সময় এসেছে বাঙালিদের একজোট হয়ে এক ধারাবাহিক অন্যায়ের প্রতিবাদ করার। রাজা আলি বা জুয়েল রানার লড়াই, তাঁদের ক্ষত, তাঁদের উপরে আক্রমণ কেবল তাঁদের ব্যক্তিগত লড়াই নয়। এটা ভারতের প্রতিটা প্রান্তের বাংলাভাষী মানুষের মর্যাদার লড়াই। ওড়িশার মুখ্যমন্ত্রী মোহন চরণ মাঝি জানিয়েছেন যে, তাঁর রাজ্যে ৪০০০-এর বেশি অবৈধ বাংলাদেশি শনাক্ত করা হয়েছে, কিন্তু এই তালিকায় কতজন বৈধ ভারতীয় নাগরিক ঢুকে পড়েছেন, তার কোনও হিসাব নেই। এই হিসাব আমাদেরই বুঝে নিতে হবে। আর যাঁদের ধরা হয়েছে তাঁদের কীসের ভিত্তিতে ধরা হয়েছে, সেটা জানার অধিকার একজন বাঙালির আছে। বাঙালিদের আজ এটা সারা দেশকে জানাতে হবে যে: (১) বাংলা ভাষা ভারতের সংবিধান স্বীকৃত ভাষা এবং কোনওভাবেই এটাকে অনুপ্রবেশের চিহ্ন করে তোলার চেষ্টাকে আমরা সব শক্তি দিয়ে রুখব। (২) পরিচয়পত্র থাকা সত্ত্বেও নাগরিকদের হেনস্থা করা হলে তার বিরুদ্ধে আইনি ও সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে। (৩) বিএসএফ বা পুলিশের বেআইনি পুশব্যাক প্রক্রিয়া বন্ধ করতে হবে, আন্তর্জাতিক ও জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে এই বিষয়ে সক্রিয় হতে হবে। (৪) ‘বাঙালি মানেই বাংলাদেশি’—এই মিথ্যা ও বিদ্বেষমূলক প্রচার বন্ধ করতে হবে। ধৈর্যের বেড়া ভেঙে যাচ্ছে। আজ যদি আমরা চুপ থাকি, তবে আগামী দিনে আমাদের ঘরের ছেলেমেয়েরাও ভারতের অন্য প্রান্তে নিরাপদ থাকবে না। ওড়িশার সেই পরিবারটা যারা আজও নো ম্যান্স ল্যান্ডে দাঁড়িয়ে রয়েছে, তাঁদের কাছে আমাদের একটাই বার্তা হওয়া উচিত—আমরা তোমাদের পাশে আছি। এখন এটা বাঙালির আত্মমর্যাদা রক্ষার লড়াই। রাজা আলিরা যেন বুক ফুলিয়ে আবার কাজ করতে যেতে পারেন এবং জুয়েল রানাদের যেন আর অকালে প্রাণ হারাতে না হয়, তার জন্য আজ ঐক্যের কোনও বিকল্প নেই। ধৈর্যের বেড়া ভেঙে গিয়েছে, এবার প্রতিবাদে শামিল হওয়ার পালা। বাঙালির এই ক্ষোভকে আজ রাষ্ট্রশক্তির কাছে পৌঁছে দেওয়া অপরিহার্য।
বেশি পেছোতে হবে না, সদ্য ফেলে আসা বছরের ডিসেম্বরের হিসেবটুকু দেখলেই হবে। এই বাংলার মুর্শিদাবাদ জেলার পরিযায়ী শ্রমিক মূলত বাংলাদেশি সন্দেহে গণপ্রহারে খুন হয়ে গিয়েছেন, তাঁকে পিটিয়ে মারা হয়েছে, কেন? তিনি বাংলাতে কথা বলছিলেন, তাঁর উপরে তিনি মুসলমান। পাশের রাজ্য ওড়িশার সম্বলপুরে তাঁকে মারা হল। সেই ওড়িশার আরেক পরিযায়ী শ্রমিক তামিলনাড়ুর এক রেল স্টেশনে লোকাল হুলিগানস, মাদকাসক্ত নাবালক কিশোর- তরুণদের হাতে আক্রান্ত হলেন। কাস্তের আঘাতে জখম হলেন মারাত্মকভাবে। পুরুলিয়ার আট জন পরিযায়ী শ্রমিক কাজ করতেন ছত্তিশগড়ের এক বেকারি কারখানায়। মজুরি চাইতে গেলে, সঙ্ঘ পরিবারের ঘনিষ্ঠ মালিক, স্থানীয় বজরঙ দলের গুন্ডাদের লেলিয়ে দেন। মানে বাঙালিদের এখন বেগার খাটার দিন এসে গিয়েছে। মালিকের ভাড়াটে গুন্ডাদের ভূমিকায় সনাতন ধর্মের এই নিষ্ঠাবান গোরক্ষকরা, এই রামভক্তের দল বাংলাদেশি তকমা দিয়ে এই শ্রমিকদের ধরে পেটায়। মজুরির বদলে পেটানি খেয়ে তাঁদের গ্রামে ফিরতে হয়। অন্যদিকে বাংলাদেশি সন্দেহেই আক্রান্ত কেবল নয়, মারা গেলেন একজন বাম শাসিত কেরলে। সেখানকার বাম সরকারের পুলিশ-প্রশাসন তৎপরতার সঙ্গে ঘটনার সঙ্গে যুক্ত উগ্র হিন্দত্ববাদী সংগঠনের দুষ্কৃতীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে, কিন্তু কেরালাতে আরএসএস–বিজেপি যে বেড়ে উঠছে হু হু করে, তা বোঝা যাচ্ছে। ঘৃণা আর হিংসা রক্ত আর হিন্দুত্বের বৃত্তটা এভাবেই সম্পূর্ণ হচ্ছে দেশজুড়ে। দেশজুড়ে এই বিদ্বেষ আর বিভাজনের বিষ বৃত্তটা ক্রমশ বড়ই হতে থাকে। আমাদের চোখের সামনেই। আমরা ছত্তিশগড়ে মজুরি চাইতে গিয়ে বাঙালি বেকার শ্রমিকদের ধর্মের জন্য, মাতৃভাষা বলার জন্য পেটানি খেতে তো দেখেছি। তার দিন কয়েকের মধ্যেই এই বাংলারই আরেক সংখ্যালঘু কনস্ট্রাকশন ওয়ার্কার, মহারাষ্ট্রের পুণেতে সেই মজুরি চাইতে গিয়েই একইভাবে মালিকের পোষা ঠ্যাঙাড়ে বাহিনীর হাতে মার খেয়ে মারা গিয়েছেন। কোনও হেলদোল? না নেই। স্থানীয় সিপিআই(এম) নেতৃত্ব ও মহারাষ্ট্রে বাম শ্রমিক সংগঠনের উদ্যোগে- চেষ্টায় তাঁর মৃতদেহ গ্রামের বাড়িতে ফেরে। এর আগে ওখানেই জেলে পুরে দেওয়া হয়েছিল দু’জন শ্রমিককে, তাঁদের মধ্যে আবার একজন বিজেপি কর্মী, তাঁর বন্ধু বান্ধব পরিবার গিয়েছিলেন মন্ত্রী সুকান্ত মজুমদারের কাছে। লাভ হয়নি, শেষমেষ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাহায্যে তাঁরা গ্রামে ফিরেছেন। কিন্তু অসুখটা কোথায়? ছত্তিশগড়ের দলিত, ওড়িশায় হিন্দু বা বাংলার মালদহ-মুর্শিদাবাদ-দুই দিনাজপুরের মুসলিম বাঙালি ভিন রাজ্যে আক্রান্ত, নিহত হচ্ছেন কেন? গোটা ২০২৫ জুড়ে আমরা দেখেছি, এই ২৬-এর শুরুতেও সেই ছবিই আমরা দেখে যাচ্ছি – বাঙালি পরিযায়ী শ্রমিক ভারতের নানান প্রান্তে, বিশেষ করে বিজেপি বা এনডিএ শাসিত রাজ্যগুলোতে স্রেফ বাংলাভাষায় কথা বলার জন্য ‘বাংলাদেশি’ বলে আক্রান্ত হচ্ছেন। তাঁদের মধ্যে অধিকাংশই সংখ্যালঘু মুসলিম হলেও, বাঙালি হিন্দু শ্রমিকদের উপরেও হামলা হয়েছে, মানে কেবল ধর্মই নয়, এটা বাংলা ভাষার সঙ্গে জড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। করছে কারা? মানে হেনস্থা চালাচ্ছে কারা? হেনস্তায় শুধু সঙ্ঘ পরিবারের বড়-মাঝারি-খুচরো লেঠেল-পদাতিক সেনারা নয়- সরাসরি রাষ্ট্র তার পুলিশ-প্রশাসন নিয়ে শামিল হয়েছে। হ্যাঁ স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলে কোনও তদন্ত না করেই তাঁদেরকে পুশব্যাক করা হচ্ছে।
আরও পড়ুন: Fourth Pillar | মোদিজির ডিয়ার ফ্রেন্ড ট্রাম্পের গলায় হিটলারের সুর
মালদহের অন্তঃসত্ত্বা সোনালি বিবির মর্মান্তিক কাহিনী তো আমাদের সবারই জানা। কিন্তু কেবল সোনালি বিবিই নয়, রাষ্ট্রের তরফে যে চূড়ান্ত অসহনীয় অসম্মান সইতে হয়েছে, সইতে হবে তাঁর মতো আরও বহু শ্রমজীবী নারী ও পুরুষকে। আজ তাঁদের যে চরম উদ্বেগ, আশঙ্কা, অপমান আজ নির্যাতনের জীবন কাটাতে হয়েছে, হচ্ছে তার পিছনে তো অবশ্যই হিন্দুত্ববাদ আছে, আছে হিন্দুহৃদয় সম্রাট মোদিজির শাসন। তাঁরই ছড়ানো সেই অনুপ্রবেশের কথার পরেই আসে ভারতের জনবিন্যাস পালটে যাওয়ার তত্ত্ব, সিঙ্গুর বা মালদার জনসভাতে তো তিনি সেটাই বললেন। “হিন্দু খতরে মে হ্যায়”, আর সেজন্যে দায়ি নাকি পুরুলিয়ার বেকারি শ্রমিক, মালদহের কোনও ফেরিওয়ালা, হুগলির বাসন বিক্রেতা, মুর্শিদাবাদের নির্মাণ শ্রমিক, পশ্চিম বা পূর্ব মেদিনীপুরের সোনার গয়নার কারিগর বা সোনালি বিবির মতো কেউ, পুরানো-নোংরা কাগজ-আবর্জনা কুড়িয়ে যাদের পেট চালানো মানুষজন! কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে দেওয়া নির্দেশের পর থেকে দেশজুড়ে অনুপ্রবেশকারী খোঁজার নামে যে অভিযান শুরু হয়েছে, তা আসলে বাঙালি মুসলিম ও ভাষাগত সংখ্যালঘুদের নিশানা করার এক মোক্ষম অস্ত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। দিল্লি পুলিশের এক আধিকারিক জানিয়েছেন যে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের পক্ষ থেকে ২০২৪ সালের শেষের দিকেই বাঙালি ও রোহিঙ্গা শরণার্থীদের শনাক্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। উত্তরপ্রদেশ, রাজস্থান, গুজরাত এবং হরিয়ানার মতো রাজ্যগুলোতে এই সময়ে হিন্দু পুনরুত্থানবাদী ভিজিল্যান্ট বাহিনী বা নজরদারি বাহিনীগুলো পুলিশের সমান্তরাল ক্ষমতা ভোগ করছে। মথুরাতে বাঙালি শ্রমিকদের বাড়িতে ঢুকে তাঁদের হেনস্থা করা, দাড়ি টেনে ছিঁড়ে ফেলা এবং তাঁদের জিনিসপত্র ভাঙচুর করা এখন নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। রাজস্থানের ভিওয়ান্ডিতে ৩৫০ থেকে ৪০০ জন বাঙালি শ্রমিককে ডিটেনশন ক্যাম্পে আটকে রাখার খবর পাওয়া গিয়েছে। এই শ্রমিকদের অপরাধ কেবল এটাই যে, তাঁরা বাংলা ভাষায় কথা বলছিলেন। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, বিএসএফ এবং স্থানীয় পুলিশ কোনও বিচার বিভাগীয় নির্দেশ ছাড়াই অভিযুক্তদের ভারতীয় বায়ুসেনার বিমানে করে সীমান্তে নিয়ে যাচ্ছে এবং সেখান থেকে ‘পুশব্যাক’ করছে। একে মানবাধিকার কর্মীরা ‘Stealthy Pushback’ বা অঘোষিত উচ্ছেদ বলে অভিহিত করেছেন। আর এই প্রক্রিয়া চলাকালীন মানুষের বায়োমেট্রিক তথ্য মুছে দেওয়া হচ্ছে, তাঁদের ভারতীয় পরিচয়পত্রগুলো নষ্ট করে দেওয়া হচ্ছে যাতে তাঁরা কোনওদিন আইনিভাবে ফিরে আসতে না পারেন। বাঙালিদের উপর এই লাগাতার আক্রমণের প্রতিবাদে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা উত্তাল হয়ে উঠেছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বিধানসভায় নিন্দা প্রস্তাব আনা হয়েছিল, যেখানে বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলোতে বাঙালির প্রতি অমর্যাদা ও অত্যাচারের কঠোর সমালোচনা করা হয়। মন্ত্রী শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়, ফিরহাদ হাকিম দাবি করেছেন যে, বিজেপি আসলে এক বাংলা-বিরোধী শক্তি। দেশের মানুষকে ভোলানোর চেষ্টা চলছে যে ভারতের জাতীয় সঙ্গীতও বাংলা ভাষাতেই লেখা বা বাংলা ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম কথ্য ভাষা। বিজেপি সরকার ‘ডবল ইঞ্জিন’ রাজ্যগুলোতে বাঙালিদের বেছে বেছে টার্গেট করছে।
ভারতের সংবিধান অনুযায়ী কোনো নাগরিককে তাঁর মাতৃভাষার ভিত্তিতে বিদেশি বলা যায় না। রাজ্যের এই প্রচেষ্টা যথেষ্ট নয় যতক্ষণ না কেন্দ্রীয় সরকার এই ভাষাগত বৈষম্য বন্ধে কড়া পদক্ষেপ নেয়। বিজেপির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে, সাধারণ শিক্ষিত বাঙালিদের উপর আক্রমণ হচ্ছে না, আর যারা আক্রান্ত হচ্ছেন তাঁরা সম্ভবত আসলেই বাংলাদেশি। এখনও ওই সম্ভবত বাঙালি, এইটুকু হলেই তাঁকে পিটিয়ে মারার বা পুশব্যাক করার লাইসেন্স পাচ্ছে তারা। হ্যাঁ, বাংলাদেশি কী না, সেই তদন্ত না করেই তাঁকে বাংলাদেশে পাঠানো হচ্ছে, এই ধরনের যুক্তি আসলে এই ঘৃণার রাজনীতিকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা মাত্র। এবারে ওই বাঙালি বিরোধী আরএসএস-বিজেপির বিরুদ্ধে বাঙালিদের রুখে দাঁড়াতে হবে।
দেখুন আরও খবর:








