মনে আছে সেই গুগাবাবার যাদুকর, আমিইইইইইই, আমি একমেবদ্বিতীয়ম, আমি একা। হ্যাঁ, এক্কেবারে সেরকম একটা স্টান্স নিয়েছে বিজেপি, তারা একাই দেশ চালাবে, তারাই ঠিক করবে কী হবে না হবে, তারাই ঠিক করবে সংসদে কে বলবে আর বলবে না, তারাই ঠিক করবে কখন কোন আইন আসবে আর তাকে কীভাবে পাস করা হবে। হ্যাঁ, এক্কেবারে এক স্বৈরতন্ত্র কায়েম করেছে তারা। ভারতের সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে গত দশ-এগারো বছর এই পরিবর্তনের সাক্ষী আমরা প্রত্যেকে। নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে বিজেপি সরকারের শাসনকালে ভারতীয় সংসদের গুরুত্ব ক্রমশ কমছে আর সেটাই এই মুহূর্তে সবথেকে বড় উদ্বেগ। কারণ ভারত এক রিপাবলিক, এক প্রজাতন্ত্র, তা তো চলবে সংবিধান মেনে, সেটা কিন্তু হচ্ছে না। গণতান্ত্রিক কাঠামোর মূল ভিত্তিই হল আলোচনা, বিতর্ক, বিরোধীদের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধা, আজ সেসব লাটে উঠেছে। সংসদ আপাতত এক নিয়মরক্ষার প্রতিষ্ঠান, বিরোধীদের কণ্ঠস্বরকে পরিকল্পিতভাবে চুপ করিয়ে দেওয়া হচ্ছে। বিরোধীদের গায়ে ‘দেশদ্রোহী’ বা ‘টুকড়ে টুকড়ে গ্যাং’-এর মতো তকমা সেঁটে দিয়ে দেশের রাজনৈতিক পরিসরকে কীভাবে বিষিয়ে তোলা হচ্ছে, সেটা আজ এক ওপেন সিক্রেট। সংসদীয় গণতন্ত্রের প্রাণভোমরা হল সংসদের কাছে সরকারের দায়বদ্ধতা। প্রধানমন্ত্রী তো কেবল এক রাজনৈতিক দলের নেতা নন, তিনি লোকসভার নেতা, জনগণের সার্বভৌমত্বের প্রতীক। কিন্তু গত এক দশকে আমরা নিয়মিতই দেখছি প্রধানমন্ত্রী সংসদের বিতর্কে অংশ নিতে বা বিরোধীদের সরাসরি প্রশ্নের সম্মুখীন হতে চানই না, জনগণ ভোট দিয়েছে, ক্ষমতায় আছি, তোমাদের প্রশ্নের জবাব দেব কেন? উনিজির এরকম একটা অ্যাটিচুড আমরা শুরু থেকেই দেখছি।
সংসদের সেশন চলছে, তিনি তাঁর বিদেশ সফর কিংবা নির্বাচনী প্রচারে ব্যস্ত। বয়স হয়েছিল, গুরুতর অসুস্থতা সত্ত্বেও ডক্টর মনমোহন সিং হুইলচেয়ারে বসে সংসদে উপস্থিত হয়েছেন কেবল একটা গুরুত্বপূর্ণ বিলের উপর ভোট দেওয়ার জন্য। এটা কেবল উপস্থিতি নয়, এটা সংসদীয় পদ্ধতির প্রতি আস্থা। তথ্য বলছে, ডক্টর সিংয়ের সংসদে উপস্থিতির হার ছিল প্রায় ৭৭ শতাংশ, যা জাতীয় গড়ের খুবই কাছাকাছি। কিন্তু মোদিজি? অনেক ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, সংবেদনশীল বিষয়েও সংসদে মুখই খুলছেন না। মণিপুরের জাতি দাঙ্গা নিয়ে দেশ উত্তাল, তখনও বিরোধীদের বারবার দাবি সত্ত্বেও প্রধানমন্ত্রী সংসদে এসে বিবৃতি দেননি। এটাই সরকারের এক সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন। দেশের প্রধান সংসদকে এড়িয়ে চলছেন, সংসদের মর্যাদা সাধারণ মানুষের চোখেও কমছে। তথ্য বলছে, ১৭তম লোকসভায় প্রধানমন্ত্রী দফতরের (PMO) কাছে রাজ্যসভায় ১,১৪৬টা প্রশ্ন করা হলেও উত্তর দেওয়া হয়েছে মাত্র ২৮টির। পার্সেন্টেজেও আসবে না। পরিসংখ্যান থেকে এটা পরিস্কার, সংসদীয় গণতন্ত্রের যে ঐতিহ্য নেহরু থেকে বাজপেয়ী পর্যন্ত ছিল, তা আজ এক সংকটের মুখে। সংসদের কার্যকারিতা মাপার মাপকাঠিটা কী? সেখানে কতদিন কাজ হচ্ছে ? কতটা সময় আলোচনার জন্য ব্যয় করা হচ্ছে? এই তথ্যগুলো। তো ১৭তম লোকসভার (২০১৯-২০২৪) পরিসংখ্যান বলছে