২০২১-এ বিজেপি দলকে ঘিরে এক উন্মাদনা দেখেছিলাম আমরা, ডায়ালেকটিকক্যাল মটিরিয়ালিজম থেকে মার্ক্স, মাও, লেনিন নাকি তেনার ঠোঁটস্থ, তো সেই তিনিও বিজেপিতে যোগ দিয়েছিলেন, টলিউডে যাঁদের হাতে কাজ ছিল না সেই অভিনেতা, অভিনেত্রী, পরিচালক সবাই নিজেদেরকে বঞ্চিত মনে করেই যোগ দিয়েছিলেন বিজেপিতে, নিজেদের সুদিন ফেরাতে। মঞ্চ থেকে রুপোলী পর্দা, কলম থেকে তুলি ধরা হাতে পদ্মফুল দেখেছিলাম আমরা। তারপর তাঁদের গ্লোরিয়াস রিট্রিটও দেখেছি, আমি ওসব পলিটিক্সে নেই বলে মদন মিত্রের হাত ধরে আবার স্বস্থানে। এবারে কি কোথাও সেই উন্মাদনা দেখতে পাচ্ছেন? না, নেই। কিন্তু শমীক ভট্টাচার্যের আমলে সেই চাহিদা আছে বিজেপি নেতা কর্মীদের কাছে। হ্যাঁ, তাঁরা সেবারে ছিলেন ব্রাত্য, নতুন নতুন উজ্জ্বল সমস্ত মুখের আলোয় ঢাকা পড়েছিল তাদের চাহিদা, এবারে কিন্তু তাদের স্বর শোনা যাচ্ছে, বিজেপি দফতর থেকে মাঠে ময়দানে। হ্যাঁ, বাঁকুড়া জেলার গঙ্গাজলঘাটি থেকে আলোককুমার সিংহ বিজেপির রাজ্য দফতরে এসে পৌঁছেছেন। দুর্গাপুর থেকে ট্রেন ধরে কলকাতা। তার পরে পথনির্দেশ জোগাড় করে সোজা বিধাননগরের বিজেপি দফতর। পুরোটাই লাঙল কাঁধে নিয়ে। যে লাঙল থেকে ঝোলা প্ল্যাকার্ডে লেখা রয়েছে, ‘ক্ষুধার্ত, বুভুক্ষু মানুষের মুখে অন্ন তুলে দিতে কৃষিমন্ত্রী হতে চাই’। হ্যাঁ, আপনি বলতেই পারেন পাগলামি, কিন্তু এই পাগলামি গতবারের ধান্দাবাজি নয়, আবার এই পাগলামি দলের কর্মী নেতাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। গত ক’মাসে এটা শমীক ভট্টাচার্যের কৃতিত্ব। এবারে বিজেপির টিকিটের দাবি দলের মধ্যে, কর্মী নেতাদের মধ্যে। খুব কম কিছু আসনে কয়েকজনে চোখ আছে বৈকি, কিন্তু সেটা সামান্য। আজ বিজেপির দলের মধ্যের সেই চাহিদার কথা বিষয় আজকে, বিজেপির প্রার্থী কারা? নতুন কতজন? পুরানো কতজন?
মুকুল রায় যখন বিজেপিতে গিয়েছিলেন, তখন তিনি খুব সচেতনভাবে দলের পুরানো কর্মীদের আবেগ, তাঁদের এতদিনের লড়াইয়ের কথা মাথায় রেখেই সংগঠনকে বড় করার চেষ্টা করেছিলেন। আর তিনি জানতেন যে, এই বাংলাতে ৩৪-৩৫ শতাংশ মুসলমান ভোট, কাজেই ইউপি, এমপি-র মতো এক উগ্র হিন্দুত্ব বিজেপিকে প্রথমেই আটকে দেবে। এই ইস্যুতে তিনি সেই সময়ের সভাপতি দিলীপ ঘোষের সঙ্গে একমত ছিলেন না। কিন্তু তাঁর স্বভাবমতই কাউকে না চটিয়ে তিনি সেই জায়গাটা তৈরি করছিলেন। কিন্তু দিল্লির নেতৃত্বের মাথা ঘুরে গেল ২০১৯-এর ওই ১৮টা আসনের জয় দেখে। তাঁরা তখন ভেবেছিলেন এক ধাক্কা আউর দো, আর দুনিয়ার সুযোগসন্ধানীরা ভেবেছিলেন এবারে নেমে পড়া যাক, নিজেদের হিসেব মত পাউন্ড অফ ফ্লেশের কথা মাথায় রেখেই সেলিব্রিটিদের, দলবদলুদের এক উন্মাদনা শুরু হয়েছিল। না হলে প্রবীর ঘোষাল, সাংবাদিক থেকে এক লাফে বিধায়ক হবার পরেও কোন বোধবুদ্ধিতে বিজেপিতে চলে গেলেন? আর ঠিক সেই সময়েই বিজেপি দলের আরেকটা পাওয়ার সেন্টার তৈরি হলো শুভেন্দু অধিকারীকে ঘিরে। হ্যাঁ, শুরু হল বিজেপিতে ‘আদি’ আর ‘নব্য’ বিজেপির আকচা আকচি। জীবনের একটা বড় অংশ প্রচারক হিসেবে কাটানো দিলীপ ঘোষ বা ১০ বছর বয়সে আরএসএস-এর শাখায় যোগ দেওয়া শমীক ভট্টাচার্যর চিন্তা ভাবনার সঙ্গে এক্কেবারে উলটো ধারনা নিয়ে দলে আসা তৃণমূলী দলবদলু, টলিউডের সেলিব্রিটি বা উচ্চাকাংখী ইনডিভিজুয়ালদের মিলমিশ সম্ভব নয়, হয়ওনি। কিন্তু মাঝারি আর তলার সারির পুরনো বিজেপি কর্মীরা থমকে গিয়েছিলেন। হ্যাঁ, এবারে তাঁরা সামনে আর অবশ্যই নব্য বিজেপির দল, শঙ্কুদেব পন্ডা, সজল ঘোষ বা ন্যাড়া বাগচি ইত্যাদিরাও ইকুয়ালি বুঝে নিতে চাইছেন।
আরও পড়ুন: Aajke | বিজেপির গ্যাসে আতঙ্ক, ‘গ্যাসাতঙ্ক’ও বলা যায়
এবারে বিজেপির টিকিট নিয়ে বাইরের সেই উন্মাদনা নেই বটে, কিন্তু চাপা টেনশন আছে, যা প্রার্থী তালিকা বের হবার পরে ফেটে বের হতে পারে। তবে গত কয়েকমাসের বঙ্গ বিজেপির চাল চলন বলে দিচ্ছে, ‘হয় এবার নয় নেভার’-এর চেয়ে ধরে খেলার এক পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছেন নতুন সভাপতি। কাজেই সবাইকে চমকে দিয়ে সাতবারের হেরো রাহুল সিনহাকে যেভাবে রাজ্যসভাতে নিয়ে গেলেন শমীক ভট্টাচার্য, সেই একই ধারা এবারে বিজেপির প্রার্থী তালিকাতে দেখলে আমি অবাক হব না। হ্যাঁ, সেখানে শুভেন্দু শিবিরের কপালে ভাঁজ পড়ছে বৈকি। দলের সংগঠনে শুভেন্দু শিবির কল্কে পায়নি, কিন্তু প্রার্থী তালিকাতেও জায়গা না পেলে কতটা ক্ষতি হবে জানা নেই। আমরা আমাদের দর্শকদের জিজ্ঞেস করেছিলাম, বিজেপির ভেতরে আদি আর নব্য বিজেপির লড়াই এই নির্বাচনে কতটা বড় হয়ে উঠবে? নাকি সেই লড়াই সামলে আদি আর নব বিজেপিরা হাতে পদ্মফুল ধরে মাঠে নামতে পারবে? শুনুন মানুষজন কী বলেছেন।
গতবার এক ওভারহাইপড বিজেপি ২০০ পারের স্লোগান দিয়ে শেষমেষ ৭৭-এ থমকে গিয়েছিল, নির্বাচনের আগে কেউই কোনও কথা না বললেও নির্বাচনের পরে বিভিন্ন বৈঠকে বারবার করে দলের পুরানো কর্মীদের অবহেলা করে কিছু উচ্চাকাঙ্খী সেলিব্রিটিদের নিয়ে হৈচৈ করা নিয়ে প্রচুর সমালোচনা হয়েছে। ইন ফ্যাক্ট সেই তখন থেকেই বঙ্গ বিজেপিতে একটা পরিস্কার বিভাজন রেখা আমাদের নজরে এসেছে, যার একধারে আরএসএস-বিজেপির পুরানো নেতা কর্মীরা, অন্যদিকে মমতাকে হারিয়ে ক্ষমতা দখলের জন্য উদগ্র কিছু মানুষজনের ভিড়। এবারের নির্বাচনে সেই উন্মাদনা বা আবেগ নেই বটে, কিন্তু দলের মধ্যে সেই ‘আদি’ আর ‘নব্য’ বিভাজনের টেনশন স্পষ্ট, যা আরও সামনে আসবে তালিকা বের হবার পরে।
দেখুন আরও খবর:








