Sunday, March 29, 2026
HomeScrollFourth Pillar | নির্লজ্জ স্বৈরাচারী ট্রাম্প আজ বিশ্বের দখল নিতে চায়
Fourth Pillar

Fourth Pillar | নির্লজ্জ স্বৈরাচারী ট্রাম্প আজ বিশ্বের দখল নিতে চায়

বিংশ শতাব্দীর শুরু থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত বিশ্ব রাজনীতির মানচিত্রের দিকে তাকালে একটা সত্য খুব স্পষ্ট হয়ে ওঠে, আর তা হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন। যে দেশটা নিজেকে গণতন্ত্র আর স্বাধীনতার ভ্যানগার্ড হিসেবে দাবি করে, তাদের আদত ইতিহাস আসলে অন্য দেশের সম্পদ লুট, নির্বাচিত সরকার ফেলে দেওয়া আর নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখার জন্য রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের এক লম্বা উপাখ্যান। গতকাল ভেনিজুয়েলার নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে (Venezuela President Nicolas Maduro) এক নাটকীয় ঝটিকা সামরিক অভিযান চালিয়ে কিডন্যাপ করে নিয়ে আসার ঘটনাটা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সেই পুরোনো আর নির্লজ্জ চেহারাকেই নতুন করে তুলে ধরেছে, মুখোশ খুলে গেছে। এটা কেবল একটা দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ নয়, এক স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের অস্তিত্বের ওপর এক চরম আঘাত। এই ঘটনার প্রেক্ষাপট বুঝতে হলে আমাদের পিছিয়ে যেতে হবে সেই সব দিনে, যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে এক ‘শিশু সাম্রাজ্য’ হিসেবে ঘোষণা করেছিল এবং বিশ্বের দখল নেওয়ার স্বপ্নে বিভোর হয়েছিল, হাল্লা রাজার সেই যুদ্ধযাত্রা । মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের এই যাত্রার শেকড় অনেক গভীরে, সেই নির্লজ্জতা তাদের জন্মক্ষণ থেকেই ডালপালা মেলেছে। ১৭৮৬ সালে যখন আমেরিকা একটা নতুন রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে উঠছে, তখনই জর্জ ওয়াশিংটন বলেছিলেন আমেরিকা একটা ‘শিশু সাম্রাজ্য’ । সেই শুরু থেকেই তাদের নজর ছিল অন্যের জমির দিকে।

টমাস জেফারসন মনে করতেন, উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার সবটাই একদিন মার্কিন নাগরিকদের দখলে আসবে। এই মানসিকতা থেকেই জন্ম নিয়েছিল ‘ম্যানিফেস্ট ডেসটিনি’ বা ‘সুস্পষ্ট নিয়তি’ নামক এক ইউটোপিয় ধারণা, যা মনে করায় যে উত্তর আমেরিকা মহাদেশ জুড়ে সাম্রাজ্য বিস্তার করাটা মার্কিনিদের এক ঈশ্বরপ্রদত্ত অধিকার। এই আগ্রাসনের প্রথম বড় শিকার ছিল নেটিভ আমেরিকান বা এই ভূখণ্ডের আদিবাসীরা। ১৮৩০ সালের ‘ইন্ডিয়ান রিমুভাল অ্যাক্ট’-এর মাধ্যমে হাজার হাজার মানুষকে তাদের পূর্বপুরুষের ভিটেমাটি থেকে উৎখাত করা হয়, যা ইতিহাসে ‘ট্রেইল অফ টিয়ার্স’ বা অশ্রুঝরা পথ হিসেবে পরিচিত। এই নির্লজ্জ দখলদারিতে প্রায় ১৬,৭০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। এটাই ছিল মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের প্রথম সাম্রাজ্যবাদী চেহারা, যেখানে ক্ষমতার জোরে একটা গোটা জাতিকে মুছে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল।

উনবিংশ শতাব্দীতে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ এক নতুন তাত্ত্বিক রূপ পেল, এলো ‘মনরো ডকট্রিন’। ১৮২৩ সালে প্রেসিডেন্ট জেমস মনরো ঘোষণা করেছিলেন যে, আমেরিকা মহাদেশে ইউরোপীয় শক্তির কোনো হস্তক্ষেপ বরদাস্ত করা হবে না । ওপর থেকে দেখলে মনে হতে পারে যে এটা লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর স্বাধীনতার রক্ষাকবচ ছিল, কিন্তু আসলে এটা ছিল ওই অঞ্চলে মার্কিন একচ্ছত্র দাদাগিরি প্রতিষ্ঠার একটা অজুহাত, মানে এই এলাকাতে দাদাগিরি আমরা করবো, অন্য কাউকে ঢুকতেও দেবো না। এই নীতির ওপর ভিত্তি করেই ১৮৪৬ সালে মেক্সিকোর ওপর যুদ্ধ চাপিয়ে দেয় আমেরিকা। যুদ্ধের শেষে মেক্সিকো তার প্রায় ৫৫ শতাংশ ভূখণ্ড হারাতে বাধ্য হয়, যা আজকের ক্যালিফোর্নিয়া, নেভাদা, উটাহ এবং অ্যারিজোনার সমৃদ্ধ এলাকাগুলো। এটা কেবল জমির লড়াই ছিল না, এটা ছিল মার্কিন অর্থনীতির চাকা সচল করার জন্য খনিজ ও প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ নেওয়ারই এক নির্লজ্জ প্রচেষ্টা। লাতিন আমেরিকার ইতিহাসে মার্কিন হস্তক্ষেপের এই ধারাকেই ‘ইয়াঙ্কি ইম্পেরিয়ালিজম’ বা ইয়াঙ্কি সাম্রাজ্যবাদ বলা হয়। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে প্রেসিডেন্ট থিওডোর রুজভেল্ট এই মনরো ডকট্রিনকে আরও আক্রমণাত্মক করে তোলেন ‘রুজভেল্ট করোলারি’র মাধ্যমে। তিনি ঘোষণা করেন, লাতিন আমেরিকার দেশগুলোতে কোনোরকম অস্থিরতা দেখা দিলেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সেখানে পুলিশি ভূমিকা পালন করার জন্য সামরিক হস্তক্ষেপ করতে পারবে। এর সরাসরি প্রভাব দেখা যায় কিউবাতে। ১৮৯৮ সালে কিউবার স্বাধীনতা যুদ্ধে স্পেনের বিরুদ্ধে সহায়তা করার নামে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সেখানে নিজের দখলদারি কায়েম করে। ১৯০১ সালের ‘প্ল্যাট অ্যামেন্ডমেন্ট’ কিউবার সংবিধানে এমনভাবে ঢুকিয়ে দেওয়া হয় যে, কিউবা চাইলেও অন্য কোনও দেশের সাথে চুক্তি করতে পারত না এবং আমেরিকা যখন খুশি কিউবার অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলাতে পারত । এভাবেই কিউবাকে কার্যত একটা মার্কিন কলোনি বা উপনিবেশে পরিণত করা হয়েছিল। কিউবার মানুষের লড়াই, ফিদেল কাস্ত্রো আর চে গুয়েভারা আর তাদের প্রতিরোধের ইতিহাস আজও আমাদের প্রেরণা দেয়। কিউবার সাধারণ মানুষ দীর্ঘ সময় ধরে মার্কিন পুতুল সরকারগুলোর অত্যাচারে, শোষণে দিন কাটিয়েছে। ১৯৫৯ সালে ফিদেল কাস্ত্রো, চে গুয়েভারার নেতৃত্বে যখন কিউবা তার শৃঙ্খল ভেঙে বেরিয়ে এল, তখনই মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ তার সবথেকে কুৎসিত রূপটা দেখিয়েছিল। ১৯৬১ সালে ‘বে অফ পিগস’ আক্রমণের লক্ষ্য ছিল কাস্ত্রোর সরকারকে উৎখাত করা, যে ষড়যন্ত্র সিআইএ করেছিল, তা কিউবার সাধারণ মানুষের প্রতিরোধের মুখে ধূলিসাৎ হয়ে যায় । আজও কিউবা এক অর্থনৈতিক অবরোধের মধ্যে বেঁচে আছে, কেবল মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের কাছে নতি স্বীকার না করার অপরাধে। কিন্তু তারা প্রমাণ করেছে, করছে যে, জনগণের শক্তি আর দেশপ্রেমের সামনে বিশ্বের সবথেকে শক্তিশালী সামরিক বাহিনীও হার মানতে বাধ্য। সেটাই আমরা এর আগে দেখেছিলাম ভিয়েতনামে, ভিয়েতনাম যুদ্ধের প্রেক্ষাপট মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের অহংকার মাটিতে মিশিয়ে দিয়েছিল।

আরও পড়ুন:Fourth Pillar | ২৬-এ চার রাজ্যের ভোট, কী হতে চলেছে? এক প্রাথমিক সমীক্ষা

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে বিশ্ব মোড়ল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে ‘কমিউনিজম ঠেকানো’র নামে ভিয়েতনামে এক অর্থহীন আর নৃশংস যুদ্ধ শুরু করে। ভিয়েতনামের সাধারণ মানুষ, যারা কেবল তাদের দেশের মুক্তি আর ঐক্য চেয়েছিল, তাদের ওপর ঢেলে দেওয়া হয়েছিল ৩০ বিলিয়ন পাউন্ডের গোলাবারুদ আর বিষাক্ত রাসায়নিক ‘এজেন্ট অরেঞ্জ’ । ভিয়েতনামের অলিগলি ছিল মার্কিন সেনাদের জন্য এক বিভীষিকা। সেখানে তারা সাধারণ মানুষের ভাষা বুঝত না, তাদের সংস্কৃতি বুঝত না, কেবল জানত ধ্বংস করতে। কিন্তু হো চি মিনের নেতৃত্বে ভিয়েতনামের মুক্তিযোদ্ধারা প্রমাণ করেছিলেন যে, বর্শা আর সাধারণ গেরিলা যুদ্ধ দিয়েই অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান আর ট্যাংককে হারানো সম্ভব । ভিয়েতনাম যুদ্ধে আমেরিকার পরাজয় ছিল বিশ্ব জনমতের এক বিরাট জয়। খোদ আমেরিকার রাজপথে হাজার হাজার মানুষ তাদের সরকারের এই অন্যায় যুদ্ধের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিল । লাশের পর লাশ ফেরত আসছিল আমেরিকায়, তরুণ মার্কিন ফৌজিদের লাশ। ভিয়েতনামে হারের পর মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ তার কৌশল বদলে ফেলে। তারা সরাসরি যুদ্ধের বদলে গোপন অভিযান আর নির্বাচিত সরকার পতনের খেলায় মেতে ওঠে। লাতিন আমেরিকাতে একে একে চিলি, ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনার মতো দেশগুলোতে মার্কিন মদতপুষ্ট সামরিক শাসকদের বসানো হয়। ১৯৭৩ সালে চিলির জনপ্রিয় আর গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট সালভাদর আলেন্দেকে এক রক্তক্ষয়ী অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সরিয়ে দেওয়া হয়, যার পেছনে সরাসরি হাত ছিল সিআইএ-র । আলেন্দে চেয়েছিলেন চিলির তামা আর প্রাকৃতিক সম্পদ যেন দেশের মানুষের কাজে লাগে, আর এটাই ছিল মার্কিন কোম্পানিগুলোর মাথাব্যথার কারণ। আলেন্দেকে হত্যার পর সেখানে যে পিনোশে একনায়কতন্ত্র কায়েম হয়েছিল, তা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের আশীর্বাদপুষ্ট ছিল। এই একই ধাঁচে ব্রাজিলে ১৯৬৪ সালে জোয়াও গৌলার্টকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয় । এই সময়কালে লাতিন আমেরিকা জুড়ে ‘অপারেশন কন্ডোর’ নামক এক ভয়ঙ্কর দমন-পীড়ন চালানো হয়, যেখানে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার সহায়তায় রাজনৈতিক বিরোধীদের নির্বিচারে হত্যা করা হতো । হ্যাঁ তারা সরাসরি নামেনি, গুপ্ত বাহিনী আর গুপ্ত হত্যা চালাতো ভাড়াটে সৈন্যবাহিনীদের দিয়ে। একবিংশ শতাব্দীতে এসে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’ বা ‘গ্লোবাল ওয়ার অন টেরর’-এর এক নতুন মোড়ক ব্যবহার শুরু করে। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার পর আফগানিস্তানে আক্রমণ ছিল কেবল শুরু। এরপর ২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণের জন্য যে অজুহাত তারা দিয়েছিল, তা ছিল এক ডাহা মিথ্যা। তারা দাবি করেছিল ইরাকের কাছে ‘গণবিধ্বংসী অস্ত্র’ আছে, যা আজ প্রমাণিত যে তা ছিল কেবল তেল সম্পদ দখলের এক সাজানো নাটক । এই যুদ্ধে ইরাকের সাধারণ মানুষের ওপর যে অকথ্য নির্যাতন আর ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়েছে, তার কোনো বিচার আজ পর্যন্ত হয়নি। আফগানিস্তান আর ইরাকের এই যুদ্ধের পেছনে ৫.৪ ট্রিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছে এবং লক্ষ লক্ষ নিরপরাধ মানুষের মৃত্যু হয়েছে । সিরিয়া আর ইরানেও মার্কিন হস্তক্ষেপের মূল উদ্দেশ্য ছিল ওই অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ আর প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর কব্জা করা। ভেনিজুয়েলার গতকালের ঘটনাটা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের এই দীর্ঘ ইতিহাসেরই এক চরম নির্লজ্জ পরিণতি। ভেনিজুয়েলা বিশ্বের অন্যতম প্রধান তেল সমৃদ্ধ দেশ, আর এটাই তাদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। হুগো চাভেজের সময় থেকেই ভেনিজুয়েলা তার সম্পদের ওপর নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে আসছে, যা মার্কিন আধিপত্যের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। ট্রাম্প প্রশাসন ক্ষমতায় আসার পর থেকেই ভেনিজুয়েলার অর্থনীতিকে পঙ্গু করতে একের পর এক অমানবিক নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে । ২০১৯ সালে তারা জুয়ান গুয়াইদো নামক এক ব্যক্তিকে স্বঘোষিত প্রেসিডেন্ট হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে ভেনিজুয়েলার সার্বভৌমত্বকে পদদলিত করার চেষ্টা করে। এরপর ২০২০ সালে ‘অপারেশন গিডিয়ন’ নামক এক ব্যর্থ অভিযানের মাধ্যমে মাদুরোকে বন্দি করার চেষ্টা করা হয় । কিন্তু সবশেষে ২০২৬ সালের ৩ জানুয়ারি যা ঘটল, তা আধুনিক বিশ্বের ইতিহাসে বিরল। কারাকাসের আকাশে শনিবার ভোররাতে যখন মার্কিন হেলিকপ্টারের শব্দ শোনা যাচ্ছিল, তখন কেউ ভাবতে পারেনি যে একটা দেশের প্রেসিডেন্টকে এভাবে তুলে নিয়ে যাওয়া হবে। ফোর্ট তিউনা সামরিক ঘাঁটিতে বোমা হামলা চালিয়ে এবং মাদুরোর বাড়িতে অভিযান চালিয়ে ডেল্টা ফোর্স নামক এক বিশেষ বাহিনী প্রেসিডেন্ট মাদুরো আর তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে কার্যত কিডন্যাপ করে নিয়ে যায় ।

ট্রাম্প একে ‘নারকো-টেররিজম’-এর বিরুদ্ধে লড়াই বলছেন, কিন্তু আসল উদ্দেশ্য তিনি নিজেই ফাঁস করে দিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট বলেছেন যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখন ভেনিজুয়েলা পরিচালনা করবে এবং সেখানকার তেলের প্রবাহ সচল করবে । তার এই বক্তব্য থেকেই পরিষ্কার যে, এটা মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ নয়, এটা তেলের জন্য আর সম্পদের জন্য এক নগ্ন সাম্রাজ্যবাদী দখলদারি। এই কিডন্যাপের আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এক পরিকল্পিত ‘ম্যাক্সিমাম প্রেসার’ বা চরম চাপের কৌশল নিয়েছিল। ভেনিজুয়েলার কূটনীতিক অ্যালেক্স সাব-কে যেভাবে কেপ ভার্দ থেকে বেআইনিভাবে তুলে নেওয়া হয়েছিল, তা ছিল এই বড় অভিযানেরই এক ছোট্ট মহড়া। অ্যালেক্স সাব যখন ভেনিজুয়েলার জন্য ওষুধ আর খাদ্য আনার মানবিক মিশনে ছিলেন, তখন তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল আন্তর্জাতিক নিয়ম লঙ্ঘন করে । মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আজ নিজেকে এমন এক পর্যায়ে নিয়ে গেছে যেখানে তারা আন্তর্জাতিক আইন বা রাষ্ট্রসংঘের কোনো ধার ধারছে না। তারা মনে করে যে তারা বিশ্বের বিচারক আর পুলিশ উভয়ই। ট্রাম্প একে ‘মনরো ডকট্রিন’-এর এক নতুন সংস্করণ হিসেবে প্রচার করছেন, যেখানে আমেরিকার স্বার্থই শেষ কথা । এই আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সারা বিশ্ব আজ সোচ্চার। চীন এই অভিযানকে আন্তর্জাতিক আইনের নগ্ন লঙ্ঘন বলেছে, মাদুরোর মুক্তি দাবি করেছে । ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুলা একে ভেনিজুয়েলার সার্বভৌমত্বের ওপর এক ভয়াবহ আঘাত হিসেবে বর্ণনা করেছেন । এমনকি খোদ আমেরিকার ভেতরেও অনেক ডেমোক্র্যাট নেতা ট্রাম্পের এই হঠকারী আর বেআইনি কাজের নিন্দা জানিয়েছেন। তারা মনে করছেন, এভাবে অন্য দেশের প্রেসিডেন্টকে তুলে আনা এক বিপজ্জনক নজির সৃষ্টি করল যা বিশ্ব শান্তিকে আরও বিপন্ন করবে । সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলো সব সময় প্রাকৃতিক সম্পদ আর ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থকে সাধারণ মানুষের জীবনের ঊর্ধ্বে স্থান দেয়। ভেনিজুয়েলার এই সংকট আজ সারা বিশ্বের সামনে এক প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছে যে, ছোট আর উন্নয়নশীল দেশগুলোর সার্বভৌমত্বের কি কোনো মূল্য নেই? মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের এই ইতিহাস আসলে লুণ্ঠন আর দখলের ইতিহাস। মেক্সিকো থেকে শুরু করে ভিয়েতনাম, পানামা থেকে ইরাক আর আজ ভেনিজুয়েলা—সর্বত্রই তাদের এক ও একমাত্র লক্ষ্য হলো নিজেদের পকেট ভারী করা আর বিশ্ব জুড়ে খবরদারি বজায় রাখা। ভিয়েতনামে তারা হেরেছিল কারণ সেখানকার মানুষ তাদের মাটি ছেড়ে দেয়নি। কিউবা আজও টিকে আছে কারণ তারা মার্কিন ডলারের কাছে মাথা নত করেনি।

ভেনিজুয়েলার এই লড়াইও কেবল মাদুরোর একার নয়, এটা সারা বিশ্বের প্রতিটা শান্তিকামী আর স্বাধীনচেতা মানুষের লড়াই। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হয়তো ভাবছে যে তারা বন্দুকের জোরে বিশ্ব দখল করবে, কিন্তু তারা ভুলে যাচ্ছে যে ইতিহাসের পাতায় সব বড় সাম্রাজ্যই একদিন ধ্বংস হয়েছে মানুষের সম্মিলিত প্রতিরোধের মুখে। ভেনিজুয়েলার এই নির্লজ্জ হস্তক্ষেপ তাই মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের পতনের আরও একটা বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে চে গুয়েভারা বলেছিলেন, সাম্রাজ্যবাদকে এক বিন্দু ছাড় দেওয়াও বিপজ্জনক। আজ ভেনিজুয়েলার ঘটনায় সেই কথার সত্যতা আমরা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করছি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখন আর কেবল রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ করছে না, তারা এখন জলজ্যান্ত প্রেসিডেন্টকে অপহরণ করতেও দ্বিধা করছে না। তাদের এই নির্লজ্জতা আজ বিশ্বের সব দেশের জন্য এক সতর্কবার্তা। যদি আজ ভেনিজুয়েলাতে এটা হয়, তবে কাল অন্য কোনো দেশেও এমনটা হতে পারে। তাই সময় এসেছে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের এই রক্তক্ষয়ী ইতিহাসের শেষ টানার। হ্যাঁ বিশ্ব জনমত আজ যেভাবে একজোট হচ্ছে, তা আমাদের আশার আলো দেখায়। কিউবা আর ভিয়েতনামের মতো ভেনিজুয়েলার মানুষও একদিন এই অন্ধকারের বুক চিরে নিজেদের মুক্তি ছিনিয়ে আনবে এবং মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের এই জঘন্য চেহারা ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই নেবে।

Read More

Latest News

evos gaming

https://www.annabelle-candy.com/about/ JUARA88 situs slot gacor situs slot gacor slot maxwin WATITOTO LGO188 DEPOBOS https://www.demeral.com/it/podcast xgo88 WDBOS SLOT GACOR toto togel slot toto togel slot poker slot gacor idn poker 88 slot gacor mix parlay idn slot https://www.annabelle-candy.com/about/ https://www.demeral.com/it/demeral_software/ nobu99 toto slot traveltoto toto slot