Monday, January 19, 2026
HomeScrollFourth Pillar | নির্বাচন কমিশনের মুখোশটা খুলে গিয়ে বেরিয়ে এল তাদের আসল...
Fourth Pillar

Fourth Pillar | নির্বাচন কমিশনের মুখোশটা খুলে গিয়ে বেরিয়ে এল তাদের আসল চেহারা

সংশোধন নয়, আরও অনেক বড় কিছু লক্ষ্য নিয়েই এগোচ্ছে নির্বাচন কমিশন

নির্বাচন কমিশনের (Election Commission) মুখোশটা খুলে গিয়ে বেরিয়ে এল তাদের আসল চেহারা। এতদিনে নির্বাচন কমিশন পরিস্কার জানিয়েই দিল যে তারা এই এসআইআর (SIR) এর মাধ্যমে নাগরিকত্বের যাচাই করতেও নেমেছে, এবং তারা দাবী করছে যে এই অধিকার নাকি তাদেরও আছে। নাগরিকত্ব দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের অধীনে থাকা এক বিষয়। নাগরিকত্ব আইন পেশ করে স্বরাষ্ট্র দপ্তর, যাবতীয় সংশোধনীও আনে ওই স্বরাষ্ট্র ফতর, স্বাধীনতার পর থেকে নাগরিকত্ব আইনে যতবার যত সংশোধনী এসেছে, যাচাই এর যত প্রচেষ্টা হয়েছে, তা সিএএ হোক, এনআরসি হোক, এনপিআর হোক, সবতাই ছিল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের কাজ। এখন দেখা যাচ্ছে কেবল ভোটার তালিকা (Voter List) সংশোধনই নয় সেই নাগরিকত্ব যাচাই এর কাজ নিয়ে নেমেছে নির্বাচন কমিশন। এবং এই ঘোষণা এস আই আর প্রক্রিয়াকে নতুন করে এক বিতর্কের মধ্যে ফেললো। সি এ এ এনে পিছোতে হয়েছিল এই মোদি – শাহ-কে, এনআরসি লাগু করতে পারেন নি, এনপিআর লাগু করতে গিয়ে ধরা পড়ে গেছেন। এবারে অন্য চেহারাতেই এনে হাজির করছেন এক নাগরিকত্ব সংশোধনী প্রক্রিয়াকে। এখন প্রশ্ন তো করতেই পারেন যে তাহলে কি নাগরিকত্ব যাচাই করা হবে না। নিশ্চই হবে, আজকের পৃথিবীতে, ক্রমশ কমতে থাকা রিসোর্স এর যুগে, নিজের দায় নিতেই মানুষের ঘুম ছুটে যাচ্ছে, খামোখা অন্যের দায় নেবো কেন? নিশ্চই অনাগরিকদের চিহ্নিত করা উচিত, তাদেরকে কীভাবে নাগরিকত্ব দেওয়া যায়, বা স্পষ্ট ভাবে কোনও দেশের নাগরিকত্বের প্রমাণ থাকলে সেই দেশে তো পাঠাতেই হবে। কিন্তু এই বেআইনি অনুপ্রবেশ ইত্যাদির সঙ্গে জুড়ে আছে বহু ধরণের মানবিক কারণ, যা সংবেদনশীল। কাজেই তা অনেক ভেবেচিন্তে শুরু করতে হয়। সময় হাতে নিয়ে করতে হয়, যখনইএক উঠ ছুঁড়ি তোর বিয়া লেগেছে গোছের কাজ শুরু করে যে কোনও সরকার, জানবেন তার পেছনে বদ মতলব আছে, থাকতে বাধ্য। এখানে কী হচ্ছে? প্রথমে বলা হল এসআইআর কেবল মাত্র ভোটার তালিকা সংশোধন। কিন্তু তার প্রক্রিয়া শুরু থেকেই বলেই দিচ্ছিল যে এটা ঠিক ভোটার তালিকা সংশোধন নয়, আরও অনেক বড় কিছু লক্ষ্য নিয়েই এগোচ্ছে নির্বাচন কমিশন। তারা কাজ শুরু করার পরেই বিরোধীরা বলতে শুরু করলেন যে নির্বাচন কমিশনের নাগরিকত্ব যাচাই করার এক্তিয়ার নেই।

নির্বাচন কমিশন জানালো এটা স্পেশ্যাল ইনটেনসিভ রিভিশন অফ ভোটার লিস্ট, ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধন। বাংলাতে কাজ শুরু হবার শেষের দিকে এসে এখন নির্বাচন কমিশন কী জানাচ্ছে? ভারতের সংবিধান, জনপ্রতিনিধিত্ব আইন ১৯৫০ এবং নাগরিকত্ব আইনের জটিল আইনি কাঠামোতে ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক ঐতিহাসিকভাবে নাগরিকত্ব প্রদান, বাতিল বা যাচাইয়ের একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী। নাগরিকত্ব আইন পেশ করে স্বরাষ্ট্র দপ্তর, যাবতীয় সংশোধনীও আনে ওই স্বরাষ্ট্র দফতর। স্বাধীনতার পর থেকে নাগরিকত্ব আইনে যতবার যত সংশোধনী এসেছে, যাচাই এর যত প্রচেষ্টা হয়েছে, তা সি এ এ (CAA) হোক, এন আর সি (NRC) হোক, এন পি আর (NPR) হোক—সবটাই ছিল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের এক্তিয়ারভুক্ত কাজ। কিন্তু এখন নির্বাচন কমিশন সুপ্রিম কোর্টে হলফনামা দিয়ে দাবি করেছে যে, ভোটার তালিকায় নাম তোলার জন্য নাগরিকত্ব যাচাই করার ‘অন্তর্নিহিত অধিকার’ তাদেরও রয়েছে। এই দাবি এবং তার ভিত্তিতে শুরু হওয়া এস আই আর প্রক্রিয়া পশ্চিমবঙ্গের মতো রাজ্যে, যেখানে নাগরিকত্বের প্রশ্নটা ঐতিহাসিক এবং রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত স্পর্শকাতর, সেখানে স্বাভাবিকভাবেই এক গভীর বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। নির্বাচন কমিশনের রুটিন কাজের মধ্যেই সাধারণত প্রতি বছর ভোটার তালিকার একটা সংক্ষিপ্ত সংশোধন বা ‘সামারি রিভিশন’ হয়ে থাকে। এতে মূলত যারা নতুন ১৮ বছর বয়সে পদার্পণ করলেন তাদের নাম তোলা হয়, যারা মারা গেছেন তাদের নাম বাদ দেওয়া হয় এবং কারো বাসস্থান পরিবর্তন হলে তা সংশোধন করা হয়। এটা একটা চলমান এবং সাধারণ প্রক্রিয়া। কিন্তু এবারের প্রক্রিয়াটা হল ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ বা এস আই আর। এই প্রক্রিয়ায় বুথ লেভেল অফিসার বা বিএলও-রা বাড়ি বাড়ি গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করছেন এবং পুরনো তথ্যের সঙ্গে বর্তমান তথ্য কে ‘লিঙ্কিং’ করার চেষ্টা করছেন। কমিশনের যুক্তি হলো, ২০০২ থেকে ২০০৪ সালের পর দেশে বা এই নির্দিষ্ট রাজ্যগুলোতে আর কোনো নিবিড় সংশোধন বা ‘ইনটেনসিভ রিভিশন’ হয়নি। দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে কেবল সামারি রিভিশনের মাধ্যমে কাজ চলায় ভোটার তালিকায় অনেক ত্রুটি, মৃত ভোটারের নাম, বা স্থানান্তরিত ভোটারদের নাম থেকে গেছে। এই ‘লেগাসি ডেটা’ বা পুরনো জমে থাকা জঞ্জাল সাফ করার জন্যই এই বিশেষ উদ্যোগ প্রয়োজন। হ্যাঁ নির্বাচন কমিশন এটাই শুরুতে জানিয়েছিল, যার মধ্যে নাগরিকত্ব যাচাই এর প্রশ্নও ছিল না।

আরও পড়ুন: Fourth Pillar | ভোট চুরি হয়েছে বিহারে, ডাকাতি হয়েছে; কিন্তু বাংলাতে কেন সেই চুরি করা যাবে না?

এবারে এই নতুন প্রক্রিয়ায় ভোটারদের একটা বিশেষ ‘এনিউমারেশন ফর্ম’ ভরতে হচ্ছে, যেখানে তাদের পুরনো ভোটার তালিকার সঙ্গে নিজেদের যোগসূত্র স্থাপন করতে বলা হচ্ছে। বিশেষ করে ২০০২ বা তার আগের কোনো ভোটার তালিকায় তাদের বা তাদের পূর্বপুরুষের নাম ছিল কি না, তা যাচাই করার বিষয়টা এই প্রক্রিয়ার মূল ব্যাপার। একে অনায়াসে আসামের এন আর সি বা জাতীয় নাগরিক পঞ্জি তৈরির প্রক্রিয়ার সঙ্গে তুলনা করাই যায়। এতদিন পর্যন্ত নির্বাচন কমিশনের কাজ ছিল স্বীকৃত নাগরিকদের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা। মানে, নাগরিকত্ব হলো ভোটার হওয়ার পূর্বশর্ত, কিন্তু নাগরিকত্ব যাচাই করার নিজস্ব কোনো তদন্তকারী এজেন্সি বা আইনি কাঠামো তো নির্বাচন কমিশনের নেই। নাগরিকত্ব প্রদান বা বাতিল—পুরো বিষয়টাই ‘ইউনিয়ন লিস্ট’ বা কেন্দ্রীয় তালিকার বিষয়, যা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক পরিচালনা করে। কিন্তু কমিশন এখন দাবি করেছে যে, সংবিধানের ৩২৪ অনুচ্ছেদ, যা নাকি কমিশনকে নির্বাচনের তদারকি ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দেয় আর ৩২৬ অনুচ্ছেদ যা প্রাপ্তবয়স্কদের ভোটাধিকার দেয়, তাদের এই ক্ষমতা দিয়েছে। ৩২৬ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে, ভারতের প্রত্যেক নাগরিক, যারা ১৮ বছরের কম বয়সী নন এবং অন্য কোনওভাবে অযোগ্য নন, তারা ভোটার তালিকায় নাম তোলার অধিকারী। কমিশনের যুক্তি হল, যেহেতু সংবিধানে ‘নাগরিক’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে, তাই ভোটার তালিকায় নাম তোলার আগে সেই ব্যক্তিটি প্রকৃতপক্ষে নাগরিক কি না, তা যাচাই করার ‘অন্তর্নিহিত ক্ষমতা’ বা ইনহেরেন্ট পাওয়ার কমিশনের রয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন তুলেছেন আইনজ্ঞরা। ১৯৫৫ সালের নাগরিকত্ব আইনের ৯ নম্বর ধারা অনুযায়ী, কোনো ভারতীয় নাগরিক যদি স্বেচ্ছায় অন্য দেশের নাগরিকত্ব নেন, তবে তার ভারতীয় নাগরিকত্ব বাতিল করার ক্ষমতা কেবল কেন্দ্রীয় সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকেরই আছে।

নির্বাচন কমিশনের হলফনামায় বলা হয়েছে, কমিশনের ক্ষমতা সীমিত—তারা কেবল দেখতে পারে কেউ বিদেশী নাগরিকত্ব নিয়েছে কি না বা মিথ্যে তথ্য দিয়ে ভোটার হয়েছে কি না। কিন্তু ব্যবহারিক ক্ষেত্রে, যখন কমিশন কাউকে ‘নাগরিক নন’ বলে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেয়, তখন সেই ব্যক্তির সামাজিক এবং আইনি অবস্থা কার্যত একজন রাষ্ট্রহীন মানুষের মতোই হয়ে দাঁড়ায়, যদিও টেকনিক্যালি তার নাগরিকত্ব বাতিল করার চিঠি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক দেয়নি। এই ধূসর এলাকাটাই এস আই আর-এর সবথেকে বিপজ্জনক দিক। নির্বাচন কমিশন এখানে কার্যত একটা ‘মিনি-এন আর সি’ পরিচালনা করছে, কিন্তু এনআরসি-র মতো কোনো আইনি রক্ষাকবচ বা ট্রাইব্যুনালের সুযোগ এখানে নেই। কোনো মানুষের নাগরিকত্ব নিয়ে সন্দেহ থাকলে তা নির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ট্রাইব্যুনালে প্রমাণ করতে হয়। কমিশন নিজে থেকে কাউকে ‘সন্দেহভাজন’ বা ‘অনাগরিক’ সাব্যস্ত করে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দিতে পারে না। লাল বাবু হোসেন বনাম বা ইলেক্টোরাল রেজিস্ট্রেশন অফিসার (১৯৯৫) মামলায় সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট জানিয়েছিল যে, যারা ইতিমধ্যেই ভোটার তালিকায় আছেন, তাদের নতুন করে নাগরিকত্বের প্রমাণ দেওয়ার প্রয়োজন নেই। যদি কেউ নতুন করে নাম তুলতে চান, তবে তাদের ক্ষেত্রে প্রমাণের দায় তাদের। কিন্তু যাদের নাম পুরনো তালিকায় আছে, তাদের ক্ষেত্রে ধরে নেওয়া হবে যে তারা বৈধ নাগরিক, যতক্ষণ না রাষ্ট্র তাদের অনাগরিক হিসেবে প্রমাণ করতে পারছে। অর্থাৎ, পুরনো ভোটারদের ক্ষেত্রে প্রমাণের দায় ছিল রাষ্ট্রের বা অভিযোগকারীর। এই রায়টাই ছিল ভোটারদের সুরক্ষার এক বড় কবচ। কাজেই যাঁরা ২০১৯ বা ২০২৪ এ ভোট দিয়েছে, তাদের সব্বাইকেই নাগরিক হিসেবে ধরে নেওয়া হবে, যদিনা সেই মানুষের সম্পর্কে অন্য তথ্য উঠে আসে। কিন্তু এখন একজন মানুষ যিনি গত ২০ বছর ধরে ভোট দিয়ে আসছেন, তাকেও প্রমাণ করতে হচ্ছে যে তিনি বা তার পূর্বপুরুষরা ২০০২ সালে বা তার আগে এই দেশে ছিলেন। যদি তিনি এই ‘লিঙ্কিং’ বা সংযোগ স্থাপন করতে ব্যর্থ হন, তবে তাকে নতুন করে ১২টা নির্দিষ্ট নথির মধ্যে যেকোনো একটা দেখিয়ে নিজের নাগরিকত্ব এবং বাসস্থানের প্রমাণ দিতে হবে। এর অর্থ হলো, একজন বিদ্যমান ভোটারের নাগরিকত্বও এখন আর ‘স্বতঃসিদ্ধ’ নয়; তাকেও নতুন করে পরীক্ষার মুখে পড়তে হচ্ছে। মানে প্রমাণের দায়ভারটা কায়দা করে রাষ্ট্রের কাঁধ থেকে সরিয়ে সাধারণ মানুষের কাঁধে চাপিয়ে দেওয়া হলো, এটাই এই এস আই আর প্রক্রিয়ার সবথেকে বিতর্কিত এবং ভীতিকর দিক। এই ২০০২ সালকে ‘কাট-অফ’ বা বিভাজন রেখা হিসেবে ব্যবহার করাটা আবার এক্কেবারে এনআরসি-র প্রক্রিয়া, আসাম এনআরসি-তে যেমন ১৯৭১ সালের ২৪শে মার্চকে কাট-অফ ডেট ধরা হয়েছিল এবং তার আগের নথির সঙ্গে লিঙ্কিং বাধ্যতামূলক ছিল, এখানেও ২০০২ সালকে একেবারেই সেইভাবেই ব্যবহার করা হচ্ছে। যদিও কমিশন বলছে এটা কেবল তথ্য যাচাইয়ের সুবিধের জন্য, কিন্তু বাস্তবে এটা একটি ছাঁকনির কাজ করছে। যারা এই ছাঁকনিতে আটকা পড়বেন, অর্থাৎ ২০০২ সালের সঙ্গে লিঙ্ক করতে পারবেন না, তাদেরকেই ‘সন্দেহভাজন’ বা নতুন করে যাচাইয়ের তালিকায় ফেলা হবে। এই প্রক্রিয়াটি কার্যত বহু মানুষকে ‘ডি-ভোটার’ বা সন্দেহজনক ভোটারের ক্যাটাগরিতে ঠেলে দিতে পারে। আর সেটাই আজ সারাদেশ জুড়ে তৈরি করা নতুন আতঙ্ক। আসলে সেই ২০১৪ থেকেই মানুষের মধ্যে ভয়, আতঙ্ক ছড়িয়েই তাদের শাসন বজায় রেখেছে এই আর এস এস – বিজেপির সরকার। আজ ইলেকশন কমিশনের আদালতে দেওয়া এফিডেফিট থেকে সেটাই আবার স্পষ্ট হয়ে গেল।

 

Read More

Latest News