২০২৬ সালের জানুয়ারির এই শীতের সকালে বিশ্ব রাজনীতির জটিল চেহারার দিকে তাকালে বুকটা কেঁপে উঠবেই। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি যেদিকে দ্রুত মোড় নিচ্ছে, তাতে ইরান ও আমেরিকার মধ্যে একটা রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ এখন আর কেবল তাত্ত্বিক আলোচনা নয়, এক ভয়াবহ বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আছে। আমেরিকা তাদের নাগরিক, অফিসিয়ালদের জানিয়েছে, ‘ঘরে ফিরুন’, ভারতও সেটাই জানিয়েছে। মানে এখন শুধু কিছু সময়ের অপেক্ষা। আমরা যারা ভারতের সাধারণ নাগরিক বা বিশেষজ্ঞ, তাঁদের কাছে মনে হতেই পারে যে, ইরানের মরুভূমিতে বোমা পড়লে আমাদের কী? কিন্তু বিশ্বায়নের এই যুগে প্রতিটা দেশ একে অন্যের সঙ্গে এমনভাবে জড়িয়ে আছে যে, তেহরানে একটা ইট পড়লে তার কাঁপন দিল্লি বা মুম্বইয়ের বাজারে স্পষ্ট বোঝা যায়। ভারত ও ইরানের সম্পর্ক কয়েক হাজার বছরের সভ্যতা ও সংস্কৃতির টান। কিন্তু আজকের এই আধুনিক ভূ-রাজনীতিতে আবেগের চেয়েও বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে অর্থনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং কৌশলগত অবস্থান। আমেরিকা যদি শেষ পর্যন্ত ইরানের ওপর সামরিক হামলা চালায়, তবে ভারতের উপর তার প্রভাব খুব সামান্য হবে না, আর কেবল বাণিজ্য বা কেবল আমদানি রফতানির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বা এই প্রভাব তেলের দাম বাড়ার মধ্যেই আটকে থাকবে না, আমাদের কৃষকের থালা থেকে শুরু করে দেশের আন্তর্জাতিক মর্যাদা—সবই এক বিশাল চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে।
ভারত ও ইরানের বাণিজ্যিক সম্পর্কের কথা উঠলে প্রথমেই যে জিনিসটার কথা মাথায় আসে, তা হল বাসমতি চাল। আমাদের দেশের পাঞ্জাব আর হরিয়ানার কৃষকদের ঘাম ঝরানো এই সুগন্ধি চালের জন্য ইরানের বাজার হাঁ করে বসে থাকে। তথ্য বলছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত ইরানের বাজারে ভারতীয় বাসমতি চালের একটা একচেটিয়া দাপট, মোট বাসমতি চাল রফতানির প্রায় ১২.৭ শতাংশ যায় ইরানে। কিন্তু এক চরম অনিশ্চয়তা এই রফতানি বাণিজ্যকে ঘিরে ধরেছে। আমেরিকা যখন হুমকি দিচ্ছে যে, ইরানের সঙ্গে যারা ব্যবসা করবে, তাদের উপর ২৫ শতাংশ অতিরিক্ত ট্যারিফ বা শুল্ক চাপানো হবে, তখন ভারতের চাল রফতানিকারকদের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের এপ্রিল থেকে নভেম্বরের মধ্যে ভারত প্রায় ৫.৯৯ লক্ষ মেট্রিক টন বাসমতি চাল ইরানে পাঠিয়েছে, যার দাম প্রায় ৪৬৮.১ মিলিয়ন ডলার। কিন্তু এখন ইরানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি এবং আমেরিকার রণংদেহী মূর্তির কারণে প্রায় ১৫০০ কোটি টাকার পেমেন্ট বা পাওনা টাকা ইরানি আমদানিকারকদের কাছে আটকে আছে। ইরানের মুদ্রাস্ফীতি এবং তাদের মুদ্রা ‘রিয়াল’-এর অস্বাভাবিক নেমে যাওয়া, পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারির হিসাব অনুযায়ী, এক মার্কিন ডলারের দাম দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৪.৭ লক্ষ রিয়াল। এই বিশাল মুদ্রা বিপর্যয়ের কারণে ইরানি ব্যবসায়ীরা ভারতীয় রফতানিকারকদের টাকা শোধ করতে পারছেন না। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে আমাদের দেশের ‘মান্ডি’গুলোতে। হরিয়ানা বা পাঞ্জাবের বাজারে বাসমতি চালের দাম প্রতি কেজি ৮৫ টাকা থেকে কমে ৮০ টাকায় নেমে এসেছে। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন বলেন যে যারা ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করবে তাদের ২৫ শতাংশ বেশি শুল্ক দিতে হবে, তখন মাথায় রাখুন ভারতের মোট ৮৬.৫ বিলিয়ন ডলারের রফতানি বাজার রয়েছে আমেরিকায়, আর ইরানের সঙ্গে ব্যবসা মাত্র ১.৬৮ বিলিয়ন ডলারের। স্বাভাবিকভাবেই ভারত সরকার বা ব্যবসায়ীরা আমেরিকার সেই বিশাল বাজার হারাতে চাইবেন না। যদি যুদ্ধ শুরু হয়, তবে এই ২৫ শতাংশ শুল্কের খাঁড়া সরাসরি আমাদের বাসমতি চালের বাণিজ্যের গলা কাটবে। কৃষকরা তাদের ফসলের ন্যায্য দাম পাবেন না, চালকলগুলোতে উৎপাদন কমে যাবে এবং ভারতের গ্রামীণ অর্থনীতি এক গভীর সংকটে পড়বে।
আরও পড়ুন: Fourth Pillar | শুভেন্দু অধিকারীর মকর সংক্রান্তির বিভ্রান্তি
এরপরেই আছে, চাবাহার বন্দর: ভারতের কৌশলগত স্বপ্নের অপমৃত্যু, বা তার সম্ভাবনা। চাবাহার বন্দর হল ভারতের বিদেশনীতির এক মাস্টারস্ট্রোক। পাকিস্তানের জমি ব্যবহার না করে আফগানিস্তান, মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর কাছে পৌঁছনোর জন্য ভারত ওমান উপসাগরের এই বন্দরে বিপুল টাকা ঢেলেছে। ২০২৪ সালের মে মাসে ভারত ইরানের সঙ্গে চাবাহার বন্দরের শহীদ বেহেস্তি টার্মিনাল পরিচালনার জন্য ১০ বছরের একটি ঐতিহাসিক চুক্তি স্বাক্ষর করে। এই চুক্তির আওতায় ভারত ১২০ মিলিয়ন ডলার মূল্যের সরঞ্জাম এবং ২৫০ মিলিয়ন ডলারের ক্রেডিট লাইন দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কিন্তু আমেরিকা যদি ইরানে হামলা চালায়, তবে এই চাবাহার বন্দরের ভবিষ্যৎ কী হবে? চাবাহার চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ আর পাকিস্তানের গ্বদার বন্দরের বিরুদ্ধে ভারতের এক শক্তিশালী কৌশলগত জবাব। যুদ্ধ শুরু হলে আমেরিকার ‘ম্যাক্সিমাম প্রেসার’ বা চরম চাপের মুখে এই বন্দরের কাজকর্ম পুরোপুরি স্থবির হয়ে যেতে পারে। যদিও ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে আমেরিকা ভারতকে চাবাহার বন্দরের জন্য ছয় মাসের এক বিশেষ ছাড় বা ‘ওয়েভার’ দিয়েছিল, কিন্তু এখনকার উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে সেই ছাড় বজায় থাকবে কী না তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। আমেরিকা যদি ইরানের উপর বোমাবর্ষণ শুরু করে, তবে চাবাহারের পরিকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে অথবা নিরাপত্তার কারণে জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে যেতে পারে। ভারত ইতিমধ্যেই এই বন্দরে যে হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে, তা কার্যত জলে যাওয়ার উপক্রম হবে। ভারতের জন্য চাবাহার ছিল মধ্য এশিয়ায় প্রভাব বিস্তারের এক তুরুপের তাস, যা হাতছাড়া হলে পাকিস্তান ও চীনের দাপট এই অঞ্চলে কয়েক গুণ বেড়ে যাবে। ভারতের সাধারণ মানুষের করের টাকায় তৈরি এই পরিকাঠামো যদি যুদ্ধের আগুনে পুড়তে শুরু করে, তবে তা হবে বিদেশনীতির এক চরম ব্যর্থতা। কিছুদিন আগে পর্যন্ত মোদিজির ট্রাম্প আর পুতিন নির্ভরতার থেকে বেরিয়ে আবার পুরানো রাস্তায় ফিরে ‘মাল্টি-অলাইনমেন্ট’ বা সবার সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার যে কৌশল ভারত নিয়েছে বা নিতে চলেছে, ইরান-আমেরিকা যুদ্ধ তা এক বিশাল অগ্নিপরীক্ষার মুখে ফেলে দেবে। ভারত একদিকে আমেরিকার কৌশলগত বন্ধু, আবার অন্যদিকে ইরানের সঙ্গে আমাদের কয়েক দশকের তেলের বাণিজ্য এবং কৌশলগত সম্পর্ক। আমেরিকা যখন ইরানে আক্রমণ করবে, তখন তারা সরাসরি ভারতের উপর চাপ তৈরি করবে যাতে ভারত এই আক্রমণের সমালোচনা না করে অথবা আগেভাগেই ইরানের সঙ্গে সব সম্পর্ক ছিন্ন করে।
আর মোদিজির সামনে এখন বড় সমস্যা হল, ২০২৬ সালের ব্রিকস (BRICS) সম্মেলন। ভারত এই বছরের ব্রিকস সম্মেলনের আয়োজক দেশ এবং ইরান এই জোটের অন্যতম নতুন সদস্য। ইরানকে বাদ দিয়ে ব্রিকস সম্মেলন করা যেমন কঠিন, আবার ইরানকে সমর্থন দিয়ে ট্রাম্পকে খেপিয়ে দেওয়াটাও ভারতের জন্য আত্মঘাতী হতে পারে। ২০২৫ সালে ভারত ইতিমধ্যেই রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনার অপরাধে ২৫ শতাংশ আমেরিকান ট্যারিফের মুখে পড়েছে। ইরানের যুদ্ধের ফলে যদি আরও ২৫ শতাংশ ট্যারিফ যোগ হয়, তবে আমেরিকার বাজারে ভারতীয় পণ্যের উপর মোট ট্যারিফের পরিমাণ দাঁড়াবে ৫০ থেকে ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত। এই বিশাল আর্থিক বোঝা সামাল দেওয়া ভারতের অর্থনীতির পক্ষে সম্ভব নয়। এই দ্বিমুখী সংকটে ভারতের বিদেশনীতি আবারও প্রশ্নের মুখে পড়বে। যদি ভাবেন মোদিজি তাঁর ব্যক্তিগত ক্যারিশমা দিয়ে এই পরিস্থিতি সামাল দেবেন, তাহলে বলি, বাস্তব ভূ-রাজনীতি ব্যক্তিগত সম্পর্কের অনেক উর্ধ্বে। ওসব সেলফিবাজি গলাজরাজড়িতে কিসসু হবে না। সমস্যা হল, ভারতকে যে কোনও একদিকে দাঁড়াতে হবে, আর যেদিকেই দাঁড়াক না কেন, ভারতের ক্ষতি হবে নিশ্চিত। আসলে ভারতের এক দীর্ঘদিনের জোট নিরপেক্ষ বিদেশ নীতি বা তারপরে মাল্টি ল্যাটারাল রিলেশনশিপ, বহুদেশের সঙ্গে এক সম্পর্ক গড়ে তোলার রাজনীতি থেকে আমরা যখন সরে গেলাম, তখন থেকেই এই সমস্যার সূত্রপাত। আর তা হয়েছে আমাদের মোদিজির ‘বিশ্বগুরু’ হওয়ার ইচ্ছের জন্য। উনি ট্রাম্পের গলা ধরে ঝুলে পড়লেন, তারপর বাইডেনের, তারপর পুতিনের, তারপর ট্রাম্পের আর পুতিনের। সব মিলিয়ে তিনি গলাজরাজড়িকেই বিদেশনীতি বলে মনে করতে শুরু করলেন। মানুষ তার প্রতিবেশীকে আগে সামলায়, তাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক তৈরি করে। উনি সেই কাজ না করে ‘পরাশক্তি’, ‘বিশ্বগুরু’ হওয়ার তাল করছিলেন এখন আমও গিয়েছে, ছালাও গিয়েছে। আমেরিকা ৫০০ শতাংশ ট্যারিফ চাপানোর হুমকি দিচ্ছে, বাংলাদেশ হুমকি দিচ্ছে চিকেন নেক কেটে দেব, নেপাল বলছে লিপুলেখ এলাকা তাদের, পাকিস্তান চীন আর তুরস্ক নতুন জোট তৈরি করতে যাচ্ছে, খুব স্বাভাবিকভাবেই তাতে বাংলাদেশও থাকবে। কাজেই সব দিক থেকেই দেশকে বিপন্ন করে একদিন তো মোদি জামানার অবসান হবে, কিন্তু তারপরেও এই জটিল জটগুলো ছাড়িয়ে এক নতুন দেশ আর তার প্রতিবেশীদের সঙ্গে সুস্থ সম্পর্ক গড়ে তোলা খুব সহজ হবে না।
দেখুন আরও খবর:








