বেনারস বা কাশী বলতে আমাদের, বাঙালিদের চোখে যে ছবিটা ভেসে ওঠে, তা হল গঙ্গার ঘাট, সরু গলি, ষাঁড়, কাশীর বিধবারা আর চারদিকে ছড়িয়ে থাকা হাজার বছরের ইতিহাস। কিন্তু গত কয়েকবছরে এই শহরের চেহারাটা যেভাবে বদলে দেওয়ার চেষ্টা চলছে, তাতে বেনারসের সেই পুরানো মেজাজ আর তার সেই ঐতিহ্য কোথায় যেন হারিয়ে যাচ্ছে। উন্নয়নের প্রয়োজন আছে ঠিকই, কিন্তু সেই উন্নয়ন যদি বেনারসের প্রাচীন পরিচয়কেই মুছে ফেলে, তবে সেই আখাম্বা আধুনিকতা দিয়ে আমরা কী করব? মণিকর্ণিকা, রাবণের শ্মশান, অগণিত শবদেহ, ধোঁয়ার কুন্ডলী, মানুষের শোক আর বয়ে চলা গঙ্গা। কিন্তু সেই মণিকর্ণিকা ঘাট তো হিন্দুদের কাছে কেবল একটা শ্মশান নয়, ‘মহাশ্মশান’, যেখানে দেহ দাহ করলে মোক্ষ লাভ হয়। হ্যাঁ, বহু মানুষের বিশ্বাস। কিন্তু ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে উন্নয়নের নামে, ‘বিউটিফিকেশন’-এর দোহাই দিয়ে ১০ জানুয়ারি হঠাৎ করেই মণিকর্ণিকা ঘাটের ঐতিহাসিক ‘মাধি’ বা উঁচু চবুতরাটি ভেঙে ফেলা হল। এই চবুতরাটা কোনও সাধারণ কাঠামো তো ছিল না; এটা ছিল ১৮শ শতাব্দীতে অহল্যাবাঈ হোলকারের হাতে গড়া ঐতিহ্যের অংশ। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হল, এই ধ্বংসলীলা চালানোর আগে কোনও ধরণের নোটিস দেওয়া হয়নি, স্থানীয় মানুষের সাথে কোনও আলোচনা করা হয়নি। হোলকার রাজবংশের উত্তরসূরিরা অভিযোগ করেছেন যে, অহল্যাবাঈ হোলকারের যে মূর্তিটা সেখানে ছিল, সেটা বুলডোজার চালিয়ে ভেঙে ফেলা হয়েছে, ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়েছে। একটা প্রাচীন ঐতিহ্যের যে ‘অথেনটিসিটি’ বা প্রামাণ্যতা থাকে, তা একবার ভেঙে ফেললে আর কোনওদিন ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। কেন ভাঙা হল? এই মণিকর্ণিকা রিডেভেলপমেন্ট প্রজেক্টের আসল উদ্দেশ্য হল প্রায় ৩৯,৩৫০ বর্গমিটারের এক বিশাল প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা, যেখানে একসাথে ১৯টা চিতা দাহ করা যাবে। প্রশাসনের যুক্তি হল, বর্ষার সময় বা ভিড়ের চাপে এখানে খুব সমস্যা হয়, তাই আধুনিক সুবিধা দরকার। কিন্তু তার জন্য কি আমাদের প্রাচীন মন্দির আর ঐতিহাসিক চিহ্নগুলোকে গুঁড়িয়ে দিতেই হত? গুঁড়িয়ে দিয়ে যা তৈরি হবে, সেখানে নিশ্চিতভাবেই উনিজির নাম ফলক থাকবে, মানে শত শত বছরের ইতিহাস মুছে দিয়ে সেখানে নিজের নামফলক বসানোর চেষ্টাই হল এই আধুনিকীকরণের আসল চেহারা। মণিকর্ণিকা ঘাটে কেবল একটা পাথর, একটা চবুতরাই ভাঙা হয়নি, কাশীর সেই আদি রূপটাকে বদলে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে যা গুপ্ত যুগ থেকে আজও টিকে ছিল। ঘাটের সেই পুরানো মন্দির—যেমন মশান মন্দির বা রত্নেশ্বর মন্দির—এখনও দাঁড়িয়ে আছে ঠিকই, কিন্তু তাদের চারপাশের যে পরিবেশ, যে গলিগুলো বেনারসের প্রাণ ছিল, সেগুলো আজ ধ্বংসস্তূপ।
মণিকর্ণিকা ঘাটের এই ভাঙচুর আমাদের মনে করিয়ে দেয় কয়েক বছর আগে তৈরি হওয়া কাশী বিশ্বনাথ করিডোরের কথা। করিডোর হওয়ার পর মন্দির চত্বর এখন অনেক ঝকঝকে, চওড়া রাস্তা হয়েছে ঠিকই, কিন্তু এর জন্য যে মূল্য বেনারসকে চোকাতে হয়েছে, তা অপরিসীম। বিশ্বনাথ মন্দিরের প্রাক্তন মহন্ত রাজেন্দ্র প্রসাদ তিওয়ারি বলেছেন, এটা একটা ‘মল’ বা শপিং কমপ্লেক্স হয়ে উঠেছে, কাশী বিশ্বনাথ এখন আর কেবল মন্দির নেই, এটা একটা বাণিজ্যিক কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। হ্যাঁ, গেলেই সেটা বোঝা যাবে। ওই করিডোর তৈরির সময়েই প্রায় ২৮৬টা প্রাচীন শিবলিঙ্গ উপড়ে ফেলা হয়েছিল। এই শিবলিঙ্গগুলোর মধ্যে অনেকগুলোই ছিল অত্যন্ত প্রাচীন, ঐতিহাসিক। হিন্দু সনাতনীদের কাছে পবিত্র শিবলিঙ্গগুলোকে অত্যন্ত অমর্যাদাজনকভাবে ড্রেনের পাশে বা ধ্বংসস্তূপের মধ্যে ফেলে রাখা হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত মাত্র ১৪৬টা শিবলিঙ্গ উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে, সেগুলো এখন বেনারসের লঙ্কা থানার মালখানায় পড়ে আছে। হ্যাঁ, বেনারসের শিবজিরা এখন থানায়। আমাদের এখানে সনাতন সনাতন বলে যে অর্বাচীন রোজ হাঁক পাড়ে সেই শুভেন্দু অধিকারী কি এই খবরগুলো রাখেন? সেই কবে অতীতে আওরঙ্গজেব মন্দির ভেঙেছিলেন তাঁর সাম্রাজ্য বিস্তারের লালসায়, কিন্তু এখনকার শাসকেরা যা করছেন তা আধ্যাত্মিকতাকে বাণিজ্যে রূপান্তর করার এক গভীর ষড়যন্ত্র। করিডোর করার জন্য বেনারসের সেই প্রাচীন গলিগুলো, যা পর্যটকদের কাছে এই শহরের প্রধান আকর্ষণ ছিল, সেগুলোকে পুরোপুরি সাফ করে দেওয়া হয়েছে। আজ সেখানে বড় বড় পাথর আর কংক্রিটের চাতাল, যা দেখলে মনে হয় না আমরা কোনও হাজার বছরের পুরনো তীর্থে দাঁড়িয়ে আছি। করিডোরের এই সংস্কৃতি এখন অযোধ্যা বা মথুরাতেও প্রয়োগ করার চেষ্টা চলছে, যেখানে মন্দিরকে কেন্দ্র করে এক ধরণের ‘রিলিজিয়াস ট্যুরিজম’ বা ধর্মীয় পর্যটনের ব্যবসা ফাঁদা হচ্ছে। আর এই করিডোর সংস্কৃতির ফলে বেনারসের স্থানীয় মানুষদের জীবনযাত্রাও বদলে গিয়েছে। দলমন্ডি এলাকার ব্যবসায়ীরা যেমন উচ্ছেদের ভয়ে আছেন, তেমনই সাধারণ পুণ্যার্থীরাও অনুভব করছেন যে, বেনারসের সেই পুরানো ভক্তিভাবের বদলে এখন একটা কৃত্রিম জাঁকজমক চারপাশকে ঘিরে ফেলেছে। ঐতিহাসিকদের মতে, ইতিহাস কেবল বড় স্থাপত্যে থাকে না, তা থাকে ছোট ছোট গলি আর মানুষের স্মৃতিতে। কাশীর সেই স্মৃতিগুলোকেই আজ স্মার্ট সিটি বানানোর নেশায় মুছে ফেলা হচ্ছে।
আরও পড়ুন: Fourth Pillar | বিজেপি কি টাকা দিয়েই ভোটে জিতে যাবে?
যাঁরা বেনারসে গিয়েছেন তাঁরা জানেন, একজন চাচী বেনারস ইউনিভার্সিটির থেকে একটু দূরে লংকাতে একটা কচুরি জিলিপির দোকান চালাতেন, ভিভিআইপি-রা সেই দোকানে যেতেন কেন? চাচী চোখা চোখা গালি দিতেন, বেশির ভাগ গালি ছিল শিবকে উদ্দ্যেশ্য করেই, কেন? কারণ বেনারসের মানুষজন শিবকে তাঁদের পড়শি বলেই মনে করেন, ভগবান নয়, অনায়াস এক সম্পর্ক, যেখানে গায়ের ঝাল মেতাতে সবচেয়ে কাছের জনকেও কুকথা বলাই যায়। সেই চাচীর দোকান আর নেই, ভাঙা পড়েছে। গলি নেই, ষাঁড়েরা বড় রাস্তায়। এখন বেনারস এর কর্পোরেটাইজেশন হচ্ছে। ২০২৬ সালের ১২ জানুয়ারি জাতীয় যুব দিবসে স্বামী বিবেকানন্দের জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে এক অনুষ্ঠানে মোদিজি বললেন যে, ভারতের পুরাণ আর মহাকাব্য—রামায়ণ ও মহাভারত—এখন বিশ্বের গেমিং ইন্ডাস্ট্রির জন্য বড় রসদ হতে পারে। ‘ভগবান হনুমান একাই পুরো বিশ্বের গেমিং জগতকে নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন’। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে আহমেদাবাদের সবরমতী রিভারফ্রন্টে প্রধানমন্ত্রীর সাথে জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রেডরিক মেজ হনুমান আঁকা ঘুড়ি ওড়াচ্ছিলেন, এই ছবিগুলো আসলে ধর্মের বাণিজ্যিকিকরণ। হ্যাঁ, হওয়াই স্বাভাবিক, বাণিজ্য তো যেখানে লাভ, সেখানেই হবে। কিন্তু তাহলে ওই আধ্যাত্মিকতা, ওই প্রাচীন ঐতিহ্য আর আস্থা-বিশ্বাস এগুলোকে সরিয়ে রাখুন। আজ ঘুড়িতে থাকলে হনুমান কাল মদের বোতলে থাকবেন, তখন গায়ে জ্বালা ধরবে না তো? তখন বিশ্বাসে আঘাত লাগবে না তো? ‘অরেঞ্জ ইকোনমি’ বা সৃজনশীল অর্থনীতির দোহাই দিয়ে আধ্যাত্মিকতাকে যে ভাবে বাণিজ্যিকীকরণ করার চেষ্টা চলছে, তাতে ভক্তির আসল গভীরতাটাই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। হেরিটেজ বা ঐতিহ্য কোনও সেলফি তোলার পটভূমি নয়, এটা হল এক জাতির পরিচয়; কিন্তু আরএসএস-বিজেপি সরকার একে কেবল পর্যটন আর বাণিজ্যের মাধ্যম হিসেবেই দেখছে।
উন্নয়ন আর ঐতিহ্যের ভারসাম্য কী ভাবে রক্ষা করতে হয়, তার উদাহরণ কিন্তু আমাদের কাছেই আছে। ভারতের প্রত্নতাত্ত্বিক বিভাগ (Archaeological Survey of India বা ASI) কম্বোডিয়ার আংকর ভাট এবং তা প্রহম মন্দিরের যে সংস্কার কাজ করেছে, তা সারা বিশ্বে প্রশংসিত হয়েছে। সেখানে কাজ করার সময় এএসআই একটা নীতি মেনে চলেছিল—ন্যূনতম হস্তক্ষেপ বা ‘মিনিমাল ইন্টারভেনশন’। অর্থাৎ, ঐতিহ্যের গায়ে আঁচড় না কেটে কীভাবে তাকে রক্ষা করা যায়, তার চেষ্টা করা। তা প্রহম মন্দিরের কথা ভাবুন, যেখানে বিশাল বিশাল গাছের শিকড় মন্দিরের পাথরের ভেতরে ঢুকে গিয়েছে। আলোচনা হয়েছিল গাছগুলো কেটে মন্দির বাঁচানোর। কিন্তু ভারতীয় বিশেষজ্ঞরা এবং ইউনেসকো মিলে সিদ্ধান্ত নেয় যে, গাছগুলোও এই ইতিহাসের অংশ, তাই তাদের না কেটেই মন্দির সংরক্ষণ করতে হবে। একেই বলা হয় সংবেদনশীলতা। আংকর ভাটে যখন কাজ করা হয়েছিল, তখন কোনও আধুনিক পাথর দিয়ে মন্দির ভরাট করা হয়নি। বদলে ‘অ্যানাস্টিলোসিস’ পদ্ধতিতে আদি পাথরগুলোকেই খুঁজে বের করে আগের জায়গায় বসানো হয়েছিল। বেনারসে কি এই ধরণের কোনও সংবেদনশীলতা ছিল? মণিকর্ণিকা ঘাটের সেই প্রাচীন মাধি বা বিশ্বনাথ করিডোরের সরু গলি—সবই তো বুলডোজার দিয়ে সাফ করে দেওয়া হল। আংকর ভাটে যেখানে একটা গাছের শিকড়কেও সম্মান দেওয়া হয়, সেখানে বেনারসে শত শত বছরের পুরানো মন্দির আর শিবলিঙ্গকে অসম্মানজনকভাবে সরানো হচ্ছে। আবার ফ্রান্সের নোতার দাম ক্যাথেড্রালের কথা দেখুন। ২০১৯-এর আগুনে পুড়ে যাওয়ার পর তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে, নোতার দামকে ঠিক আগের মতোই তৈরি করা হবে। এর জন্য তারা আধুনিক পাথর বা কংক্রিট ব্যবহার না করে সেই একই খনির চুনাপাথর ব্যবহার করেছে, যা দিয়ে মধ্যযুগে চার্চটা তৈরি হয়েছিল। তারা আদি নকশা আর উপকরণকে এতটাই গুরুত্ব দিয়েছে যে, আকাশছোঁয়া খরচ হওয়া সত্ত্বেও তারা আধুনিক শর্টকাট নেয়নি। কিন্তু বেনারসে আমরা কী দেখছি? চারদিকে রাজস্থানি পাথর আর ঝকঝকে টাইলস, যা বেনারসের সেই ধুলোমাখা প্রাচীন গরিমাটাকে পুরোপুরি ঢেকে ফেলছে। সেখানে মন্দিরকে ঘষে-মেজে চকচকে করার এক অসুস্থ প্রতিযোগিতা চলছে।
কাশীর আধুনিকীকরণের আরেকটা প্রধান স্তম্ভ ছিল ‘নমামি গঙ্গে’ প্রজেক্ট। গঙ্গাকে পরিষ্কার করা আর তার পবিত্রতা ফিরিয়ে আনা ছিল মোদি সরকারের অন্যতম বড় প্রতিশ্রুতি। কিন্তু পরিসংখ্যান আর বাস্তব ছবিটা এক্কেবারে অন্য কথা বলছে। ২০২৫ সালের অগাস্ট মাসের রিপোর্ট অনুযায়ী, গঙ্গার দূষণের মাত্রা এখনও উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে। যদিও সরকার দাবি করছে যে তারা ৩৪,৮০৯ কোটি টাকা খরচ করে ২১৬টা পয়ঃপ্রণালী শোধনাগার (STP) প্রজেক্ট নিয়েছে, কিন্তু বেনারস থেকে তারিশঘাট পর্যন্ত গঙ্গার অবস্থা এখনও ‘আংশিক উন্নত’ হিসেবেই চিহ্নিত। ঘাটের উপর তলায় কংক্রিটের চাতাল বাড়িয়ে যে আধুনিকীকরণ করা হচ্ছে, তাতে নদীর স্বাভাবিক বাস্তুতন্ত্রের উপর চাপ বাড়ছে। মণিকর্ণিকা ঘাটে যখন বিশাল লোহার কাঠামো আর সিমেন্টের কাজ চলছে, তখন সেই কনস্ট্রাকশন থেকে ওঠা ধুলো আর আবর্জনা সরাসরি গঙ্গার জলে মিশছে। আজ ঘাটে ঘাটে যে ভাবে লাউডস্পিকার আর লেজার শো-র দাপট বেড়েছে, তাতে বেনারসের সেই শান্ত, আধ্যাত্মিক পরিবেশটা হারিয়ে গিয়েছে। গঙ্গার দুই ধারের প্রাচীন স্থাপত্যগুলোকে তো আমরা ধ্বংস করলামই, এখন আধুনিকতার নামে নদীটাকেও একটা কৃত্রিম চেহারা দেওয়ার চেষ্টা চলছে। বেনারস থেকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি টানা তৃতীয়বার জিতলেও তাঁর জয়ের ব্যবধান নজিরবিহীনভাবে কমে গিয়েছে। ২০১৪ সালে তিনি প্রায় ৩.৭১ লাখ ভোটে জিতেছিলেন, ২০১৯ সালে তা বেড়ে হয়েছিল ৪.৭৯ লাখ, কিন্তু ২০২৪-এ সেই ব্যবধান কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১.৫ লাখে। বেনারসের গলিতে কান পাতলে শোনা যায়, এই ভোট কমে যাওয়ার অন্যতম বড় কারণ হল ভিটেমাটি হারানো মানুষের ক্ষোভ। স্মার্ট সিটির নামে যাদের ঘরবাড়ি বা বাপ-ঠাকুরদার দোকান বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, তারা এই উন্নয়নকে আশীর্বাদ হিসেবে নিতে পারেননি। অবশ্যই আমরা আধুনিকতার বিরোধী নই। বেনারসে ভালো রাস্তা হোক, ঘাটে পরিচ্ছন্নতা ফিরুক, এটা আমরা সবাই চাই। কিন্তু তার জন্য কি আমাদের শিকড় ছিঁড়ে ফেলতে হবে? বেনারসের মহিমা তার ঝকঝকে পাথরে ছিল না, তা ছিল সেই সরু গলিগুলোতে যেখানে হাজার বছর ধরে শিবের উপাসনা হয়েছে। সেই গলিগুলো আজ নেই, সেই ছোট ছোট মন্দিরগুলো আজ নেই, সেই ‘অথেনটিসিটি’ আজ হারিয়ে গিয়েছে। বেনারসের ক্ষেত্রে যা দেখা যাচ্ছে, তা হল উন্নয়নের নামে এক ধরণের জবরদখল। মোক্ষদাত্রী কাশী আজ ধুঁকছে আধুনিকতার চাপে। মণিকর্ণিকা ঘাটের সেই চবুতরা ভাঙার শব্দ আসলে আমাদের ঐতিহ্যেরই ভেঙে পড়ার শব্দ। এখনও সময় আছে, যদি না আমরা সচেতন হই এবং আমাদের এই অমূল্য উত্তরাধিকারকে রক্ষার দাবি না তুলি, তবে আগামী প্রজন্ম বেনারসকে কেবল পড়ার বইতে পড়বে, গঙ্গার ঘাটে তারা দেখবেনা মছলিবাবার ডেরা, মগনলালের বজরা, দেখবে না চিতার কুন্ডলীর দিকে তাকিয়ে সর্বজায়ার কান্না, দেখবে না সরু গলিতে ষাঁড়ের নির্বিকার বসে থাকা, গোধুলিয়া চকে রাবড়ি কিম্বা সূর্যাস্তে সাধু-সন্ন্যাসীদের জমায়েতে ঝাঁঝালো ধোয়ার সঙ্গে মন্ত্র উচ্চারণ।
দেখুন আরও খবর:








