গৌতম ভট্টাচার্য : শেষ ওভারে গিয়েও রক্ষা নেই। সর্বিট্রেট পরিস্থিতি। ৩০ রান বা তার বেশি দিলে বিশ্বকাপ থেকে হড়কে যাবে ভারত । ওয়াংখেড়ের দর্শককে যিনি দীর্ঘক্ষণ চুপ করিয়ে দিয়েছেন সেই জেকব বেথেল ব্যাট হাতে। খেলছেন ইংল্যান্ডের হয়ে সর্বকালের অন্যতম সেরা টি টোয়েন্টি ইনিংস। আর বল হাতে কিনা শিবম দুবে। যাঁকে এতক্ষণ বেথেলদের থেকে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। পাছে তাঁর বোলিং আর্ম থেকে ম্যাচ বেরিয়ে যায়।
কিন্তু দুবের নার্ভ ফেল করেনি। বেথেল বরং দ্বিতীয় রান নিতে গিয়ে আউট হয়ে গেলেন। আউটফিল্ড থেকে দুর্দান্ত থ্রো করেছিলেন হার্দিক। দ্বিতীয় বিশ্বকাপ ফাইনালিস্ট সেখানেই স্থির। বিফলে গেল তাঁর অতুলনীয় সেঞ্চুরি। তবু কী ম্যাচ ! আহা !
বলিউড যেমন নানান ধরণের ছবি বানায়। ক্রিকেট মাঠও নানান দিন তার নানান চিত্রনাট্য তৈরি করে।
কোনটা সাহিত্য ধর্মী। কোনওটা শিল্পনির্ভর। কোনওটা কম বয়েসীদের জন্য ভূতের । কোনওদিন আপাদমস্তক মশলা। কোনোদিন আবার এমন ছবি করে যেখানে দু’পক্ষ শুধু মার মার মার। অল আউট আকশন। রোববার আহমেদাবাদে ফিন আলেনদের বিপক্ষ বাছার যুদ্ধ যেমন ছিল আল আউট একশন ফিল্ম।
ওয়াংখেড়ের বিশ্বকাপ সেমিফাইনাল এমন ভয়ডরহীন অবিশাস্য ব্যাটসম্যানশিপ দেখিয়েছে যে চোখ বুজলে মনে হচ্ছে এআইএর সাহায্য ছাড়া ঘটল কী করে ! ক্রিকেট কি তাহলে আরও নতুন দিগন্ত পেরিয়ে গিয়েছে যা ডেটা এনালিস্টদেরও চমকে দিচ্ছে ? নাকি ব্যাটিংয়ের জন্য অর্ডারি পিচ এমন বানানো হয়েছিল যে ডট বল শব্দটাকে আজকের মতো সি এল দেওয়া যেত।
একেবারেই ঠিক বললাম না। ম্যাচটা একশনের মোড়কে ছিল থ্রিলার। টি টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ইতিহাসে তর্কহীনভাবে সর্বকালের শ্রেষ্ঠ ব্যাটিং থ্রিলার। জেকব বেথেল বনাম সঞ্জু স্যামসন। একজন হারলেন। একজন জিতলেন। কিন্তু দুজনেই তাক লাগিয়ে দিলেন। প্রথমজনের দেশ রক্ষনশীলতার ম্যানুয়াল তৈরি করেছে। অন্যজন যে শহরে ম্যাচ খেলছেন সেই মুম্বই কিনা বিলিতি ব্যাটিং ম্যানুয়ালকে এত বছর ধরে আত্মিক অনুকরণ করেছে।
আরও খবর : রুদ্ধশ্বাস লড়াই! বেথেলের শতরানও রক্ষা করতে পারল না ইংল্যান্ডকে
ওয়াংখেড়ে মাঠটা এমনিতেও এত পুঁচকে যে লাগলেই প্রায় চার। তার বয়েস ইডেনের তুলনায় অনেক কম। ইডেন যেখানে ব্যাটিং ৯৩। ওয়াংখেড়ে ৫২। কিন্তু গত ক’বছর ধরে মুম্বই ক্রিকেট সংস্থার কিছু কুশলী লোকেরা স্টেডিয়ামের ইন্টেরিয়র নবীন -প্রবীণ মিলিয়ে এমনভাবে ডিজাইন করেছেন যে মনে হবে ভারতীয় ক্রিকেটের আত্মা একমাত্র এখানেই গচ্ছিত। আর সেই আত্মা যেন নিজের প্রতিনিধিস্বরূপ স্মৃতির টুকরো টুকরো ফুলকি ছড়িয়ে দিয়েছে গোটা স্টেডিয়ামের অন্তরমহলে।
মাঠে ঢোকা মাত্র গাভাসকারের স্টাচু। মুম্বই ক্রিকেটের পিতামহ ভীষ্ম বিজয় মার্চেন্টের নামে প্যাভিলিয়ন। টেন্ডুলকার স্ট্যাচু। রবি শাস্ত্রী স্ট্যান্ড। রোহিত শর্মা স্ট্যান্ড। ভেঙ্গসরকর স্ট্যান্ড। ধোনির বিশ্বকাপজয়ী ছক্কা যেখানে পড়েছিল সেই বিশেষভাবে অলংকৃত চেয়ার। ওয়াদেকারের নাম দিয়ে সম্মানিত জায়গাটা। গাভাসকার স্ট্যান্ড। ইতিহাসের এমন দধিকর্মা চারপাশে ছড়িয়ে রয়েছে যে মাঠে ঘটতে থাকা তুচ্ছ ঘটনাও মায়াবী আঙ্গিক পেয়ে যায়।
এদিন অবশ্য তুচ্ছ কোনও কিছু ঘটছিল না। বরং বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে ভারত যে ভঙ্গিতে ব্যাট করল তা দুঃসাহসিক। মেরিন ড্রাইভের কয়েক কিলোমিটার দূরে কালা ঘোড়া নামে আরবান মুম্বইয়ের বিখ্যাত এলাকা আছে। যা ভারতব্যাপী চিত্রশিল্পীদের মৃগয়াক্ষেত্র। মুম্বইয়ের উল্লেখযোগ্য সব চিন্ত্রপ্রদর্শনী এবং আর্ট গ্যালারির ঠিকানা হল কালা ঘোড়া। এদিন ওয়াংখেড়েতে বসে মনে হচ্ছিল কালা ঘোড়া চিত্রপ্রদর্শনী একচেটিয়া কারবারি বলে এতদিন যা শুনে এসেছি সর্বাংশে সত্যি নয়। নইলে ছয় মারার এগজিবিশন কী করে বিশ্বমঞ্চের জন্য এখানে ঘটল ? ভারত মারল ১৯ ওভারবাউন্ডারি। বিশ্বকাপের ইতিহাসে যুগ্মভাবে সর্বোচ্চ। ধোনি বহুদিন পর ভারতের খেলা দেখতে এলেন এবং আবিষ্কার করলেন এরা তাঁর ছক্কা মারার বীর-সাম্রাজ্যকে কোথায় প্রসারিত করে দিয়েছে। ইংল্যান্ডও তাই।
একইরকম তাৎপর্যপূর্ণ গম্ভীরের ভারতের খুনে ভঙ্গিতে আগাগোড়া খেলে যাওয়া। পরিস্থিতিতে অবিচলিত থেকে এই হাই টেম্পো ক্রিকেটমডেল তারা আবাহন করে ২০২২ বিশ্বকাপে এই ইংল্যান্ডের কাছেই সেমিফাইনাল হেরে যাওয়ার পর। সেদিন তাদের প্রথম ব্যাট করে করা মাত্র ১৬৮ রানের টার্গেট উইকেট না হারিয়ে তুলে দিয়েছিলেন বাটলাররা। সেই নিষ্ক্রমণের পর কোচ দ্রাবিড় এবং ক্যাপ্টেন রোহিত মিলে ঠিক করেন টি টোয়েন্টিতে নতুন রণনীতি। তা হল পরিস্থিতি নির্বিশেষে চালিয়ে খেলতে হবে। ব্যক্তিগত মাইলস্টোন ভাবলে হবে না। সব সময় অক্ষত রাখতে হবে ব্যাটিংয়ের মোমেন্টাম। গম্ভীর জমানা সেই চোখকে আরো দুটো লেভেল ওপরে তুলে দিয়েছে। কেউ আর ব্যক্তিগত কীর্তি ভাবে খেলছে না। সঞ্জু স্যামসনের ৪২ বলে ৮৯ অনায়াসে হতে পারত ৬৪ বলে ১১৪। ইডেনে যে সেঞ্চুরিটা আটকে গেল আজ ইজি সেটা কুড়িয়ে নেওয়া যেত। কিন্তু এই ভারত জানত শিশিরের জন্য তারা ফিল্ডিং করার সময় বল গ্রিপ করতে অসুবিধে হবে। প্লাস ইংল্যান্ডের কেউ যদি ফিন অ্যালেন হয়ে যায় ! যথসম্ভব রান বাড়িয়ে ব্যাংকে রাখতে হবে।
স্যামসন যে ভঙ্গিতে এদিন ইংল্যান্ড এবং বিশেষ করে তাঁর পুরোনো শত্রু জোফরা আর্চারকে মারতে শুরু করলেন তাতে মনে হচ্ছিল ভারতের হয়ে ভিভ ব্যাট করছেন। আর্চারকে তো ফেলে দিলেন তেন্ডুলকর স্ট্যান্ডের থার্ড টায়ারে। আন্দাজ করা কঠিন যে ৭ বলে ১৫ রানে থাকার সময় তাঁর সহজ ক্যাচ হ্যারি ব্রুক ফেলে না দিলে ভারত আড়াইশতে পৌঁছত কিনা? সেমিফাইনালের টার্নিং পয়েন্ট ওই ক্যাচ ফেলা। হয়তো ভারতকে ফের বিশ্বকাপ দেওয়ারও। আর মাত্র কদিনের অপেক্ষা !
ইংল্যান্ড যখন সহজতম ক্যাচ ফেলছে। অক্ষর প্যাটেল তখন এমন দুটো ক্যাচের অংশীদার হচ্ছেন যা এ মাঠের চিরকালীন নায়ক একনাথ সোলকারকে মনে করিয়ে দিচ্ছে। তাঁর ও শিবম দুবের রিলে ক্যাচ মনে করিয়ে দিল বার্বাডোজে সূর্যকুমার যাদবের ক্যাচ যে ভারতকে কাপ দিয়েছিল। আজকেরটা কি ফাইনাল তুলল ? অবশ্যই। অক্ষর এখন উন্নততর জাদেজা।
জীবনের মতো ক্রিকেট কী দ্রুত বদলায়। দু’হাজার পঁচিশে যাঁরা কুড়ি বলের সভ্যতার তিন মহাতারকা তাঁদের এখন মনে হচ্ছে দলের কাঁটা। অভিষেক শর্মা। জোস বাটলার এবং এদিন চার ওভারে ৬৪ রান দেওয়া বরুন চক্রবর্তী। ফাইনালে এই দুজনকে বসিয়ে রিঙ্কু আর কুলদীপকে খেলাতেই পারে ভারত।
আর হ্যাঁ ,ব্যাটার — ফিল্ডারদের কথা বলছিলাম। আসল কৃতিত্ব সেই একটা লোকের। জাসপ্রিত বুমরা ,ওই চার ওভারে ৩৩ রানের বেশি দিলে মধ্যরাতে গোটা ভারতের মন খারাপ হয়ে যেত।
দেখুন অন্য খবর :







