ওফফফ সে এক দিন আছিল, সকালবেলায় কালোদার দোকানে ফিরিতে চা, মাখন টোস্ট খেয়ে ন্যাপাদা, রঙ্গ দা, গাঙ্গুলিদা রবিবার রবিবার গণশক্তি বিক্রি করতেন, এ এক অন্য ধরনের বিক্রির ছক, কাউকে কিচ্ছু বলতে হত না, যাওয়া আসার পথে মানুষজন চুপচাপ বা হেঁ হেঁ করে হেসে একটা করে পত্রিকা কিনে পয়সা দিয়ে চলে যেতেন। দীর্ঘ এবং কষ্টকর জনসংযোগ সেরে এসে সেই এলসিএস, এলসিএম খোঁজ নিতেন কোন প্রোমোটার নতুন ফেলাটবাড়িতে হাত দিয়েছে, কোন বাড়িওলা তার ভাড়াটে উচ্ছেদ করতে চায়, কোন ভাড়াটে উচ্ছেদ হতে চায় না এসব ইন্টারেস্টিং খবর নেওয়ার চেষ্টা করতেন, কারণ এলাকাতে জনগণতান্ত্রিক বিপ্লবের ভার তো তেনারই হাতে। এরই মধ্যে কখনও সখনও খবর আসত যে বিরোধী দলের কোনও নেপো, হুপো পোস্টার মেরেছে দেওয়ালে, পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বেবেন, চৌকে দিয়ে তাদের বাবা, কাকাকে ডেকে এনে যা বলা হত তার মর্মার্থ ছিল ইয়া তো শুধর যাও, নহি তো উপর যাও, হয় শুধরে যান, না হলে উপরে যান। কে আর তার সন্তান ভাইয়ের উপরে যাওয়ার কথায় সায় দেবেন, তাই ওই শুধরে যাওয়া, মানে পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়াটাই কাজের কাজ বলে মনে করত। ফ্যাক্টরি থেকে ইউনিয়নের নেতা পাঠিয়ে দিত সুবাসিত দার্জিলিং চা, বাজারের বিশু মাছওলা দিয়ে যেত পাকা পোনা বা ভেটকির গাদা। সেসব দিন চলে গেছে। শুভ্র ধুতি পাঞ্জাবি আর পাম্প শু পরা জ্যোতি বসু, ওদিকে আরও শুভ্রকেশ, ধুতি আর চপ্পল পরা বুদ্ধ ভট্টাচার্য, এক অভিজাত, শিক্ষিত আবহ, বিলেতের ব্যারিস্টার আর প্রেসিডেন্সির ছাত্র। হ্যারি পলিটের সংস্পর্শে কমিউনিস্ট জ্যোতি বসু আর মার্কেজের অনুবাদ করা বুদ্ধ ভট্টাচার্য। সেইখান থেকে কালীঘাটের হোক না বামুন, কালীঘাটের বস্তির এক মহিলা এসে ঝাড়েবংশে উৎখাত করে দেবে? বংশে পিদিম জ্বালানোর কেউ নেই? এ কি প্রাণে সহ্য হয়? এ ব্যথা কি যে ব্যথা বোঝে কি আনজনে, সজনী আমি বুঝি মরেছি মনে মনে। আর তাই সামনে আরএসএস থাকুক, মোহন ভাগবত থাকুক, মোদিজির ফাসিস্ত রেজিম থাকুক, সিপিএমের অর্জুন চক্ষু দেখছে কেবল মাছের চোখ, চোখের মধ্যের ছবিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। আর সেটাই বিষয় আজকে। মমতাকে ছোট করার চেষ্টায় সিপিএম উন্মাদ।
মমতা বিলেতে গেছেন, আমরা সব্বাই জানি এসব অপটিক্স-এর ব্যাপার, নেতা-নেত্রীরা বিলেত বিদেশ যান, তা অস্বাভাবিক কিছুই নয় আর তা দিয়ে এক্কেরে বিশাল রাজভোগ বৃষ্টি শুরু হবে তাও নয়। এ আমরা জানি। ফি বচ্ছর জ্যোতি বসু যেতেন, ফি মাস নরেন্দ্র মোদি যান, মমতা তো তবু সেই তালিকার এক্কেবারে তলায়, সেই কবে গিয়েছিলেন, সেবারেও সাংবাদিকেরা সঙ্গে ছিল, তাঁর সঙ্গে গলা মিলিয়েছিল, আমি যে গান গেয়েছিলেম ইত্যাদি, তো তাঁদের একজনকে জেলে পুরেছিল মোদি সরকার, উনিই সেই সাদার মধ্যে কালো ভেড়াটি, যিনি সাংবাদিকতার শীর্ষ দেখেছেন আবার চুরির দায়ে জেলেও গেছেন।
আরও পড়ুন: Aajke | দিলীপের হাতে দা, মুখে ঘৃণা, নতুন দোসর শুভেন্দু
তো যাই হোক, সেও তো বছর তিনেক আগের কথা। তো এবারেও গেছেন। যাবার আগেই সিপিএম মুখপত্রে জানাল যে ওনাকে কেউ ডাকেইনি, এই খবর কীভাবে সিপিএমকে জনগণতান্ত্রিক বিপ্লবের দিকে এক পা এগিয়ে দেবে জানি না কিন্তু এই খবর ছেপে আসলে তেনারা ওই সেই পুরনো গায়ের ঝাল ঝাড়ার চেষ্টা করলেন। পরের দিনই সব কাগজ রেডি, কোন কলেজ, কোন ইউনিভার্সিটি থেকে ডাক এসেছে তা সব্বাই জানল, বিপ্লব এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার বললে এক রাখ খিল্লি করল লোকজন, এবারে সেই সিপিএম লন্ডন থেকেই অপারেশন মমতা শুরু করে দিলেন, কে বা কাহারা আরজি কর প্রাক্তনী সংগঠনের নামে এক বিশাল চিঠিতে মমতা যে কত অগণতান্ত্রিক তা বুঝিয়ে অনুরোধ করলেন কেলগ কলেজে তাঁর ওই বক্তৃতা যেন বন্ধ করা হয়। মানে মমতার সেমিনার বন্ধ করলেই তো ওই জনগণতান্ত্রিক বিপ্লব মাইলখানেক এগিয়ে আসবে, তাই এই অনুরোধ। তো অমন উড়ো চিঠিতে এখন বিয়েও ভাঙে না, এমন এক বিখ্যাত রাজনৈতিক নেতার সেমিনার কি ভাঙা যায়? কিন্তু ওই আরজি কর প্রাক্তনীদের অনেকেই সাফ জানিয়ে দিল যে এ কাজ তাঁদের নয়, আবার মুখ পুড়ল। আসলে মমতা শুনলেই সিপিএম ছোট সেজ মেজ বড় নেতাদের পালস রেট বেড়ে যাচ্ছে, রক্তের চাপ অনুভব করছেন, কারও কারও পুরনো কলিক পেইন ফিরে আসছে, সঙ্গে রক্ত আমাশা। সবটাই এক অসম্ভব মমতা-ঘৃণা থেকে জন্ম নেওয়া এই অসূয়া আমরা বার বার দেখছি। আমরা আমাদের দর্শকদের জিজ্ঞেস করেছিলাম যে সিপিএম প্রায় উন্মাদের মতো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিদেশ ভ্রমণ নিয়ে অপপ্রচার চালিয়েই যাচ্ছে, এমনকী উড়োচিঠি দিয়ে সেমিনার বন্ধ করার চেষ্টাও করেছে। এই উগ্র মমতা বিরোধিতাই কি সিপিএমের জনবিচ্ছিন্নতার কারণ?
জনবিচ্ছিন্ন এক দল রাজ্যের ৪০টা লোকসভাতে জামানত পর্যন্ত বাঁচাতে পারে না, এক দল যে মাত্র ২০১১-র মার্চ মাসেও বিধানসভায় ২৩৫ জন বিধায়ক নিয়ে গর্ব করত, তারা আজ শূন্য, আ বিগ জিরো। কিন্তু এই জনবিচ্ছিন্নতার কারণ না খুঁজে তাঁরা কেবল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কেই তাঁদের শত্রু ধরে নিয়েই রাজনীতিটা করে যাচ্ছেন, এরফলে আগের করা ভুল ভ্রান্তিগুলো তারা বুঝতেও পারছেন না, ঠিক করে নেওয়া তো দূরের কথা। এবং যত দিন যাচ্ছে ততই আরও বেশি করে জনবিচ্ছিন্নতার সঙ্গে সঙ্গে পাল্লা দিয়ে হতাশাও বাড়ছে। এখান থেকে বের হওয়ার একটাই রাস্তা আছে কমরেড, গো টু দ্য মাসেস। মানুষের কাছে যান, তাদের কথা শুনুন, ভুলগুলোকে চিহ্নিত করুন না হলে ইন্ডিয়ান মিউজিয়ামের এক কোনায় নিশ্চিত জায়গা পেয়েই যাবেন, তা নিয়ে আমার তো কোনও সন্দেহ নেই।