লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার উদ্যোগে তৈরি হয়েছে ‘পার্লামেন্টারি ফ্রেন্ডশিপ গ্রুপ’ বা সংসদীয় বন্ধুত্ব গোষ্ঠী। দুনিয়ার ৬০টার বেশি দেশের সঙ্গে সংসদীয় যোগাযোগ বাড়ানোর জন্যই এই গ্রুপ তৈরি করেছেন লোকসভার স্পিকার৷ শাসক, বিরোধী – দু’শিবিরের প্রথম সারির সাংসদ, সংসদীয় নেতাদের এই গ্রুপের সদস্য করা হয়েছে। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, ডেরেক ও’ব্রায়েন এবং কাকলি ঘোষদস্তিদার এই গ্রুপের সদস্য। এছাড়াও বেশ কিছু সাংসদকে দুনিয়ার বিভিন্ন দেশে পাঠানো হবে দেশের কথা বলার জন্য। এদিকে ঠিক এই মুহুর্তে বড় প্রশ্ন হল, সরকার বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো কি আজ দেশ বিরোধী? হ্যাঁ, মোদিজি থেকে বিজেপি নেতৃত্বের ক্রমাগত প্রচার তো সেই কথাই বলে। বিরোধী প্রত্যেক কন্ঠকেই তাঁরা ‘দেশদ্রোহী’ বলছেন, দেশকে টুকরো করার কাজে ব্যস্ত, এমন কথাও বলছেন, সরকারের কাজের বিরুদ্ধে যে কোনও প্রতিবাদকেই ‘দেশদ্রোহীতা’ বলেই চিহ্নিত করা হচ্ছে। আবার অন্যদিকে সেই সরকার সেই বিরোধীদেরই দুনিয়ার বিভিন্ন দেশে পাঠাচ্ছে দেশের কথা বলতে। আসুন একটু দেখে নিই দেশের ভেতরে, সংসদে এই মুহুর্তে বিরোধীদের নিয়ে বিজেপির অবস্থানটা ঠিক কী।
একটা সংসদীয় শাসনব্যবস্থার প্রাণভোমরা হল সরকারের সমালোচনা, গঠনমূলক বিরোধিতা। সংসদীয় গণতন্ত্র তো কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসন নয়, এমন একটা ব্যবস্থা যেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্তের পাশাপাশি সংখ্যালঘুর, বিরোধীদের বক্তব্য গুরুত্ব দিয়ে শোনা হয়। আর ভারত বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে দীর্ঘ সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে কিছু ব্যতিক্রম বাদ দিলে ঠিক সেই ঐতিহ্যের ধারক। কিন্তু এখন? এই ঐতিহ্যের কাঁথায় আগুন দেওয়া হয়েছে। বিরোধীদের ভূমিকা কেবল সরকারের সমালোচনা করা নয়, সরকারের স্বৈরাচারী প্রবণতাকে আটকানো, জনগণের সেই অংশের প্রতিনিধিত্বকে নিশ্চিত করা, যারা বর্তমান শাসক দলকে ভোট দেয়নি। স্বাধীনতার পর জওহরলাল নেহরুর সময়ে লোকসভায় কংগ্রেসের বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল, কিন্তু বিরোধী নেতাদের বক্তব্যকে গুরুত্ব পেত। শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি, অটল বিহারী বাজপেয়ীর মতো নেতারা সংখ্যায় কম ছিলেন, কিন্তু তাঁদের ব্যক্তিগত বাগ্মিতা, যুক্তিপূর্ণ সমালোচনা সরকারকে অনেক সময় নীতি পরিবর্তনে বাধ্য করত। মানে এটা মাথায় রাখা হত যে, সংসদীয় গণতন্ত্রে বিরোধীরা হল এক ‘অপেক্ষমান সরকার’ (Government-in-waiting), যাদের মূল কাজ শাসনের স্বচ্ছতা বজায় রাখা, সরকারকে জনগণের প্রতি দায়বদ্ধ রাখা। এখন এই মৌলিক ধারণাটাই প্রশ্নের মুখে দাঁড়িয়ে।
ঠিক এই মুহুর্তে ‘মেজরেটেরিয়ানিজম’ বা সংখ্যাগুরুবাদের আলোচনা খুব জরুরি। সংখ্যাগুরুবাদ হল, এমন একটা রাজনৈতিক দর্শন, যেখানে নির্বাচিত সংখ্যাগরিষ্ঠ দল মনে করে যে, তারা যেহেতু বিপুল জনসমর্থন পেয়েছে। ব্যস! তাদের যেকোনও সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করা মানেই জাতির ইচ্ছার বিরোধিতা করা, দেশের বিরোধিতা করা। ২০১৪, ২০১৯ সালের সাধারণ নির্বাচনে বিজেপির একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পর সংসদে এই মানসিকতার প্রতিফলন আমরা দেখছি। এটাকে ‘ক্রিপিং অথরিটারিয়ানিজম’ বা ধীর গতিতে চলতে থাকা স্বৈরতন্ত্রও বলাই যায়। আনুষ্ঠানিক গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো বহাল আছে কিন্তু তাদের কার্যকারিতা, গণতান্ত্রিক স্পিরিট ক্রমশ ভ্যানিশ হয়েছে। আর তার চাপ বিচার বিভাগ, মিডিয়া, উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতেও পড়ছে। হিন্দু জাতীয়তাবাদের দর্শনের সঙ্গে এই সংখ্যাগুরুবাদ মিশে গিয়ে এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করেছে, যেখানে ভিন্নমত, প্রতিবাদকে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ হিসেবে দাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হল, বিরোধীদের ‘দেশবিরোধী’ হিসেবে ব্র্যাকেট করা। নরেন্দ্র মোদি, অমিত শাহের মতো শীর্ষস্থানীয় নেতারা প্রায়ই বিরোধী নেতাদের বলছেন এরা ‘টুকড়ে টুকড়ে গ্যাং’, এরা ‘আরবান নকশাল’। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে কেবল প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং রাষ্ট্রের শত্রু হিসেবে মানুষের সামনে তুলে ধরা হচ্ছে। কোনও বিরোধী নেতা বিদেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে ভারতের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির সমালোচনা করলে, তাঁকে দেশের সম্মানহানির দায়ে, মানে সরকারের সমালোচনাকে রাষ্ট্রের অসম্মান হিসেবে দেখা হচ্ছে, বিরোধীদের সরকারের অনুগত হয়ে থাকার পাঠ দেওয়া হচ্ছে। ২০২৩ সালের ডিসেম্বর মাসে ভারতের সংসদীয় ইতিহাসে যা ঘটেছিল তা আগে কখনও দেখা যায়নি। সংসদের নিরাপত্তা লঙ্ঘনের ঘটনায় সরকারের কাছ থেকে বিবৃতির দাবিতে বিক্ষোভ দেখানোর জন্য ১৪৬ জন বিরোধী সংসদ সদস্যকে বহিষ্কার করা হয়। লোকসভা থেকে ১০০ জন এবং রাজ্যসভা থেকে ৪৬ জন সাংসদকে বরখাস্ত করে পুরো সংসদকে কার্যত বিরোধীশূন্য করে ফেলা হয়েছিল। খালি তাই নয়, তাঁদের বাইরে রেখেই সংসদে খুব গুরুত্বপূর্ণ কিছু আইন পাসও করানো হয়, যার মধ্যে রয়েছে তিনটে নতুন ফৌজদারি আইনের মতো জরুরি বিল, আলোচনা ছাড়াই সেই বিল পাস করানো হল।
আরও পড়ুন: Fourth Pillar | মোদিজি লজ্জা পেলেন? কেন? কবে? কোথায়?
প্রায় শূন্য বিরোধী উপস্থিতিতে কোনও আলোচনা ছাড়াই এরকম বিল পাস করানো হলে, তাকে কি সংসদীয় গণতন্ত্র বলা যায়? সংসদীয় গণতন্ত্রে বিরোধী দলনেতা (Leader of Opposition) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদ। রাজ্যসভায় বিরোধী দলনেতা মল্লিকার্জুন খাড়গে বারবার অভিযোগ করেছেন যে, তিনি যখনই মণিপুর ইস্যু বা আদানি ইস্যু নিয়ে কথা বলতে চেয়েছেন, তখনই তার মাইক্রোফোন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। একইভাবে রাহুল গান্ধীর বক্তব্যেও বারবার কাঁচি চালানো হয়েছে। ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে আদানি-হিন্ডেনবার্গ ইস্যু নিয়ে রাহুল গান্ধীর লোকসভার বক্তৃতার ১৮টা অংশ স্পিকারের নির্দেশে বাদ দেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে আদানি আর প্রধানমন্ত্রীর সম্পর্ক নিয়ে করা প্রশ্নগুলোও ছিল। ২০২৪ সালের বাজেটের পরে রাহুল গান্ধীর বক্তব্যে মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি ‘এপস্টিন ফাইল’ সংক্রান্ত উল্লেখ বাদ দেওয়া হয়েছে। ১৭তম লোকসভার (২০১৯-২০২৪) কাজকর্ম বিশ্লেষণ করলে এক ভয়াবহ ছবি বেরিয়ে আসছে। লোকসভায় পাস হওয়া বিলগুলোর ৩৫ শতাংশের উপর মাত্র এক ঘণ্টারও কম সময় আলোচনা হয়েছে। আইন পাস করানোতে সংসদীয় স্থায়ী কমিটির (Standing Committees) ভূমিকা খুব গুরুত্বপূর্ণ। যেখানে বিভিন্ন দলের প্রতিনিধিরা বিলের ত্রুটি-বিচ্যুতি নিয়ে আলোচনা করেন, কিন্তু মোদি সরকারের দ্বিতীয় মেয়াদে মাত্র ১৬ শতাংশ বিল স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়েছে, যা আগের সরকারগুলোর তুলনায় খুব কম। এর ফলে পাস হওয়া আইন নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
ভারতের বিচার বিভাগ বিভিন্ন সময়ে সরকার আর রাষ্ট্রের মধ্যে ফারাকটা পরিস্কার করেই জানিয়েছে। ২০২৩ সালের এপ্রিল মাসে সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্টভাবে জানায় যে, সরকারের নীতির সমালোচনা করাকে কোনোভাবেই ‘দেশবিরোধী’ বা ‘এস্টাবলিশমেন্ট বিরোধী’ বলে অভিহিত করা যাবে না। একইভাবে ‘সিডিশন’ বা ‘রাষ্ট্রদ্রোহ আইন’ (ধারা ১২৪এ) নিয়েও আদালত বারবার বলেছে, যতক্ষণ না কোনও বক্তব্য সরাসরি হিংসাকে উসকে দিচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত সরকারের চুড়ান্ত সমালোচনাকেও ‘রাষ্ট্রদ্রোহ’ বলা যাবে না। কিন্তু আসলে দেখা যাচ্ছে যে, সামান্য সমালোচনার দায়েও পুলিশ ও কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাগুলো নাগরিকদের বিরুদ্ধে ইউএপিএ (UAPA) বা রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা দিচ্ছে।
এই বিজেপি দলের নেতারা বলেন ১৯৭৫ সালের ২৫শে জুন ‘গণতন্ত্রের কালো দিন’, এক্কেবারে ঠিক। কিন্তু এই মুহুর্তের পরিস্থিতি ১৯৭৫-এর চাইতেও অনেক খারাপ, কারণ এটা একটা ‘অঘোষিত জরুরি অবস্থা’। ১৯৭৫ সালের জরুরি অবস্থা ছিল সাংবিধানিক ঘোষণার মাধ্যমে, যেখানে নাগরিক অধিকার প্রকাশ্যে কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এখন যা ঘটছে, তা অত্যন্ত সন্তর্পণে আর ‘আইনসম্মত’ উপায়ে। বিরোধীদের হয়রানি করতে ইডি (ED), সিবিআই (CBI) বা আয়কর দফতরের ব্যবহার, মিডিয়াকে করপোরেট শক্তি দিয়ে কব্জা করা, সংসদীয় প্রক্রিয়াকে অকেজো করে দিয়ে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে চুলোর দোরে পাঠানো হচ্ছে। আসলে ১৯৭৫-এর জরুরি অবস্থা ছিল একটা ক্ষণস্থায়ী ধাক্কা, যা দেশ সামলে উঠেছে। কিন্তু এখন, এই মুহুর্তে যে ‘মেজরেটেরিয়ানিজম’ বা ‘সংখ্যাগুরুবাদ’-এর চর্চা চলছে, তা মানুষের মনস্তত্ত্বকে চিরস্থায়ীভাবে ভাগ করে দিচ্ছে। হোয়াটসঅ্যাপ ইউনিভার্সিটির মাধ্যমে ছড়ানো প্রোপাগান্ডা বিরোধী নেতাদের ‘দেশবিরোধী’ হিসেবে তুলে ধরছে, আর তার স্বপক্ষে জনমতও তৈরি করা হচ্ছে। মাথায় রাখুন সরকার আর রাষ্ট্র এক নয়। সরকারের সমালোচনা করা দেশপ্রেমেরই এক অংশ, কারণ এটাই রাষ্ট্রকে আরও শক্তিশালী আরও স্বচ্ছ হতে সাহায্য করবে। কিন্তু হচ্ছে ঠিক উলটো টা। সংখ্যাগরিষ্ঠতার দম্ভে বিরোধীদের বহিষ্কার করা, তাঁদের কথা বলতে না দেওয়া, তাদের দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন তোলা শেষ পর্যন্ত সংসদীয় গণতন্ত্রকেই দুর্বল করবে। তো একদিকে এরকম একটা অবস্থা তৈরি করা হচ্ছে, অন্যদিকে সরকার সামান্য প্যাঁচে পড়লেই বিরোধীদের পাঠাচ্ছেন দুনিয়ার দেশে দেশে ভারতের কথা বলতে।
স্ববিরোধিতাটা একবার বুঝুন, যে সাংসদ এই দেশেই বসে দেশবিরোধিতার অভিযোগের মুখে দাঁড়িয়ে আছেন, সেই সাংসদকেই বিদেশে পাঠানো হচ্ছে দেশের কথা বলার জন্য। হ্যাঁ, এটা আসলে স্ববিরোধিতাও নয়, এটা এক ধরণের তামাশা, বিজেপি-আরএসএস সংসদকে এক তামাশার জায়গা বানিয়ে তুলেছে, আজ নয় সেই শুরু থেকেই। এক নোংরা খেলা খেলছে নরেন্দ্র মোদির সরকার। স্পিকার সাহেব টোপ ফেলছেন বিদেশ বেড়ানোর, যান আপনারাও মোদিজির মতো দেশ বিদেশ ঘুরুন, কেউ যদি বলে ভারতে বিরোধীদের শাসক দল মর্যাদা দেয় না, তাহলে সেই বেড়ানোর ছবিগুলোকে, কারও কারও বেসামাল মুহুর্তগুলোকে তুলে ধরে এই জোকার স্পিকার প্রমাণ দিয়ে দেবেন সরকার বিরোধীদের জন্য কত খরচ করেছে। সেই টোপ বিরোধীরা গিলবেন কিনা ঠিক করার সময় এসেছে। যাঁরা টোপ গিলবেন তাঁদের নাম মাথায় রাখবে দেশের মানুষ।
দেখুন আরও খবর:








