Tuesday, March 17, 2026
HomeFourth Pillar | মোদিজির চোখের সামনে দিয়েই ডাকাতি হচ্ছে

Fourth Pillar | মোদিজির চোখের সামনে দিয়েই ডাকাতি হচ্ছে

আরএসএস–বিজেপি ২০১৪-তে ক্ষমতায় আসার পরেই প্রথম নজর দিয়েছিল দেশের ইতিহাসে। ভারতের সুপ্রাচীন ইতিহাসের ধর্মনিরপেক্ষতা, দেশের বিরাট বৈচিত্রময় সংস্কৃতি, ভাষা, ভাষার ইতিহাস, নতুন সভ্যতা গড়ে ওঠা, নতুন রাজত্বের শুরুয়াত আর শেষ, বিভিন্ন ক্ষমতার মধ্যে লড়াই আর তার নানান হিসেব নিকেশ, বিভিন্ন ধর্মের সময়কাল, রাজারা কেউ হিন্দু, কেউ শৈব, কেউ শাক্ত, কেউ বৈষ্ণব, কেউ বৌদ্ধ, কেউ জৈন, কেউবা মুসলমান, তাদেরও কেউবা শিয়া, কেউবা শুন্নি। কিন্তু সেই ইতিহাসকে নিজেদের মতো করে নেওয়ার জন্যই, এক নতুন সাম্প্রদায়িক ন্যারেটিভ গড়ে তোলার জন্যই, আরএসএস বিজেপির নেতৃত্বে দেশের ইতিহাসকে নতুন করে লেখার একটা উদ্যোগ শুরু হয়। সেই কাজের প্রথম লক্ষ্য ছিল সাড়ে পাঁচশো বছরের ইসলামিক ইতিহাসকে মুছে দেওয়া, ব্রিটিশ বিরোধী সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী ইতিহাসকে বিকৃত করা, আর এক নতুন হিন্দু ইতিহাসের জন্ম দেওয়া, যা ইতিহাস নয় তাকেও ইতিহাস বলে চালানো, আর সেটার মধ্য দিয়েই নিজেদের সাম্প্রদায়িক ন্যারেটিভকে আরও শক্তপোক্ত করে গড়ে তোলা। তার কতগুলো খুব সোজা কমন ন্যারেটিভ তো আমাদের সামনেই আছে। ইসলামিক শাসনে হিন্দুরা ছিল শোষিত, লাঞ্ছিত। ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে কংগ্রেস লড়েনি, তারা দেশভাগ করে স্বাধীনতা এনেছিল জহরলাল নেহেরু প্রধানমন্ত্রী হবেন বলে। এরকম কিছু ন্যারেটিভ তাঁরা ক্ষমতায় এসেই ছড়িয়েছেন, আর ঠিক সেই কাজটাকেই আরও বড় করে করার জন্য তাঁরা ভারতের ইতিহাস গবেষণা পরিষদের দখল নেন, আর অখিল ভারতীয় ইতিহাস সংকলন পরিকল্পনা তৈরি করেন, যেখানে রামায়ণ থেকে আধুনিক ভারতবর্ষের ইতিহাস লেখার কাজ হবে আর ভারত, মাদার অফ অল ডেমোক্রেসি বলেও একটা প্রজেক্ট হাতে নেওয়া হয়।

২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদির প্রথম দফার সরকার গঠনের তিন বছর পর দিল্লির ইন্ডিয়ান কাউন্সিল ফর হিস্টোরিকাল রিসার্চ (ICHR)-এ গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ পান আরএসএস-ঘনিষ্ঠ সংগঠন ‘অখিল ভারতীয় ইতিহাস সংকলন পরিকল্পনা’ (ABISY)-র একাধিক সদস্য। ইতিহাস নতুন করে লেখার আরএসএস-এর দীর্ঘদিনের এজেন্ডার অংশ হিসেবেই এই নিয়োগগুলো করা হয়েছিল, খুব ভেবেচিন্তেই। এমন সমস্ত গবেষণা শুরু হয়, যার নিট বিষয় হল ঐ ইসলামিক শাসনে হিন্দুদের ওপর অত্যাচার, আর স্বাধীনতার লড়াই এ কংগ্রেস আসলে ইংরেজদের পক্ষে দালালি করেছিল, এই দুটো মোদ্দা কথাগুলো প্রমাণিত হয়। আর তার জন্য তারা সেই শুরু থেকেই কাজ শুরু করেছিল। সেইখানে কেলেঙ্কারি, মানে ঘোটালা। যা সামনে এসেছে তা হল ১৪ কোটি টাকার একটা কেলেঙ্কারি—যেখানে একজনকে একাধিক ভূমিকায় নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল, সেখানে অডিট রিপোর্ট জাল করা হয়েছে, এবং দলিলপত্র মুছে ফেলা হয়েছে — আর এসবের পিছনে রয়েছেন আরএসএস ঘনিষ্ঠ এক প্রাক্তন বিজেপি সাংসদ। মূল অনিয়মগুলোর মধ্যে ছিল — ৬.২৬ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছিল এমন ৩৯৭ জন গবেষককে, যারা কাজ জমাই দেয়নি। ১.০৯ কোটি টাকা পেয়েছে এমন সংস্থা, যাদের ৮৫টা প্রকল্পের কাজ অসম্পূর্ণ, ২.৫৫ কোটি টাকার সংস্কারকাজ অনুমোদন ছাড়াই করানো হয়েছে। বেসিল (BECIL) নামে এক সংস্থাকে e-office অ্যাপ তৈরির কাজ পুরো অগ্রিম টাকায় দেওয়া, যা নিয়মানুযায়ী নয়। এই BECIL আবার আরএসএস ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী কিরণ ডি.এম-এর সংযোগযুক্ত একটি প্রতিষ্ঠানকে ১২ লক্ষ টাকায় কাজ দেয়, যার নাম ছিল ‘ইফোরা’। এই কোম্পানির আর কোনো উল্লেখযোগ্য ব্যবসা ছিল না, এবং এর পরিচালকরাও RSS ঘনিষ্ঠ বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে যুক্ত।

আরও পড়ুন: Fourth Pillar | অপারেশন সিঁদুর এই মুহূর্তে বিজেপির একমাত্র নির্বাচন হাতিয়ার

এর সঙ্গেই যোগ হয়েছে ‘India: The Mother of Democracy’ বই প্রকাশে দুর্নীতি, ICHR-এর তৎকালীন সদস্য সচিব কদম এবং চেয়ারম্যান তনোয়ারের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় ৩০.১ লক্ষ টাকা ব্যয়ে একটি বই — যার নাম ‘India: The Mother of Democracy’। যদিও অনুমোদিত বাজেট ছিল ২০ লক্ষ টাকা। বইটি প্রকাশের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল ‘কিতাবওয়ালে’ নামের এক প্রকাশনাকে, যার কর্ণধার প্রভাস জৈন বিভিন্ন আরএসএস নেতার ঘনিষ্ঠ। বইটির দাম ধার্য করা হয়েছিল ৫,০০০ টাকা। কিন্তু সেই মূল্য কীভাবে ধার্য করা হল? কেন এত দাম হবে এই বইয়ের? কী এমন আছে? কেউ জানে না।  ICHR নিজেই ১,০০০ কপি কিনেছিল ২৫ লক্ষ টাকা দিয়ে, যার মধ্যে মাত্র ২৬ কপি বিক্রি হয়, ৯৪ কপি প্রধানমন্ত্রীর দফতরে উপহার হিসেবে পাঠানো হয়, বাকি ৮৮০ কপি পড়ে আছে, কিছুদিন পরে উইপোকার খাবার হবে বলে। আর এই কেলেঙ্কারির ঘটনাস্থল? ভারতের ইতিহাস গবেষণা পরিষদ, অর্থাৎ আইসিএইচআর। আইসিএইচআরের মূল কাজ ভারতের ইতিহাস নিয়ে গবেষণা করা এবং গবেষকদের অনুদান দেওয়া। এই প্রতিষ্ঠানটি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন একটি স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা। কিন্তু ২০১৫ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে এখানে যা হয়েছে, তা ছিল ক্ষমতার অপব্যবহার, স্বজনপোষণ আর আর্থিক দুর্নীতির মঞ্চ। সংবাদসংস্থা নিউসলন্ড্রি ৭০টি সরকারি ফাইল, অন্তত ১৫ জন কর্মচারী ও প্রাক্তন সদস্যের সাক্ষাৎকার, এবং ঐ গবেষণা পরিষদেরই  হিন্দিতে লেখা একটি গোপন তদন্ত রিপোর্ট যা তারা কখনও জনসমক্ষে প্রকাশ করেইনি, সেগুলো বিশ্লেষণ করে এই তথ্য সংগ্রহ করেছে, প্রকাশও করেছে। কী ঘটেছিল? ইন্ডিয়ান কাউন্সিল ফর হিস্টোরিক্যাল রিসার্চ আইসিএইচআরের দিল্লির অফিসে একজন ‘নিয়মিত কর্মকর্তা’ হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন দীনানাথ বাতস। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই তাঁকে একসঙ্গে চারটে দায়িত্বে দেওয়া হয় — প্রধান প্রশাসনিক কর্মকর্তা, হিসাবরক্ষক, ড্রয়িং অ্যান্ড ডিসবার্সিং অফিসার (ডিডিও), এবং ক্যাশিয়ার। মানে তিনিই সব। সরকারি কোনও দফতরে এটা করা যায় না, কিন্তু এখানে হয়েছিল, এই ধরনের একাধিক দায়িত্ব একই ব্যক্তির হাতে তুলে দেওয়াটা সরকারি নিয়মই নেই, কারণ এতে জালিয়াতির আশঙ্কা থাকে। আর ঠিক সেটাই ঘটেছিল।

তদন্ত রিপোর্টে বলা হয়েছে, বাতস ২০১৫ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে কয়েক হাজার নথিপত্র নিজের হাতে নিয়ন্ত্রণ করেন এবং আর্থিক লেনদেনেও তিনি নিজের কর্তৃত্ব বজায় রাখেন। তিনি নিজের বেতন, বোনাস, পেনশন, ছুটির অর্থ এবং অন্যান্য সুবিধা নিজেই বেআইনিভাবে বাড়িয়ে নিয়েছিলেন। রিপোর্ট বলছে, তিনি ভুয়া ভাউচার তৈরি করতেন, বিলগুলো ছোটছোট অ্যামাউন্টের করে ফেলতেন যাতে বড় অঙ্কের লেনদেন নজরে না আসে, এবং অনেক ক্ষেত্রে খরচই দেখাতেন না। তো কত টাকার দুর্নীতি হয়েছে? তদন্ত রিপোর্ট অনুযায়ী, বাতস ১৪ কোটি ৭ লাখ টাকার দুর্নীতি করেছেন। আইসিএইচআরের এক অভ্যন্তরীণ হিসাব অনুযায়ী এই অর্থ অন্তত ৬০টা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ছড়িয়ে ছিল। এই অডিটে দেখা যায়, ICHR-এর বিভিন্ন আর্থিক লেনদেনে প্রায় ১৪.০৩ কোটি টাকার অনিয়ম হয়েছে। এর মধ্যে ছিল ৭.৪ কোটি টাকার অনুদান, যা এমন গবেষকদের দেওয়া হয়েছিল যারা গবেষণার কাজ শেষ করেইনি এবং জমাও দেয়নি। রিপোর্টেই বলা হচ্ছে, সিনিয়র কর্তারা “পাগলের মত খরচের প্রবণতা” দেখিয়েছেন, যার একটি উদাহরণ হল – একজন সিনিয়র কর্তার সম্পাদিত বই প্রকাশ করতে ৩০ লক্ষ টাকা খরচ হয়েছে। যে বই এর কোনও মাথামুণ্ডু নেই। অডিট রিপোর্টে লেখা হয়, “সিদ্ধান্ত গ্রহণে কোনো স্বচ্ছতা নেই এবং ব্যাপকভাবে জেনারেল ফিনান্সিয়াল রুলস (GFR) ও অন্যান্য নিয়ম ভঙ্গ হয়েছে।” এই রিপোর্টটা তৈরি হয় ২০২২ সালে, শিক্ষা মন্ত্রকের নির্দেশে একটা তদন্ত কমিটি তৈরি করার পর। তবে রিপোর্টটা কখনও বাইরে আসেনি য়ার এই রিপোর্টের ভিত্তিতে বাতসের বিরুদ্ধে কোনও এফআইআর পর্যন্ত দায়ের করা হয়নি।

আচ্ছা এই বাতস কে? দীনানাথ বাতস আরএসএস ঘনিষ্ঠ সংগঠন, ‘আখিল ভারতীয় ইতিহাস সংস্কৃতি সংসদ’-এর সঙ্গে যুক্ত। তিনি ‘দ্বিতীয়ক’ পদে ছিলেন — যার মানে তিনি একজন জেলা স্তরের সক্রিয় সদস্য ছিলেন। এবং এখন আইসিএইচআরের সদস্যরাও বেশিরভাগই বিজেপি-ঘনিষ্ঠ অথবা আরএসএস সমর্থক। এর মধ্যে রয়েছেন তৎকালীন চেয়ারম্যান ও বিজেপি সাংসদ যেলাম নারসিংহ রাও, যিনি বাতসের নিয়োগে সরাসরি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। ঐ তদন্ত রিপোর্ট অনুযায়ী, বাতসের দুর্নীতির কাজে অফিসের একাধিক কর্মী জড়িত ছিলেন। এবং ঐ রিপোর্টেই বলা হয়েছে এই দূর্নীতির কথা ওপরতলার প্রত্যেকেই জানতেন, এবং জেনেশুনেই না দেখার ভান করেছেন। দুর্নীতির বিরুদ্ধে মোদিজির জিরো টলারেন্সের কী হল? সরকার কী করেছিল? শিক্ষা মন্ত্রক এই দুর্নীতির কথা জানার পর কোনও ব্যবস্থা নেয়নি। বরং, বাতসকে শাস্তি দেবার বদলে অনায়াসে স্বেচ্ছায় অবসরের সুযোগ দেওয়া হয়। যাঁরা ওখানে কাজ করেন, তাঁদের অনেকের বক্তব্য, এতে সরকারের মদত ছিল বলেই তিনি এতদিন এই দুর্নীতি চালাতে পেরেছিলেন। এই কেলেঙ্কারি শুধু একটি সরকারি সংস্থার আর্থিক দুর্নীতির গল্প নয়। এটা দেখায় কীভাবে আরএসএস-বিজেপি ঘনিষ্ঠ লোকেরা সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলিতে ঢুকে প্রতিষ্ঠানকে দলীয় আদর্শ অনুযায়ী চালিয়ে যাচ্ছে, আর সেখানেও চলছে র‍্যামপার্ট দুর্নীতি। যেসব ইতিহাসবিদ বা গবেষক সরকারের বাছাই নয়, সরকারের মনমত বিষয় নিয়ে গবেষণা করছেন না, তাঁদের প্রজেক্টগুলোর অনুদান বন্ধ হয়েছে, অথচ যারা সরকারের মদতপুষ্ট, তাঁদের প্রকল্পে খরচ হয়েছে কোটি কোটি টাকা। এই ১৪ কোটি টাকার হিসাব কি আদৌ কখনও চাওয়া হবে? বাতস বা তাঁর মদতদাতারা কি কখনও বিচারের মুখোমুখি হবেন? না হবেন না। এতদিনে একটাই জবাব স্পষ্ট — নীরবতা। সরকার চুপ, প্রতিষ্ঠান চুপ, এবং বাতসও ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। একটা ঐতিহ্যবাহী গবেষণা প্রতিষ্ঠানকে, রাজনৈতিক মতাদর্শের মদতে কীভাবে দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত করা হয়েছে — ICHR-এর এই কেলেঙ্কারিই তার বড় উদাহরণ। আরএসএস ঘনিষ্ঠদের লাগাতার অনুপ্রবেশ, নিয়ম ভেঙে নিয়োগ, অযোগ্যদের পদোন্নতি এবং সরকারি টাকা অপচয়ের মাধ্যমে দেশজ ইতিহাস চর্চার অন্যতম প্রধান প্রতিষ্ঠানটি আজ সংকটের মুখে।

Read More

Latest News

evos gaming

https://www.annabelle-candy.com/about/ JUARA88 situs slot gacor https://www.demeral.com/it/demeral_software/ BWO99 slot 5000 situs slot gacor joker toto slot maxwin slot maxwin situs bola BANDAR80 WATITOTO LGO188 DEPOBOS https://www.demeral.com/it/podcast neked xgo88 WDBOS SLOT GACOR toto togel slot toto togel slot poker slot gacor idn poker 88 slot gacor