ভারতবর্ষের এখনকার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে যখন আমরা আমাদের দেশের বিদেশনীতির দিকে তাকাই, তখন এক অদ্ভুত অস্থিরতা এবং দিকভ্রান্তির ছবি ফুটে ওঠে। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে, বা বলা ভালো স্বাধীনতার পর থেকেই ভারতের বিদেশনীতি যে সুসংহত এবং নির্দিষ্ট এক নীতির ভিত্তিতে হেঁটেছিল, গত এক দশকে তা যেন এক গোলকধাঁধায় হারিয়ে গিয়েছে। একদিকে বিশ্বমঞ্চে নিজেকে ‘বিশ্বগুরু’ হিসেবে তুলে ধরার এক আগ্রাসী প্রচার কৌশল, আর অন্যদিকে রূঢ় বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে ভারতের স্ট্রাটেজিক পজিশনিংয়ের দ্রুত নেমে আসা — এই দুটো একে অন্যের এক্কেবারে বিপরীত। স্বাধীনতার প্রাক্কাল থেকে শুরু করে নেহরুভিয়ান যুগের জোট নিরপেক্ষতা, ইন্দিরা গান্ধীর সময়ের বাস্তববাদী কূটনীতি এবং অটল বিহারী বাজপেয়ির জমানার ভারসাম্যপূর্ণ বিদেশনীতিকে ছাপিয়ে নরেন্দ্র মোদির জমানায় ভারত এক নজিরবিহীন অনিশ্চয়তার মধ্যে এসে দাঁড়িয়েছে। আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন, প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে তিক্ততা এবং চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কের জটিল সমীকরণ আজ ভারতকে এক আন্তর্জাতিক সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
ভারতবর্ষের বিদেশনীতির বিবর্তন বুঝতে গেলে আমাদের একটু পিছনে ফিরে তাকাতে হবে। স্বাধীনতার অনেক আগে থেকেই ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের নেতৃত্বে একটা সুনির্দিষ্ট বিশ্বদর্শন গড়ে উঠেছিল, যা মূলত সাম্রাজ্যবাদ এবং ঔপনিবেশিকতাবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিল। তবে এই ধারার বাইরে আরএসএস (RSS) বা হিন্দু মহাসভার মতো সংগঠনগুলোর চিন্তাধারা ছিল একেবারেই আলাদা। ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, বিংশ শতাব্দীর প্রথমদিকে যখন ইউরোপে ফ্যাসিবাদ এবং নাৎসিবাদের উঠে আসছে, তখন ভারতের এই দক্ষিণপন্থী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে হিটলার এবং মুসোলিনির প্রতি এক গভীর মুগ্ধতা কাজ করত। আরএসএস-এর প্রথম দিকের নেতা এমএস গোলওয়ালকর বা হিন্দু মহাসভার বীর সাভারকার, হিটলারের ‘সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ’ আর আর্য শ্রেষ্ঠত্বের তত্ত্বকে কেবল গুরুত্ব দিতেন তাই নয়, সেগুলোকে তাঁদের দর্শনে মিশিয়ে দিয়েছেন। ১৯৩০ সালে আরএসএস-এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা বিএস মুঞ্জে ইতালিতে গিয়ে বেনিতো মুসোলিনির সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে সাক্ষাৎ করেন। ফিরে এসে ওই গেস্টাপোদের মত সশস্ত্র বাহিনী তৈরি করার কাজটা শুরু করেছিলেন। হ্যাঁ, সেই তখন তাঁর তৈরি ওই বাহিনীর পোষাক ছিল খাঁকি, ব্রাউন শার্টসদের মতোই। গোলওয়ালকর তাঁর লেখায় সরাসরি ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে, জার্মানি যেভাবে তাদের দেশ থেকে ইহুদিদের ‘পরিষ্কার’ করেছে, তা হিন্দুস্তানের জন্য এক বিরাট শিক্ষা হতে পারে। এই আদর্শিক উত্তরাধিকার আজও বর্তমান সরকারের বিদেশনীতি এবং অভ্যন্তরীণ জাতীয়তাবাদের বয়ানে প্রতিফলিত হয়, যেখানে সংখ্যালঘুদের ক্রমাগত কোণঠাসা করার চেষ্টা বা একটা অতি-জাতীয়তাবাদী ভাবমূর্তি তৈরির চেষ্টা তো আমরা দেখতেই পাচ্ছি। মজার বিষয় হল, একসময় আরএসএস হলোকাস্টকে সমর্থন করলেও, বর্তমান প্রেক্ষাপটে তারা ইসরায়েলের কট্টর সমর্থক। এই পরিবর্তনের মূলে কোনও নৈতিক অবস্থান নেই, বরং অভিন্ন শত্রু হিসেবে ইসলামের প্রতি ঘৃণা কাজ করছে। এই আদর্শিক দ্বিচারীতা ভারতের এখনকার বিদেশনীতিতে এক বড় সংকটের জন্ম দিয়েছে।
১৯৪৭ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর জওহরলাল নেহেরু ভারতের বিদেশনীতির ভিত্তি গড়ে দেন, তিনি ভারতকে কোনও বিশেষ শক্তির বলয়ে না ঢুকিয়ে ‘জোট নিরপেক্ষ নীতি’ গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেন। এই নীতির মূল উদ্দেশ্য ছিল ভারতের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা এবং সদ্য স্বাধীন দেশগুলোর মধ্যে সংহতি বজায় রাখা। নেহেরু বিশ্বাস করতেন যে, ভারত যদি কোনও একটা পক্ষের হয়ে দাঁড়ায়, তবে তার উন্নয়নের গতি রুদ্ধ হবে। নেহেরু জমানায় ভারত ‘পঞ্চশীল’ নীতির কথা বলেছে, যা শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের উপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছিল। লাল বাহাদুর শাস্ত্রী বা ইন্দিরা গান্ধীর জমানায় এই নীতিতে কিছুটা বাস্তববাদী ছোঁয়া লাগে। ১৯৭১ সালের বাংলাদেশ মুক্তি যুদ্ধের সময় সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে ভারতের মৈত্রী চুক্তি ভারতের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনকে আরও শক্তিশালী করে তোলে। এমনকি সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পরেও ভারতের বিদেশনীতিতে এক ধরনের ধারাবাহিকতা বজায় ছিল। নরসিংহ রাও-এর সময়ের ‘লুক ইস্ট’ পলিসি বা অটল বিহারী বাজপেয়ির জমানার পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্র হিসেবে ভারতের আত্মপ্রকাশ—সবই ছিল এক সুশৃঙ্খল বিবর্তনের অংশ। বাজপেয়ি জমানার বিদেশনীতির একটা বড় বৈশিষ্ট্য ছিল যে, তিনি প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের উপর জোর দিয়েছিলেন। তাঁর সেই বিখ্যাত কথা আজও প্রাসঙ্গিক, “আমরা বন্ধু বদলাতে পারি, কিন্তু প্রতিবেশী নয়”। বাজপেয়ী আমেরিকা এবং রাশিয়ার মধ্যে এক সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রেখে চলতেন এবং কখনওই ভারতের স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে কোনও একটা দেশের উপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা দেখাননি। কিন্তু ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় আসার পর থেকেই ভারতের বিদেশনীতিতে এক নাটকীয় পরিবর্তন শুরু হল, এক নির্বোধের ‘কুছ কর দিখানা হ্যায়’, তো শুরু হল খোল নলচে বদল। এর আগে পর্যন্ত ভারতের বিদেশনীতি ছিল অনেকটা প্রাতিষ্ঠানিক। মোদি এসে একে এক ধরণের ‘পার্সোনাল ডিপ্লোম্যাসি’ বা ব্যক্তিগত কূটনীতিতে বদলে দিলেন, যা করেছেন, উনিই করেছেন, সর্বত্র উনি, সেলফি থেকে গলা জড়াজড়ি। বিদেশের মাটিতে বড় বড় ইভেন্ট করে প্রবাসী ভারতীয়দের আবেগ উসকে দেওয়া এবং বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধানদের সঙ্গে অতি-ঘনিষ্ঠতার ছবি প্রচার করাকে বিদেশনীতির সাফল্য হিসেবে তুলে ধরা হতে থাকল। আর সেই ভাবমূর্তি তৈরির প্রক্রিয়ার নাম দেওয়া হয় ‘বিশ্বগুরু’ হওয়া। মোদি সরকার প্রচার করতে শুরু করে যে, বিশ্ব এখন ভারতের কথা শুনে চলে।
আরও পড়ুন: Fourth Pillar | খেলার মাঠে রাজনীতিকে ঢোকাবেন না, বড় ক্ষতি হয়ে যাবে
কিন্তু এই গ্ল্যামারাস প্রচারের আড়ালে ভারতের বাস্তব কূটনৈতিক অবস্থান যে কতটা ভঙ্গুর হয়ে পড়ছে, তা ধরা পড়তে শুরু করে গত কয়েকবছরে। ভারতের বিদেশনীতির এখনকার দৈন্যদশা সবচেয়ে বেশি সামনে এসেছে ২০২৫ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর। ট্রাম্পের প্রথম আমলে মোদিজির সঙ্গে তাঁর যে বন্ধুত্ব দেখানো হয়েছিল, ২০২৫ সালে তার ছিটেফোঁটাও অবশিষ্ট নেই। বরং ট্রাম্প প্রশাসন এখন ভারতের উপর এক নজিরবিহীন অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করেই চলেছে। ২০২৫ সালের ২ এপ্রিল আমেরিকা প্রথমে ভারতের পণ্যে উচ্চ শুল্কের অভিযোগে ২৬ শতাংশ রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ ঘোষণা করে। এরপর ৬ অগাস্ট ট্রাম্প প্রশাসন সরাসরি ৫০ শতাংশ পর্যন্ত ট্যারিফ বা শুল্ক আরোপ করার সিদ্ধান্ত নেয়, যা ২৭ অগাস্ট থেকে কার্যকর হয়। ট্রাম্পের অভিযোগ ছিল যে, ভারত রাশিয়ার কাছ থেকে ক্রমাগত তেল কিনে পুতিন সরকারকে যুদ্ধ চালাতে সাহায্য করছে এবং ব্রিকস (BRICS) গোষ্ঠীর মাধ্যমে ডলারের আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করছে। এই ৫০ শতাংশ ট্যারিফ ভারতের টেক্সটাইল, জুয়েলারি এবং কেমিক্যাল খাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ শিল্পগুলোকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে। মোদি সরকার যে ‘বিশ্বগুরু’ হওয়ার দাবি করছিল, ট্রাম্পের এই একটা সিদ্ধান্তেই সেই দাবির অসারতা প্রমাণিত হয়েছে। আমেরিকার হুমকির সামনে ভারত আজ কার্যত অসহায়। কূটনীতিতে ব্যক্তিগত বন্ধুত্ব যে কোনো স্থায়ী সমাধান নয়, তা মোদি বনাম ট্রাম্প অধ্যায় থেকেই স্পষ্ট। ২০২৫ সালের মে মাসে ট্রাম্প একতরফাভাবে দাবি করেন যে তিনি ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি আলোচনায় সফলভাবে মধ্যস্থতা করেছেন। কী হয়েছিল, তা তো জানার উপায় নেই, কিন্তু এটা তো ভারতের দীর্ঘদিনের পররাষ্ট্রনীতির একেবারে পরিপন্থী ছিল, কারণ ভারত কখনওই দ্বিপাক্ষিক ইস্যুতে তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপ চায়নি। ট্রাম্পের এই বারবার তোলা দাবি বিশ্বমঞ্চে ভারতের সার্বভৌম ভাবমূর্তিকেই খাটো করেছে। শুধু তাই নয়, ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনিরকে যেভাবে হোয়াইট হাউসে আমন্ত্রণ জানিয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, তা ভারতের জন্য এক বড় কূটনৈতিক পরাজয়। মোদিজির ‘গায়ে পড়া’ সম্পর্ক ট্রাম্পের কাছে কোনও মূল্য পায়নি, কারণ ট্রাম্পের কূটনীতি সম্পূর্ণভাবেই লেনদেনের ওপর ভিত্তি করে চলে।
আসুন প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে ‘নেবারহুড লস্ট’ নীতির কথায়। মোদি জমানার বিদেশনীতির সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা সম্ভবত আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা করা। ২০১৪ সালে প্রতিটা সার্ক (SAARC) দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের নিয়ে যে যাত্রার সূচনা হয়েছিল, দশ বছর পর তার পরিণতি হয়েছে ভয়াবহ। আজ নেপাল, বাংলাদেশ, মলদ্বীপ এবং শ্রীলঙ্কার মতো দেশগুলোতে ভারত-বিরোধী জনমত তুঙ্গে। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ককে একসময় ‘সোনালি অধ্যায়’ বলা হত। কিন্তু মোদি সরকারের সম্পূর্ণভাবে শেখ হাসিনার উপর নির্ভরতা এবং জনগণের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষাকে অবজ্ঞা করার ফল দেখছি আমরা, ২০২৪ সালের অগাস্ট মাসে হাসিনার পতনের পর। হাসিনা এখন ভারতে আশ্রয় নিয়ে আছেন, আর এই বিষয়টাই এখনকার বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার আর সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম ভারত-বিদ্বেষ তৈরি করেছে। ২০২৫ সালের শেষে এসে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক এক ঐতিহাসিক সংকটে দাঁড়িয়ে আছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে ছাত্রনেতা শরীফ ওসমান হাদির হত্যার ঘটনায় এই উত্তেজনা চরম পর্যায়ে পৌঁছয়। যার ফলে ২২ ডিসেম্বর দুই দেশই একে অপরের নাগরিকদের ভিসা দেওয়া স্থগিত করে দিয়েছে। ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে যে নির্বাচন হতে যাচ্ছে, সেখানে আওয়ামি লিগ নিষিদ্ধ। দিল্লির সামনে এখন বড় প্রশ্ন, তারা কার সঙ্গে সম্পর্ক রাখবে? নেপাল একসময় ভারতের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্র ছিল। কিন্তু ২০১৫ সালের অঘোষিত অবরোধ এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দিল্লির ‘বিগ ব্রাদার’ মনোভাব নেপালকে চীনের দিকে ঠেলে দিয়েছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে নেপালে এক বিধ্বংসী ‘জেন-জি’ ছাত্র বিক্ষোভের ফলে ওলি সরকারের পতন ঘটে, যা ভারতকে আবারও অপ্রস্তুত অবস্থায় ফেলে দেয়। এর মাঝেই কালাপানি এবং লিপুলেখ নিয়ে সীমান্ত বিতর্ক মেটেনি, বরং নেপাল তাদের ১০০ টাকার নোটে বিতর্কিত মানচিত্র ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিয়ে কড়া বার্তা দিয়েছে। মলদ্বীপে মোহামেদ মুইজ্জু ক্ষমতায় এসেছেন ‘ইন্ডিয়া আউট’ স্লোগান দিয়ে। ভারত সেখান থেকে তার সামরিক কর্মী সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে। যদিও ২০২৫ সালের জুলাই মাসে মোদিজি মলদ্বীপ সফর করে সম্পর্ক মেরামতের চেষ্টা করেছেন এবং বিশাল অঙ্কের অর্থনৈতিক সাহায্য দিয়েছেন। কিন্তু মলদ্বীপের কৌশলগত ঝোঁক এখন চীনের দিকেই বেশি।
ওদিকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ভারতের বিদেশনীতির জন্য এক অগ্নি পরীক্ষা। ভারত একদিকে রাশিয়ার পুরানো বন্ধু, কিন্তু আমেরিকার ৫০ শতাংশ ট্যারিফের চাপ বুঝিয়ে দিচ্ছে যে এই বন্ধুত্ব বজায় রাখা কতটা ব্যয়বহুল হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমেরিকা বলছে ভারত সস্তায় তেল কিনে রাশিয়ার যুদ্ধবিগ্রহে অর্থ যোগান দিচ্ছে। ফলে ভারত না পারছে রাশিয়ার হাত ছাড়তে, না পারছে আমেরিকার ক্ষোভ সামলাতে। আবার চীনের সঙ্গে সম্পর্ক গত কয়েক বছর ধরে হিমশীতল অবস্থায় রয়েছে। ২০২০ সালের গালওয়ান সংঘর্ষের পর থেকে সীমান্তে উত্তজনা কমেনি। মোদি সরকার কখনও কোয়াড-এর মাধ্যমে আমেরিকার কাছাকাছি থাকার চেষ্টা করছে, আবার কখনও চীনকে খুশি করার জন্য নমনীয় সুর ধরছে। এই দোদুল্যমান অবস্থা ভারতের বিদেশনীতিকে অত্যন্ত দুর্বল এবং কিংকর্তব্যবিমূঢ় করে তুলেছে। নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে ভারতের বিদেশনীতি আজ আসলে এক বড় ধরণের আইডেন্টিটি ক্রাইসিস, পরিচিতি সংকটে ভুগছে। ঘরোয়া রাজনীতিতে চমক দেওয়ার জন্য ‘বিশ্বগুরু’ ভাবমূর্তি তৈরি করা হলেও, বিশ্বমঞ্চে ভারতের গুরুত্ব আদতে কমছে। আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন, প্রতিবেশীদের সঙ্গে বিচ্ছিন্নতা এবং চীন-রাশিয়া সমীকরণে ভারতের অবাস্তব অবস্থান আমাদের জাতীয় নিরাপত্তাকে বিপন্ন করছে। কূটনীতিতে ব্যক্তিগত ক্যারিশমা কখনও বেশিদিন টিকে থাকে না যদি না তার পিছনে থাকে শক্তিশালী অর্থনৈতিক ও কৌশলগত ভিত্তি। আজকের দিনে ভারতের জন্য সবচেয়ে বড় শিক্ষা হল, বিদেশনীতি ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট নয়। ভারতবর্ষের দীর্ঘদিনের সুসংহত বিদেশনীতিকে যেভাবে ‘ঘেঁটে ঘ’ করে ফেলা হয়েছে, তাতে করে ভারত আন্তর্জাতিক মহলে এক ধরণের হাসির পাত্র বা ‘বিশ্বজোকার’ হয়ে ওঠার জায়গাতে এসে দাঁড়িয়েছে। এই পরিস্থিতির বদল না হলে ভারতের ভবিষ্যৎ কূটনীতি কেবল একাকীত্বের দীর্ঘশ্বাস হয়েই রয়ে যাবে। শক্তিশালী নেতার ইমেজ কেবল দেশের ভেতরে চলে, আন্তর্জাতিক দাবার বোর্ডে চাল দিতে হয় বুদ্ধি দিয়ে, কেবল আবেগ বা গায়ে পড়া সম্পর্ক দিয়ে নয়।
দেখুন আরও খবর:








