যেমনটা রোজ করে থাকি, একটা বিষয়ের অবতারণা আর সেই বিষয়কে নিয়ে অন্তত দুটো ভিন্ন মতামতকে এনে হাজির করা, যাতে করে আপনারা আপনার মতটাকে শানিয়ে নিতেই পারেন আবার আপনার বিরুদ্ধ মতটাকেও শুনে নিতে পারেন। শহরের রাজপথে ছিল অসংখ্য মিছিল। এবং এটাও সত্যি যেদিন সেই মিছিলের শুরুয়াত, সেই ১৪ অগাস্ট তো কেবল লাল ঝান্ডা নিয়ে মানুষজন পথে নেমেছিলেন, তা তো নয়। আমার নিজের চোখেই দেখা, বহু তৃণমূল নেতাকর্মী সমর্থক, তাঁরা তাঁদের পরিবার সমেত পথে নেমেছিলেন। এখনই অন্তত দু’জন বড় নেতার কথা তো বলতেই পারি, রাজ্যসভা সদস্য শুখেন্দুশেখর রায়, দলের সাধারণ সম্পাদক তন্ময় ঘোষ। নেমেছিলেন পথে। যদিও এটাও আবার ঠিকই যে কিছুদিন পর থেকে এই সামাজিক আন্দোলন এক পরিপূর্ণ রাজনৈতিক আন্দোলনে বদলে যায়, সেটাও আবার সরাসরি রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বেও নয়, সামনে বোড়ে এগিয়ে দিয়ে পেছন থেকে গুজগুজ ফুসফুস। কাজেই এক বিরাট সম্ভাবনা, যা ছিল এই আন্দোলনের মধ্যে লুকিয়ে, যা হয়ে উঠতেই পারত এক নারী সুরক্ষার আন্দোলন, এক সার্বিক দুর্নীতি বিরোধী আন্দোলন, এক লিঙ্গসাম্যের আন্দোলন, তা হয়ে উঠল সিসিটিভি আর কমিটির টানাহ্যাঁচড়া, আর এক পার্সেপশনের লড়াই, আমি আরজি কর আন্দোলনের পক্ষে, তুই বিপক্ষে। আন্দোলন হয়ে উঠল পরিচিত রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের মহড়া মাত্র। কাজেই ধেয়ে এল সেই সব পরিচিত শব্দ বন্ধ, চটিচাটা, কালীঘাটের ষড়যন্ত্র, নবান্নের ধর্ষক, মমতা বেগম এবারে পালাবে, হেলিকপ্টার রেডি আছে, চটিচাটা উঠল গাছে, ইত্যাদি ইত্যাদি ইত্যাদি।
এবং প্রায় অবাক করার মতন ব্যাপার হল যে সুশীল বুদ্ধিজীবী শিল্পী অভিনেতা গায়ক কবিরা প্রতিবাদে নেমেছিলেন, তাঁদেরও কেউ কেউ এইসব শব্দবন্ধ অনায়াসে ব্যবহার করে ফেললেন, এক অভিনেত্রী বললেন কান ধরে ওনাকে ক্ষমতা থেকে সরাব। কেন বললেন? সম্ভবত বাংলাদেশের হাসিনা বিতাড়নের মতো মমতা বিতাড়ন হাতের মুঠোয়, তাই নিজের স্কোর, নিজের পয়েন্ট বাড়াতেই এতটা বাড়াবাড়ি করলেন। কিন্তু লাঠি গুলি টিয়ার গ্যাস ছাড়াই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আন্দোলন সামলালেন এবং এই সেদিন ৩১ ডিসেম্বর ধর্মতলায় দ্রোহের আগুন জ্বালাতে এই বুদ্ধিজীবী শিল্পীদের প্রায় কেউই হাজির ছিলেন না, তাঁদের কেউ না যাঁরা দ্রোহের আগুন উসকে দিতে এই কথাগুলো বলেছিলেন, তাঁদের একজনও নয়। আর আন্দোলন সফল হলে আন্দোলনের একটা ডিভিডেন্ড তো সব্বাই পায়, কিন্তু ব্যর্থ হলে ব্যাকলাশ তো আসেই, আসবেই, সামনের পক্ষ কি চৈতন্য নাকি? মেরেছ কলসির কানা তা বলে কি প্রেম দেব না? এরকমটা আশা করাও ভুল, কাজেই সেই দায়িত্ব নিলেন কুণাল ঘোষ, আজকে এখনও পর্যন্ত যিনি তৃণমূল দলের মুখপাত্র, তিনি বললেন যাঁরা সেদিন দলনেত্রীকে ওই কটুকথাগুলো বলেছিলেন তাঁদের কে তৃণমূলের কোনও আয়োজনে কেন ডাকা হবে? দল, দলের নেতা কর্মীদের আয়োজনে মাচায় তাঁরা আসবেন কোমর দোলাবেন আর টাকা নিয়ে চলে যাবেন, তা হয় নাকি? এটাই তিনি বোঝাতে চেয়েছিলেন। বলার পরেই র্যাঙ্ক অ্যান্ড ফাইলে তা ছড়িয়ে গেল, সেই দিনগুলো যে সব দলের কর্মী আশঙ্কায়, আতঙ্কে দিন কাটিয়েছেন, স্বাভাবিকভাবেই তাঁরা লুফে নিলেন কুণালের কথা, মুখপাত্রের কথা।
আরও পড়ুন: দিলীপ ঘোষের বাংলাদেশের মাল বয়কট সত্যি মিথ্যে কথাগুলো
এবং এইখানেই কহানি মে টুইস্ট, মাত্র কদিন আগেই যাঁকে কুণাল ঘোষ ভাবী মুখ্যমন্ত্রী বলেছিলেন, সেই ভাবী মুখ্যমন্ত্রী অভিষেক নেমেছেন মাঠে। খানিকটা চৈতন্যের সুরে তিনি বলেছেন সে আবার কী, যার যা ইচ্ছে বলতেই পারেন, তাঁরা প্রতিবাদে নেমেছিলেন বলেই কি তাঁদের মঞ্চে উঠতে দেওয়া হবে না? এটা হয় না, এটা দলের কথা নয়। কে কী পরবে, কে কী খাবে, কে কী বলবে সে সবের বিচার করে মাচায় গান করতে দেব বা দেব না এটা সিপিএম জমানাতে হত, আমদের জমানাতে এসব হবে না। এমনিতে ওনাকে বলতেই হবে, ওই সময়েই তো বাস্তিল দুর্গের ইতিহাস শুনিয়েছিলেন শুখেন্দুশেখর রায়, আশঙ্কাতে? ভয়ে? নাকি বিকল্প দরজা খোলার জন্য তা অবশ্য জানা নেই। কিন্তু সেসব তীব্র ইনটেলেকচুয়াল প্রতিবাদের পরে তিনি ঘরে ফিরেছেন আর সুবহ কা ভটকা শাম কো ঘর আয়ে তো উসে ভুলা নহি কহতে। উনি বুঝেছেন আর কোনও গতি নাই, তাই কালীঘাটে সিগনাল পাঠিয়েছিলেন, আলো সবুজ হবার পরে আ গলে লগ যা, সুখেন্দুশেখর আবার তৃণমূলেই। এই ক্ষমাসুন্দর চোখেই অভিষেক পাপকে ঘৃণা করো পাপীকে নয় ইত্যাদি ইত্যাদি বলেছেন, এরকম ক্ষমাসুন্দর কথাবার্তা আমরা মাঝে মধ্যে অভিনেতা দেবের মুখেও শুনি, কিন্তু, কিন্তু যারা রোজ মাটিতে পড়ে থাকে, এই তীব্র ঘৃণা আর দ্বেষ, গোদা বাংলায় ঝাড়ের মুখে দাঁড়িয়ে রাজনীতি করে, সেই র্যাঙ্ক অ্যান্ড ফাইল যুবরাজের এই কথা মানবেন? কারণ ইতিমধ্যেই মাচা আয়োজকরা তাঁদের লিস্ট থেকে সম্ভাব্য গন্ডোগোলের কথা ভেবেই বেশ কিছু নাম ছেঁটে দিয়েছেন, জানিয়েই দিয়েছেন এ বছরে অন্তত নয়, কে এই হ্যাপা পোয়াবে বলুন?
অভিষেকের কথা হাড়ভাঙা বাজার কমিটির আয়োজকেদের কানে গেছে? বা বগলাসুন্দরী ইকো পার্কের ভলিন্টিয়ারেরা সে কথা মানবেন? কাজেই যা হওয়ার তা কিন্তু হয়ে গিয়েছে। এই হল অন্য দিকের কথা। কিন্তু বল এখন রেফারির কোর্টে, কুণাল জানিয়েই দিয়েছেন, রেফারি যা বলবেন তাই মেনে নেব। হ্যাঁ কালীঘাটের রেফারি কি কিছু বলবেন? নাকি মৌন থাকবেন সেটা দেখার। যদিও আমরা তো জানিই যে মৌনং সম্মতি বাচনম।