এক অরাজক অবস্থা তৈরি করেছে এই নির্বাচন কমিশন। বিশ্বের কোথাও যা হয়নি, তা ওনারা ভারতে করে দেখাচ্ছেন, এমনিতে দেখলে মনে হবে এক উন্মাদ বা অশিক্ষিতের কাণ্ড কারখানা। কারণ বিশ্বে আর কোথাও নাগরিককে চিঠি দিয়ে রাষ্ট্র বলে না যে, এসো বাপু তুমি তোমার নাগরিকত্বের প্রমাণ দাও। তোমার বাপের ছেলেপুলের সংখ্যা বা তোমার দাদুর নামের এই হতকুচ্ছিত বানান দেখে আমাদের যঠেষ্ট সন্দেহ হচ্ছে যে, তুমি নাগরিক নও, তাই নোটিস দেওয়া হল, ডকুমেন্টস কাঁধে করে নিয়ে এসো, সময় পেলে দেখব, তোমাকে আমার সামনেই প্রমাণ করতে হবে যে, তুমি নাগরিক। না, সারা বিশ্বের কোথাও কোনও রাষ্ট্র কাঠামোতে রাষ্ট্র এতটা আহাম্মক নয়, কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য, আমাদের রাষ্ট্রপ্রধান ‘এ প্লাস বি হোল স্কোয়ার’-এর ‘এক্সট্রা টু এ বি’ খুঁজে পান আর মেঘের আড়ালে রাডারকে ফাঁকি দিয়ে সার্জিকাল স্ট্রাইক চালান। কাজেই এক আহাম্মকের নেতৃত্বে এক আরও আহাম্মক নির্বাচন কমিশন কাজ করবে, এ তো স্বাভাবিক। কিন্তু তাঁরা ভাবতেই পারেননি যে, এভাবে রুখে দাঁড়াবেন মমতা। বরং ভেবেছিলেন যে, উনি যে রকমটা করেন, রাস্তায় নামবেন, স্লোগান দেবেন, চাই কী ওনার? ঘোষণা থেকে সরে এসে দু’চারটে বন্ধ ডাকবেন আর সেই সুযোগে ওনার হাত পা কুচ করে কেটে আগামী নির্বাচনে গদি দখলে নেমে পড়বে বিজেপি। কিন্তু দুটো জিনিস খেয়াল করলে এই কাজটা যে এত সহজে করা যাবে না সেটা বুঝতে পারত নির্বাচন কমিশন – (১) বিরাট জনসমর্থন, (২) তৃণমূল দলের খোল নলচে বদলে দিয়েছেন যুবরাজ। হ্যাঁ, সেটার ওপরে ভর করেই লড়ে গেল তৃণমূল। সেটাই বিষয় আজকে। এসআইআর-এর বিরুদ্ধে প্রথম লড়াইয়ে জয় মমতার।
একটু শুরুর দিকে নজর দিন, রাজ্য জুড়ে বিএলও-দের কাজ শুরুর সঙ্গে সঙ্গে নেমে পড়ল বিএলএ, মানে রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরাও। সেখানে তৃণমূল প্রায় ৯০ শতাংশ বুথে, একজন নয়, দু’তিনজন করে, বিজেপির বিএলএ খুব বেশি হলে ৩০ শতাংশে, আর সিপিএম-এর ৪০ শতাংশ বুথে। কিন্তু সেটাও কথা নয়, সেই বিএলএ-রা প্রতিদিন কাজ সেরে তাঁদের ইনফরমেশন ‘দিদিকে বলো’ অ্যাপে তুলছেন। কোনও কোনও ক্ষেত্রে বিএলও-দের আগে, কোথাও আবার বিএলও, সেও তৃণমূল। কাজেই মিলিজুলি সরকার। মানে নির্বাচন কমিশন যে ডেটা পেয়েছেন, সেই ডেটা পেয়েছেন আই প্যাক অফিসও। যেদিন ফার্স্ট ফেজের কাজ শেষ হয়ে খসড়া তালিকা বেরোল, সেদিন বিকেলেই আই প্যাক দফতর থেকে কোন জেলায় কতজন বাদ পড়েছেন, কোন ধর্ম, কোন পদবির ইত্যাদি বের করে ছড়িয়ে দিয়েছেন। আর দেখা গেল, আমরা অনেকেই যে আশা করেছিলাম সেরকম হিসেব মেনেই মতুয়া, রাজবংশী, আদিবাসী আর কলকাতা-হাওড়া চটকল বেলটে বিহারি মানুষজনের নাম বেশি বাদ গিয়েছে। কাজেই শুভেন্দুবাবুরা ঘন ঘন দিল্লি যেতে থাকলেন, আর সেই সময়ে এর আগে এসআইআর প্রক্রিয়াতে যা ছিল না, এমন এক ব্যবস্থা এনে হাজির করা হল বাংলায়। হ্যাঁ, ঠিক ধরেছেন, সেটাই হল ‘লজিক্যাল ডিস্ক্রিপেন্সি’। নানান প্যাঁচ পয়জারে আসল উদ্দেশ্য – সংখ্যালঘু মানুষজনের ভোট কেটে দেওয়া। হ্যাঁ, এই বাংলার সবর ইন্সটিটিউট নামে এক সংস্থা তাঁদের সমীক্ষাতে দেখাচ্ছেন যে, বিভিন্ন কেন্দ্রে মুসলমান জনসংখ্যরা উপস্থিতির হারেই ‘নো ম্যাপিং’ হয়েছে বা ওই ‘অ্যাবসেন্ট শিফটেড’, ‘ডেড’ বা ‘ডুপ্লিকেট’ তালিকাতে মুসলমানদের নাম এসেছে। কিন্তু যেই ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি’র ব্যাপারটা এল, সঙ্গে সঙ্গে সেই ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি’ নেই বলে এক বিরাট সংখ্যক মুসলমানদের ডেকে পাঠানো হল। কতটা? ধরুন বালিগঞ্জ বিধানসভা কেন্দ্র, সেখানে ৫০ শতাংশ মুসলমান মানুষজন থাকেন, তো ‘নো ম্যাপিং’য়ে বা ওই এএসডিডি তালিকাতে কমবেশি ৫১ শতাংশ মুসলমান মানুষজনের নাম আছে, কিন্তু ‘লজিক্যাল ডিস্ক্রিপেন্সি’ তালিকাতে ৭৭.৫ শতাংশ মুসলমান মানুষজনকে নোটিস পাঠানো হয়েছে। মেটিয়াবুরুজে ৮৬.৮৭ শতাংশকে নোটিস পাঠানো হয়েছে, যেখানে মুসলমান জনসংখ্যা ৬০ শতাংশ নোটিস পেয়েছেন, ভবানীপুরে ৫২ শতাংশ, যেখানে মুসলমান জনসংখ্যা ২০ শতাংশ, কোলকাতা পোর্টে ৮১ শতাংশকে নোটিস দেওয়া হয়েছে, যেখানে মুসলমান জনসংখ্যা ৫০ শতাংশ।
আরও পড়ুন: Aajke | সিপিএম পলিটব্যুরো সদস্যও বলছেন মমতা লড়ছেন এসআইআর-এর বিরুদ্ধে
খুব পরিস্কার যে, দিল্লির ছকবাজেরা এই ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি’ দিয়ে বড় সংখ্যক মুসলমানেদের ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেবার একটা ষড়যন্ত্র করেছিলেন। কিন্তু (১) মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে আদালতে গিয়ে, (২) মামলাটাকে এক সর্বভারতীয় প্রচারে নিয়ে গিয়ে এক চাপ তৈরি করলেন, ফলও হাতে নাতে, (১) সময়সীমা বেড়ে গেল, মানুষ একটু সময় পাবে, (২) বাইরের রাজ্য থেকে ফড়ে মাইক্রো অবজার্ভার এনে সেই কাজে সুবিধে করতে চেয়েছিল বিজেপি, সেটাও তিনি আটকে দিলেন। এটাই এই পর্যায়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বড় জয়, এবারে অপেক্ষা ফাইনাল লিস্টের, জানিয়ে রাখি, সেরকম গণহারে তালিকা থেকে বাদ পড়লে কিন্তু আবার আমরা এক গণপ্রতিরোধ দেখতে পাবো, যার সামনে থাকবেন ওই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। আমরা আমাদের দর্শকদের জিজ্ঞেস করেছিলাম যে, আদালতের রায়ের ফলে শুনানির দিন বাড়লো আর বাইরে থেকে আনা মাইক্রো অবজার্ভারদের ক্ষমতা চলে গেল, এটাকে কি মুখ্যমন্ত্রীর জয় বলবেন? শুনুন মানুষজন কী বলেছেন।
বিজেপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসার পরেই ভেবেছিল যে ব্যস, ধর্মতলা কর্মখালি, এবারে হিন্দুরাষ্ট্র ঘোষণা করে দেবো ব্যস, গল্প শেষ! তারপর তাঁরা জানতে পারলেন যে, এই সংবিধানটা রেখে সেটা সম্ভব নয়, তাহলে তাহলে এনআরসি করো, অসমে হল, বাঁশ কেন ঝাড়ে? ছাঁকনিতে ৮০ শতাংশ হিন্দু। তাঁদের বেনাগরিক করতে হবে। তাহলে? সিএএ আনো। এবারে সমস্যা সিএএ-তে আবেদন করবেন তো বিদেশি নাগরিক, দেশের নাগরিকরা কীভাবে আবেদন করবেন? তাহলে এবার নির্বাচন কমিশন, সেখানে বিভিন্ন তালেগোলে মুসলমানদের নাম বাদ দিয়ে তাঁদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক করে রাখা হবে। কিন্তু সেখানেও একা দেওয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে গেলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। হ্যাঁ, অন্তত এই পর্যায়ে তিনিই রুখে দিলেন এই চক্রান্ত।
দেখুন আরও খবর:








