দক্ষিণপন্থী দল ভাঙে, ভেঙেছে, ভাঙবে আর সেসবের কোনও আদর্শগত মোড়ক দেওয়ার খুব একটা চেষ্টা হয় না। ইন্দিরাকে মানলে নব-কংগ্রেস আর ওই মোরারজি ইত্যাদি বুড়ো নেতাদের মানলে আদি-কংগ্রেস, এই তো? মমতাকে মানলে তৃণমূল, না মানলে কংগ্রেস। সোজা ব্যাপার। মানে কংগ্রেস গান্ধিজির ‘গ্রাম সুরাজ’-এর কথা বলে, মমতা ‘গ্রাম সুরাজ’ মানেন না। এসব দাবানআঁশটে মানে গোলানো কথাবার্তা নেই। কিন্তু বামেদের আছে। বামেরা দল ভাঙলে তার এক আদর্শগত ব্যাখ্যা দেওয়াটা জরুরি। চারিদিক থেকে মিলিটারি ঘিরে ধরে মারছে। একদল জেদি, যা করছি তাই ঠিক। অন্যদল আদতে প্রাণ বাঁচাতে আত্মসমর্পণের পথ বেঁচে নিয়েছে। আরে বাবা, বেঁচে থাকলে তবে তো বিপ্লব! কিন্তু যাঁরা একটু খবর রাখেন, তাঁরা জানেন এই দুই খুব সোজা ইস্যুতে বিভক্ত মাওয়িস্টরাও কত শত আদর্শ, মার্কস-এর কোটেশন, মাও কী বলিয়াছিলেন ইত্যাদি এনে খাড়া করেছেন। সিপিআই থেকে সিপিএম, সিপিএম থেকে নকশাল, সেই নকশালেরা ভেঙে সাড়ে বিয়াল্লিশ টুকরো, কিন্তু দেখবেন লেখা আছে সবটাই আদর্শের খাতিরে, সবটার একটা বিশাল ব্যাখ্যা আছে, যাকে ওনারা দলিল বলেন। আর সেই জন্যেই বামেদের বিভাজন তিক্ততম হয়ে ওঠে, কারণ তারা একে অন্যের কোট আনকোট আদর্শগত শত্রু। বামেদের মধ্যে ইনার পার্টি স্ট্রাগল চলে, মানে দলের মধ্যে দুই লাইনের, তিন বা চার লাইনের লড়াই, কিন্তু ভাঙলে তখন ইনার লাইন আর্মস স্ট্রাগল। সিপিএম নকশাল মেরেছে, নকশাল সিপিএম মেরেছে – এ তো নতুন কিছু নয়। তো বহুদিন পরে বহু বাম মিলে আরজি কর হত্যা, ধর্ষণের বিরুদ্ধে ফ্রন্ট গড়ে লড়াই শুরু করেছিলেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কেবল তা খবরের কাগজের একের পাতা থেকে পাঁচের পাতা হয়ে সাতের পাতা পার করে থেমে গিয়েছিল, আবার তা ফিরেছে, আবার ভাঙনের কথায়, ওরা আদর্শচ্যুত, ও মমতাপন্থী। হ্যাঁ, আজ সেই হত্যা ধর্ষণ আন্দোলনের সেই করুণ পরিসমাপ্তিই বিষয় আজকে, অনিকেত না দেবাশিস? হ্যাঁ, এইখানে এসে ঠেকল আরজি কর আন্দোলন।
আমরা শুনতে পাচ্ছিলাম, জেনেওছিলাম খানিকটা যে, মতবিরোধ তো আগেও ছিল, কিন্তু ডাক্তারদের পোস্টিং নিয়ে সেই মতবিরোধ ভাঙনের দিকে নিয়ে যাচ্ছে জুনিয়র ডাক্তারদের সংগঠনকে। সেটা সামনে এলো ডঃ অনিকেত মাহাতোর পদত্যাগ পত্রের পরে। জুনিয়র ডক্টর্স ফ্রন্ট থেকে পদত্যাগ করে এবং সিনিয়র রেসিডেন্টশিপ (এসআর–শিপ) ছেড়ে দিয়ে বন্ডের ৩০ লক্ষ টাকা সরকারকে ফেরানোর জন্য ক্রাউড ফান্ডিংয়ের দ্বারস্থ হলেন তিনি। হ্যাঁ, জানিয়েই দিয়েছেন যে, তিনি আর এই রাজ্য সরকারের অধীনে চাকরি করবেন না, আর সেই জন্যই বন্ডের ৩০ লক্ষ টাকা ফেরত দেওয়ার জন্য মানুষের কাছে আবেদন জানালেন। জুনিয়র ডক্টরস ফ্রন্ট উপেক্ষা করতে পারত। কারণ তাঁরা তো জানেন ওই জুনিয়র ডক্টরস ফ্রন্টের রাজনৈতিক সমীকরণ। মূলত তিনটে রাজনৈতিক দলের ছাত্র নেতারাই এই ফ্রন্টে ছিলেন। বেশিটা হল বিভিন্ন নকশালপন্থী সংগঠনের সদস্যরা, ১২ থেকে ১৪টা একে অন্যকে সংশোধনবাদী বলা নকশালপন্থী দলের নেতাদের প্রভাবে একটা গ্রুপ। দ্বিতীয় গ্রুপ হল, এসইউসিআই-এর। তৃতীয় ছোট অস্তিত্ব সিপিএম-এর। এই সবটা মিলে হল এই জুনিয়র ডক্টরস ফ্রন্ট, যাঁরা ফ্রন্টের বাইরে একে অন্যকে মমতাপন্থী, সংশোধনবাদী, দালাল ইত্যাদি বলেন, হ্যাঁ তাঁরাই একসঙ্গে এই জুনিয়র ডক্টর ফ্রন্ট চালাচ্ছিলেন যা জন্মের সময়েই টুকরো টুকরো হবার সম্ভাবনা নিয়েই গড়ে উঠেছিল। সেটা এতদিনে সাঙ্গ হল।
আরও পড়ুন: Aajke | হে মহামান্য ইলেকশন কমিশনার, আপনি কি কারোর নাগরিকত্ব কাড়ার অধিকারী?
অনেকিতের পদত্যাগ মানেই ওই এসইউসিআই প্রভাবিত ডাক্তারেরা এবার অন্যপথে হাঁটা দেবে। না, অনিকেত নিশ্চিতভাবেই তৃণমূলে যাবেন না, কিন্তু ওই ডাক্তারেরা যেতেই পারে। ওদিকে হারাধনের বাকি দুই সন্তান এখন প্রেস মিটে এটা বোঝাতেই বসেছেন যে, অনিকেত নৈতিকভাবে কতটা অধঃপতিত এবং তিনি আসলে তৃণমূলের অনুগামী। তাঁদের অভিযোগ আরজি কর আন্দোলনে এত মানুষ যে নিঃস্বার্থ ভাবে ফ্রন্টের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, তাঁদের সেই অংশগ্রহণকে অনিকেত কেবল অসম্মান করেছেন, তাই নয়, অনিকেতের মামলা লড়তে ফ্রন্টের তোলা চাঁদার ১৭ লক্ষ টাকা নাকি খরচ হয়েছে। মানে কেবল ‘মমতার অনুগামী নয়, ও তো চোর’! হ্যাঁ, এরকম একটা ন্যারেটিভ সেট করে দিলেন আপতত জুনিয়র ডক্টরস ফ্রন্টের দেবাশিস হালদার, আসফাকুল্লা নাইয়ারা। এখন দেখার পালটা বোমা কবে পড়ে? বা সরাসরি বোমা না ফেলেও বোমার মত তথ্য লিক করে দেওয়াটাও বাম রাজনীতির এক অঙ্গ। আমরা আমাদের দর্শকদের জিজ্ঞেস করেছিলাম যে, আরজি কর ধর্ষণ হত্যার সময়ে গড়ে ওঠা জুনিয়র ডক্টরস ফ্রন্ট ঘাড় ধাক্কা দিয়েই বের করে দিল তাদের একদা এক নম্বর নেতা ডঃ অনিকেত মাহাতোকে। এটা কি ওনাদের আদর্শের লড়াই, না নেতৃত্বের লড়াই না বখরা ভাগাভগির লড়াই?
আসলে গোড়ায় গলদ থাকলে কিছুই শেষমেষ টেকে না। হ্যাঁ, আরজি করে দুর্নীতি ছিল, অধ্যক্ষ্যের ছত্রছায়াতেই সেই দুর্নীতি বেড়েছে। সেই দুর্নীতির আবহাওয়াতেই বেড়ে ওঠে খুনে ধর্ষকরা, তার বিরুদ্ধে লড়াই জরুরি। এটাও ঘটনা যে, এই ছবি রাজ্যের বিভিন্ন মেডিকেল কলেজেও আছে। সেই কলূষিত পরিবেশেই একজন জানোয়ার একজন ডাক্তার মেধাবী ছাত্রীকে ধর্ষণ, খুন করেছে। কিন্তু সেই ধর্ষণ বা খুন করার সঙ্গে সরাসরি না প্রশাসন না সরকার, সরাসরি কেউ জড়িত ছিল না, তবুও এক রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়ে দাবি এক দফা এক মুখ্যমন্ত্রীর পদত্যাগ বলে যে আন্দোলন শুরু হল, তার গোড়ায় গলদ ছিল বলেই সে লড়াই কোনও জায়গাতেই পৌঁছতে পারল না। আর ব্যর্থ লড়াইয়ের পরে দোষী খোঁজা হয়, এখন সেই দোষী খোঁজার পালা চলছে।
দেখুন আরও খবর:








