হিন্দিতে একটা কথা আছে, ‘অ্যা বৈল মুঝে মার’, বৈল মানে ষাঁড়, বাংলা অনুবাদ হল, ‘আয় ষাঁড় আমাকে মেরে যা’। খানিকটা ‘বাঁশ কেন ঝাড়ে’ গোত্রের কথা। বঙ্গ বিজেপিকে দেখে সেটাই মনে হয়। তাঁরা আপাতত আত্মঘাতী গোল খেতে ব্যস্ত। মমতা ব্যানার্জি ইন্ডোর স্টেডিয়ামে তৃণমূল কর্মীদের সভা ডেকে নির্বাচনী প্রচারের শুরুয়াতটা করে দেবার পরে যুবরাজ জনসভা আর জনসম্পর্ক শুরু করে দিয়েছেন। হ্যাঁ, মানুষের ভিড় আছে, তিনটে টার্মের পরেও যদি মানুষের ভিড় শাসক দলের সভাতে উপচে পড়ে তাহলে তা নিয়ে তাঁরা ফলাও করে প্রচার করবেন বৈকি, করছেনও। যদিও আমরা জানি ভিড় কিছুই নয়, ২০১১-তে গোহারান হারার মাত্র ক’দিন আগে যাদবপুরে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের রোড শোতে হাঁটার জায়গাও ছিল না, কিন্তু তারপরে? তিনি নিজেই যাদবপুরে হেরেছিলেন। হ্যাঁ, এরকম হয়। কিন্তু হ্যাঁ, এখানে কিন্তু আছে, জনসভার ভিড় নয়, সেই জনসভাতে শাসক বা বিরোধী দল কোন প্রশ্ন তুলছেন, কোন প্রশ্নের জবাব দিচ্ছেন, সেটাই হাওয়ার দিক বুঝতে সাহায্য করে, আর সেখানেই বিজেপি অন্তত ১০০ যোজন পিছিয়ে। জানতে চাইবেন তো, এক যোজন মানে কত কিলোমিটার? এক যোজন মানে ১২ কিলোমিটার, বাকিটা আপনারা হিসেব করে নিন। প্রশ্ন তুলবেন কি? এই তো সবে বঙ্গ বিজেপির কমিটি ঘোষণা হল, এরপরে চেয়ার ছোঁড়াছুড়ি হবে, ধাক্কাধাক্কি হবে, এক লবি ‘কাজে নামব না’ বলে জানাবে, বঙ্গ বিজেপি সভাপতি সেসব সামাল দেবেন, তারপর তো প্রশ্ন তোলার পালা। কিন্তু ইতিমধ্যেই তাঁদের দিকে ছোড়া প্রশ্ন জমে যাচ্ছে। হ্যাঁ, বহু প্রশ্ন। সেটাই বিষয় আজকে, ২৬-এর নির্বাচনে বিজেপিকে এমন অনেক প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে, যার উত্তর তাদের কাছে নেই।
কোন প্রশ্নের উত্তর নেই? আসুন কিছু নমুনা দিই। বীরভূমের সোনালি বিবি এবং কয়েকজনকে দিল্লি পুলিশ বাংলাদেশি বলে গ্রেফতার করে কাঁটাতার পার করে বাংলাদেশে পাঠিয়েছে। খবরটা নিয়ে তৃণমূলের এক সাংসদ লেগে থেকে, মামলা করে, তা সমাজ মাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়ে একটা অসম্ভব সংবেদনশীল ইস্যু তৈরি করলেন, সোনালি বিবিকে ফেরত আনতে বাধ্য হল সরকার, অন্তঃস্বত্তা সোনালির সন্তান হল, অভিষেক মজুমদার চলে গেলেন তার নামকরণ করতে। বাঙালির কাছে, বাঙালি মুসলমানের কাছে মেসেজটা ভাবুন। ওদিকে বাংলাদেশি সন্দেহে মহারাষ্ট্র পুলিশ দক্ষিণ দিনাজপুরের অসিত সরকার ও গৌতম বর্মনকে গ্রেফতার করে সাত মাস জেলে রেখেছিল। দুজনেই হিন্দু। হ্যাঁ, বাংলাতে কথা বলে। এরমধ্যে গৌতম আবার বিজেপি কর্মী। স্বাভাবিকভাবেই পরিবারের লোকজন চেষ্টা তদ্বির শুরু করেন। তাঁরাই জানাচ্ছেন, জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার জন্য মহারাষ্ট্র পুলিশ ব্যক্তি–পিছু দেড় লক্ষ টাকা চেয়েছিল। এবং সেই কথাবার্তার সময়ে পুলক চক্রবর্তী যিনি নাকি বিজেপির শক্তি প্রমুখ, সেখানে হাজির ছিলেন। তিনি এরপরে গৌতমের স্ত্রী’কে নিয়ে গিয়েছিলেন মন্ত্রী সুকান্ত মজুমদারের কাছে। কিন্তু উনি নাকি শুধু বলেছিলেন, ‘দেখছি, চেষ্টা করছি’। এরপরে তাঁরা তৃণমূলের সঙ্গে যোগাযোগ করেন, অভিষেক ব্যানার্জীর টিম, বিষয়টার গুরুত্ব বুঝেই মাঠে নামেন, তাঁদের জেল থেকে ছাড়িয়ে বাড়িতে ফেরানো হয় আর তারপরে সেখানে হাজির যুবরাজ, অবশ্যই কৃতিত্ব দাবি করবেন, করেছেনও। আর মেসেজটা কী গেল? বাঙালির কাছে, বাঙালি হিন্দুদের কাছে? দেশে বাংলাতে কথা বললে বিজেপি রাজ্যগুলোতে জেলে পাঠানো হয়, সেখান থেকে ছাড়িয়ে আনতে তৃণমূল সাহায্য করে।
আরও পড়ুন: Aajke | ইলেকশন কমিশনে অমর্ত্য সেন ডাক পাবেন, মোদিজির ডাক পড়বে না কেন?
বিজেপির কাছেও কিন্তু সেই সুযোগ ছিল, তারা সুযোগ হারিয়েছে তো বটেই, এবারে সামনের নির্বাচনে রাজ্য জুড়ে কেন বাঙালি পরিযায়ী শ্রমিকদের বিজেপি শাসিত রাজ্যে জেলে পাঠানো হচ্ছে? হেনস্থা করা হচ্ছে? খুন করা হচ্ছে? এই প্রশ্নগুলোর মুখোমুখি তো দাঁড়াতেই হবে। কোনও উত্তর আছে বঙ্গ বিজেপির সভাপতির কাছে, তাঁর নতুন টিমের কাছে? আর গ্রাম বাংলাতে এই প্রশ্নের উত্তর না দিয়েই পার পেয়ে যাবেন এটা মাথাতেও আনবেন না। একটা, দু’টো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, লাগাতার, গুজরাত, দিল্লি, মহারাষ্ট্র, ওড়িশাতে এই ঘটনাগুলো ঘটেই যাচ্ছে, কাজেই উত্তর তো দিতে হবেই। আর এখানেই এক ফ্যালাসি, চতুর্থবারের জন্য নির্বাচনের মাঠে নেমে কোথায় বিরোধীদের প্রশ্নবাণে ব্যতিব্যস্ত হবে শাসক দল, তা নয়, খেলাটা উলটে দিতে পেরেছে তৃণমূল, ঠিক যে খেলাটা বিজেপি জাতীয় রাজনীতিতে করে, তারাই প্রশ্ন করে বিরোধীদের, সেই খেলাটা অবিকল রপ্ত করেছে যুবরাজের টিম। আমরা আমাদের দর্শকদের জিজ্ঞেস করেছিলাম যে, টিম বিজেপি এখনও মাঠেই নামতে পারল না, ওদিকে যুবরাজের টিম গোলের পর গোল করছে। ১৫ বছরের অ্যান্টি ইনকমব্যান্সি থাকার পরেও তৃণমুলকে কেন তেমনভাবে বাগে আনতে পারছে না বিজেপি?
না, এই একটা নয়, আরও হাজারো প্রশ্নে বিদ্ধ বঙ্গ বিজেপি, কিন্তু প্রশ্ন কি নেই শাসক দলের বিরুদ্ধে, আছে বৈকি, শিক্ষা দফতর তো আপাতত এক নাট্যশালা। কে, কবে ভেবেছিল এই পরিমাণ প্রাথমিক স্কুল আমাদের বাংলাতে যেখানে শিক্ষক নেই, শিক্ষক আছেন তো ছাত্র নেই, দুটোই আছে তো ব্ল্যাক বোর্ড নেই, ডাস্টার নেই, নেই বসার জায়গা। কেবল শিক্ষক নিয়োগে দুর্নীতি নয়, সামগ্রিকভাবে এক্কেবারে প্রাথমিক শিক্ষা থেকে উচ্চ শিক্ষা পর্যন্ত যে ছবি আমাদের সামনে আছে তা নিয়ে বহু প্রশ্ন তো তোলাই যায়। সমস্যা হল তুলবে কে? রাজ্যের প্রধান বিরোধী দল নিজেই হাজারো প্রশ্নের সামনে আর দলীয় কোঁদলে ব্যতিব্যস্ত, অন্যদিকে বামেরা? অনিল বিশ্বাসের পর সেই যে বিশ্বাস হারিয়েছেন, সে আর ফেরেনি।
দেখুন আরও খবর:








