জগন্নাথের রাগ হত। পাড়ার ছেলেরা তাকে দেখলেই চিৎকার করত, ওই যে মাকু, ও মাকুদা। না, জগন্নাথ সিপিএম বা মার্কসিস্টও ছিলনা, তাহলে রাগত কেন? জগন্নাথ আমার দেখা সেই প্রথম যুবক যার, মাথায় চুল ছিল না, গালে দাড়ি ছিল না, গোঁফও ছিল না। তো সেসময় বডি শেমিং নিয়ে এত হৈচৈ ও ছিল না, পারার ছেলেরা জগন্নাথ কে রাস্তায় দেখলেই, মাকু, ও মাকু দা বলে চিৎকার করতো, জগন্নাথ রেগে আগুন, তেলে বেগুন, পালটা চিৎকার করতো, ইঁট নিয়ে ছুটত। ক্লাস ফোর পাস জগন্নাথ ইংরিজিতে গালিগালাজও দিত। বহুদিন পরে জগন্নাথের কথা মনে পড়ল, দুপুরে এই ভিডিও টা দেখার পরে, দেখুন, (শুভেন্দু গাড়ি থেকে নেমে চিৎকার করে তেড়ে যাচ্ছে, আর পেছন থেকে ছেলেরা স্লোগান দিচ্ছে), সত্যি বলছি ঠিক এই রকম মারমুখো, এরকম আগলভাঙা কথাবার্তা, সামনের পুলিশ অফিসার বলছেন, আপনি গাড়িতে উঠুন, তাঁকে ধাক্কা দিচ্ছেন। মানে খানিকটা উত্তেজনার মূহুর্তে নিজেকে হারিয়ে ফেলার মতো অবস্থা। হ্যাঁ, সেটাই বিষয় আজকে, শুভেন্দু বাবু কো গুসসা কিঁউ আতা হ্যায়?
সব্বাই জানে যে, শুভেন্দু বাবু বিজেপিতে এসেছিলেন দুটো কারণে- (১) রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হতে, (২) নিজেকে সিবিআই বা ইডির তদন্ত থেকে বাঁচাতে। দ্বিতীয় উদ্দেশ্য একশ শতাংশ সফল। সেই ২০১৬-তে মুরলীধর লেনে বিজেপি দফতরে, বিজেপি নেতারা, কৈলাস বিজয়বর্গীয়, দিলীপ ঘোষ, শমীক ভট্টাচার্য, সবাই মিলেই দেখিয়েছিলেন কেমন করে শুভেন্দু অধিকারী হাত পেতে টাকা নিচ্ছেন, তারপর স্লোগান, ‘ভাগ শুভেন্দু ভাগ’। সেই ভিডিও বিজেপির অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে, নেটে ছিল। তো নারদা ঘুস মামলাতে শুভেন্দুবাবুকে একদিনের জন্যও ডাকা হয়নি, আর নেট থেকে ওই ভিডিও তুলে নিয়েছে বিজেপি। হ্যাঁ, সেকেন্ড মিসন অ্যাকমপ্লিসড! কিন্তু প্রথমটা? সে তো সাহারার শিহরণ হয়ে বসে আছে, মরিচীকা, কেবল দূরে সরে যাচ্ছে। আসলে ২০১৯-এ ওই ১৮টা আসনে বিজেপির জয় দেখেই শুভেন্দু ধরেই নিয়েছিলেন, নৌকা ডুবছে, তো তিনি ঘাসফুল ছেড়ে পদ্মফুল ধরলেন। ওদিকে বিজেপি ভেবেছিল ‘সেকেন্ড ইন কমান্ড’কে দলে নিলেই এসে যাবে রাজ্যপাট। কিন্তু মমতার দলে যে কোনও ‘সেকেন্ড ইন কমান্ড’ নেই, সেটা বোঝার মতো ক্ষমতা বিজেপির নেই, বরং শুভেন্দুর এন্ট্রি বিজেপির মধ্যে এক নতুন সমস্যা তৈরি করল, গোটা বিজেপিতে এখন নব্য বিজেপি, যারা শুভেন্দু অনুগামী, ভার্সেস আদি বিজেপি যাদের অনেকে দিলীপ ঘোষব অন্যদের অনুগামী।
আরও পড়ুন: Aajke | সিপিএম-এর সাহায্যের পরেও শুভেন্দু অধিকারী নন্দীগ্রামে জিতবেন?
শুভেন্দুও ক্রমশ বুঝতে পারছেন, তাঁর সনাতনী হিন্দু কার্ড খেলাটা ব্যুমেরাং হয়েছে, বুঝতে পারছেন অংকের হিসেবে তৃণমূলকে গদি থেকে সরানো প্রায় অসম্ভব, বুঝতে পারছেন বিজেপিতে একটা পারফরম্যান্সের ব্যাপার আছে, যা না দেখাতে পারলে তাঁকে মাঠের বাইরে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। প্রচন্ড স্ট্রেস তাঁকে ক্লান্ত করছে, এদিকে রোজ তাঁর অনুগামীদের সামনে তাঁকে তাঁর লড়াকু ইমেজকে তুলে ধরতে হচ্ছে। আর এই স্ট্রেসের মধ্যেই তিনি খেই হারাচ্ছেন, টেম্পার লুজ করছেন, কটা ছেলে পথচলতি গাড়ি দেখে স্লোগান দিচ্ছে, রাজ্যের বিরোধী দলনেতা তাঁদের তাড়া করছে। একবার নয়, এই ছবি বারবার দেখছি আমরা। আমি নিশ্চিত, কেউ তো তাঁকে নিশ্চয়ই বলেছে যে, এটাকে পাত্তা না দিতে, কিন্তু তিনি দিচ্ছেন, তাঁর স্ট্রেস তাঁকে অধৈর্য করে তুলছে। নির্বাচনের আগে দলের মধ্যে প্রার্থী নিয়ে টানাপোড়েন বাড়ছে, তাঁর লোকজনদের কমিটিতে নেওয়া হয়নি, বলেছিলেন প্রার্থী পদ এনে দেবেন, চাপ আছে, স্ট্রেস বাড়ছে। হ্যাঁ, সেই জন্যেই ঘন ঘন এক উত্তেজিত শুভেন্দু অধিকারী ধরা পড়ছেন ক্যামেরায়। আমরা আমাদের দর্শকদের জিজ্ঞেস করেছিলাম, শুভেন্দু অধিকারী কি আবার এক হারের গন্ধে খানিক হতাশ? দলের ভেতরে চলতে থাকা কোন্দলে বিরক্ত? তাই কি হঠাৎ হঠাৎ খুব তুচ্ছ কারণে রেগে যাচ্ছেন? এগুলো কি হতাশার বর্হিপ্রকাশ? শুনুন মানুষজন কী বলেছেন।
বহু আগে আমরা তৃণমূল নেত্রীকে দেখেছিলাম রেগে যেতে, তাঁর যাত্রাপথে কিছু বিজেপি সমর্থক ‘জয় শ্রী রাম’ বলে স্লোগান দিচ্ছিল, উনি একবার নয় বার দুই-তিন বার গাড়ি থেকে নেমে তাঁদের মুখোমুখি হয়েছিলেন। তারপর কারও পরামর্শ মেনেই হোক বা নিজের ইচ্ছেতেই হোক, তাঁকে এই ভাবে রিঅ্যাক্ট করতে আর দেখা যায়নি। হ্যাঁ, পাবলিক লাইফ মেইনটেন করা, তাও আবার আজকের দিনে খুব সোজা নয়। অনেক কিছু গায়ে না মেখেই ইগনোর করতে জানতে হয়, কিন্তু শুভেন্দুবাবু সম্ভবত বাড়তে থাকা উদ্বেগের ফলেই সেই রাগ, গুসসা কন্ট্রোল করতে পারছেন না। আমার রাঙা মামা বলতেন, রহমানিয়ার থেকে কচি খাসির রাংয়ের মাংস এনে পেঁপে দিয়ে পাতলা ঝোল করে খেলে নাকি স্ট্রেস কমে। জানিনা, সবার কি কমে?
দেখুন আরও খবর:








