এক কোটি ৪০ লক্ষ মানুষকে নোটিশ দিয়েছে নির্বাচন কমিশন, এর বেশিরভাগটাই ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি’, মানে তালিকায় থাকা তথ্য যুক্তি বোধ্য নয়। কোনওদিন মানসিক রোগীদের হাসপাতালে গিয়েছেন, বা মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলেছেন? দেখবেন মানসিক রোগে আক্রান্তদের একটা বড় অংশ আপনাকে পাগল ঠাওরাবে, মানসিক রোগের চিকিৎসকেরাও তাই বলেন যে, মানসিক রোগীরা অন্যদেরকেই মানসিক রোগী হিসেবে চিহ্নিত করতে ভালোবাসে। আমাদের নির্বাচন কমিশন যাকে ওই উন্মাদ মহম্মদ বিন তুঘলক বলাই যায়, সেই কমিশন এখন দেশের নাগরিকদের ভোটার তালিকার লজিক খুঁজতে বেরিয়েছে। এবং যদি তা না হয়, তাহলে আর একটাই বিশেষণ বাকি থাকে, তা হল ‘শয়তানি’ চলছে। হ্যাঁ, হয় ‘উন্মাদ’, না হলে ‘শয়তান’ ছাড়া এই দুর্ভোগ আর অশান্তি কেউ নামিয়ে আনতে পারে না। তাকিয়ে দেখুন গত কয়েকমাস ধরে কী চলছে? মানুষের কাজ নেই, কর্ম নেই, চাষবাস নেই, কী হচ্ছে? না, ভোটার তালিকা সংশোধন। দেড় কোটি মানুষকে লাইনে দাঁড় করানোটা জরুরি ছিল? একজনের নাম পেলাম, বৃদ্ধার নাম সাদেজান শেখ, জন্মেছেন ১৯৪৭ সালে, মানে ১৯৬৮ সাল থেকে তিনি ভোট দিচ্ছেন, বাঁকুড়ার এই মহিলাকে লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সির কারণে ডেকে পাঠানো হয়েছে, এতদিন পরে তাঁকে প্রমাণ করতে হবে যে, তিনি নাগরিক। আর এই লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি নিয়ে প্রয়োজনীয় দলিল নিয়ে, শুনানির সময়ে বিএলএ-র থাকা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ এসেছে, এবার ফিন রামসে শুরু হবে সবটা। হ্যাঁ কেউ তো বলতেই পারেন যে, এর আগেরবারে আমার সঙ্গে বিএলএ ছিল না, আমি বিএলএ নিয়েই শুনানিতে আসছি। কী বলবেন নির্বাচন কমিশন? এর আগে বলেছেন মাধ্যমিকের অ্যাডমিট কার্ড চলবে না, এবারে সেই মানুষটি অ্যাডমিট কার্ড নিয়ে আসবেন, কী করে মানা করবেন? হ্যাঁ, জটিলতা বাড়িয়েছেন, এবারে নিজেদের ঠিক করা সময়সীমা থেকেও পেছোতেই হবে নির্বাচন কমিশনকে, কারণ বৈধ ভোটার বাদ পড়লে কী হবে ওনারা বুঝে গিয়েছেন। সেটাই বিষয় আজকে, একজন বৈধ ভোটারও বাদ পড়লে তাণ্ডবনৃত্যের জন্য তৈরি থাকুন মিঃ নির্বাচন কমিশনার।
কথায় আছে না, মূর্খদের মরণ বহুবার, বহুবার তাঁদের মরতে হয়, আমাদের নির্বাচন কমিশনও ঠিক সেরকম এক প্রতিষ্ঠান। আপনি যদি মিল পেতে চান তাহলে সেই নোটবন্দির দিনগুলোতে চলে যান, উনি তো ‘মিত্রোঁওওওওও’ বলে কেটে পড়লেন, মানুষ? নো ক্লু, কেউ কিচ্ছু জানে না, রোজ একটা করে নতুন সার্কুলার। ভাবুন একবার নতুন নোট ছাপা হচ্ছে, তার সাইজ আলাদা, কেউ আগে থেকে ভাবেনইনি যে, সেই সাইজের ট্রে এটিএম কাউন্টারগুলোতে নেই, কাজেই আগে ঘোড়া এসে গেল, পরে গাড়ি কেনা হল। মানুষের চূড়ান্ত দুর্ভোগ আমরা দেখেছিলাম, আর তারপরে আজ অবধি আমদের উনিজির মুখে এই নোটবন্দি নিয়ে আর একটাও কথা নেই। এই এসআইআর’ও কিন্তু এক্কেবারে সেই পরিণতির দিকে এগোচ্ছে। বিহারে যে শয়তানি করেছে সেই শয়তানি বাংলাতে করা যাবে না, এটা ইতিমধ্যেই বুঝেছে কমিশন, বুঝেছে শুনানিতে একজন বৈধ ভোটারের নাম বাদ রাখাটা একেবারেই অসম্ভব, বুঝেছে যে হয়রানি করিয়ে মানুষের নাম বাদ দেওয়া বাংলাতে সম্ভব নয়, বুঝেছে যে এই হয়রানি শেষমেষ ওনাদের প্রভুদের ভোট ব্যাঙ্কে ধস নামাবে।
আরও পড়ুন: Aajke | থাপ্পড়টা কি খুব জোরে লাগল শুভেন্দুবাবু?
কিন্তু আজ সেই বোধোদয়ের পরে সময় কোথায়? শুনানির তারিখ পেছতেই হবে, হবেই, আর শুনানির তারিখ পেছোলে ফাইনাল লিস্ট বার করতেও সময় লাগবে বৈকি। অথচ এই প্রক্রিয়াকে খুব স্বাভাবিক এক সংশোধনী প্রক্রিয়া হিসেবেই করাই যেত। একটা অ্যাপ আর এক লাগাতার প্রচার চালিয়ে বছরখানেক ধরে এই তালিকা শুদ্ধিকরণের কাজ করাই যেত, ব্লকে ব্লকে একটা করে সেন্টার করে দিলে যাঁরা নিজেরা সংশোধনের কাজ করতে পারত না, তাঁদের কাজ হয়ে যেত, বাকি মানুষজন সময়ে সুযোগে তাঁদের বিভিন্ন গরমিলগুলো শুধরে নিতে পারতেন। হ্যাঁ, যেকোনও সভ্য দেশে এমনটাই হয়, মোদিজি তো বিদেশ ভ্রমণ কম করেন না, হেঁ হেঁ আর গলা জড়াজড়ি না করে এই বিষয়টাই তো জেনে আসতে পারতেন। কিন্তু না এক হুলুস্থুল কাণ্ড না ঘটালে তো মানুষের মোদ্দা সমস্যাগুলো থেকে নজর ঘোরানো যাবে না, তাই বর্গী, মারাঠা দস্যুর মতো ‘হা রে রে রে রে’ করে আনা হল এসআইআর। আপনি এখন আপনার নামটাকে ওই ভোটার লিস্টে রাখার জন্য জান লড়িয়ে দিন, এটাই আসল উদ্দেশ্য, ইতিমধ্যে তাঁরা দেশ বেচে দেবেন আদানি, আম্বানিদের কাছে, গুটিকয়েক শিল্পপতিদের হাতে, এটাই তো লক্ষ্য। আমরা আমাদের দর্শকদের জিজ্ঞেস করেছিলাম, এই ভোটার তালিকা সংশোধনের আসল উদ্দেশ্যটা কী বলে আপনাদের মনে হয়?
আসলে বড্ড কাঁচা কাজ করে ফেলেছেন আমাদের জ্ঞানেষ কুমার, উনি বাংলার ইতিহাস পড়েননি, এ বাংলাতে রাজনৈতিক আবহের এতটুকুও না জেনে একটা কাজে হাত দিয়ে ফেলেছেন। হ্যাঁ, এখানে দুটোই আছে, রাজনীতির জন্য রাজনীতি আছে, আবার মানুষের জন্যও রাজনীতি আছে। সেই প্রেক্ষিতে প্রভুদের আদেশে সবটা উলটে পালটে দেবার চেষ্টা করার আগে দশবার ভাবা উচিত ছিল, ১৪ ফেব্রুয়ারি তো অসম্ভব, কিন্তু যেদিনই ফাইনাল লিস্ট বার করুন, একজন বৈধ ভোটার বাদ পড়লে বাঙালি বুঝিয়ে দেবে এ বাংলাতে কেবল ঘাসের চাষ হয় না।
দেখুন আরও খবর:








