ওয়েবডেস্ক- ২০২৬ বিধানসভা ভোটের (2026 Assemble Election) আগে যুবভারতী এখন চর্চায়। পরতে পরতে নাটকীয় মোড়! লিওনেল মেসির (Lionel Messi) কলকাতায় আসা, শনিবার তাঁর যুবভারতীতে (Yuva Bharati) যাওয়া, তার পর তার মাঠ থেকে প্রস্থান সব কিছুই এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। এই কাণ্ডের অন্যতম চরিত্র আয়োজক সংস্থার কর্ণধার শতদ্রু দত্ত (Satadru Dutta) । যিনি ইতিমধ্যেই পুলিশের হেফাজতে। ইতিমধ্যেই ক্রীড়ামন্ত্রী পদ থেকে ‘ইস্তফা’ দিয়েছেন অরূপ বিশ্বাস (Arup Biswas)। মুখ্যমন্ত্রী সেই প্রস্তাব গ্রহণও করেছেন।
যুবভারতীয় কাণ্ডের পর থেকেই বিরোধীরা একবাক্যে অরূপ বিশ্বাসকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে। তাঁর সঙ্গে তুলনা টানা হয়েছে প্রাক্তন ক্রীড়ামন্ত্রী মদন মিত্রের। যাঁর আমলে যুবভারতীতে ফিফার ‘ফ্রেন্ডলি ম্যাচ’ খেলতে এসেছিল লিয়োনেল মেসি-সহ আর্জেন্টিনা। খেলতে আসে ‘ব্রাজিল অলস্টার’। দ্বিতীয় ম্যাচটির সময় যুবভারতী কেলেঙ্কারিতে ধৃত শতদ্রু দত্ত নাকি মদন মিত্রকে (Former Sports Minister Madan Mitra) নাস্তানাবুদ করে ছেড়েছিলেন। পরিস্থিতি এমনই পর্যায়ে গিয়েছিল যে, চুক্তিভঙ্গের দায়ে তৎকালীন ক্রীড়ামন্ত্রী গ্রেফতারও হয়ে যেতে পারতেন। ব্যক্তিগত চেষ্টাচরিত্র করেই সে যাত্রায় নিজের মান বাঁচিয়েছিলেন মদন মিত্র। যুবভারতীর কর্মকাণ্ডের পরে সেই ‘শতদ্রু’র নাম এখন মুখে মুখে। মদন মিত্র অবশ্য এই নিয়ে তেমন কিছু বলতে চাননি। সেই ঘটনা বলছে, ১৩ বছর আগে ২০১২ সালে শতদ্রুর উদ্যোগেই কলকাতায় এসেছিল ‘ব্রাজিল অলস্টার’। সেই দলে ছিলেন ১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপজয়ী ব্রাজিল দলের সাত খেলোয়াড়। ছিলেন অধিনায়ক দুঙ্গা, বেবেতো, মাউরো সিলভা, ব্র্যাঙ্কোর মতো ফুটবলারেরা।
২০০২ বিশ্বকাপজয়ী দলেরও জনা তিনেক সদস্যও সেই দলে ছিলেন। তাঁদের বিরুদ্ধে প্রাক্তন ভারতীয় ফুটবলারদের প্রদর্শনী ম্যাচ ছিল যুবভারতীতে। সেই ম্যাচেও প্রায় ৫০ হাজারের বেশি লোক হয়েছিল। অধিকাংশ দর্শকই টিকিট কেটে খেলা দেখতে এসেছিলেন। ম্যাচটি হয়েছিল ডিসেম্বর মাসের ৮ তারিখে। যুবভারতীতে কানায় কানায় ভিড়। কিন্তু দেখা যায় নির্দিষ্ট সময় পার হয়ে গেলেই ব্রাজিলের টিম মাঠে নামছে না। পরিস্থিতি জটিল হতে থাকে।
আরও পড়ুন- ক্রীড়ামন্ত্রী হিসেবে পদত্যাগ করছেন অরূপ বিশ্বাস? দেখুন বড় খবর
মদন মিত্র তখন যুবভারতীতে ক্রীড়ামন্ত্রীর জন্য নির্দিষ্ট ঘরে বসে। তার মধ্যেও উদ্বেগ বাড়তে থাকে, তিনি দেখেন টিম নামছে না। সেই সময়েই তাঁর কাছে প্রশাসনের উপরমহল থেকে ফোন আসে। জানানো হয়, টিম হায়াত রিজেন্সি হোটেল ছেড়ে মাঠে আসেনি। এবার চাপানউতোরের পালা শুরু। টিম না নামলে রাজ্য সরকার চাপে পড়বে। কারণ সেই সময়, তৃণমূল সরকার তখন মাত্রই দেড় বছর হল রাজ্যে ক্ষমতায় এসেছে। এর আগে আগে ২০১১ সালের ২ সেপ্টেম্বর আর্জেন্তিনা-ভেনেজুয়েলা ‘ফ্রেন্ডলি ম্যাচ’ ভালো ভাবেই হয়েছিল। ফলে কলকাতা যে আন্তর্জাতিক মানের খ্যাতনামীদের চাপ নিতে প্রস্তুত সেকথা বিশ্বের দরবারে নজর কাড়ে।
মদনের এক ঘনিষ্ঠের কথায় জানা যায়, শতদ্রু দত্তকে ডেকে দাদা জানতে চান, কী হয়েছে। শতদ্রু দাদাকে জানান, চুক্তি অনুযায়ী ব্রাজিল দলের ভারতীয় মুদ্রায় ২ কোটি বকেয়া আছে আছে। সেই টাকা না-পেলে টিম হোটেল থেকে মাঠেই আসবে না। মাঠে নামার তো প্রশ্নই নেই।’’
মদন আরও জানতে পারেন, শতদ্রু ব্রাজিল অলস্টার দলের ম্যানেজারকে বলেছেন, মদন রাজ্যের ক্রীড়ামন্ত্রী। টাকাপয়সার ব্যাপারে তিনিই যা প্রয়োজন সেটা করবেন। তার উপরেই সমস্ত বিষয়টা নির্ভর করছে। মদনের ওই ঘনিষ্ঠের দাবি, ‘‘দাদা তখনও পর্যন্ত টাকাপয়সা বা চুক্তির কথা কিছুই জানতেন না।’’ এই অবস্থায় মদন মিত্র ব্রাজিলের টিম ম্যানেজারকে জানিয়েছিলেন, টিম মাঠে খেলতে নামুক। তিনি ভারতীয় মুদ্রায় ওই টাকা জোগাড় করবেন। কিন্তু রাজি হননি ব্রাজিলের ম্যানেজার। তিনি বলে দেন, পুরো বকেয়া অর্থ মেটাতে হবে মার্কিন ডলারে! ওই দিন মানে ২০১২ সালের ৮ ডিসেম্বর ছিল রবিবার। ফলে ভারতীয় মুদ্রাকে বিদেশি মুদ্রায় পরিবর্তন করার উপায় ছিল না। শেষ পর্যন্ত মদনের মৌখিক প্রতিশ্রুতিতেই ব্রাজিল অলস্টার মাঠে নামতে রাজি হয়। সেইসঙ্গে ক্রীড়ামন্ত্রীকে জানানো হয়, বকেয়া টাকা না-পাওয়া পর্যন্ত তাঁরা ভারতেই থাকবেন তারা। ক্রীড়ামন্ত্রীর বিরুদ্ধে পুলিশে চুক্তিভঙ্গের অভিযোগ করবেন।
মদন-ঘনিষ্ঠের কথায়, ‘‘ওরা বলেছিল, উই উইল ক্যাম্প ইন ইন্ডিয়া!’’ মদন ঘনিষ্ঠের বক্তব্য, সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত উদ্যোগে মদন সেই টাকা জোগাড় করেছিলেন এবং চুক্তিভঙ্গের দায় থেকে রেহাই পেয়েছিলেন। যদিও রাজ্য সরকার বা রাজ্যের ক্রীড়া দফতরের উদ্যোগে সেই দলকে কলকাতায় আনা হয়নি। তার পর থেকে মদন আর শতদ্রুর সঙ্গে কোনও সংশ্রব রাখেননি।
এবারেও নাকি সদ্য ইস্তফা দেওয়া ক্রীড়া মন্ত্রীও শতদ্রুর উপর ক্ষুব্ধ হয়ে যান, তার কর্মকাণ্ডে। মেসির সফরের ২৪ ঘন্টা আগে তিনি নাকি দুপুর থেকে বিকাল পর্যন্ত চার ঘণ্টা অরূপ বিশ্বাসকে যুবভারতীতে বসিয়ে রেখেছিলেন! বারবার ফোন করলেও ধরেননি বলে অভিযোগ। প্রত্যক্ষদর্শীদের কথায়, এতেই বিরক্ত হয়ে যান অরূপ বিশ্বাস। এই ধরনের অনুষ্ঠান এই শেষ, আর করতে দেওয়া হবে না, বলে জানিয়ে দেন অরূপ।
হুগলির রিষড়ার ছেলে শতদ্রু দত্ত। বাঙ্গুর পার্কের তাঁর বিলাসবহুল বাড়ি। সুরক্ষায় বাড়িতে লাগানো ১৮ টি সিসি ক্যামেরা। ছোট থেকে শতদ্রু ফুটবল প্রেমী।
দিয়েগো মারাদোনার এমনই ভক্ত যে, নিজের ছেলের নামও রেখেছেন ‘দিয়েগো’। রিষড়ার মানুষের কাছে শতদ্রুকে রনি নামেই চেনে। একটা সময় জামাইবাবু অশেষ দত্তের হাত ধরে ইভেন্টের জগতে প্রবেশ। সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে। এই মুহূর্তে এই শতদ্রু বিধাননর পুলিশের হেফাজতে। আর আজ ক্রীড়ামন্ত্রীর পদ থেকেও ইস্তফা দিলেন অরূপ বিশ্বাস।
দেখুন আরও খবর-







