আলোচনার বিষয়, বিজেপির নতুন কার্যকরী সভাপতি। হ্যাঁ, এই এক দল যারা মাথার উপরের সংগঠন আরএসএস-এর কোনও রেজিস্ট্রেশন নেই, যা পাড়ার ক্লাবেরও থাকে। আরএসএস-এ কোনও পোস্টের জন্য কোনও নির্বাচন হয় না। ঠিক সেরকম বিজেপিতেও কোনও নির্বাচন হয় না। তুলে এনে বসিয়ে দেওয়া হয়। মোদি–শাহ জামানার আগে তবু একটু আধটু আলোচনা হত, এখন সেসবেরও পাট উঠে গিয়েছে, ওনাদের মনে হয়েছে তাই দিলীপ ঘোষের বদলে শমীক ভট্টাচার্য রাজ্য সভাপতি, ঠিক সেরকমভাবে বিহারের এক অখ্যাত মন্ত্রী ইন্টারমিডিয়েট পাস, কিন্তু অমিত শাহের এক্কেবারে অনুগত ৪৫ বছরের নীতীন নবীনকে কার্যকরী সভাপতি করা হল। এখনও পর্যন্ত এই কার্যকরী সভাপতি পদের গুরুত্ব বিরাট কারণ এই পদে যিনি বসেন তিনিই আসলে দলের আগামী সভাপতি। মানে সেই অর্থে একজন অত্যন্ত অনুগত মানুষকে দলের সভাপতি করে রেখে জেপি নাড্ডার সময়েও দলের রাশ ছিল অমিত শাহের হাতে, এবারেও তাই হতে চলেছে, বকলমে দল চালাবেন অমিত শাহ। হ্যাঁ, এইসব হয় নির্বাচন ছাড়াই। এই অমিত শাহ, এই মোদিজি গণতন্ত্রের কথা বলেন, এই অমিত শাহ কংগ্রেস দলের অভ্যন্তরীণ ভোট নিয়ে লেকচার দেন। রাশিয়াতে পাওয়া যেত, এখন প্রায় সর্বত্রই পাওয়া যায়, মাত্রউস্কা ডল, মাত্রউস্কা পুতুল। একটা বড় পুতুল, তার পেটে একটা ছোট পুতুল, তার পেটে আরেকটা, তারও পেটে আরেকটা – এইরকম করে শেষমেষ একটা ছোট্ট পুতুল, কড়ে আঙুলের চেয়েও ছোট। সোভিয়েত রাশিয়া ভেঙে যাওয়ার পরে, যখন কেজিবি-র রাতে হঠাৎ হানা দেওয়া, গুম খুন করে দেওয়া বা সাইবেরিয়াতে চালান করে দেওয়া খানিক বন্ধ, তখন এক লেখক লিখেছিলেন, ‘জার শাসনের বিরুদ্ধে যখন লেনিনের নেতৃত্বে বিপ্লব হচ্ছে, তখন আমরা কেবল লেনিনের কথাই শুনিনি, সমান গুরুত্ব দিয়ে, কখনও কখনও তাঁর চেয়েও বেশি গুরুত্ব দিয়ে আমরা শুনতাম টটস্কির কথা, কামেনভ বা বুখারিনের কথা, জিনোভয়েবের কথা। এঁদের মধ্যে বিতর্ক ছিল, আলোচনা ছিল, কিন্তু এক যৌথ নেতৃত্ব ছিল। এর সবটাই উধাও হয়ে গ্যালো ১৯১৭-র বিপ্লবের কিছুদিনের মধ্যেই। ভ্যানিশ! যৌথ নেতৃত্বের নামে একজনকেই তুলে ধরা হল, আর স্তালিন এসে যাওয়ার পরে তো অন্য কোনও নেতা কথা বলা তো দুরস্থান, বেঁচেই রইলেন না। ক্রমশ আমাদের রাশিয়ার রাজনৈতিক নেতৃত্ব ওই মাত্রউস্কার মতো হয়ে উঠল, বিরাট এক নেতার পেটের মধ্যে বাকি নেতারা, তাদের স্বাধীন অস্তিত্বই নেই, তাঁরা কিছু তোষামুদে, জো হুজুর।’ হ্যাঁ, ঐ স্তালিনের আমলেই মার্শাল ঝুখভের মতো সেনাপতিও এক পুতুলই ছিলেন। স্বৈরাচারী সমস্ত নেতাদের কম বেশি এটাই থিওরি, রাজনৈতিক কাঠামোটাকে ওই মাত্রউস্কা পুতুল করে দাও। চোখ মেললেই দেশে বিদেশে, রাজ্যে, অঞ্চলে শহরে, গ্রামে এই মাত্রউস্কাদের দেখতে পাবেন। সেই পুতুলেরা ধাপে ধাপে বামন হয়েছে, তাঁদের বাড়-বাড়ন্ত সবটাই ওই সবচেয়ে বড় পুতুলটার পেটেই হবে, তার বাইরে নয়।
এবার আমাদের দেশের রাজনৈতিক কাঠামোটা কেমন, সেটা নিয়ে কটা কথা হোক। আমাদের দেশ স্বাধীন হল, চারিদিকে জ্যোতিষ্ক, নেহেরু বলছেন, রাজেন্দ্র প্রসাদ বিরোধিতা করছেন, বল্লবভাই প্যাটেল অন্য মত প্রকাশ করছেন – এ তো আমরা দেখেছি, দলের মধ্যেই কেবল নয়, দলের বাইরেও আম্বেদকরের মতো নেতা, শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর মতো নেতা বা কমিউনিস্ট নেতা ইএএস নাম্বুদ্রিপাদ, হীরেন মুখার্জীর মতো নেতাদের বিরোধিতা শোনা যেত। জহরলাল নেহেরু প্রধানমন্ত্রী, তো কি? শুনতেন সে সব কথা। তখন সদ্য হয়ে উঠেছেন জনসংঘের নেতা, অটলবিহারী বাজপেয়ি। তিনি লিখছেন, তীব্র বিরোধিতা করেছেন সংসদে দাঁড়িয়েই, তাঁর শব্দচয়ন ছিল কঠিন, বয়সের গুণেই, কিন্তু নেহেরু কেবল শোনেননি, বলেছেন, ‘খুব ভালো বলেছ’। নেহেরুর পরে শাস্ত্রীজি, লাল বাহাদুর শাস্ত্রী, তাঁর ছোট্ট আমলে যৌথ নেতৃত্ব বজায় ছিল, সেই কারণেই হিন্দি ভাষাকে জাতীয় ভাষা করার একরোখা জিদ ছেড়ে তিনিই ঘোষণা করেছিলেন, যতদিন না অহিন্দিভাষী রাজ্য এটা মেনে নিচ্ছে, ততদিন এ জিনিষ করা যাবে না। অবশ্য ততদিনে তামিলনাড়ু থেকে মুছে গিয়েছে কংগ্রেস। এর পরেই এলেন ইন্দিরা গান্ধী, আর এই সময় থেই এক দীর্ঘ সময় আমাদের দেশের রাজনৈতিক কাঠামো হয়ে উঠল ওই মাত্রউস্কা পুতুলের মতো। ইন্দিরা দল থেকে তাঁর বিরোধীদের বার করলেন বা বেরিয়ে যেতে বাধ্য করলেন। যাঁরা থাকলেন তাঁরা তাঁদের বলার ক্ষমতা হারালেন। এরমধ্যে জরুরি অবস্থা এল, কেবল দল নয় বিরোধীদেরও বলার ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া হল। সেই মাত্রউস্কা ভেঙে চুরমার ১৯৭৭-এ, জনতা দলের সরকার, প্রত্যেকে কথা বলছেন, প্রত্যেকে। প্রয়োজনে, অপ্রয়োজনে, ধান্দায়, নিজের স্বার্থ গোছাতে বা এক আধজন দেশের স্বার্থে, কিন্তু কোনও পুতুলগিরি ছিল না। কাজেই সরকারও থাকল না। এরপর আবার মিসেস গান্ধী, কিন্তু তাঁর হাত ধরে এবার একটু আলাদা চেহারাতেই ফিরে এল সেই মাত্রউস্কা কাঠামো। তিনি মারা যাওয়ার পরে রাজীব গান্ধী এলেন কিন্তু কাঠামোতে যে খুব বদল হল তা নয়, কিন্তু এই দ্বিতীয় দফায় ইন্দিরার শাসন বা রাজীবের শাসন বা তার পরেও বিরোধী কন্ঠস্বরকেও চেপে দেওয়া হচ্ছে, দু-একটা ব্যতিক্রম ছাড়া এমনটা কিন্তু ছিল না। এরপরে সংখ্যালঘু সরকারদের জামানা, মাত্রউস্কা তৈরি হওয়ার সবচেয়ে কঠিন শর্ত, কাজেই হয়নি। অটলবিহারীর মন্ত্রী সভাতে এটা ছিল না, দিগগজ নেতারা ছিলেন, আদবানি, জর্জ ফার্নান্ডেজ, মুরলি