বিজেপিরও অনেকেই একান্ত আলোচনাতে বলেন, ২০২১ এ যদি তৃণমূল ভেঙে একগুচ্ছ নেতা না এনে বিজেপি দিলীপ ঘোষের নেতৃত্বেই লড়তো, তাহলে ২০২১ এ হেরে গেলেও, আজ নিশ্চিত জেতার জায়গাতে থাকতো। হ্যাঁ দলের আদিপন্থীরা হাত কামড়াচ্ছেন, এবারেও হলো না। কিন্তু বঙ্গ বিজেপি যে শেকড়ে ফেরার চেষ্টা করছে, অন্তত নতুন সভাপতির কাজকর্ম, বক্তৃতা বাইটে সেটা স্পষ্ট। বন্দে ভারতে নিরামিষ দেওয়া হচ্ছে, বাম তৃণমূল তা নিয়ে সরব হবার মুহুর্তে আপনি শমীক ভট্টাচার্যের (Samik Bhattacharya) বাইট তা শুনুন, বিবেকানন্দকে কোট করছেন, আরে দূর এ দশে মা কালী পাঁঠা খাবে, বাঙালি মাছ ভাত ছাড়া ভাবা যায় নাকি, হ্যাঁ বিহারে মাছ মাংসের দোকানের লাইসেন্সের ব্যপারেও এরকম কথাই বলেছেন শমীক ভট্টাচার্য। আপনি যদি মনে করেন বিজেপি সর্ব অর্থে অত্যন্ত গোঁড়া সনাতনী হিন্দু, যা জামা পালটে বিজেপি হবার পরে শুভেন্দু অধিকারী বলার চেষ্টা করছেন, তেমনটা নয়, বিজেপির ধারে পাশে কিছু সংগঠন আছে, সেটা হিন্দু জাগরণ মঞ্চ, বিশ্ব হিন্দু পরিষদ বা বজরং দল হতেই পারে, বিজেপি কিন্তু এসব ব্যাপারে খুউউব প্রাকটিক্যাল, তাঁরা যস্মিনদেশে যদাচার, যে দেশে যেমন, সে দেশে তেমন এ বিশ্বাস করে, তাদের আমলে বিফ এক্সপোর্ট কমেনি, তাদের আমলেই মধ্য প্রাচ্য দেশগুলোর সঙ্গে কথা বলে হালাল সার্টিফিকেশন বোর্ড তৈরি হয়েছে, তাদের শাসনেই গোয়াতে বা মেঘালয়ে বা উত্তর পূর্বের রাজ্যগুলোতে কোনও বিজেপি নেতা বিফ ব্যান নিয়ে কোনও কথা কখনও বলে না, বরং বিফ উৎসব করতে দেখেছি। বেশ কিছুদিন ধরেই এ বঙ্গের যাবতীয় সিদ্ধান্ত আর বক্তব্য আসতো দিল্লি থেকে শমীকের আমলে তা সম্ভবত বদলাচ্ছে, বিজেপি এ রাজ্যে শেকড়ে ফিরছে, ফেরার চেষ্টা করছে, সেই সূত্র ধরেই রাহুল সিনহা (Rahul Sinha) প্রথমবার সংসদীয় গণতন্ত্রের আপেল চাখার সুযোগ পেলেন, সেটাই আমাদের বিষয় আজকে, রাহুল সিনহার দিল্লি যাত্রা, বঙ্গ বিজেপির শেকড়ে ফেরা।
হ্যাঁ আমরাও রাহুল সিনহা কে রাজ্যসভার সম্ভাব্য তালিকা থেকে অন্য আরও অনেক সংবাদ মাধ্যমের মতই বাদ রেখেছিলাম কিন্তু সবাইকে চমকে দিয়েই রাহুল সিনহাকেই পাঠানো হচ্ছে রাজ্য সভায়। হ্যাঁ এটা বঙ্গ বিজেপির আপাতত শেকড়ে ফেরার এক চেষ্টা। রাহুল সিনহার ব্যাপারটা তো প্রায় সেই সুকুমার রায়ের সৎপাত্র কবিতার মত, “ধন্যি ছেলের অধ্যবসায় ! উনিশটিবার ম্যাট্রিকে সে ঘায়েল হয়ে থামল শেষে।“ হেরে যাবার লিস্টটা বিরাট, ১৯৯৮ এ রায়গঞ্জ লোকসভা আসন, ২০০১ এ করণদিঘি বিধানসভা, ২০০৪ এ জগদ্দল বিধানসভা, ২০০৯ এ বাঁকুড়া লোকসভা, ২০১৪ তে উত্তর কলকাতা লোকসভা, ২০১৬ তে জোড়াসাঁকো বিধানসভা, ২০১৯ এ উত্তর কলকাতা লোকসভা, ২০২১ এ হাবড়া বিধানসভা। ভাবা যায়? ৬২ বয়সের রাহুল লাগাতার ৮ টা বিভিন্ন নির্বাচনে হেরেছেন, এরকম রেকর্ড কংগ্রেসের প্রণব মুখোপাধ্যায় বা প্রদীপ ভট্টাচার্যেরও ছিল না, তো শেষমেষ তিনি সংসদে যাচ্ছেন, রাজ্যসভার সাংসদ। হ্যাঁ, রাজ্য বিজেপি বদলাচ্ছে, সেই বদলটা চোখেও পড়ছে। আর এস এস তার শর্তগুলোকে সামনে রাখছে, বিজেপি লং টার্ম খেলাতে নামছে। হ্যাঁ এই কথাগুলোই আলোচনা হবে বিজেপির ভেতরে। কিন্তু এই ছোট ছোট বদলগুলোই কি বিজেপিকে ক্ষমতা এনে দেবে, বাংলার মসনদে বসিয়ে দেবে, না তা হবে না কিন্তু এই বদলগুলো দিয়ে বঙ্গ বিজেপি ক্রমশ বাঙালি হয়ে উঠতে পারে, ক্রমশ বাংলার মেজাজ মর্জি মতন এক চেহারা নিতেই পারে। কিন্তু এই প্রসেসে বিরাট চাপে পড়েছেন আমাদের শান্তিকুঞ্জের মেজখোকা, বঙ্গ বিজেপি সভাপতি আর তাঁর টিম যখন খানিক ইনক্লুসিভ রাজনীতি, বাঙালির মন বুঝে রাজনীতির কথা ভাবছেন, ঠিক তখন উনি নাস্তিক আর সেকুলারিজম নিয়ে ছড়িয়েছেন, রাজ্য থেকে নাস্তিক আর সেকুলারদের নাকি উনি তাড়িয়ে ছাড়বেন। রামমোহন, বিদ্যাসগর, ডিরোজিওর সময়েও সনাতনীরা এরকম মূর্খের মত চেঁচিয়ে ছিল, কোনও লাভ হয়নি। কিন্তু ওনার মানে মেজখোকার এই অসার কথাবার্তায় পরিস্কার বোঝা যাচ্ছে, বঙ্গ বিজেপির এই তৃণমূল থেকে আসা নব্য বিজেপির দল বেশ চাপে পড়েছে, শমীক ভট্টাচার্য লম্বা খেলার জন্য তৈরি হচ্ছেন আর শুভেন্দু অধিকারি দম হারাচ্ছেন, হ্যাঁ আপাতত বিজেপির ভেতরে এটাই আলোচনার বিষয়। আমরা আমাদের দর্শকদের জিজ্ঞেষ করেছিলাম, একদা বঙ্গ বিজেপির এক্কেবারে প্রথম মুখ শুভেন্দু অধিকারি দলের মধ্যে তাঁর নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছেন, তাঁর পছন্দের লোকজনকে দলের সাংগঠনিক কমিটিতে নেওয়া হয় নি, এবারে রাজ্যসভা সদস্যের বাছাইতেও শমীকের দিকেই রায় দিয়েছে দিল্লি, শান্তিকুঞ্জের খোকাবাবু কি চাপে রয়েছেন? শুনুন মানুষজন কী বলেছেন।
আরও পড়ুন: Aajke | শুভেন্দু বাবু কো গুসসা কিঁউ আতা হ্যায়?
বিজেপি নেতারা একটু খঁজখবর নিলেই বুঝতে পারবেন ২০১১ র সময়ে তাঁদের কোর ভোট ১০/১২ শতাংশ এখন বেড়ে ১৮/২০৫ হয়েছে, কিন্তু রাজ্যের ক্ষমতায় আসার জন্য সেটাই যথেষ্ট নয়, সেই সমর্থন পেতে হলে বঙ্গ বিজেপিকে আগে বাঙালি হতে হবে, হিন্দুত্বের যে ধারণা এই বাংলাতে ছড়িয়েছেন চৈতন্য, রামকৃষ্ণ, বিবেকানন্দ তাকে আত্মস্থ করতে হবে, যে হিন্দু ধর্মে এক ঈশ্বরে অবিশ্বাসী নাস্তিক চার্বাককে মহর্ষি উপাধি দেওয়া হয়, সেই হিন্দুত্বই এই বাংলার শিরা, উপশিরা, ধমনিতে বইছে, সেই উদার সর্বধর্ম সমন্বয়ের বদলে এক সনাতনী হিন্দুত্বকে তো সেই কবেই বাঙালি সমাজ প্রত্যাখ্যান করেছে, সেই ইতিহাস জানতে হবে। আর নতুন কাকে অখাদ্য কুখাদ্য খেতে ভালোবাসে সেই ধারা মেনে শুভেন্দুবাবুর এই হঠাৎ হিন্দু হয়ে ওঠাকে আটকাতেও হবে।







