হ্যাঁ এটাই প্রশ্ন, ফাইনাল ভোটার লিস্টে মুসলমান ভোটার বাদ দেবার টার্গেট এর কতটা কাছাকাছি শুভেন্দু অধিকারি (Suvendu Adhikari)? দেড় কোটি মুসলমান আর রোহিঙ্গা বাদ যাচ্ছে? কারণ এসব বাদ দেওয়ার পরেই তো ওই রামরাজ্য আসবে। রাম মন্দিরে (Ram Mandir) ধর্ম ধ্বজা তোলার সময়ে মোদিজী বলেছিলেন, রাম রাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে। দুদিন আগে বিশ্ব হিন্দু সম্মেলন হয়ে গেল হরিদ্বারে, তাঁদের আর তর সইছে না, তাঁরা এখনই হিন্দু হৃদয় সম্রাট মোদিজীকে হিন্দু রাষ্ট্রের সেনানায়ক হিসেবে দেখতে চান, হ্যাঁ ওসব প্রধানমন্ত্রী ইত্যাদি সেকেলে ব্যাপার ওনাদের কাছে, ওনারা রাজা, সেনাপ্রধান ইতিয়াদি বোঝেন যাঁদের নেতৃত্বে তৈরি হবে এক রাম রাজ্য। হ্যাঁ তাঁরা সেই রামরাজ্য প্রতিষ্ঠার কথা বলেছেন, হিমন্ত বিশ্বশর্মা আবার জোর দিয়েই বলেছেন যদি না আটকানো হয় তাহলে আর দশবছরের মধ্যে মিয়াঁরাই অসম দখল করবে। সংবিধান মোতাবেক এই উন্মাদদের জেলে থাকা উচিত, কিন্তু তাঁরা পাগলা ষাঁড়ের মতনই ঘুরে বেড়াচ্ছেন, আর মাঝেমধ্যেই রামরাজ্যের কথা বলছেন। এ কেমন রামরাজ্য? যে রাষ্ট্রে কেবল ভোটার তালিকা সংশোধনকে কেন্দ্র করে এখনও পর্যন্ত আমাদের এই বাংলাতে ১৩০ জন মানুষ হয় আত্মহত্যা করেছেন, নাহলে ওই দুশ্চিন্তায় মারা গিয়েছেন। একজন মহিলা, যিনি সংসার সামলেছেন, কাজ সামলেছেন, বাচ্চাদের বড় করেছেন, তিনি অসহায়ভাবে লিখছেন এই টেনশন নিতে পারছেন না, লিখে গলায় দড়ি দিয়ে ঝুলে পড়লেন? এ কিসের গণতন্ত্র, যার জন্য এত লাশের দরকার হয়? মোদিজী বলেছেন তিনি রাম রাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে চান, এক সরকারি কর্মসূচিতেই যদি এতগুলো নিরীহ মানুষের প্রাণ যায়, তাহলে সে শাসনকে কোন মাপকাঠিতে রামরাজ্য বলা হবে? প্রতিটা ক্ষেত্রে আমরা পিছোচ্ছি, এখনও দেশ একটা আধুনিক মাইক্রো চিপ তৈরি করতে পারে না, একটা মোবাইল বা টিভি তৈরি করতে পারে না, যা হয় সেটাকে স্ক্রু ডাইভার ইন্ডাস্ট্রি বলে, পার্টস এনে জুড়ে দিয়ে প্যাকেটে পোরার ইন্ডাস্ট্রি, এখনুও পর্যন্ত আমাদের দেশ একটা লেন্স তৈরি করতে পারলো না, এখনও আমরা ডাল, থেকে সরষে থেকে ভোজ্য তেল আমদানি করছি, এখনও আমাদের রপ্তানি আমদানির একের তিনভাগও নয়, জিনিষপত্রের মূল্যবৃদ্ধি এখনও মানুষকে ক্রমশ অসহায় করে তুলছে, চাকরি নেই, মাথা পিছু আয় ২৬০০ ডলারের মতন, আর এর থেকে যদি ওপরের ৫শতাংশ মানুষের আয় তুলে নেওয়া হয় তাহলে তা কমে ১৭০০ ডলারে দাঁড়াবে, অথচ প্রধানমন্ত্রী বলছেন আমরা পৃথিবীর তৃতীয় অর্থনীতি হবো। এই তথ্যের আড়ালে মিথ্যের প্রচার তিনি থামাবেন না, কিন্তু এটাও বোঝেন যে মানুষ ধৈর্য হারাচ্ছে, মানুষ প্রশ্ন করা শুরু করছে, মানুষ রাস্তায় নামা শুরু করছে, তাই সেই মানুষকে আরও বিপন্ন করো, আরও আরও অসহায় করে দাও, সে ব্যস্ত থাকুক নাগরিকত্ব নিয়ে, যে মানুষ গত ১০ টা নির্বাচনে ভোটদিয়েছেন তিনিও নিবিষ্ট মনে খুঁজে যাচ্ছেন নিজের নাম, তিনি লিস্টে আছেন কি না। অথবা সেই মানুষ উদ্বেল হয়ে উঠুক রামের নামে, ৫০০ বছরের গোলামী কেটে এক কাল্পনিক স্বাধীনতার নামে জয়ধ্বনী দিক, সে ভুলে যাক যাবতীয় অভাব অভিযোগ আর জীবন ধারণের সমস্যার কথা, তার কাছে থাকুক এক আবেগ, যা রামকে ঘিরে গড়ে উঠুক, এক ঘৃণা, যা মুসলমানদের কে নিয়ে বাড়তে থাকুক, তার সমস্যার, সব সমস্যার জন্য দায়ী করুক ওই তাদের। সেই ওরা আমরার বৃত্তে ঘুরতে থাকুক রাজনীতি আর সমাজ, সেটাই আরএসএস – বিজেপি চায়, সেই জন্যই তারা এক ধারে আপনার নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলছে, অন্যদিকে রাম রাজ্যের কথা বলছে।
আজ ২৩ তারিখ, দিন ৪/৫ সময় আছে, কাজ চলছে, সেসবের পরে নাকি ফাইনাল তালিকা বের হবে। বলা হয়েছে সেটা ফাইনাল হলেও তারপরেও আবার যোগও হতে পারে, তার দায়িত্ব এবারে বিচারকদের হাতে, হ্যাঁ বিচারকদের আদালতে লক্ষ লক্ষ মামলা পড়ে আছে, কঝুলে আছে, তার কিছুর বয়স ৭/৮/৯/১০, তাতে কি? ওনারা এবার ভোটার লিস্ট সংশোধনের দায়িত্বে। কিন্তু তারপরেও কেবল সাধারণ ভুলের জন্যও যদি কারোর নাম বাদ পড়ে, যা পড়বেই, তাহলে সেদিনের মৃত্যু মিছিল কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? বিহার জয় হয়ে গেছে, সেই আনন্দে বাংলা জয়ের খোয়াব নিয়ে বঙ্গে আসছেন বিজেপি নেতারা, আসছেন অমিত শাহ, কতগুলো মৃত্যুর দায় নেবেন তাঁরা? কতগুলো লাশ বইবেন তাঁরা? এই মৃত্যুর দায়ভার তাঁদের ওপরে পড়বে না? এই লাশেদের সারি তাঁদের চোখে পড়ছে না? আমরা একবার বহু লাশ বহু রক্ত মাড়িয়ে এক স্বাধীন দেশে বাঁচার স্বপ্ন দেখেছি, আমাদের বাংলার কিশোর কিশোরী, যুবক যুবতীরা ফাঁসি কাঠে চলেড়েছেন, কালাপানি খাটতে চলে গেছেন, মুচলেকা না দিয়ে কেউ কেউ পূর্ণ মেয়াদের জেল খেটেই বাইরে এসে দেখেছেন তাঁর দেশ বিভাজিত, তাঁর ঠিকানা বদল হয়ে গেছে। এসব তো মোদি শাহেরা দেখেন নি, গুজরাট থেকে একজনেরও নাম জানা নেই যিনি স্বাধীনতা সংগ্রামে ফাঁসিকাঠে চড়েছেন। সেই স্বাধীনতার আগে এই বাংলাতে বেনিয়াগিরি করতে এসেছেন সেটা জানা আছে। সেই দুই গুজরাটির এই লাশের পাহাড় ডিঙিয়ে ভোট প্রচারে আসতে কোনও দ্বিধা নেই, লজ্জাও নেই, কিন্তু মাথায় রাখবেন প্রতিটা জনসভাতে এই মৃত্যু হিসেব নেবে বাংলার মানুষ, তৈরি থাকুন। ভোটার তালিকা সংশোধনকে এক জীবন মরণের ব্যাপার করে তোলা হল, সারা দেশের মানুষের কাছে, বিশেষ করে সেই মানুষজন যাঁদের রাজ্যে নির্বাচন মাত্র মাস চার, পাঁচ মাসের মধ্যেই ছিল। এই নির্বাচন শেষ করে পরের নির্বাচনের আগে সেই তালিকা কে শুদ্ধ করলে কোন ক্ষতিটা হত? ২০০২ থেকে এই তালিকা ধরেই সামারি রিভিশন হয়েছে ভোট হয়েছে। কিন্তু প্ল্যান তো আলাদা, তাই চার পাঁচ মাসের মধ্যেই এস আই আর শুরু করা হল। নানান জটিলতা এসেছে, কোন দলিল গ্রাহ্য হবে তাই এখনও জানা গেলনা, সুপ্রিম কোর্টের রায়ও মানতে রাজি নন নির্বাচন কমিশন, ডোমিসাইল সার্টিফিকেট তাঁরা নিচ্ছেন না, তারমধ্যে জোচ্চুরি চলছে, ১০০ টাকা করে মতুয়া সংঘের কার্ড কিনেছেন যিনি তিনি জানতে পারলেন ওই কার্ডের কোনও দামই নেই, তাহলে কি তাঁকে আবার ফিরে যেতে হবে কাঁটাতার বেড়া পারকরে ওপারে, ওই দেশে? এবং খেয়াল করেছেন যে এতশত করার পরেও আপনি একটা কথাই ভেবে যাচ্ছেন আপনার, নিকট আত্মীয় পরিজনের নাম থাকবে তো ফাইনাল লিস্ট এ? না থাকলে কাকে ধরবেন? দিদি না দাদা কে? হ্যাঁ আপনার গত দু মাস গেছে এই চিন্তায়, আগামী আরও চার দিন এই চিন্তাতেই কেটে যাবে। কেন? কারণ রাষ্ট্রের নির্বাচন কমিশন স্পেশ্যাল ইনটেন্সিভ রিভিশন অফ ভোটার লিস্ট এর কাজ করছেন। হ্যাঁ চারদিন পরে আপনি জানতে পারবেন আপনার নাম ভোটার তালিকাতে আছে কি না, আর যদি না থাকে তাহলে তারপরে? ভাবতেও হাড় হিম হয়ে যাচ্ছে। আপনার চাকরি আছে কি না? আপনার রোজগারে দুটো ছেলেমেয়ের স্কুলের ফিজ, ডাক্তার বদ্যি, খাবার দাবার, সামাজিকতার দায় মেটানো যাচ্ছে কি না? আপনার রিটায়ারমেন্টের পরেও আপনার ঘরে দুজন বেকার বসে আছে কি না? আপনার বাজারে যাবার আগে প্রতিদিন হাত কাঁপে কি না? রেশনে এক সপ্তাহ চাল গম না পেলেও আপনার সংসার চলে কি না? আপনার পাড়ায় রাস্তার অবস্থা কেমন? রোজ কারেন্ট চলে যাচ্ছে কি না? না এসব ভাবার সময় কোথায় বিশ্বের সবথেকে বড় গণতন্ত্রে আপনার আপাতত একমাত্র চিন্তা ভোটার লিস্ট এ নাম টা আছে কি না। পরধান সেভক মাত্র বলেই চলেছেন বিশ্ব এখন রামময়, ভারত হলো মাদার অফ ডেমোক্রাসি, কাজেই আপনার ঐ ভোটার লিস্ট নিয়েই চিন্তা সেই বিশাল গণতান্ত্রিক ইকো সিস্টেমের সঙ্গে এক্কেবারে খাপে খাপ পঞ্চুর বাপ। আচ্ছা এটাও কি তার সঙ্গে খেয়াল করেছেন আমাদের দেশে ২০২৪ এ লোকসভা নির্বাচনে মাত্র ৬৫.৭৯% ভোট পড়েছিল। এর মানে কী? মানে খুব পরিস্কার, ৩৫% মানুষ এই নির্বাচন ইত্যাদিকে তেমন গুরুত্ব দেন না, বা ভোট দেবার প্রয়োজনীয়তাই মনে করেন না। তার মানে হল এই ভোটার তালিকা সংশোধন আসলে ভোট বা নির্বাচনের থেকে অনেক বড় কিছু, অন্তত ভোটার তালিকা সংশোধনের থেকে অনেক আলাদা উদ্দেশ্য নিয়েই আনা হয়েছে। এটা একটা অস্ত্র, আর তার এক নম্বর টার্গেট হল পশ্চিমবঙ্গ, আমাদের বাংলা।
যে ভাবে হোক, যে কোনও পদ্ধতিতে হোক, ডাউটফুল ভোটারের সংখ্যা বাড়াতে হবে, যে ভাবে হোক সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে মুসলমান ভোটারদের নাম তালিকা থেকে বাইরে রাখতে হবে, হ্যাঁ, টার্গেট লকড, প্রতিটা আসনে কমসম করে ৭/৮ হাজার ভোটার বাদ দিতে হবে, যার সিংহ ভাগ থাকবে মুসলমান। এক মুসলমান বিরোধী অভিযান চালানো হচ্ছে এই এস আই আর এর মাধ্যমে, এক চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে আসলে সেই লক্ষ্যকেই অর্জন করার চেষ্টা চালাচ্ছে নির্বাচন কমিশন। এক্কেবারে সেই তালে তাল মিলিয়ে মাত্র কদিন আগেও বিরোধী দলনেতা বলেছেন দেড় কোটি নাম বাদ যাবে, তারপর দেখবো কে কোথায় দাঁড়িয়ে। আসলে এস আই আর এখন একটা অস্ত্র, বাংলা দখল করার অস্ত্র, হ্যাঁ এখনও পর্যন্ত সেটাই মনে করছেন বিজেপি নেতারা, নির্বাচনের পরে সার সত্য বুঝতে পারবেন, হ্যাঁ পরিস্কার বুঝতে পারবেন আবার গোহারান হারের পেছনে অন্যতম কারণ থাকবে এই এস আই আর।