মনোহর যোশী। কাজেই ওই মাত্রউস্কা কাঠামো লাগু করা যায়নি। তাছাড়া বিজেপির এক বিরাট যৌথ নেতৃত্বের ইতিহাস আছে, ছিল, কাজেই মাত্রউস্কা গড়ে উঠল না। দ্বিতীয় পর্যায়ে আবার কংগ্রেসের কামব্যাক, প্রথম আর দ্বিতীয় ইউপিএ, এতগুলো দলের কোয়ালিশন এবং তাদের উপর নির্ভরতা থাকার কারণেই অমন কাঠামো তৈরি হবার সুযোগ ছিল না, অনেকেরই বলার ইচ্ছে হবে মনমোহন তো ছিলেন কাঠপুতুল, চালাচ্ছিলেন তো সোনিয়া গান্ধী। না, দলের ক্ষেত্রে সেটা ঠিক হলেও সরকারের ক্ষেত্রে নয়, সেখানে মনমোহন এক্কেবারে নিজের মতো করেই এগিয়েছেন। ক’জন খোঁজ রাখেন আমেরিকার সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তির সময়ে কেবল সিপিএম-এর নয়, বিরোধিতা ছিল কংগ্রেস দলেও। মনমোহন সোনিয়াকে জানিয়েছিলেন, প্রয়োজনে পদত্যাগ করবেন, কিন্তু বিল আসবে।
আরও পড়ুন: Fourth Pillar | কুমিরও কাঁদছে, শুভেন্দু অধিকারীও কাঁদছে
এই বারে ২০১৪-তে নরেন্দ মোদির সরকার। প্রথম দিন থেকেই নয়, তার আগে নির্বাচনের সময় ওই গোটা ক্যাম্পেন জুড়েই মোদিজির ইমেজ বানানো হয়েছে, মিডিয়াকে কাজে লাগানো হয়েছে, এক ‘লার্জার দ্যান লাইফ ইমেজ’, ভারতের নয়া যুগাবতার, হিন্দু হৃদয় সম্রাট। ব্যাস, প্রথমদিন থেকেই আমাদের রাজনৈতিক কাঠামো বদলে যেতে থাকল, কিছুদিনের মধ্যেই বোঝা গেল। এমনকি আদবানি, যোশি, উমা ভারতী, অরুণ জেটলি বা সুষমা স্বরাজেরা নেহাতই মাত্রউস্কার পেটে ছোট থেকে আরও ছোট হতে থাকা পুতুল। দলের শীর্ষ নেতাদের গিলে ফেলার পরেই মোদিজি মন দিলেন রাজ্যের দিকে। তাকিয়ে দেখুন, বিজেপি শাসিত রাজ্যের মধ্যে দুজন মুখ্যমন্ত্রীর নাম দেশের লোক জানেন – আদিত্য নাথ যোগী আর হিমন্ত বিশ্বশর্মা, ব্যাস। আর কারও নাম নেই, আর কোনও গুরুত্বপূর্ণ রাজ্য নেতা নেই, সবটাই নরেন্দ্রভাই দামোদরদাস মোদি। গুগল না করে গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী বা উত্তরাখন্ডের মুখ্যমন্ত্রীর নাম বলুন তো? আর রাজ্য নেতাদের নাম? ক’জন জানেন? গোটা দল বসে আছে, মোদিজি কব আয়েঙ্গে। কিন্তু তিনি তো ‘করণ-অর্জুন’ নন, ক্ষয়ে যাচ্ছে তাঁর ধার। একজন প্রধানমন্ত্রীই সব তালার চাবি হতে পারেন না। মিলিয়ে নেবেন আমার কথা, আপাতত তিনি পশ্চিমবঙ্গ, কেরল, তামিলনাড়ু আর পন্ডিচেরি ছাড়া অন্য কোনও দিকেই যাবেন না। এবং মিলিয়ে নেবেন, ঠিক যেদিন বাংলাতে ভোট, সেদিন কেরালাতে তিনি পদযাত্রা করবেন, যেদিন কেরালাতে ভোট, সেদিন তিনি তামিলনাড়ুতে র্যালি করবেন, সক্কাল থেকে টিভিতে সেসব ছবি দেওয়া হবে। গুজরাত বিজেপিকে মোদিজি ছাড়াও বিরাট মাপের নেতা দিয়েছে। আজ কে আছেন গুজরাতে? মহারাষ্ট্রে? তেলেঙ্গানাতে বন্দি সঞ্জয় কুমার খানিক নিজের জায়গা করেছিলেন, তাঁকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে, বিজেপি নিজেও জানে, সামনের নির্বাচনে তারা ডিসট্যান্ট তিন নম্বরে। অন্ধ্রতে বিজেপি নেই, কার সঙ্গে জোট বাঁধবেন সেই হিসেব তারা নিজেও করে উঠতে পারেননি, শেষপর্যন্ত ঠেকেছেন চন্দ্রবাবু নাইডুর পায়ে। তিনি আপাতত অন্ধ্রপ্রদেশ ছাড়া কোথাও তাকাচ্ছেন না, যেদিন তাকাবেন, সেদিন সমস্যা তৈরি হবে। বিহারে বিজেপির এখনও এক গ্রহণযোগ্য মুখ খুঁজে চলেছে। ঝাড়খন্ডে এতদিন পরে আবার অতল থেকে খুঁজে আনা হয়েছে বাবুলাল মারান্ডিকে, রঘুবর দাসের লোকজন বসে আছেন বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য। রাজস্থানে একা বসুন্ধরা রাজে সিন্ধিয়াকে নিয়ে নাজেহাল বিজেপি। এখানেও মোদিজির চোখে চোখ রেখে কথা বলতে পারবে এমন নেতা নেই, ছত্তিশগড়ে রমন সিং কি এখন মার্গদর্শক মন্ডলীতে? জানা নেই, কিন্তু তিনি নেই। মধ্যপ্রদেশে শিবরাজ শিং চৌহান, মামাজি, আপাতত মন্ত্রী বটে, কিন্তু মনরেগার নাম বদল নিয়েও নাকি ওনার সায় ছিল না। উলটে নরেন্দ্র সিং তোমর, প্রহ্লাদ সিং প্যাটেল বা কৈলাশ বিজয়বর্গীর মতো নেতাদের পাঠানো হয়েছে অবলিভিয়নে। তাঁরা কোথায়? কিন্তু তাকিয়ে দেখুন একজনেরও কোনও প্রশ্ন নেই। কর্ণাটকে ইয়েদুরিয়াপ্পাকে সরিয়ে দিয়ে বোম্মাইকে আনার সময়েই আমরা এই অনুষ্ঠানে বলেছিলাম ‘হিমালয়ান ব্লান্ডার’। আমরাই কেবল নয়, বাকি মিডিয়াও বলেছে, কিন্তু সবচেয়ে বড় পুতুল যিনি তিনি শোনেননি, কর্নাটক হাত থেকে গিয়েছে।
বাংলার কথা বলা বাহুল্য, রাহুল সিনহা বা দিলীপ ঘোষ আপাতত তাঁদের দফতরের জন্য জায়গাও পাচ্ছেন না। দলের কথা ছেড়ে দিন, বিরোধী দলেও কথা বললেই পাঠানো হচ্ছে ইডি, সিবিআই। অবশ্য আঞ্চলিক দলেও এই একই মাত্রউস্কা কাঠামো, নাহলে সে দল টিকবেই না, সে তৃণমূল বলুন, বিজেডি বলুন, শিবসেনা বলুন বা ডিএমকে, সবটাই ওই একই কাঠামো। কিন্তু দেশজুড়ে মোদি আমলের বৈশিষ্ট্য হল, এক নেতা, এক দেশ, এক ভাষা, এক ধর্ম, এক খাদ্যাভ্যাস। তাই উনি ওনার পেটের মধ্যে ঢুকিয়েছেন গোটা দলটাকে। এবার চাইছেন গোটা দেশটাকেই পেটের মধ্যে ঢোকাতে। এতে শুরুর দিকে কিছু লাভ হয়েছে বৈকি। কিন্তু এখন দুটো জিনিস শুরু হয়েছে, পেটের ভেতরে থাকা পুতুলেরা তলায় তলায় বিক্ষুব্ধ, তাদের ক্ষোভ প্রকাশ্যে না এলেও দলের ভেতরে পরিস্কার দৃশ্যমান। আর দু’নম্বর হল, গোটা দেশের বিরোধীদের আক্রমণের একটাই লক্ষ্য, মোদি, মোদি, মোদি। রাজনৈতিক কাঠামো মাত্রউস্কা টেকেনি, বিশ্বে কোথাও টেকেনি, এখানেও টিকবে না। মাত্রউস্কা ঘরের সাজানো মিষ্টি পুতুল হয়ে থাকুক, রাজনৈতিক কাঠামো হিসেবে নয়।








