Friday, January 30, 2026
HomeScrollAajke | রবি ঠাকুর সাহিত্যে নয়, শান্তিতে নোবেল পেলেন, বাঙালি বিরোধী বিজেপির...
Aajke

Aajke | রবি ঠাকুর সাহিত্যে নয়, শান্তিতে নোবেল পেলেন, বাঙালি বিরোধী বিজেপির নতুন আবিষ্কার

রবি ঠাকুর নবীনের উদ্দেশ্যেই হয়তো লিখেছিলেন, ‘আমার মাথা নত করে দাও হে তোমার চরণধুলার পরে’

Written By
অনিকেত চট্টোপাধ্যায়

আগের দুধুভাতু সভাপতি জেপি নাড্ডা বাঙালি সমাজকে জানিয়েছিলেন, ‘ভাইসকল রবিনদরনাথ ট্যায়গোর জোড়াসাঙ্কোতে নয় শান্তিনিকেতনে জন্মেছিলেন’, নবদ্বীপ যে বলেননি তাই তো যথেষ্ট। যাঁদের সর্বোচ্চ নেতা বঙ্কিমদাকে চা খাওয়ান, সেই দলের এক সভাপতি না বানালে জেলার দায়িত্বেও অসফল জেপি নাড্ডা এরকম বলবেন সেটাই তো স্বাভাবিক। আসলে বাঙালি নিয়ে দেশ জোড়া এই আরএসএস–বিজেপির ন্যারেটিভগুলোকে এর সঙ্গে মেলালে অনায়াসে এর কারণটা বুঝে ফেলবেন। সেই ব্যাখ্যাতে পরে আসছি। এর আগে ইসওয়ার চান্ড্রা ভিদ্যাসাগারকে দিয়ে ওনারা ‘সহজ পাঠ’ লিখিয়েছেন, তা আবার এই রাজ্য থেকেই উচ্চারিত হয়েছে। সেই দলের নবনিযুক্ত সভাপতি ভাষণ দিতে এলেন, সামনে কাগজ লেখা, পরীক্ষার সময় মরিয়া হয়ে চোথা করার মত মুখ করে তিনি কাগজ দেখছিলেন এবং বলছিলেন। তাঁর টেলিপ্রম্পটার জোটেনি, সেই কবে গাব্বু খেলা নাটকে একটা ডায়ালগ মনে পড়ে গেল, ‘যে যেমন তার তেমন, আমি দারোগা আমার রিভালবার, তুমি কনস্টেবল তোমার বাঁট, স্টার্ট, লেফট রাইট লেফট রাইট’। ভয়ঙ্কর নকশাল এবং নকশালীদের মোকাবেলায় বেঘোরে প্রাণ হারানোর ভয়ে বেচারা কনস্টেবল ওই রিভালবারটা চেয়েছিল, এই আর কি। তো এনার টেলিপ্রম্পটার জোটেনি, কারণ ইনি জলভাতে সভাপতি, দুধুভাতেও নয়, টেলিপ্রম্পটার তো উনিজির জন্য, অবশ্য সেই টেলিপ্রম্পটার বিভ্রাটও আমরা দেখেছি, মোদিজি তখন ধরা পড়া ছিঁচকে চোরের মতো এদিক ওদিক তাকান। তো টেলিপ্রম্পটার ছিল না তো ছিল না, কিন্তু কোন আহাম্মক এই নিতীন নবীন এর ভাষণটি লিখে দিয়েছিলেন, তিনি সেই ভাষণে আমাদের জানালেন, সাহিত্যের জন্য নয়, রবিনদারনাথ ট্যায়গোর শান্তির নোবেল পেয়েছেন, কোন শান্তির ছেলে এই খবর ওনাকে দিল কে জানে, উনি কিন্তু সোনামুখ করে বলেও ফেললেন। উনি তো বললেন আশেপাশে কি কেউ ছিল না, একজনও না? কেউ একজনও ধরিয়ে দিলেন না যে স্যর, আপনি ঘেঁটে ফেলেছেন। না, সেরকমও কেউ ছিলেন না। আজ সেটাই বিষয় আজকে, রবি ঠাকুর সাহিত্যে নয়, শান্তিতে নোবেল পেলেন, বাঙালি বিরোধী বিজেপির নতুন আবিস্কার।

প্রধানমন্ত্রী থেকে অমিত শাহ থেকে জেপি নাডডা থেকে নব্য নিযুক্ত জাতীয় সভাপতি নিতীন নবীন, একবার নয় বারবার এমন ভুল করেন, বাংলা সাহিত্য নিয়ে, বাঙালির ইতিহাস নিয়ে, বাংলার সমাজ নিয়ে একবার নয় বারবার এরকম ভুল তেনারা করেন। আচ্ছা এমনও তো হতে পারে যে, ওনারা মুখ ফসকে কিছু একটা বলতে গিয়ে কিছু একটা বলে ফেলেছেন। এমন তো আমাদের মুখ্যমন্ত্রীও বার কয়েক বলেছেন, বলেছেন তো গান্ধীজির অনশন ভঙ্গে রবি ঠাকুরের উপস্থিতির কথা, বলেছেন তো সিধু কানুর সঙ্গে ডহরবাবুর কথা। বা ধরুন তারও আগে প্রেসিডেন্সি ছাত্র বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য আস্ট্রোলজির কোনও বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই বলতে গিয়ে তিন মিনিট ধরে অ্যাসট্রোনমির পিন্ডি চটকেছেন, রাইটার্সে ফিরে কেউ বলাতে তাঁর হুঁস ফিরেছিল, এরকম ভুল কি স্বাভাবিক নয়! আগেও হত, সর্বব্যপি মিডিয়ার উপস্থিতি তো তখন ছিল না, থাকলে ধরা পড়ত। তাহলে? হ্যাঁ, তাহলে এ নিয়ে কথা কীসের, মুখ ফসকে বলে ফেলেছেন, ব্যস। না, বিষয়টা এত সোজা নয়। খেয়াল করুন, দেশ জুড়ে বেশ কিছু ন্যারেটিভ তৈরি হচ্ছে, যা আদতে বাঙালি বিরোধী, আর সেই ন্যারেটিভগুলো খুব কৌশলে ছড়িয়ে দিচ্ছে আরএসএস–বিজেপি। হ্যাঁ, সেটা বুঝলে বুঝতেই পারবেন যে অন্য আর দশজন রাজনৈতিক নেতাদের মুখ ফসকে কিছু বলে ফেলার সঙ্গে বিজেপি-আরএসএস-এর কথাগুলোর একটা গুণগত, কোয়ালিটেটিভ তফাৎ আছে। দুটোকে যাঁরা গোলাচ্ছেন তাঁরা হয় বিষয়টা বোঝেন না, না হলে শয়তানি করছেন।

আরও পড়ুন: Aajke | না, শুভেন্দু অধিকারী হচ্ছেন না বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মুখ

ন্যারেটিভগুলো খেয়াল করুন। ‘বঙ্গালি লোগ হর চিজ পর বাওয়াল করতেঁ হ্যাঁয়’, মানে সব বিষয়ে রুখে দাঁড়ায়, প্রতিবাদ করে, ছোট ব্যাপার নিয়ে চ্যাঁচামেচি করে। মানে খুব সাফ, রবি ঠাকুরের জন্মস্থান শান্তিনিকেতন বলেছে তো বলেছে, এত চ্যাঁচাবার কী আছে? ট্রেন সময়ে আসেনি তো আসেনি, এত রাগ দেখানোর কী আছে? প্লেন ছ’ঘন্টা ডিলেড, তো? চুপ করে বসে থাকুন প্লেন এলে খবর দেব, চিৎকার করতে হলে ‘বঙ্গাল মে চলা যাও’। শুনেছেন না? তারপর ধরুন ‘ইয়ে বঙ্গালি লোগ বাত বাত পর সেকুলার সেকুলার চিল্লাতে হ্যাঁয়’, মানে আমাদের এই কলকাতাতেই একই রেস্তোঁরাতে মুরগি, খাসি, শুয়োর আর গরুর মাংস সার্ভ করা হয়, এটা তাঁদের আপত্তির কারণ। আমরা কেন কথায় কথায় ‘জয় শ্রী রাম’ না বলার জন্য মানুষ পিটিয়ে মারি না? হ্যাঁ, তাই ‘ইয়ে বঙ্গালি লোগ বেফালতু সেকুলার সেকুলার চিল্লাতেঁ হ্যাঁয়’। আরেকটা ন্যারেটিভ হল, ‘বঙ্গালি লোগ খানা লেকর জরুরত সে জ্যাদা সেনসেটিভ হ্যায়, ট্রেন মে ভেজ মিল রহা হ্যায় তো ভেজ খাও, নহিঁ তো মত চড়ো’, সিম্পল সলিউশন। হ্যাঁ, এইভাবেই গুচ্ছ ন্যারেটিভ তৈরি করা হয়েছে বাংলাকে নিয়ে, ‘বাঙ্গালি লোক ডরপোক হ্যায়’, ‘বঙ্গালি লোগ গলত প্রনাউন্সেশন করতেঁ হ্যাঁয়’, ‘বঙ্গালি লোগ ঝগড়া করতেঁ হ্যায়’, এরকম আরও। আর এগুলো কিন্তু একটা দেশজুড়ে তৈরি করা এক ইকোসিস্টেম, যেখানে বাঙালিরা লাফিং স্টক, তারই অঙ্গ হল লাগাতার এই অসতর্ক উচ্চারণ, আমাদের খাবার নিয়ে, আমাদের ঐতিহ্য নিয়ে, আমাদের মনিষীদের নিয়ে, আমাদের সমাজ নিয়ে। আমরা আমাদের দর্শকদের জিজ্ঞেস করেছিলাম যে, বিজেপির জাতীয় সভাপতি নিতীন নবীন জানালেন যে, রবি ঠাকুর সাহিত্য নয়, নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছিলেন। এটাকি কেবল মুখ ফসকে কিছু বলা নাকি বাঙালিদের হেয় করাটাই আরএসএস-বিজেপির ছক? শুনুন মানুষজন কী বলছেন।

সে এক সময় ছিল, যখন স্কুল কলেজ ছেড়ে মানুষ স্বাধীনতা সংগ্রামে নেমেছিলেন, বিরাট নেতা, কিন্তু তিনি তেমনভাবে স্কুল কলেজে যাননি। আবার অনেকেই এমন ছিলেন যাঁরা সমুদ্রের মতো জ্ঞান আহরণ করেছেন পড়াশুনো করে, স্কুলে গিয়ে নয়, বাড়িতেই। এই মুহূর্তে রবি ঠাকুর ছারাও আবুল কালাম আজাদের কথা তো বলতেই পারি। কিন্তু আজকের দিনে যদি কেউ স্কুল কলেজে না যান, তাহলে তাঁর দারিদ্রই একমাত্র কারণ হতে পারে। কিন্তু বিহারের পরিচিত বিধায়ক নবীন কিশোর প্রসাদ সিনহার ১৯৮০ সালে জন্ম নেওয়া ছেলে যদি কলেজের দরজায় পা না দেন, তাহলে তিনি নেহাতই এক বখে যাওয়া সন্তান, যিনি বাবার মৃত্যু পরে বংশানুক্রমিকভাবে রাজনীতিতে পা দিয়ে আজকের এই জলভাত জাতীয় সভাপতি হয়েছেন, তিনি রবি ঠাকুর জানেন না, কিন্তু ক’দিন এই ট্রাম্প সাহেব, নোবেল পিস পুরস্কার ইত্যাদি পড়ে তাঁর ধারণা হয়েছে নোবেল তো শান্তির জন্যই দেয়, আর বাঙালি এক কবিকে নিয়ে বলতে হলে অত জানার বা বোঝারই বা কী আছে? তাই সাহিত্য নয় রবি ঠাকুরকে তিনিই শান্তির জন্য নোবেল পুরস্কার দিলেন, বিজেপির এক ছোট নেতা নিশ্চই মনে মনে ভাবছেন, এই পুরস্কারের পরেই তো রবিঠাকুর নবীনের উদ্দেশ্যেই লিখেছিলেন, ‘আমার মাথা নত করে দাও হে তোমার চরণধুলার পরে’। জয় হোক নবীনের।

দেখুন আরও খবর:

Read More

Latest News