২৮ জানুয়ারি ২০২৬, ৮টা ১১: মুম্বই থেকে টেক–অফ করল বেসরকারি চার্টার্ড বিমান লিয়ারজেট ৪৫ । বিমানটা পরিচালনা করছিল ভিএসআর (VSR) নামক একটা বেসরকারি অপারেটর আর এর রেজিস্ট্রেশন নম্বর ছিল ভিটি-এসএসকে (VT-SSK) । বারামতির ৫৫ কিমি দূরে এসে কো-পাইলট শাম্ভবী আবহাওয়া জানতে চান, কন্ট্রোল থেকে ক্যাপ্টেন মাধব জানান, তিন হাজার মিটার দৃশ্যমানতা, ভিজিবিলিটি। হাওয়া শান্ত। ৮টা ১৮: বারামতির সঙ্গে যোগাযোগ করলেন পাইলট। রানওয়ে ১১–য় এসে পাইলট জানান, রানওয়ে দেখা যাচ্ছে না। বিমান মুখ ঘুরিয়ে আবার ফিরে আসে, আবার বিমানের পজিশন জানতে চাওয়া হয়। পাইলট জানান, তিনি এবার দ্বিতীয়বার ল্যান্ড করতে যাচ্ছেন, ক্যাপ্টেন মাধব জানতে চান, রানওয়ে দেখতে পাচ্ছেন? শাম্ভবী বলেন, এখনও দেখা যাচ্ছে না, দেখা গেলে বলব। কয়েক সেকেন্ড পরে বলেন, এ বার তিনি রানওয়ে দেখতে পাচ্ছেন। ৮টা ৪৩: পাইলটকে বলা হয় ‘ক্লিয়ার টু ল্যান্ড’, কিন্তু এবারে জবাব এল না। এতে পাইলটের জবাব দেওয়ার কথা থাকলেও তিনি জবাব দেননি, কোনও সাড়া পাওয়া যায়নি বিমান থেকেও। ৮টা ৪৪: ভেঙে পড়ে বিমান। বারামতির রানওয়ের কাছ থেকে ধোঁয়া দেখা যায়। বিমান ক্র্যাশ করার পরে জ্বলছে, আগুনের গ্রাসে মহারাষ্ট্রের উপমুখ্যমন্ত্রী অজিত পাওয়ারের প্লেন। তখন কালো ধোঁয়া আর আগুন। কারও বেঁচে থাকার কোনও সম্ভাবনাই ছিল না। এই ঘটনার ঠিক একমাস আগে ২৮ ডিসেম্বর ২০২৫, ঐ বারামতি এয়ারপোর্টে গিয়েছিলেন গৌতম আদানি। সেদিনও ছিলেন বারামতির অজিত দাদা পাওয়ার। কেন জানা নেই সফর সংক্ষিপ্ত করেই একটা ছোট্ট অনুষ্ঠান সেরে গৌতম আদানি ফিরে গিয়েছিলেন। কিন্তু সময়টা খুব গুরুত্বপূর্ণ।
এই বারামতি এয়ারপোর্টটা কেমন? একটা ১৭৭০ মিটার এয়ারস্ট্রিপ বা রানওয়ে ঘিরে ছোট একটি টাওয়ার বিল্ডিং। বারামতিকে বলা হয় ‘আনকন্ট্রোলড এয়ারফিল্ড’। কেন? ‘আনকন্ট্রোলড’ কেন? কারণ এখানে নামা বা ওঠা সবটাই পাইলটকেই করতে হয়, তলা থেকে ম্যানুভার করার কোনও ব্যবস্থা নেই। এখানে এয়ার ট্র্যাফিক কন্ট্রোল নেই। নেই ইন্সট্রুমেন্টাল ল্যান্ডিং সিস্টেম। কেবলমাত্র ফ্লাইট ট্রেনিং অর্গানাইজেশনের ইন্সট্রাক্টর একজন অভিজ্ঞ পাইলট টাওয়ারে বসে রেডিও মারফত যোগাযোগ করেন বিমানের সঙ্গে। ওদিকে ‘লিয়ারজেট ৪৫’ বিমান বোম্বার্ডিয়ার অ্যারোস্পেসের তৈরি একটা জনপ্রিয় মাঝারি মাপের বিজনেস জেট। তবে ভিএসআর ভেঞ্চারস দ্বারা পরিচালিত এই বিশেষ বিমানটার (VT-SSK) সুরক্ষা রেকর্ড নিয়ে গুরুতর অভিযোগ আছে। জানা গিয়েছে যে, এই বিমানটার আগে থেকেই নানান যান্ত্রিক ত্রুটি ছিল। বিশেষ করে বিমানের ভেতরের বাতাসের চাপ (Air Pressure) নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা আর উইন্ডশিল্ডে ফাটল ধরার মতো সমস্যা ধরা পড়েছিল। এই ত্রুটিগুলোর কারণেই বিমানটা দীর্ঘ সময় পরিষেবা থেকে দূরে রাখা হয়েছিল, আর পরে সেটাকে মেরামত বা ‘রিমডেলিং’ করে পুনরায় চালু করা হয়। এদিকে মাত্র কিছুদিন আগে রিলায়েন্স এই বারামতি বিমানবন্দরের দায়িত্ব নিয়েছে। কিন্তু সেখানে আরও বড় করে এয়ারপোর্ট তৈরির ব্যাপারে উদ্যোগ নিয়েছিল আদানি গ্রুপ, পাশাপাশি জায়গাতে বারামতি এয়ারপোর্টের জন্য জায়গাও বাছা হয়েছে। আর কে না জানেন যে, বারামতি আদতে পাওয়ার সাম্রাজ্য, বড় পাওয়ারের অনুমোদন আর ছোট পাওয়ারের সমর্থন ছাড়া সেসব কাজ সম্ভব নয়।
আরও পড়ুন: Fourth Pillar | মোদিজি সস্তায় স্কচ হুইস্কি আর ভেড়ার নরম মাংস কাদের খাওয়াবেন?
এই ধরনের এয়ারফিল্ডে ভিএফআর বা ভিসুয়াল ফ্লাইং রুলস–এ নামতে হয়। তার জন্য খাতায়–কলমে প্রয়োজন হয় পাঁচ হাজার মিটার দৃশ্যমানতা। যার মানে, রানওয়ের পাঁচ হাজার মিটার উপরের আকাশ থেকে পাইলটকে রানওয়ে পরিষ্কার দেখতে হবে। নয়তো তিনি নামতে পারবেন না। বুধবার সেখানে ভিজিবিলিটি ছিল তিন হাজার মিটার। সূত্র বলছে ‘যে বিমানবন্দরে এটিসি রয়েছে, সেখানে নামার সময়ে ভিজিবিলিটি পাঁচ হাজারের কম থাকলেও বিশেষ পরিস্থিতিতে তবু নামা যায়। কারণ, এটিসি–র সঙ্গে পাইলটের সবসময়ে যোগাযোগ থাকে। কিন্তু, বারামতির মতো আনকন্ট্রোলড এয়ারফিল্ডে, যেখানে এটিসি–র কোনও ফেসিলিটি নেই, সেখানে কোনও অবস্থাতেই পাঁচ হাজার মিটারের কম দৃশ্যমানতা থাকলে নামার কথা নয়।’ এখানে কত ছিল? মাত্র ৩০০০। তাহলে ১৫ হাজার ফ্লাইং কিলোমিটার অভিজ্ঞতা থাকার পরেও পাইলট, কো-পাইলট সেখানে নামতে গেলেন কেন? এবং একবার নয়, প্রথমবার মিস করার পরে আবার ফিরে এলেন। হ্যাঁ, সেই প্রশ্ন তো আছে। দ্বিতীয় প্রশ্ন হল, আকাশে চূড়ান্ত বিপদ হলে পাইলটরা সেই পরিস্থিতি বোঝাতে ‘মে ডে’ কল করেন। কেন সেই কল করলেন না পাইলটেরা? ‘মে ডে’ কল করার জন্য সময় ছিল না? ভিজিবিলিটি নেই, তবুও তাঁরা সেকেন্ড আটেম্পট নিলেন, কিন্তু ‘মে ডে’ কল করলেন না? এ প্রশ্নও আছে। তিন নম্বর প্রশ্ন, বারামতির আকাশে, রানওয়ের ২,৬০০ ফুট দূরের আকাশ থেকে একবার বিমানটা নেমে আসে ২,৪০০ ফুটে। আবার চলে গেল ২,৮০০ ফুটে, আর সেটা একবার নয়, এভাবে বার দুয়েক সে ২,৪০০ এবং ২,৮০০ ফুটের মধ্যে ওঠানামা করে। তখন তার গতি ছিল ঘণ্টায় প্রায় ২৫৩ কিলোমিটার। কিন্তু, কেন? বিশেষজ্ঞদের একাংশের বলছেন, তখনই সম্ভবত যান্ত্রিক সমস্যা দেখা দিয়েছিল। কিন্তু তাহলে সে কথা পুনে এটিসি–কে তাঁরা জানালেন না কেন? তাঁরা উচ্চতা কমাচ্ছেন বাড়াচ্ছেন, ফার্স্ট অ্যাটেম্পট নিচ্ছেন, পিছিয়ে যাচ্ছেন, যান্ত্রিক সমস্যা হয়েছে, কিন্তু গ্রাউন্ডে যিনি আছেন তাঁর সঙ্গে কমিউনিকেশন থাকা সত্ত্বেও সেসব জানালেন না কেন? হ্যাঁ, এই প্রশ্নও আছে। সেটা অন্তর্ঘাত? জানি না, সেটা ষড়যন্ত্র? জানি না। কিন্তু যা হয়েছে তা প্রশ্নাতীত নয়। বেশ কিছু প্রশ্ন আছে। ঘটনার বহু আগে থেকেই সেই প্রশ্নগুলো জন্ম নিয়েছে।
খেয়াল করে দেখুন ডিসেম্বরের ২০ বা ২১ তারিখ থেকেই এনসিপি, বিজেপি, শিন্ডে শিবসেনার আসন রফা নিয়ে যে মনোমালিন্য চলছিল, তা এক চুড়ান্ত রূপ নেয়, আর এনসিপি অজিত পাওয়ার গোষ্ঠী একলা চলার সিদ্ধান্ত নেয়। তারপরে গৌতম আদানি বারামতিতে। কেন? একটা এআই কেন্দ্র উদ্বোধন ইত্যাদির জন্য। আদানির ক্ষেত্রে সেটা খুব জরুরি ছিল? গৌতম আদানি, অজিত পাওয়ার দেখা করতে চেয়েছিলেন? জানা নেই। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যাবে। এবারে আসুন আরও কতগুলো তথ্যের দিকে নজর দেওয়া যাক। আমেদাবাদে এয়ার ইন্ডিয়ার ১৭১ নম্বর ফ্লাইট (বোয়িং ৭৮৭ ড্রিমলাইনার) ওড়ার কিছু পরেই এক বিল্ডিংয়ের উপরে আছড়ে পড়ে, যাতে ১২ জন ক্রু এবং ২২৯ জন যাত্রী সমেত মোট ২৬০ জন মারা যান। সেই ঘটনার পর জেডি(ইউ) সাংসদ সঞ্জয় ঝা’র নেতৃত্বে একটা সংসদীয় স্থায়ী কমিটি গঠন করা হয়েছিল, যা ২০২৫ সালের অগাস্ট মাসেই তাদের ৩৪৪ পাতার রিপোর্ট পেশ করে। সঞ্জয় ঝা কমিটির সেই রিপোর্টটা ছিল ভারত সরকারের জন্য এক চরম সতর্কবার্তা। কমিটি খুব স্পষ্টভাবে বলেছিল যে, ভারতে বিমান চলাচলের সংখ্যা বা ফ্লাইটের সংখ্যা যে হারে বাড়ছে, সেই হারে সুরক্ষা তদারকি বা ‘সেফটি ওভারসাইট’ বাড়ানো হয়নি। বিশেষ করে প্রাইভেট জেট এবং চার্টার্ড সার্ভিসের ক্ষেত্রে এক চরম বিশৃঙ্খলার পরিবেশ কাজ করছে। হ্যাঁ, এটা খুব পরিস্কার করেই ওই কমিটির রিপোর্টে লেখা আছে। আমেদাবাদ দুর্ঘটনার তদন্ত চলাকালীন জানা গিয়েছিল যে, বিমানের ব্ল্যাক বক্স থেকে পাওয়া তথ্য জানাচ্ছে প্লেন টা ওড়ার পরেই কোনও এক অজানা কারণে ইঞ্জিনের জ্বালানি সরবরাহ বা ‘ফুয়েল কাট-অফ’ সুইচগুলো বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ককপিট ভয়েস রেকর্ডিংয়ে এক পাইলট অন্যজনকে জিজ্ঞেস করছিলেন, “তুমি কেন বন্ধ করলে?” উত্তরে অন্যজন বলেছিলেন তিনি কিছু করেননি। এই যান্ত্রিক রহস্য বা মানুষের ভুল নিয়ে আজ অবধি কোনও স্পষ্ট উত্তর পাওয়া যায়নি, যা কেবল জনমানসে নয় বিশেষজ্ঞ মহলেও গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
সঞ্জয় ঝা কমিটির রিপোর্টে ভারতের প্রধান বিমান চলাচল নিয়ন্ত্রক সংস্থা ডিজিসিএ (DGCA)-র বর্তমান অবস্থাকে একটা ‘অস্তিত্ব সংকট’ (Existential Threat) হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। রিপোর্ট অনুযায়ী, ডিজিসিএ বর্তমানে ৫০ শতাংশের বেশি কর্মী ঘাটতি নিয়ে ধুঁকছে। ১০৬৩টা অনুমোদিত কারিগরি ও নিয়ন্ত্রক পদের মধ্যে মাত্র ৫৫৩টা পদ পূর্ণ রয়েছে। এর মানে হল, ভারতের আকাশে উড়ে বেড়ানো হাজার হাজার বিমানের সুরক্ষা অডিট করার জন্য প্রয়োজনীয় লোকবল সরকারের কাছে নেই। কমিটি এই চরম অব্যবস্থার পেছনের কারণ হিসেবে ইউপিএসসি (UPSC)-র নিয়োগ প্রক্রিয়া আর টেকনিক্যালি ইকুইপড, কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন মানুষজনদের জন্য আকর্ষণীয় বেতন বা সুযোগ-সুবিধার অভাবকে দায়ি করেছে। এমনকি বিমান বাহিনীর অভিজ্ঞ অফিসারদের ডিজিসিএ-তে নিয়োগ করার প্রক্রিয়াটাও সফল হয়নি, কেউ মাথাতেও রাখেননি যে প্রস্তাবটা কেউই মেনে নেবেন না, কারণ সেখানে যোগ দিলে তাঁদের অনেক চাকরির সুবিধা বাতিল হয়ে যায়। এই লোকবল সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়ছে বিমানের ফিটনেস এবং লাইসেন্সিং ব্যবস্থার উপর। ২০২৫ সালের এপ্রিল মাস পর্যন্ত করা একটা তথ্যে দেখা গিয়েছে যে, তদারকির সময় ধরা পড়া ৪৬৯২টা সুরক্ষা ত্রুটির মধ্যে মাত্র ৯৪৫টা সংশোধন করা সম্ভব হয়েছিল, আর বাকি ৩৭৪৭টা ত্রুটি অসম্পূর্ণ অবস্থায় পড়ে ছিল, মানে যেসব ত্রুটি থাকলে প্লেন আকাশে ওড়ানোর কথাই নয়। এর মধ্যে আবার ৩৭টা ছিল অত্যন্ত গুরুতর বা ‘লেভেল ১’ ক্যাটাগরির ত্রুটি, যা সাথে সাথে সমাধান করার কথা ছিল। অজিত পওয়ারের চার্টার্ড বিমানটাও কি এই সমাধান না হওয়া ত্রুটির কোনও তালিকার মধ্যে ছিল? এই প্রশ্নের জবাব আজও অধরা। সেই ত্রুটি ছিল কী না তাও আজ বোঝা যাবে না, জানাই যাবে না এই দুর্ঘটনা কতটা দুর্ঘটনা, কতটা দুর্ঘটনার বাইরে অন্য কিছুর সম্ভাবনা।
দেখুন আরও খবর:








