Tuesday, January 20, 2026
HomeScrollFourth Pillar | মোদিজির ডিজিটাল ইন্ডিয়াতে নাগরিকত্বের প্রমাণ দিতে মানুষ লাইনে দাঁড়িয়ে...
Fourth Pillar

Fourth Pillar | মোদিজির ডিজিটাল ইন্ডিয়াতে নাগরিকত্বের প্রমাণ দিতে মানুষ লাইনে দাঁড়িয়ে মরছে

কর্পোরেট দুনিয়ায় ‘আকর্ষণীয়’ মনে হলেও বাংলার সাধারণ মানুষের কাছে মোদিজির ‘ডিজিটাল ইন্ডিয়া’ আজ বিভীষিকার আরেক নাম

Written By
অনিকেত চট্টোপাধ্যায়

ভারতবর্ষের প্রশাসনিক ইতিহাসে এই সময়ে চলতে থাকা মামদোবাজির কোনও তুলনা নেই, যা হচ্ছে তাকে ‘অরাজকতা’ বললে কম বলা হয়। একদিকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে ‘ডিজিটাল ইন্ডিয়া’, আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর সমাজ গঠনের স্বপ্ন ফেরি করা হচ্ছে, আর অন্যদিকে সেই প্রযুক্তিরই গ্যাঁড়াকলে পড়ে কোটি কোটি প্রান্তিক মানুষ নিজের ঘর-বাড়ি ছেড়ে নাগরিকত্বের প্রমাণ দিতে সরকারি দফতরের সামনে দিনের পর দিন লাইনে দাঁড়িয়ে আছে। প্রযুক্তির যে লক্ষ্য হওয়া উচিত ছিল মানুষের জীবনযাত্রা সহজ করা, তা আজ পশ্চিমবঙ্গে এক চরম অনিশ্চয়তা আর আতঙ্ক তৈরি করেছে। বিশেষ করে স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন বা এসআইআর দিয়ে যখন সাধারণ মানুষের ভোটাধিকার আর নাগরিক সত্তাকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করানো হয়, তখন ডিজিটাল ক্ষমতায়নের পুরো বিষয়টাই এক প্রকান্ড তামাশা বলেই মনে হয়। ২০১৫ সালে ভারত সরকার যে উচ্চাকাঙ্ক্ষী ডিজিটাল ইন্ডিয়া মিশন চালু করেছিল, তার মূলে ছিল তিনটে বিষয়—(১) ডিজিটাল পরিকাঠামো তৈরি করা, (২) চাহিদানুযায়ী সরকারি পরিষেবা পৌঁছে দেওয়া, (৩) নাগরিকদের ডিজিটাল ক্ষমতায়ন। কিন্তু আজ কী দেখছি? এই ডিজিটাল পরিকাঠামোই আজ মানুষের নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়ার বা তাঁদের অস্তিত্বকে সংকটের মুখে ফেলার এক মস্ত হাতিয়ার হয়ে দাঁড়িয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের আগে নির্বাচন কমিশনের এই বিশেষ ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়া আদতে সাধারণ মানুষের কাছে এক অগ্নিপরীক্ষা হয়ে উঠেছে। এক কোটিরও বেশি মানুষ আজ সরকারি দফতরের বাইরে হাহাকার করছে, কারণ তাঁদের প্রমাণ করতে হবে তাঁরা এই দেশেরই মানুষ। অথচ পরিহাসের বিষয় হল, দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের নিজেদের নথিপত্র এবং ব্যক্তিগত তথ্য নিয়ে যখন বড় রকমের ঘাপলার কথা আমরা জানি, তারপরেও ডিজিটাল দুনিয়াতে কাগজ দেখতে চেয়ে এক সার্কাস চলছে দেশজুড়ে।

ডিজিটাল ইন্ডিয়া প্রকল্পের প্রচার করা হয়েছিল এমনভাবে যে, ভারতের প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতেও ব্রডব্যান্ড, হাইস্পিড ইন্টারনেট পৌঁছে যাবে, যার ফলে সাধারণ মানুষ যেকোনো সরকারি পরিষেবা ঘরে বসেই পেয়ে যাবে। সরকার দাবি করেছে যে, উমঙ্গ (UMANG) অ্যাপ দিয়ে হাজার হাজার পরিষেবা এখন হাতের নাগালে আর ডিজি লকারে মানুষ তাদের সব নথি নিরাপদে রাখতে পারছে। কিন্তু গবেষণাপত্র এবং সরকারি তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, ভারতের গ্রামীণ অঞ্চলে ইন্টারনেটের সুযোগ এখনও অত্যন্ত নগণ্য। ২০২৩ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, যেখানে শহর এলাকায় টেলি-ডেনসিটি ১০০ শতাংশের বেশি, সেখানে গ্রামীণ এলাকায় ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ ৪০ শতাংশের নিচে। আর নেট থাকলে রিল দেখা যায়, কিন্তু ডিজিটাল পরিসেবা, ডিজি লকারের ব্যবহার, অনলাইন ফর্ম ফিলাপ করার জন্য যে ন্যুনতম শিক্ষার দরকার, তা তো নেই। এই পরিকাঠামোগত অভাবের কারণে ই-গভর্নেন্স বা ডিজিটাল প্রশাসনের সুবিধা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছনোর বদলে উল্টে তাঁদের দৈনন্দিন জীবনে নতুন নতুন বাধা তৈরি করছে। শহরে মানুষ হাইস্পিড ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পারলেও, গ্রামের মানুষকে সামান্য সরকারি কাজের জন্য কমন সার্ভিস সেন্টার বা সাইবার ক্যাফেতে ভিড় করতে হচ্ছে। অনেক সময় দেখা যাচ্ছে যে, যে সমস্ত ওয়েবসাইট বা অ্যাপের মাধ্যমে পরিষেবা দেওয়ার কথা, সেগুলো ঠিকমতো কাজ করছে না অথবা ভাষার সমস্যার কারণে সাধারণ মানুষ তা বুঝতে পারছে না। এর ফলে ডিজিটাল ইন্ডিয়া আসলে সমাজের ওপরের স্তরের মানুষ, বড় জোর ১৫ শতাংশ মানুষকে সুবিধে দিলেও, প্রান্তিক মানুষকে আরও বেশি করে পিছিয়ে দিচ্ছে। ডিজিটাল ইন্ডিয়া মিশন অ্যাপ গুলো দিয়ে সরাসরি সুবিধে বা আধার-নির্ভর লেনদেনের কথা বলা হলেও, বাস্তবে ব্যর্থ বায়োমেট্রিক অথেন্টিকেশন বা আধার লিঙ্কিংয়ের ভুলের কারণে লক্ষ লক্ষ মানুষ তাদের রেশন বা পেনশন পাচ্ছে না। আর সেই একই ডিজিটাল সিস্টেম ভোটার তালিকা সংশোধনের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে এনে ফেলা হয়েছে। তার ফলাফল আরও মারাত্মক হয়ে উঠেছে। মানুষ আজ আতঙ্কিত যে, সামান্য একটা যান্ত্রিক ভুলের কারণে হয়তো তাঁদের নাম ভোটার তালিকা থেকে মুছে যাবে আর তারা রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়বে।

নির্বাচন কমিশন দাবি করেছে যে, একটা ত্রুটিমুক্ত ভোটার তালিকা তৈরি করাই তাদের উদ্দেশ্য, শুনতে তো সুন্দর কিন্তু এই প্রক্রিয়ায় যে পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়েছে তা নিয়ে বিস্তর প্রশ্ন উঠেছে। কমিশন ২০০২-২০০৪ সালের ভোটার তালিকাকে ভিত্তি হিসেবে ধরে বর্তমান ভোটারদের তথ্যের সাথে তা মেলানোর চেষ্টা করছে। দীর্ঘ ২০ থেকে ২২ বছর আগের কোনও তালিকার সাথে বর্তমান প্রজন্মের তথ্য মেলাতে গিয়ে দেখা যাচ্ছে যে, লক্ষ লক্ষ মানুষের তথ্য আর মিলছে না। বলা হচ্ছে এনারা ‘আনম্যাপড’ বা অচিহ্নিত ভোটার। প্রযুক্তি ব্যবহারের নামে যে জটিলতা তৈরি করা হয়েছে, তাতে সাধারণ মানুষ খেই হারিয়ে ফেলছে। ২০২৫-২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গের এসআইআর পরিসংখ্যান দেখলে শিউরে উঠতে হয়। খসড়া তালিকা থেকে ইতিমধ্যেই প্রায় ৫৮ লক্ষ ২০ হাজার ৮৯৮ জন ভোটারের নাম বাদ পড়েছে। প্রায় ১ কোটি ৩৬ লক্ষ ভোটারের তথ্যে ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি’ খুঁজে পাওয়া গিয়েছে, যার ফলে তাঁদের নাম নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে। এছাড়া প্রায় ৩২ লক্ষ মানুষকে ‘আনম্যাপড’ বা অচিহ্নিত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে কারণ ২০০২ সালের তালিকার সাথে তাদের তথ্যের মিল নেই। ১৫ লক্ষ ৫৩ হাজার ভোটারকে মৃত হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে ঠিকই, কিন্তু জীবিত মানুষেরাও নোটিসের পাহাড় থেকে রেহাই পাচ্ছেন না। এই বিপুল সংখ্যক মানুষের নথিপত্র যাচাইয়ের জন্য রাজ্যজুড়ে ৩,২৩৪টা হিয়ারিং সেন্টার খোলা হয়েছে ঠিকই, কিন্তু সেখানে যাওয়ার যাতায়াত খরচ আর দীর্ঘ লাইনের ধকল সাধারণ মানুষের কাছে এক আতঙ্ক, এক অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেকে অভিযোগ করছেন যে, ডিজিটাল লিঙ্কিং না হওয়ার কারণে তাঁদের সরাসরি ‘সন্দেহভাজন’ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। যারা গত ১০ থেকে ১৫ থেকে ২০টা নির্বাচনে নিয়মিত ভোট দিয়ে আসছেন, তাঁদের কাছে আজ নতুন করে এই প্রমাণ চাওয়া এক চূড়ান্ত মানসিক হয়রানি ছাড়া আর কিছুই নয়। ডিজিটাল ইন্ডিয়ার প্রবক্তারা দাবি করেছিলেন যে, প্রযুক্তি সময় বাঁচাবে, কিন্তু বাস্তবে মানুষ এখন এক অফিস থেকে অন্য অফিসে হন্যে হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন।

একজন সাধারণ নাগরিককে যখন বলা হয় যে, তাঁকে তাঁর জন্ম তারিখ বা শিক্ষাগত যোগ্যতার অকাট্য প্রমাণ দিতে হবে, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে দেশের সর্বোচ্চ পদে আসীন ব্যক্তিদের স্বচ্ছতা নিয়ে। আমরা তো সবাই জানি যে, খোদ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির জন্ম তারিখ বা শিক্ষাগত যোগ্যতার সার্টিফিকেট নিয়ে বড় রকমের বিতর্ক রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর সরকারি জীবনী এবং নির্বাচনী হলফনামায় তাঁর জন্ম তারিখ ১৭ সেপ্টেম্বর ১৯৫০, কিন্তু গুজরাত বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু পুরানো রেকর্ড বা কলেজের নথিতে দেখা যাচ্ছে, তাঁর জন্ম তারিখ ২৯ অগাস্ট ১৯৪৯। কোনটা ঠিক? নির্বাচন কমিশনের কাছে তিনি কোন নথি জমা দিয়েছেন? যদি দেশের প্রধানমন্ত্রীরই দু’টো জন্ম তারিখ থাকে, তবে সাধারণ মানুষের সার্টিফিকেটে কোনও যান্ত্রিক ভুলের জন্য কেন তাঁদের নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলা হবে? নরেন্দ্র মোদি দাবি করেন যে, তিনি ১৯৭৮ সালে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএ (BA) এবং ১৯৮৩ সালে গুজরাত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ (MA) ডিগ্রি অর্জন করেছেন। কিন্তু এই ডিগ্রিগুলোর সত্যতা জানতে চেয়ে যখনই কোনো আরটিআই (RTI) করা হয়েছে, তখনই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তা দিতে অস্বীকার করেছে। এমনকি দিল্লি হাইকোর্ট পর্যন্ত রায় দিয়েছে যে, প্রধানমন্ত্রীর ডিগ্রি জনসমক্ষে আনা বাধ্যতামূলক নয় কারণ এটা তাঁর ব্যক্তিগত তথ্যের মধ্যে পড়ে। কিন্তু মানুষের কাছে এইসব সার্টিফিকেট দেখতে চাওয়া হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর পরিবার সম্পর্কেও বিস্তর গোলযোগ, সরকারি জীবনী অনুযায়ী তাঁরা ছয় ভাই-বোন হলেও, বিরোধী দলগুলি দাবি করেছে যে, তাঁর বাবার সাতটা সন্তান ছিল। সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক যে, যাঁর নিজের জন্ম তারিখ, শিক্ষা বা পরিবার নিয়ে এত বড় রকমের অস্পষ্টতা রয়েছে, তিনি কোন নৈতিক অধিকারে সারা দেশের সাধারণ মানুষকে নাগরিকত্বের প্রমাণ দিতে বাধ্য করছেন? ডিজিটাল ইন্ডিয়ার চাকচিক্যের পেছনে যে হাহাকার লুকিয়ে আছে, তার সবচেয়ে করুণ ছবিটা দেখা যায় পশ্চিমবঙ্গের ব্লক অফিস বা মিউনিসিপ্যালিটিগুলোর বাইরে।

আরও পড়ুন: Fourth Pillar | শেষমেষ নোবেল পুরস্কার বাগিয়ে নিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প, কিন্তু কেমন করে?

এসআইআর বা ভোটার কার্ড সংশোধনের আতঙ্কে মানুষ আজ সর্বস্বান্ত হতে বসেছে। নথিপত্র জোগাড় করার এবং লাইনে দাঁড়ানোর ধকল সইতে না পেরে ইতিমধ্যেই অনেক মানুষের মৃত্যুর খবর সামনে এসেছে। মানুষের মনে ভয় ঢুকে গিয়েছে যে, যদি এবার নথিপত্র ঠিক না হয়, তবে তাঁদের ডিটেনশন ক্যাম্পে যেতে হবে। কলকাতা পৌরসভার বাইরে জন্ম শংসাপত্র বা ডেথ সার্টিফিকেট সংশোধনের জন্য যে লাইন পড়ছে, তা দেখে বোঝা যায় মানুষ কতটা আতঙ্কিত। ৮০ বছরের বৃদ্ধা জয়ন্তী দেবী, যিনি ঠিকমতো কানে শোনেন না বা চোখে দেখেন না, তাঁকে ১৯৬৭ সালের পারিবারিক নথিপত্র নিয়ে হিয়ারিং ক্যাম্পে দাঁড়িয়ে আছেন। ৭৫ বছরের পোলিও আক্রান্ত সবিতা মান্নাকে অ্যাম্বুলেন্সে করে হিয়ারিং ক্যাম্পে হাজির হতে হয়েছে কারণ ২০০২ সালের তালিকায় তাঁর নাম পাওয়া যায়নি। বারাসাতের নিরুফা খাতুনের মতো মহিলারা আজ মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন, কারণ বাবার মৃত্যুর পর তাঁর নাম তালিকায় খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। নির্বাচন কমিশন নির্দেশ দিয়েছিল যে, ৮৫ বছরের বেশি বয়স্ক বা প্রতিবন্ধীদের বাড়ি গিয়ে পরিষেবা দেওয়া হবে, কিন্তু বাস্তবে বৃদ্ধদের স্ট্রেচারে করে ক্যাম্পে আসার ছবিই নিত্যদিন দেখা যাচ্ছে। এই ডামাডোলের সুযোগ নিয়ে দালালেরা জন্ম শংসাপত্র বা ভোটার কার্ডে নামের বানান ঠিক করার জন্য হাজার হাজার টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। ডিজিটাল ইন্ডিয়া যেখানে দুর্নীতি বন্ধ করার কথা বলেছিল, সেখানে প্রযুক্তির এই জটিলতা দুর্নীতির এক নতুন বাজার খুলে দিয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে মতুয়া সম্প্রদায় ইদানিং এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শক্তি। দীর্ঘদিন ধরে তাদের সিএএ (CAA)-র মাধ্যমে স্থায়ী নাগরিকত্ব দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এই মুহূর্তে এসআইআর প্রক্রিয়া মতুয়াদের মধ্যে এক গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। বহু মতুয়া পরিবারের কাছে ২০০২ সালের কোনও নির্বাচনী রেকর্ড নেই, কারণ তাঁরা হয়তো তার পরে ওপার বাংলা থেকে এসেছেন। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মতুয়া-অধ্যুষিত নদিয়ার কৃষ্ণগঞ্জ আসনে বাদ পড়া বা অচিহ্নিত ভোটারের সংখ্যা ৪২.১১ শতাংশ। উত্তর ২৪ পরগনার বনগাঁ দক্ষিণ আসনে ৪১.৭৬ শতাংশ এবং স্বরূপনগরে ৩৮.৪৬ শতাংশ ভোটারের নাম কাটা গিয়েছে। বিজেপি নেতারা আগে দাবি করছিলেন যে, আধার কার্ড দিলেই হবে; পরে বললেন, মতুয়া সার্টিফিকেটের কথা, সেসব টাকা দিয়েই বিক্রি হল। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে যে, ভোটার তালিকা থেকে যদি নাম বাদ যায়, তবে সিএএ-র শংসাপত্রও তাঁদের রক্ষা করতে পারবে কী না, তা নিয়ে ঘোর সন্দেহ আছে। অনেক জায়গায় দেখা গিয়েছে যে, সিএএ-র আবেদনপত্রকেও ভোটার তালিকা সংশোধনের ক্ষেত্রে বৈধ নথি হিসেবে গ্রহণ করা হচ্ছে না। মতুয়া সম্প্রদায়ের মানুষ যাদের পদবি প্রধানত বিশ্বাস (২০.৭৯ শতাংশ), মণ্ডল (১৭.৮৩ শতাংশ) বা দাস (১০.৭৮ শতাংশ), তাঁদের মধ্যেই ভোটার তালিকা থেকে নাম কাটার হার সবচেয়ে বেশি দেখা গিয়েছে। এই তথাকথিত ‘ডিজিটাল সংস্কার’ আসলে সেই মানুষগুলোর উপরেই সবচেয়ে বেশি আঘাত হানছে, যাঁরা যুগ যুগ ধরে এদেশে বসবাস করছেন, কিন্তু যাঁদের কাছে আধুনিক ডিজিটাল ডাটাবেসের কোনও অস্তিত্ব নেই।

এসআইআর বা ভোটার তালিকা সংশোধনের পুরো প্রক্রিয়াটাই এক অগোছালো তুঘলকি কাণ্ড। নির্বাচন কমিশন মাঝপথে হঠাৎ করে নিয়ম বদলে দিচ্ছে। প্রথমে আধার কার্ড গ্রাহ্য হবে বলা হলেও পরে জানানো হচ্ছে আধার একক নথি হিসেবে যথেষ্ট নয়। এর সাথে যুক্ত হয়েছে অ্যালগরিদমের কারসাজি। ‘ডি-ডুপ্লিকেশন সফটওয়্যার’ নামক একটা সফটওয়্যার দিয়ে কয়েক কোটি ভোটারের নামকে সন্দেহজনক তালিকায় ফেলে দেওয়া হয়েছে। মজার কথা হল, সুপ্রিম কোর্টে যে সফটওয়্যারটাকে আট দিন আগে ‘ত্রুটিপূর্ণ’ বলা হয়েছিল, তাকেই আবার তড়িঘড়ি চালু করে দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনিক আধিকারিকরাও এই যান্ত্রিক চাপে বিভ্রান্ত। বিএলও-রা বাড়ি বাড়ি গিয়ে যে তথ্য সংগ্রহ করছেন, তা অনেক সময় অনলাইনে আপলোড হচ্ছে না। এর উপর যোগ হয়েছে ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি’ নামক এক বিমূর্ত ধারণা, যার কোপে পড়েছেন এক কোটিরও বেশি মানুষ। ডিজিটাল ইন্ডিয়া যেখানে স্বচ্ছতার দাবি করে, সেখানে এই অস্বচ্ছ অ্যালগরিদম আসলে গণতন্ত্রের ভিতকেই নড়বড়ে করে দিচ্ছে। মোদিজির ডিজিটাল ইন্ডিয়া হয়তো কর্পোরেট দুনিয়ায় খুব আকর্ষণীয় মনে হতে পারে, কিন্তু বাংলার সাধারণ মানুষের কাছে তা আজ এক বিভীষিকার নাম। যে মানুষটা দশবার ভোট দিয়েছেন, আজ তাকেই চোর-দায়গ্রস্তের মতো সরকারি অফিসে লাইন দিতে হচ্ছে। একদিকে যখন শীর্ষ নেতৃত্বের ব্যক্তিগত তথ্য গোপনীয়তার চাদরে ঢাকা রাখা হচ্ছে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের ২০ থেকে ৩০ বছরের পুরানো নথিপত্র নিয়ে যে টানাটানি চলছে, তা চরম অন্যায্য। প্রযুক্তির উদ্দেশ্য তো হওয়া উচিত ছিল মানুষের কষ্ট কমানো, কিন্তু তা এখন মানুষের কণ্ঠরোধ করার অস্ত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসআইআর-এর নামে এই হাহাকার যদি বন্ধ না হয়, তবে এই ‘ডিজিটাল ইন্ডিয়া’ ইতিহাসের পাতায় এক অন্ধকার অধ্যায় হিসেবেই চিহ্নিত হবে। যে দেশে নাগরিকত্বের প্রমাণ দিতে গিয়ে মানুষকে লাইনে দাঁড়িয়ে মরতে হয়, সেই দেশে উন্নয়নের লম্বা লম্বা দাবি আসলে এক তামাশা ছাড়া আর কিছুই নয়।

দেখুন আরও খবর:

Read More

Latest News