এটা ভারতের সংসদীয় ইতিহাসে সবচেয়ে কম সময় চলা পূর্ণমেয়াদী লোকসভাগুলোর অন্যতম। এই পাঁচ বছরে লোকসভায় মাত্র ২৭৪টা অধিবেশন হয়েছে। ১৭তম লোকসভায় গড়ে বছরে মাত্র ৫৫ দিন কাজ হয়েছে। হ্যাঁ, ৩৬৫ দিনের মধ্যে ৫৫ দিনে কাজ হয়েছে। ১১টা সেশন নির্ধারিত সময়ের অনেক আগেই বিরোধীদের প্রতিবাদের দোহাই দিয়ে স্থগিত করে দেওয়া হয়েছে। মানে সরকার নিজের সুবিধামতো বিতর্ক এড়িয়ে যেতেই এই পথ বেছে নিয়েছে। লোকসভা তার নির্ধারিত সময়ের ৮৮ শতাংশ এবং রাজ্যসভা ৭৩ শতাংশ কাজ করতে পেরেছে।
আরও পড়ুন: Fourth Pillar | দেশের স্বার্থ বিসর্জন দিয়েই মোদিজি আমেরিকা-ভারত বাণিজ্য চুক্তি করেছেন
সংসদীয় গণতন্ত্রের আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ হল, ‘স্ট্যান্ডিং কমিটি’। কোনও আইন পাশ করার আগে তা বিশেষজ্ঞ আর বিরোধী সাংসদদের পর্যালোচনার জন্য বিলগুলোকে এই কমিটিগুলোতে পাঠানো হয়, এটাই চলতি নিয়ম। কিন্তু গত এক দশকে এই প্রথা প্রায় বন্ধ, ১৫তম লোকসভায় যেখানে ৭১ শতাংশ বিল এই কমিটিগুলোতে পাঠানো হয়েছিল, সেখানে ১৬তম লোকসভায় তা নেমে দাঁড়িয়েছে ২৬ শতাংশে, ১৭তম লোকসভায় তা আরও কমে মাত্র ১৬ শতাংশে এসে ঠেকেছে। মানে পরিস্কার, সরকার কোনও ধরণের আলোচনা বা বিশেষজ্ঞ মতামত ছাড়াই আইনগুলো যেন তেন প্রকারেন পাশ করিয়ে নিতে চাইছে। আইন পাশ করানোটা এখন এক যান্ত্রিক প্রক্রিয়া, ১৭তম লোকসভায় পাস হওয়া প্রায় ৫৮ শতাংশ বিল পেশ করার মাত্র ১২-১৪ দিনের মধ্যেই পাশ করিয়ে নেওয়া হয়েছে। জম্মু ও কাশ্মীর পুনর্গঠন বিল (২০১৯) বা নারী সংরক্ষণ বিল (২০২৩)-এর মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আর বিতর্কিত আইনগুলো পেশ করার মাত্র দু’দিনের মধ্যে কোনও আলোচনা ছাড়াই পাশ করা হয়েছে। আরও ভয়াবহ তথ্য হল, লোকসভায় পাশ হওয়া ৩৫ শতাংশ বিলের ক্ষেত্রে আলোচনার জন্য এক ঘন্টাও সময় ব্যয় করা হয়নি। অনেক ক্ষেত্রে হট্টগোলের মধ্যেই বিল পাশ করিয়ে নেওয়া হয়েছে। এমনকি দেশের বাজেট, যা জনগণের করের টাকার হিসাব এবং আগামীর রূপরেখা তৈরি করে, তাও বিস্তারিত আলোচনা ছাড়াই পাশ করা হয়েছে। ২০২৩ সালে তো পুরো বাজেটটাই কোনও আলোচনা ছাড়াই পাশ করে দেওয়ার এক বিরল নজির হয়ে থেকে গিয়েছে।
বিজেপি সরকারের গত এক দশকের রাজনীতিকে একটু খুঁটিয়ে দেখলে বোঝা যাবে, বিরোধীদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে নয়, ‘শত্রু’ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সংসদের ভেতরে বাইরে শাসক দলের নেতাদের মুখে শুনছি ‘দেশদ্রোহী’, ‘দেশ ভাঙার কারিগর’ বা ‘টুকড়ে টুকড়ে গ্যাং’-এর মতো শব্দ। মানে খুব স্পষ্ট, বিরোধীরা সবাই ‘দেশদ্রোহী’, সরকার পক্ষের সব্বাই ‘দেশপ্রেমিক’। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নিজেই সংসদে দাঁড়িয়ে কংগ্রেসকে এই গ্যাংয়ের নেতা বলেছেন। বলেছেন, কংগ্রেস এখন মাওয়িস্ট আর মুসলমান টেররিস্টের দল। রকের ভাষা ব্যবহার করছেন প্রপধানমন্ত্রী তাও আবার সংসদেই। দেশের গৃহমন্ত্রী নিজে এই ধরণের শব্দ ব্যবহার করেন, যা গণতান্ত্রিক পরিবেশের শিষ্টাচারকে লঙ্ঘন করে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটা আসলে এক ধরণের ‘আধিপত্যবাদী