ক’দিন আগেই বলেছিলাম সারা ভারতে বিজেপির এক অভাবনীয় পুনরুত্থানের সময়েই বাংলাতে বিজেপির মুষল পর্ব শুরু হয়ে গেছে। হ্যাঁ, কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের শেষে শতপুত্র হারিয়ে গান্ধারী কৃষ্ণকে অভিশাপ দিয়েছলেন, বংশ ধ্বংস হয়ে যাওয়ার। মহাভারতের ষোলো নম্বর পর্বে সেই মুষল পর্বে বলা হয়েছে কেমন করে যাদব বংশ ধ্বংস হয়েছিল, স্বয়ং কৃষ্ণ, বলরাম, এমনকী অর্জুনও সেই ধ্বংস হওয়াকে আটকাতে পারেননি। একে অন্যকে নির্বিচারে খুন করেছিল যাদবেরা। তারপর মহাপ্লাবনে সেই দ্বারকা নগর ডুবে যায় জলের তলায়, যেখানে বসে আমরা কিছুদিন আগে মোদিজিকে ধ্যান করতে দেখেছি, সে ছবি ফোটোশপ ছিল এমনটাও কেউ কেউ বলেন তো যাই হোক বলছিলাম মুষল পর্বের কথা। বাংলা বিজেপির মধ্যে যে ক্ষমতার লড়াই তার তিনটে ভরকেন্দ্র আছে। একটা হল প্রাচীনপন্থী, আরএসএস এবং তার সহযোগীদের। সেখানে আবার দুটো ভাগ। প্রথমটা হল অমিতাভ চক্রবর্তী, সুকান্ত মজুমদার, জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায় ইত্যাদির দলবল। দ্বিতীয় ভাগ হল বিজেপির আরএসএস-এর দিলীপ ঘোষ পন্থীরা, যাঁরা বলেন দিলীপদার আমল ছিল বঙ্গ বিজেপির স্বর্ণযুগ, দিলুদাই পারেন মমতার সঙ্গে লড়ে যেতে। তৃতীয় ভাগ হল তৃণমূল সিপিএম থেকে বিজেপিতে যাওয়া শুভেন্দু অধিকারী, শঙ্কর ঘোষ ইত্যাদি নেতা এবং তাঁদের অনুগামীরা। তিনভাগকে অঙ্কের হিসেবে প্রায় সমান শক্তিধর হিসেবে মনে হতেই পারে, কিন্তু আমাদের কাছে মনে হয়েছে শুভেন্দু শিবির খানিক বেশি শক্তি ধরে কারণ এক বিপুল টাকার জোর। সেই হেন বিজেপিতে আপাতত প্রশ্ন দলের গোপন তথ্য বার করে দিচ্ছে কে? খুঁজে বার করতে ৫ জনের কমিটি তৈরি হয়েছে। কিন্তু আদতে সব্বাই জানে, কমিটির প্রত্যেকে জানে, দলের তলার থেকে উপরের সারির নেতা কর্মীরা জানেন যে কে ফাঁস করছে গোপন তথ্য আর সেটাই আমাদের বিষয় আজকে, শুভেন্দুর বিরুদ্ধে শুভেন্দু তদন্ত করছেন।
পেটে ঘুষি বা পিঠে কিল মারলে অভিব্যক্তি বা প্রতিক্রিয়া কিন্তু বের হয় মুখ দিয়ে, উফফফ, ওওওওহ ইত্যাদি মুখ দিয়েই বের হবে। ঠিক সেরকম যখনই কোনও রকম আক্রমণ শুভেন্দু অধিকারীর বিরুদ্ধে হয়েছে, খেয়াল করে দেখুন দু’ তিনটে ইউটিউব চ্যানেল ভয়ঙ্কর ভাবে মাঠে নেমেছে। সেই আক্রমণ যে দিক থেকেই আসুক না কেন, প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়ে প্রতিবাদ জানাবেন সন্ময় বন্দ্যোপাধ্যায়, বা সফিকুল ইসলাম ইত্যাদিরা।
আরও পড়ুন: Aajke | ভারতের রণবীর এলাহাবাদিয়া এবং বাংলাদেশের পিনাকী ভট্টাচার্য
এরমানে এই নয় যে ওনারা শুভেন্দু অধিকারীর টাকা পয়সায় লালিত পালিত, যদিও সে কথা অনেকেই আড়ালে আবডালে বলে থাকেন। এর আগে বহুবার এরকম ব্যাপার আমরা দেখেছি। ২০২৪-এ নির্বাচনে পরেও দেখেছি, যে সময়ে দিলীপ ঘোষ খুব সরাসরিই শুভেন্দুর দিকে তির ছুড়ছিলেন, আমাকে কাঠি করে হারানো হয়েছে ইত্যাদি। সেই সময়েও এই দুটো চ্যানেলে বোঝানোর চেষ্টা হচ্ছিল যে শুভেন্দু অধিকারী প্রার্থী নির্বাচন করেন না, খেয়াল করুন এগজ্যাক্টলি এই কথাই শুভেন্দুও তখন বলছিলেন। তো এবারে কেস আলাদা। হঠাৎই সিবিআই-এর চাকরির বিনিময়ে টাকা নেওয়ার তালিকাতে দুই নতুন সংযোজন, ১) দিব্যেন্দু অধিকারী, ২) ভারতী ঘোষ। তো শুরু হয়ে গেল। জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায় তাঁর সমাজমাধ্যমে লিখেই দিলেন কেউ ছাড় পাবে না, চুন চুন কর জেল মে ভেজা যায়েগার মতো হুঁশিয়ারি। সঙ্গে সঙ্গে একটা আইনি নোটিস দিব্যেন্দু অধিকারীর কাছ থেকে, জগা সাংবাদিক ধাঁ করে সেটা ডিলিটও করে দিলেন। কিন্তু শান্তিকুঞ্জের প্রেস্টিজ তো ততক্ষণে পাংচার। কাজেই টাকা পান কি পান না সেটা বিষয় নয়, আসরে হাজির সন্ময় ইত্যাদিরা। বেরিয়ে এল অ্যাকাউন্ট নম্বর, বিজেপির অ্যাকাউন্ট নম্বর যেখান থেকে ওই জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়ের এক নিউজ পোর্টাল আছে, মাধ্যম কমিউনিকেশন, যেখানে উনি সম্পাদক, সেখানে এক কোটির বেশি টাকা গেছে, সে টাকা কেন গেল? অ্যাকাউন্ট নম্বর, চেক ডিটেলস, তারিখ সবসুদ্ধ। এবং একটাই প্রশ্ন সেদিন সংবাদমাধ্যমে লিখলেন কেন? মুছলেন কেন? তো এই তথ্য ফাঁস নিয়ে নাকি কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ভারি অখুশি, ইতিমধ্যে জানা গেছে, যে কারা ফাঁস করল, কেন ফাঁস করল, তা খুঁজে বার করতে পাঁচজনের কমিটি তৈরি হয়েছে, যাতে শুভেন্দু অধিকারীও আছেন। ওদিকে কার দেওয়া তথ্য জানা নেই, কিন্তু আমরা জেনেছি যে তাপস রায় ঘনিষ্ঠ এক নেতা যিনি ক’দিন আগেই তৃণমূল ছেড়ে বিজেপি জয়েন করেছিলেন ওই তাপস রায়ের সঙ্গে, অরুণ হাজরা ওরফে চিনু দা, তিনি নাকি ৭৮ কোটি টাকা কামিয়েছেন, কারা ফাঁস করছে বা করাচ্ছে এইসব খবর? শোনা যাচ্ছে এটা নাকি বদলা। মানে এরকম ঝাপু, টাকা মারা, কমিশন খাওয়া অনেক হয়েছে এবারে সে সব বের হয়ে আসছে। আপাতত পাঁচ সদস্যের সেই গোয়েন্দ কমিটি কবে বসবে? শুভেন্দুবাবু সেখানে নিজেই নিজের বিরুদ্ধে তদন্ত বা গোয়েন্দাগিরি কীভাবে করবেন তা দেখার জন্য বসে রইলাম অধীর অপেক্ষায়। ইতিমধ্যে দর্শকদের জিজ্ঞাসা করেছিলাম, হঠাৎই বঙ্গ বিজেপির কারা টাকা মেরেছে, ঘুষ খেয়েছে, কাটমানি নিয়েছে এসব তথ্য বেরিয়ে আসছে। এটা কি বিজেপির মধ্যে এক চূড়ান্ত কোন্দলের ফলেই হচ্ছে? আবার সেই সব তথ্য বের করল কারা তা নিয়ে বিজেপিই কমিটি তৈরি করেছে, বিজেপিতে আসলে চলছেটা কী? শুনুন মানুষজন কী বলছেন।
২০২১-এ ছায়া মন্ত্রিসভা হয়ে গিয়েছিল, শুনেছিলাম তথ্য সংস্কৃতি দফতর না পেলে রুদ্রনীল মন্ত্রীই হবেন না এটাও জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল। মুখ্যমন্ত্রী নিয়েও মান অভিমান চলছিল, কিন্তু মন্ত্রিসভা যে বিজেপিরই হচ্ছে তা নিয়ে কোনও সন্দেহ ছিল না, আর সমস্যাটা সেখান থেকেই শুরু, মানে অত্ত উঁচু তাল গাছ থেকে পড়লে হাড়গোড় তো ভাঙবেই। সেই ২০২১ থেকেই বিজেপির চাহিদা আর জোগানে বিরাট সমস্যার সূত্রপাত। সেই দিন থেকেই বিজেপির আদিনবদের লড়াই শুরু হয়ে গেছে। আপাতত যে লড়াই মুষল পর্ব হয়ে উঠেছে। মুষল পর্বের শেষে চারিদিকে পড়ে থাকবে অসংখ্য কাটাছেঁড়া লাশ, সেই বিস্তীর্ণ মাঠে পদ্ম থাকবে না, থাকবে দিগন্ত বিস্তৃত ঘাস। আর ঘাস থাকলে অবরে সবরে ঘাসফুল যে ফুটবে তা তো বলাই বাহুল্য।