Saturday, March 14, 2026
HomeFourth Pillar | সিঁদুর বেচা প্রধানমন্ত্রী

Fourth Pillar | সিঁদুর বেচা প্রধানমন্ত্রী

আগে বলেছি আবার বলছি একজন সৈনিকের কাছে তার অপারেশনের নাম কী? সেই যুদ্ধের নামের সঙ্গে সিঁদুর জড়িয়ে আছে না কুমকুম তা গুরুত্বপূর্ণ নয়, তা নিয়ে তিনি মোটেই চিন্তা করেন না, এই সিঁদুর ইত্যাদি এক্কেবারে এক রাজনৈতিক ব্যাপার। এমনিতে অপারেশন সিঁদুরের নাম আমরা শুনলাম দুই সেনানীর মুখে, কর্নেল সোফিয়া কুরেশি আর কর্নেল ব্যোমিকা সিং। কিন্তু মোদিজি তখন চুপ। উনি হিসেবটা দেখে নিতে চাইছিলেন, সময় চাইছিলেন। ১২ মে, ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধবিরতির ৪৮ ঘণ্টা পরে, প্রথমবারের মতো ‘অপারেশন সিঁদুর’ নিয়ে মুখ খুললেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এরপর ২২ মে থেকে ৩১ মে পর্যন্ত, টানা আট দিনে ছ’টা রাজ্যে মোট ন’টা জনসভায় ভাষণ দেন তিনি— একেবারে ঝড় তুলে দেন ভোটের মাঠে। দেশের সাংসদেরা, এমনকী বিরোধী সাংসদেরা দেশের বাইরে বিভিন্ন দেশে গিয়ে ভারতের অবস্থান খোলসা করছেন আর মোদিজি দেশের মধ্যে সিঁদুর বিক্রি করছেন, ভোট প্রচার করছেন। যুদ্ধের মাত্র ওই ক’টা দিন চুপচাপ থাকলেও, রাজস্থান, গুজরাট, মধ্যপ্রদেশ, উত্তরপ্রদেশ, পশ্চিমবঙ্গ আর বিহারে নির্বাচন প্রচারে নেমে মোদিজি নিজের কাঁধেই তুলে নিয়েছেন ভারতীয় সেনার সব কৃতিত্ব। এমন একটা হাবভাব যেন উনিই যুদ্ধে গিয়েছিলেন, যুদ্ধ জয় করে ফিরেছেন। তিনি বললেন, পাকিস্তানকে গুলি করে জবাব দেওয়া হয়েছে, আর সেটা শুধু সেনাবাহিনীর দৌলতে নয়, ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ উদ্যোগের শক্তিও তার পেছনে কাজ করেছে।

সেই মেক ইন ইন্ডিয়া কে করেছেন? মোদিজি। তাঁর দাবি, এই অপারেশন ভারতের দেশি অস্ত্রের শক্তি পৃথিবীকে দেখিয়ে দিয়েছে। জুড়ে দিয়েছেন তাঁর সাধের বিকশিত ভারতের কথা, ‘বিকশিত ভারত’-এর স্বপ্ন তুলে ধরেছেন, মোদিজি বারবার বলেছেন, এই স্বপ্ন তখনই সফল হবে, যখন সেনাবাহিনী মজবুত হবে। ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ অস্ত্রই হবে সেই মজবুতির ভিত। যদিও সেই কবে থেকে আজ অবধি বিজেপি নেতাদের চূড়ান্ত নারীবিদ্বেষী বক্তব্য নিয়ে তিনি একটা কথাও বলেননি, বরং সেসব তিনিও বিশ্বাস করেন, তবুও অপারেশন সিঁদুরকে তিনি তুলে ধরলেন ‘নারীদের সম্মান রক্ষার প্রতিশোধ’ হিসেবে। বক্তৃতায় বারবার ‘সিঁদুর’-এর প্রতীক ব্যবহার করেন, হিন্দু নারীর সতীত্বের প্রতীক। রাস্তার ধারে ঝোলানো হয়েছে তাঁর সামরিক পোশাকে কাট আউট, ব্যানারে কালোর মধ্যে লাল, অপারেশন সিঁদুরের নাম— সব মিলিয়ে ব্যাপক নির্বাচনী প্রচার। পহেলগামের সন্ত্রাসবাদী হামলার পর অপারেশন সিঁদুরের যে সামরিক প্রতিক্রিয়া, যে মিসাইল অ্যাটাক, যে ড্রোন আক্রমণ, তার সবটার কৃতিত্বও মোদি নিজের নামে টানেন, মোদি কা ইয়ে পরাক্রম ইত্যাদি। অথচ যেসব জঙ্গি ওই হামলার পিছনে ছিল, তারা এখনও ধরা পড়েনি— সেই প্রসঙ্গে কিছু বলেননি, তখন মুখে তালা লাগানো। এমনকী ট্রাম্পের এই দাবিও এড়িয়ে যান যে, আমেরিকার মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি হয়েছে, আর বাণিজ্যিক চাপে ভারত-পাকিস্তান পরমাণু যুদ্ধ থেকে ফিরে এসেছে। সেসব নিয়ে কোনও কথাই নেই। আসুন দেখে নেওয়া যাক এই আটদিনে আটটা রাজ্যে তিনি কী বললেন।

বিকানের, ২২ মে। তৃণমূল দল সমেত বিরোধীদের দাবি ছিল সংসদের বিশেষ অধিবেশন ডাকার— পহেলগাম হামলা, অপারেশন সিঁদুর আর চারদিনের যুদ্ধ নিয়ে আলোচনা করতে চান সাংসদেরা। ঠিক সেই সময়েই মোদি রাজস্থানের বিকানেরে সভা করেন। বলেন, “আমার রক্তে এখন আর রক্ত নেই, গরম সিঁদুর বইছে!” বুঝুন রক্তে সিঁদুর বইয়ে দিলেন। তার ভাষায়, “আমাদের প্রতিনিধিরা সারা বিশ্বে গিয়ে পাকিস্তানের আসল চেহারা দেখাবে। পাকিস্তান কখনও সরাসরি যুদ্ধে ভারতের কাছে জিততে পারেনি। তাই ওরা সন্ত্রাসকে অস্ত্র করেছে। স্বাধীনতার পর থেকে এভাবে চলেছে। কিন্তু এখন ভুলে গেছে— মা ভারতীর সেনা মোদি দাঁড়িয়ে আছে। মোদির মাথা ঠাণ্ডা, কিন্তু রক্ত গরম—আর সেই রক্ত এখন গরম সিঁদুর!” মানে লড়ল তো মোদি, কাজেই বটম লাইন মোদিকে ভোট দিন। এরপরে গুজরাটের দাহোদ, ২৬ মে। চার দিন পর, নিজের রাজ্য গুজরাটে মোদি দু’ দিনের সফরে যান। সেখানে রাস্তায় লাল শাড়ি আর অপারেশন সিঁদুর লেখা টুপি পরে বিজেপি মহিলা কর্মীদের বিরাট লাইন দেখা গেল, মানে আগে থেকেই সাজানো ছিল, তাঁরা স্বাগত জানালেন যুদ্ধফেরত নায়ককে। সেখানে মোদিজি বললেন, “যে কেউ যদি আমাদের বোনেদের সিঁদুর মুছতে চায়, তার সর্বনাশ অবশ্যম্ভাবী। অপারেশন সিঁদুর শুধুই সামরিক অভিযান না— এটা ভারতের সংস্কৃতি, আবেগের প্রতিফলন। জঙ্গিরা ভাবতেই পারেনি মোদির সঙ্গে লড়া এত কঠিন হবে!”

আরও পড়ুন: Fourth Pillar | নরেন্দর মোদি, সারেন্ডার মোদি

আবার সেই নিজের নাম জুড়ে দিলেন দেশের সেনা অভিযানের সঙ্গে। সবটাই উত্তম পুরুষে আমি আমি করে বলা, সেই গলা কাঁপানো আবেগী ভাষণে পহেলগামের হামলার কথা আবার তুললেন, কিন্তু আবারও তদন্তের অগ্রগতি নিয়ে কিছু বললেন না। “একটা বাবা নিজের বাচ্চার সামনে গুলি খেয়েছে— এই ছবি আজও দেখলে আমার রক্ত গরম হয়ে যায়। ১৪০ কোটির ভারতীয়কে চ্যালেঞ্জ করেছিল ওরা। আর তাই মোদি করেছে তার কর্তব্য—তিন বাহিনীকে ফ্রি হ্যান্ড দিয়েছে,” বলেন তিনি। মোদিদি করেছেন কর্তব্য, এখন করছেন নির্বাচনের প্রচার। বললেন, “আমাদের সেনারা যা করেছে, তা বহু দশকেও দুনিয়া দেখেনি। ৯টা বড় জঙ্গি ঘাঁটি চিহ্নিত করে, ৬ তারিখ রাতে মাত্র ২২ মিনিটে ওগুলো ধ্বংস করে দিয়েছি,” অনায়াসে বললেন ধ্বংস করেছি, সেনারা ধ্বংস করেনি, উনি করেছেন। ২২ এপ্রিলের পহেলগাম হামলার বদলা ৭ মে নেওয়ার কথা মনে করিয়ে দিয়ে তিনি বললেন, “বিকশিত ভারত তখনই সম্ভব, যখন আমাদের সেনা শক্তিশালী হবে, আর অর্থনীতি হবে দৃঢ়।” এরপরে গেলেন এই গুজরাটেরই ভুজে ২৬ মে। ২৬ মে, গুজরাটের ভুজে জনসভায় মোদিজি বললেন, ৯ তারিখ রাতে কচ্ছ সীমান্তে ড্রোন আক্রমণ হয়েছিল। সেটা নাকি তাঁর ‘গুজরাটি পরিচয়’ লক্ষ্য করে হয়েছে বলেও ইঙ্গিত দিলেন। ভাষাটা খেয়াল করুন “ওরা ভেবেছিল মোদি গুজরাটের ছেলে— এখানে কিছু করে দাগ ফেলবে। কিন্তু জানত না কার সঙ্গে ওরা খেলছে,” বলেন তিনি।

এবং কথা বলতে শুরু করলে তিনি মিথ্যে না বলে থামতে পারেন না, হঠাৎ চলে গেলেন না জানা ইতিহাসে, যা এর আগে কেউ শোনেনি, এই প্রথম জানা গেল এখানে ১৯৭১ সালের যুদ্ধ করা কিছু মহিলা তাকে ‘সিঁদুর গাছ’ উপহার দিয়েছেন। কোথায়? কবে? কারা? সেই সিঁদুর গাছ বস্তুটি কী? এখন কোথায় আছে? না কিচ্ছু জানা যাবে না। বললেন “এই গাছ আমি প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে লাগাব। এটা বড় হয়ে বটবৃক্ষের মতো ছায়া দেবে,” বললেন মোদি। আর তারপরেই দেশের প্রধানমন্ত্রী গয়ে গেলেন গব্বর সিং। “পাকিস্তানকে সন্ত্রাসের রোগ থেকে মুক্ত করতে হলে, তার যুবকদেরই রুখে দাঁড়াতে হবে। শান্তিতে বাঁচো, রুটি খাও— না হলে আমার গুলি তো রেডি আছেই।” এরপরে আবার সেই গুজরাটের গান্ধীনগর, ২৭ মে। গান্ধীনগরে মোদি আবার অপারেশন সিঁদুরের কথা তোলেন। চীনের নাম না নিয়ে বলেন, “আমরা এমন একটা দেশ গড়ব যেখানে কোনও বিদেশি পণ্য থাকবে না।” ভাবুন একবার, পৃথিবীর কোন আহাম্মক আজকের দিনে এমন এক দেশ গড়ে তোলার কথা চিন্তাও করতে পারে? তারপরে? আরও অশিক্ষিত কথাবার্তা, বললেন “এমনও অবস্থা হয়েছে যে গণেশজিও বিদেশি হয়ে এসেছে— ছোট ছোট চোখ, যেন খুলতেই চায় না।” মঙ্গোলয়েড চেহারা তাঁর কাছে বিদেশি মনে হয়।

ওই বক্তৃতাতেই তিনি বলেন, “আপনাদের বাড়িতে একদিনের জন্য দেখে নিন, কত বিদেশি পণ্য ব্যবহার করছেন। চুলের ক্লিপ, চিরুনি, দাঁতের ফ্লস, সব বিদেশি! দেশ বাঁচাতে হলে অপারেশন সিঁদুর শুধু সেনার কাজ না, ১৪০ কোটির দায়িত্ব।” মানে ওনার কোনও দায়িত্ব নেই, এতদিনে একটা চিপ তৈরি হল না, একটা লেন্স তৈরি হল না, উনি বিদেশি পণ্যমুক্ত ভারত গড়বেন। এরপরে সিকিম, ২৯ মে অবশ্য আবহাওয়ার কারণে সিকিমে তার সফর বাতিল হলেও অনলাইনে ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে বক্তব্য রাখলেন মোদিজি, বললেন, “পাকিস্তান প্রতিশোধ নিতে চেয়েছিল, কিন্তু ওদের মুখোশ খুলে গেছে। আমরা ওদের বেশ কয়েকটা বিমানঘাঁটি গুঁড়িয়ে দিয়েছি। দুনিয়া দেখেছে ভারত কত দ্রুত, নিখুঁত আর নির্ভুলভাবে কাজ করতে পারে।” ওইদিনেই আলিপুরদুয়ারে এলেন, সারলেন নির্বাচনী প্রচার। বললেন, “এই ‘সিঁদুর খেলার’ মাটিতে দাঁড়িয়ে আমি ভারতীয় প্রতিজ্ঞা জানাতে এসেছি। সন্ত্রাসবাদীরা আমাদের বোনেদের সিঁদুর মুছে দিতে চেয়েছিল, তাদের সেই দাম দিতে হয়েছে।” এবং তারপরে লাগাতার রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে আক্রমণ, সিঁদুর আর রাজনীতিকে মিলিয়ে এক নতুন ধারাভাষ্য। ৩০ মে বিহারের করাকাতে সভা করেন মোদি। জানান, পহেলগাম হামলার পর বিহারের মাটি থেকেই তিনি প্রতিশোধের শপথ নিয়েছিলেন— এবার এসে জানালেন, সেই প্রতিশোধ সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। তিনি শপথ নিয়েছেন, তিনি প্রতিশোধ নিয়েছেন, এক আমি সর্বস্ব মেগালোম্যানিয়াকের ভাষণ। “যারা পাকিস্তানে বসে আমাদের বোনেদের সিঁদুর মুছে দিয়েছিল, তাদের ঘাঁটি ধ্বংস করেছে আমাদের সেনা। দুনিয়া দেখেছে ভারতীয় কন্যাদের সিঁদুরের শক্তি।”

এরপরে গেলেন কানপুর। উত্তরপ্রদেশের কানপুরে বলেন, ২৪ এপ্রিলের উন্নয়ন প্রকল্পের অনুষ্ঠান পহেলগামের হামলার কারণে বাতিল করতে হয়েছিল। ওই হামলায় কানপুরের শোভম দ্বিবেদী শহিদ হন। “তার মেয়ে ঐশান্যার চোখের কান্না, রাগ— সেই আবেগেই নাকি অপারেশন সিঁদুর গড়ে উঠেছে।” এখানেও ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ তুলে ধরে বললেন, “দেশি অস্ত্র শুধু অর্থনীতির জন্য না, গর্বেরও প্রতীক। আত্মনির্ভর ভারতের লক্ষ্যেই এটা শুরু হয়েছে। আর এই পথে উত্তরপ্রদেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।” তাহলে কোটি কোটি টাকার অস্ত্র রাশিয়া, আমেরিকা, ফ্রান্স ইজরায়েল থেকে কেন কেনা হচ্ছে? কেউ জানে না। কানপুর থেকে ভোপাল, ৩১ মে, সেখানে মোদিজি বললেন, “অপারেশন সিঁদুর এখন নারীদের শক্তির প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। পহেলগামে শুধু রক্তপাত হয়নি, আমাদের সংস্কৃতির উপরও আঘাত হয়েছে। কিন্তু ওরা যে নারীদের চ্যালেঞ্জ করেছিল— সেটাই ওদের জন্য কাল হয়েছে। এবার থেকে আমরা শুধু প্রতিরক্ষা করব না, প্রত্যাঘাত করব। যারা সন্ত্রাসকে লালন করে, তাদের বুকে আঘাত করা হবে।” আজ ১৪০ কোটির কণ্ঠে একটাই কথা— তোমরা যদি গুলি চালাও, তাহলে উত্তর পাবে গোলায়!” মানে আবার গোলি খা, আসলে এক জিঙ্গোইস্টিক, এক জঙ্গি জাতীয়তাবাদীর মতোই যুদ্ধকে দেশের সঙ্গে, নিজের সঙ্গে আর তাঁর সরকারের সঙ্গে জুড়ে সেটাকেই তিনি আগামী নির্বাচনগুলোতে অপারেশন সিঁদুরকে ব্যবহার করতে চান। আসলে মোদিজি সিঁদুর বেচতে চান, ওনার এই রাজনীতি এখন সব্বার সামনে পরিষ্কার।

Read More

Latest News

evos gaming

https://rendez-vous.benin-ambassade.fr/profil-d/ https://www.annabelle-candy.com/about/ JUARA88 DEPOBOS idn poker 88 situs slot gacor https://www.demeral.com/it/demeral_software/ BWO99 slot 5000 poker situs slot gacor joker toto slot maxwin slot maxwin situs bola BANDAR80 WATITOTO LGO188 DEPOBOS https://www.demeral.com/it/podcast bandar togel neked