কলকাতা: নন্দীগ্রাম (Nandigram) গণহত্যার ১৯ বছর, শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Mamata Banerjee)। শনিবার সকালে স্যোশাল মিডিয়ায় কৃষকদের শ্রদ্ধা জানিয়ে মমতা লেখেন, ‘নন্দীগ্রাম দিবসে নন্দীগ্রাম, সিঙ্গুর ও নেতাই-সহ সমগ্র বিশ্বের সকল শহিদের প্রতি জানাই বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি এবং অন্তরের গভীর প্রণতি।’ ২০০৭ সাল ১৪ মার্চ, প্রায় ১৯ বছর আগে কৃশকদের রক্ত ভেসে গিয়েছিল নন্দীগ্রাম। এই নন্দীগ্রামই বদলে দিয়েছিল বাংলার রাজনীতির অভিমুখ। বঙ্গের রাজনৈতিক ক্ষমতা পরিবর্তনের পিছনে গুরুত্বপূর্ণ নন্দীগ্রাম।
রাজ্যে তখন বাম সরকার। মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। রাজ্যের কোণায় কোণায় তখন রব উঠছে, কাজ চাই। আর কাজের জোগান দিতে রাজ্যে শিল্প টানতে মরিয়া বাম সরকার। যেভাবেই হোক, শিল্প আনতেই হবে। যোগাযোগ হল সালেম গোষ্ঠীর সঙ্গে। ইন্দোনেশিয়া থেকে সালেম গোষ্ঠীকে ডেকে আনলেন বুদ্ধবাবু। ঠিক হল, কেমিক্যাল হাব তৈরি হবে বাংলায়। কিন্তু তার জন্য তো জমি লাগবে। সরকার জানাল, জমি অধিগ্রহণ করতে হবে। নন্দীগ্রামের পাশ দিয়েই বয়ে গিয়েছে হলদি নদী। ওপারে হলদিয়া। বিশাল শিল্পাঞ্চল। বুদ্ধবাবুর সরকার সিদ্ধান্ত নিল, হলদি নদীর এ পারেও তৈরি হবে শিল্প বলয়। তাই সব দিক বিবেচনা করে নন্দীগ্রামকেই বেছে নিল সরকার।মাথায় বাজ ভেঙে পড়ল নন্দীগ্রামের। ঘর ছেড়ে, জমি ছেড়ে যাবেন কোথায় তাঁরা! রুখে দাঁড়ালেন গ্রামবাসীরা। স্লোগান উঠল – রক্ত দেব, প্রাণ দেব নন্দীগ্রাম দেব না। বাম সরকারের বিরুদ্ধে শুরু হল গ্রামের প্রান্তিক মানুষদের আন্দোলন। সেই প্রতিরোধের আগুনে ঘৃতাহুতি দিলেন তৎকালীন বিরোধী নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। অভিযোগ করলেন, জোর করে কৃষি জমি হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে সরকার।
৭ জানুয়ারি গুলি চলল নন্দীগ্রামে। মারা গেলেন পাঁচ জন। কাঠগড়ায়, স্থানীয় সিপিএম নেতা শঙ্কর সামন্ত। অভিযোগ, শঙ্কর সামন্তের বাড়ি থেকেই গুলি চলেছিল। নন্দীগ্রাম তখন ফুঁসছে। স্থানীয় সিপিএম নেতা ও কর্মীদের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষ চলতেই থাকে। ১৪ মার্চ প্রায় হাজার তিনেক পুলিশ ঘিরে ফেলল গোটা নন্দীগ্রাম। অভিযোগ ওঠে, পুলিশের উর্দি গায়ে হাওয়াই চটি পায়ে কিছু মানুষও যোগ দেয়। সবাই সশস্ত্র। বিরোধীরা বলেন, তারা নাকি ছিল সিপিএমের ক্যাডার বাহিনী। প্রত্যেকে প্রশিক্ষিত ও সশস্ত্র।নন্দীগ্রামে ঢোকার একাধিক রাস্তা কেটে দেন আন্দোলনকারীরা, কোথাও আবার রাস্তার উপর বড় বড় গাছ ফেলে দেওয়া হয়।দা, হাঁসুয়া, তির ধনুক হাতে প্রতিরোধ গড়ে তুলল নন্দীগ্রামের মানুষ। প্রায় হাজার পাঁচেক গ্রামবাসী একত্রিত হয়ে গড়ে উঠল প্রতিরোধ বাহিনী। পুলিশ দুটি দলে ভাগ হয়ে গ্রামে ঢোকার চেষ্টা করে। পুলিশ জোর করে গ্রামে ঢোকার চেষ্টা করতেই শুরু হয় খণ্ডযুদ্ধ।প্রথমে কাঁদানে গ্যাস। তারপর রবার বুলেট। শেষে গুলি। সরকারি হিসেবে ১৪ জন গ্রামবাসীর মৃত্যু হয়।রক্ত ভেসে গিয়েছিল নন্দীগ্রাম।২০১১ সালে সরকার পরিবর্তন। সরকারে আসার পর থেকেই নন্দীগ্রাম দিবস পালনে আরও জোর দেয় তৃণমূল। সেই ধারা বজায় রেখে আজ, শনিবার পোস্ট করলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
বঙ্গের দুয়ারে কড়া নাড়ছে আরও একটা বিধানসভা নির্বাচন। এই প্রায় দু’দশকে বদলেছে রাজ্যে রাজনৈতিক চিত্রপট। তৎকালীন শাসকদল সিপিএম বিধানসভায় তাদের অস্তিত্বই নেই। তখন মমতার সঙ্গে থাকা শুভেন্দু অধিকারী সেই দলের বিরোধী দলনেতা।নন্দীগ্রাম দিবসে মমতা শ্রদ্ধা জানিয়ে পোস্টে সেখেন, নন্দীগ্রামে কৃষিজমি আন্দোলনের শহীদদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে প্রতিবছর এই দিনটিকে আমরা ‘কৃষক দিবস’ হিসেবে পালন করি। আমাদের কৃষকরা আমাদের গর্ব। তাঁরাই আমাদের অন্নদাতা। তাই তাঁদের প্রতিটি প্রয়োজনে আমরা তাঁদের পাশে থাকি। ‘কৃষকবন্ধু (নতুন)’ প্রকল্পে আর্থিক সহায়তা থেকে শুরু করে ন্যায্য মূল্যে বিক্রি, শস্য বিমার যাবতীয় খরচ বহন করা থেকে শুরু করে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে আর্থিক সহায়তা, কৃষকের অকাল মৃত্যুতে কৃষক পরিবারের পাশে দাঁড়ানো থেকে শুরু করে কৃষক পেনশন প্রদান, ১৮৬টি ‘কিষাণ মান্ডি’ চালু করা থেকে শুরু করে বিনামূল্যে কৃষি যন্ত্র প্রদান – সবকিছুই আমরা করেছি।আগামীদিনেও আমরা এভাবেই আমাদের কৃষকদের পাশে থাকবো।







