। প্রাসঙ্গিকতা হারালে কী হয়? দলের আকর্ষণ কমে। কমিউনিস্ট পার্টি মানে দিন বদলাবে, কমিউনিস্ট পার্টি মানেই রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলের এক জোরদার লড়াই, কমিউনিস্ট পার্টি মানেই আন্দোলন, পুলিশের অত্যাচার, লাঠি গুলি, জেল। সিপিএমকে দেখলে কি সেটা মনে হয়? কাজেই যে ছাত্র যুবরা বিপ্লবের এক রোমাঞ্চকর ছবির কল্পনায় কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন, তাঁরা আকর্ষিত হচ্ছেন না। সেই খেতে কিষান, কলে মজুররা শ্রেণি সংগ্রামের হাতিয়ার হিসেবে কমিউনিস্ট পার্টির ঝান্ডার তলায় দিন বদল করবেন, কারখানা হবে তার, খেতখামার হবে তার। সে অবাক হয়ে দেখল তার জমি নিয়ে টাটা তৈরি করবে ন্যানো কারখানা, বাধা দিতে গেলে কমিউনিস্ট সরকার পুলিশ পাঠাচ্ছে, ওদিকে সেই সিঙ্গুরের থেকে সড়কপথে মাত্র ২৪ কিলোমিটার দূরে হিন্দমোটরে অ্যাম্বাসাডর কারখানা বন্ধ হয়ে গেল, সরকার তার শ্রমিকদের বাঁচাতে এগিয়ে এল না। বিপ্লবী ইউনিয়ন সামান্য কিছু টাকায় চুক্তি করে শ্রমিকদের আন্দোলন জারি না রেখে ভলান্টারি রিটায়ারমেন্ট-এর ব্যবস্থা বাতলে দিল। কৃষক, শ্রমিক দূরে সরে গেছেন, তাঁরা আকর্ষিত হচ্ছেন না। মধ্যবিত্ত সমাজ শহরের নতুন ভোলবদল, গঙ্গার ঘাটে আমোদের ব্যবস্থা আর আলো ঝকঝকে ফ্লাইওভারের প্রশংসায় পঞ্চমুখ, রাগ ক্ষোভ থাকলেও শেষমেশ দিদি হ্যায় তো মুমকিন হ্যায় গোছের জায়গাতে আছেন। বাকি মধ্যবিত্ত আজ আর বিপ্লবের স্বপ্ন দেখে না, মুসলমান দেখলে আঁতকে ওঠে, এক বড় অংশ হিন্দু পুনরুত্থান চান। তাঁরাও আর আকর্ষিত হচ্ছেন না। কাজেই সব মিলিয়ে প্রাসঙ্গিকতা হারিয়েছে সিপিএম, মানুষ আসছেন না, ছাত্র যুব তো সমাজেরই অংশ, তাও আবার সবচেয়ে সংবেদনশীল অংশ, তাঁরা আসছেন না, আসার কোনও আকর্ষণ বোধ করছেন না।

Read More

Latest News