একটু দেরিতেই ঘুম ভাঙে এমএলএ সাহেবের, তো সকালে ঘুম ভাঙার পরে বাড়ির ডাইনিং রুমে বসে চায়ের কাপে সবেমাত্র প্রথম চুমুকটা দিয়েছিলেন জীবনকৃষ্ণ। এমন সময়ে সামনের দেওয়ালে রাখা সিসিটিভি-তে দেখতে পান, সাদা রঙের একটা সরকারি গাড়ি বাড়ির সামনে এসে হাজির। এবং নাকি সঙ্গে সঙ্গেই চায়ের কাপ ফেলে দোতলায় গিয়ে তাঁর দুটো মোবাইলই জানলা দিয়ে বাইরে ছুড়ে দেন। এর পরে, সাতটা নাগাদ ইডি আধিকারিকরা তাঁকে যখন ডাকাডাকি শুরু করেন, সেই সময়ে আম গাছের ডাল বেয়ে ৭ ফুটের পাঁচিল টপকে কচুবনে ঝাঁপ দিলেন বিধায়ক জীবনকৃষ্ণ। আগেরবারের ঘটনা মাথায় ছিল তল্লাশিতে আসা কর্মকর্তাদের, তাই ওই জায়গায় আগে থেকেই সিআইএসএফের জওয়ানদের নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন ইডি আধিকারিকরা। তাঁরা জলকাদা মাখা, মাথার উপরে কচুরিপানা লেগে থাকা সাদা গেঞ্জি এবং কালো ফুলপ্যান্ট পরে দৌড়তে থাকা জীবনকৃষ্ণকে কপ করে ধরে ফেলেন। এবং আফটার অল উনি মাননীয় বিধায়ক তাই তাঁকে পোশাক পাল্টানোর সুযোগ দেওয়া হয় এবং তার পরে শুরু হয় জিজ্ঞাসাবাদ পর্ব। সেখানেই নাকি উনি জানান যে আগেরবারে পুকুরে ফেললেও, এবারে যাতে খুঁজলেই পাওয়া যায় সেই কথা ভেবেই উনি মোবাইলগুলোকে পুকুরে নয় বাড়ির পাশের ঝোপে ফেলেছেন। পুলিশের কুত্তা আনতে হয়নি, ডুবুরিও ডাকতে হয়নি, মিনিট দশ পনেরোর মধ্যেই দু’খানি মোবাইল অক্ষত অবস্থায় বাজেয়াপ্ত করে জীবনকৃষ্ণকে নিয়েই ইডি অফিসারেরা সোজা আদালতে। কাস্টডিতে নিতে হবে, জিজ্ঞাসাবাদ চলবে। সংবাদ মাধ্যমে আবার পল্লবিত হবে নানান তথ্য। কোটি কোটি টাকার সেসব কাহিনি গরম চায়ের সঙ্গে জমবে ভালো। কিন্তু সেসব তো হল, আমার এক দুষ্টু বন্ধু ফোন করে তার সন্দেহের কথা জানাল যে সত্যিই কি এমএলএ জীবনকৃষ্ণ তাঁর নিজের মোবাইলই ফেলেছেন? নাকি ও দুটি ফেলার জন্যই রাখা ছিল? হ্যাঁ সেটাই বিষয় আজকে, এমএলএ জীবনকৃষ্ণ কি তাঁর নিজেরই মোবাইল ছুড়ে ফেলেছেন ঝোপে?
২০২৩-এর ১৪ এপ্রিল কান্দি মহকুমার বড়ঞার আন্দি গ্রামে তাঁর বাড়িতে হাজির হয়েছিলেন সিবিআই আধিকারিকরা। সে বারও গোয়েন্দাদের নজর এড়িয়ে পাঁচিল টপকে পালানোর চেষ্টা করেন তিনি। দু’টি মোবাইল ছুড়ে ফেলেছিলেন পুকুরে। টানা তিনদিন ধরে পাম্প লাগিয়ে পুকুরের জল ছেঁচে মোবাইলগুলি উদ্ধার হয়েছিল। চিত্রনাট্যে কী মিল, এবারেও একইভাবে তিনি ছুড়ে দিলেন মোবাইল, কিন্তু এবারে সাবধানে, গ্রামে তিন দিন ধরে নৌটঙ্কি চলবে এটা বোধ হয় তিনি চাননি। কিন্তু পালানোর চেষ্টা সেবারেও, এবারেও। আর অভিযোগ? সেই একই, নিয়োগ দুর্নীতিতে ৪৬ লক্ষ টাকা তুলেছিলেন জীবনকৃষ্ণ। সেই টাকা বাবা থেকে শুরু করে স্ত্রী এবং ছেলের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে গিয়েছে।
আরও পড়ুন: Aajke | লকেট চট্টোপাধ্যায়ের জায়গাতে জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়?
তো এর আগে ১৩ মাস ধরে তাঁকে হাজতে জেলে রাখা হল, জেরা হল, মোবাইলের তথ্য বের করা হল, নিশ্চিতভাবেই ওনার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ইত্যাদির পুরো হদিশ তাঁরা পেয়েছিলেন। এবং সেসব শেষ হয়ে যাওয়ার পরে এক বছরের বেশি কেটে গেছে, সেই একই লোককে গ্রেফতার করতে আবার সেই সাতসকালে ইডি হানা এবং একই কু-নাট্যের রিপিটেশন। এবং এবারে এখনই প্রশ্ন উঠছে এমএলএ জীবনকৃষ্ণ কি দু’খানা ডামি মোবাইল ছুড়ে দিয়ে নাটক করার পরে সেই দুটোকে উদ্ধার করিয়ে হাজতে গেলেন, আসলি মোবাইল কি অন্য কোথাও চলে গেছে? এরকম এক থিওরি হাজির হলে তা যে হতেই পারে না তেমন বলার মতো কোনও কারণ তো নেই। আবার সেই দু’খানি আসলি মোবাইল যে সত্যিই কোথাও পাচার হয়ে গেছে, তারও কোনও প্রমাণ নেই। অতএব এখন এ নিয়ে বিস্তর গবেষণা চলবে। ওদিকে আর এক থিওরিতেও জান আছে। সেখানেও বিস্তর মিল। ২৪-এর ভোটের আগে ২৩-এর মার্চ এপ্রিল থেকে আমরা দুটো ঘটনা প্যারালালি ঘটতে দেখেছি, ১) প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বনগাঁ লোকালের নিত্যযাত্রীদের মতোই বাংলাতে আসা শুরু করেছিলেন, রুটি দিয়ে আলুপোস্ত খেয়ে, রবিঠাকুরের কবিতা আউড়ে বাঙালি হওয়ার চেষ্টা করছিলেন। ২) এবং সকাল-সন্ধ্যায় খবর আসছিল এর ঘরে সিবিআই, তার ঘরে ইডি, এবং তাঁরা সব্বাই তৃণমূল নেতা বা তৃণমূল ঘনিষ্ঠ। এবারে কি সেই একই নাটক অনুষ্ঠিত হচ্ছে, জীবনকৃষ্ণ সেখানে বোড়ে মাত্র? শোনা যাচ্ছে সেপ্টেম্বরের শুরুতেই এক মন্ত্রীকেও গ্রেফতার করা হবে। মানে ভোট এসেছে, আকাশে চিল শকুন ঘুরিতেছে, এসব তারই অঙ্গ। আমরা আমাদের দর্শকদের জিজ্ঞেস করেছিলাম যে ভোটের আট ন’ মাস আগে থেকে রাজ্যে ডেইলি প্যাসেঞ্জারি শুরু করেন মোদি–শাহ সমেত বিজেপির দিল্লির নেতারা আর তারই সঙ্গে তাল মিলিয়েই আসে ইডি-সিবিআই। এবারে সেই খেলা শুরু হয়ে গেছে। কিন্তু এসবের পরেও কি বিজেপি আগামী বিধানসভা নির্বাচনে খুব একটা কিছু করে উঠতে পারবে? শুনুন মানুষজন কী বলেছেন।
কিন্তু এটাও ঘটনা যে এই এমএলএ জীবনকৃষ্ণের মতো লোকজন আর তাদের এই নৌটঙ্কি দলের কাছে ক্রমশ এক বোঝা হয়ে ওঠে। আমি যদি ধরেও নিই যে ইডি বা সিবিআই এক প্রতিহিংসামূলক উদ্দেশ্য নিয়েই রাজ্যে আসবে, এর ওর তার বাড়িতে রেড করবে, বিভিন্ন কথা ভাসিয়ে দেবে সংবাদমাধ্যমে, রাত হলেই মিডিয়ার কলতলায় সেসব নিয়ে আকচা আকচি চলবে। জানি কিন্তু সেই কাজকে এমন নাটকীয় করে তুলে মানুষের সামনে নিজে আর দলকেও যারা ব্যতিব্যস্ত করে তুলছে, তাদের চিহ্নিত করেই দল থেকে তাড়ানো হোক। যে কোনও দলেই এরা হল সেই নিকৃষ্ট মানের লোকজন যারা পচা আলুর মতো পুরো বস্তাকে পচিয়ে দেয়, এসব পচা আলুকে বস্তা থেকে ছুড়ে ফেলে দেওয়াটা প্রথম কাজ, হ্যাঁ, যে কোনও দলের শুদ্ধিকরণের প্রথম ধাপ হল পচা আলু চিহ্নিত করা, আর তাদের ছুড়ে ফেলা।