রাজনীতি’, যেখানে শাসক দল বিশ্বাস করে যে কেবল তারাই ‘দেশপ্রেমিক’ এবং বাকি সবাই ‘শত্রু’। কাজেই তাদের বাদ দিয়েই চলছে সংসদ। ২০২৩ সালের শীতকালীন অধিবেশনে সংসদের ভেতরে নিরাপত্তা লঙ্ঘনের একটা ঘটনার পর বিরোধীরা যখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বিবৃতির দাবি তোলেন, তখন সরকার আলোচনার বদলে কয়েকদিনের ব্যবধানে মোট ১৪৬ জন বিরোধী সাংসদকে বরখাস্ত করে দিলেন। লোকসভা থেকে ১০০ জন আর রাজ্যসভা থেকে ৪৬ জন সাংসদকে বরখাস্ত করে সংসদকে কার্যত বিরোধী শূন্য করে দেওয়া হয়েছিল। আর এই সময়ের মধ্যে এই নির্লজ্জ সরকার দেশের গুরুত্বপূর্ণ তিনটে ফৌজদারি আইন পরিবর্তনের মতো বিল পাশ করিয়ে নিল। বিরোধীদের অভিযোগ, সরকার ইচ্ছা করেই তাদের মুখ বন্ধ রাখতে এই বরখাস্তের পথ বেছে নিয়েছিল যাতে কোনও বাধা ছাড়াই তারা তাদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে পারে। সংসদীয় গণতন্ত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠতা মানেই স্বৈরাচার তো নয়, কিন্তু বিরোধীদের এভাবে বের করে দিয়ে আইন পাশ করার ঘটনা আসলে গণতন্ত্রের কফিনে শেষ পেরেক ঠোকার মতো এক ব্যাপার। হিসেব বলছে, ২০১৪-১৯ এ ৮১ জন সাংসদ বরখাস্ত হয়েছিলেন, কিন্তু ২০১৯-২৪ মেয়াদে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২০৬-এ। কিচ্ছু না, খুব সাধারণ ছোটখাটো প্রতিবাদ বা প্ল্যাকার্ড দেখানোর অপরাধেই এভাবে সাংসদদের বের করে দেওয়া হয়েছে।
এটা গণতন্ত্র নয়, এটা প্রজাতন্ত্র নয়। স্পিকার নিজেই বিরোধী নেতাদের কথা বলতে বাধা দিচ্ছেন, তাঁদের মাইক বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং তাঁদের বক্তব্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ সংসদের রেকর্ড থেকে মুছে ফেলা হয়। ক’দিন আগে প্রাক্তন সেনাপ্রধান জেনারেল এমএম নারাভানের অপ্রকাশিত আত্মজীবনী থেকে চীন সীমান্ত সম্পর্কিত কিছু তথ্য পড়ে শোনাতে চাওয়ায় রাহুল গান্ধীকে বাধা দেওয়া হল, তারপরে ৮ জন সাংসদকে বরখাস্ত করা নিয়ে তীব্র উত্তেজনা তৈরি হয়। স্পিকার জানাচ্ছেন, বিরোধী দলের মহিলা সদস্যরা নাকি প্রধানমন্ত্রীর সুরক্ষার জন্য বিপদজনক, ভাবা যায়? ভারতের সংবিধানের ৯৩ নম্বর অনুচ্ছেদ বলছে, লোকসভার স্পিকার নির্বাচনের পরপরই একজন ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন করাটা বাধ্যতামূলক। আর সেই পদ সাধারণত বিরোধী দলকে দেওয়ার এক ঐতিহ্য রয়েছে, যাতে ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় থাকে। কিন্তু বিজেপি সরকার ১৭তম লোকসভার পুরো পাঁচ বছরের মেয়াদে কোনও ডেপুটি স্পিকার নিয়োগই করেনি। চিন্তা ভাবনা করেই নিশ্চই করেননি। মোদিজির বাওয়াল ‘Mother of Democracy’ যে একটা ফাঁকা আওয়াজ, তা আজ সবার সামনে বড্ড পরিষ্কার। হিসেবে দাবি করলেও বাস্তবে গণতান্ত্রিক রীতিনীতি পালনের ক্ষেত্রে এই সরকারের অনীহা বারবার ধরা পড়েছে। একসময় বিজেপি নেত্রী সুষমা স্বরাজ সংসদে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, “বিরোধীরা শত্রু নয়, তারা কেবল রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ।” আজ সেই বিজেপি বিরোধীদের বুলডোজ করে একাই দেশ চালাতে চায়।
দেখুন আরও খবর:








