বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সেদিন বুঝতে পেরেছিলেন, বাংলার ভাগ্যাকাশে দুর্যোগের ঘনঘটা, বুঝেছিলেন ইংরেজ বেনিয়াদের ছকবাজি, সবাইকে ডেকেছিলেন, রায়দূর্লভ, জগৎশেঠ, মিরজাফর, মীরমদন, মোহনলাল, চিকের আড়ালে বসানো হয়েছিল ঘসেটি বেগমকে, এমনকি ডাকা হয়েছিল এক ফরাসি কর্নেলকে, সীরাজউদ্দৌলা সেদিন সবার কাছে আবেদন করেছিলেন, কাকুতি মিনতি করেছিলেন, বাংলা ইংরেজদের দখলে চলে যাবে, বাংলার স্বাধীনতা চলে যাবে, আসুন আমরা আগে ইংরেজদের আটকাই, পরে নিজেরা লড়ে নেব। হ্যাঁ, তিনি সিংহাসন ছেড়ে দেওয়ার কথাও বলেছিলেন। কিন্তু জগৎশেঠ, রাউদূর্লভ, উমিচাঁদ, মীরজাফরের দল ততদিনে বিকিয়ে গিয়েছে ইংরেজদের কাছে, কেউ ব্যবসার লোভে, কেউ মসনদের লোভে। ফলাফল আমরা জানি, মীরমদন আর মোহনলাল কামান নিয়ে লড়েছিলেন, মারা গিয়েছিলেন; ফরাসিরা ছোট সেনাদল নিয়ে লড়েছিলেন, কিন্তু পেরে ওঠেননি, বাংলা পদানত হয়েছিল ইংরেজদের কাছে। আজ ঠিক সেভাবেই বিজেপি আসছে, বর্গিদের হানাদারির মতো, মানুষের সমর্থন না পেয়ে ভাতে মারার চেষ্টা করছে বাংলাকে, মনরেগা থেকে বিভিন্ন সরকারি বরাদ্দ আটকে রেখেছে, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় তো চ্যালেঞ্জ করে সংসদে দাঁড়িয়ে বলেছেন যে, ২০২০ থেকে মনরেগার একটা টাকাও এসেছে সেটা প্রমাণ করুন। না, আসেনি। ২০২৬-২৭-এর বাজেটে বাংলার নামটুকুও নেই। তারপরেও মাথা নোয়াচ্ছে না বাংলা। তাই কিছু মিরজাফর, রায়দূর্লভ, জগৎশেঠ, উমিচাঁদ, ঘসেটি বেগমদের কাজে লাগানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। লক্ষ্য – (১) সাম্প্রদায়িক উন্মাদনা ছড়াও, হিন্দুরা অসুরক্ষিত এই মেসেজ পাঠাও, হিন্দু ভোটের মেরুকরণ করো, (২) মুসলমান ভোট ভাগ করে দাও, যা শেষমেষ সুবিধে করে দেবে বিজেপিকে। সে কথা সাধারণ মানুষ জানেন, তার জন্য তো খুব বেশি বুদ্ধি খাটাতে হচ্ছে না, কিন্তু কমরেড সেলিমের দিকে তাকান, তিনি একটা আসনে জিতে আসার জন্য এখনও সেই বিভাজনের এক নম্বর ঘুঁটি হয়ে দাঁড়িয়েছেন। সেটাই বিষয় আজকে, পদ্ম রুখতে ঘাসফুল,মজিদ মাস্টার বোঝেন, কমরেড সেলিম কেন বোঝেন না?
এমনিতে মজিদ মাস্টার কি খুব ধোয়া তুলসিপাতা? না, সেই ৮৬-৮৭-৯০-এর দশকে যাঁরা সাংবাদিকতা করেছেন তাঁরা জানেন ওই অঞ্চলে মজিদ মাস্টার ছিল শেষ কথা, বিরোধিতার টুঁ শব্দটা শুনতে পেলেও বিপদ আছে, মজিদ মাস্টারের দলবল আসবে, জানতেন এলাকার মানুষ। কিন্তু এটাও ঠিক যে উনি ব্যক্তিগতভাবে অসৎ ছিলেন না, একেবারেই না, খুব সাধারণ জীবন যাপন করতেন, এখনও করেন। সেহেন কট্টর সিপিএম বহুদিন হল সিপিএম আর করেন না। কিন্তু মাথায় রাখুন তিনি কিন্তু তৃণমূলও করেন না, ওনার মতো একজনের ধান্দা নিয়ে তৃণমূলে ভিড়ে যাওয়াটাই তো স্বাভাবিক ছিল। না, উনি ভেড়েন নি। সেই মজিদ মাস্টার বললেন, বিজেপিকে আটকাতে তৃণমূলকে ভোট দেবো, বিজেপিই প্রধান শত্রু। হ্যাঁ, এটা উনি বুঝেছেন, কিন্তু সেলিম সাহেব বোঝেননি, এমএলএ, মন্ত্রী, এমপি-র সেই দিনগুলো তাঁকে শয়নে স্বপনে তাড়া করে, সেদিনের অমন সুখ তিনি ভুলতে পারেন না, চানও না। তাই ওনার সোনার হরিণ চাই, যে কোনও মূল্যে ওনার দরকার একটা এমএলএ আসন, আর তার জন্য জান লড়িয়ে দিচ্ছেন। বলেছেন কে, মজিদ মাস্টার? ভুলেই গিয়েছেন সেদিন ওই অঞ্চলে ডুগডুগি বাজিয়ে লোক জড়ো করতেন এই মজিদ মাস্টার, উনি গিয়ে ভাষণ দিয়ে কৃতার্থ করতেন। উনি একটা আসনে জেতার জন্য যাবতীয় নীতি নৈতিকতা তাকে তুলেছেন। হ্যাঁ ওনার একান্ত অনুগামী তো বলেই দিয়েছেন, নীতি নৈতিকতার সব দায় কেন সিপিএম নেবে? মানে অনৈতিক কাজ চলছে, চলবে।
আরও পড়ুন: Aajke | ভোটের বাদ্যি বেজেই গেল, না খুব বেশি হলে দুই কি তিন দফাতেই ভোট নেওয়া হবে
উনি গেলেন হুমায়ুন কবীরের সঙ্গে দেখা করতে, হৈ হৈ হল, শোনা গেল উনি নাকি মন বুঝতে গিয়েছিলেন, তো হুমায়ুন কবীরই জানালেন, একবার নয় তো, বেশ ক’বারই বিভিন্ন পাঁচতারা হোটেলে ওনার সঙ্গে দেখা করেছেন কমরেড সেলিম, মানে মন বুঝতে একবার নয়, মুর্শিদাবাদের কোন আসন থেকে হুমায়ুন কবীর ওনাকে জিতিয়ে আনতে পারে, তার বিনিময় মূল্য কী বা কত সেটা জানতেই গিয়েছিলেন। যদি তা না হয়, মানে হুমায়ুন কবীরও তো একেবারেই বিশ্বাসযোগ্য কেউ নন, তাহলে কমরেড সেলিমের তো বলা উচিত ছিল, উনি মিথ্যে বলছেন, আমি ওই একবারই গিয়েছিলাম। না বলেননি, দেঁতো হাসি হেসে জানিয়েছেন যে, আমি সব কথার জবাব দিতে যাব কেন? নিশ্চয়ই না, কিন্তু কেউ যদি আপনাকে চোর বলে, অন্তত একবারের জন্যও তো বলা উচিত যে, আমি চুরি করিনি। না উনি বলবেন না, কারণ উনি আজ সেই পক্ষে, যেভাবে হোক মমতাকে হারাও, কারণ খুব ভালো করেই জানেন যে মমতা হারলে বিজেপি আসবে, আসবেই, অন্য কোনও বিকল্পের কথা পাগলেও ভাববে না। হ্যাঁ, উনি সেটাই চান, আর বোনাস হিসেবে পেতে চান একটা এমএলএ আসন। কাজেই মজিদ মাস্টার যা বোঝেন, তা উনি জানেন, বোঝেনও, কিন্তু ওই যে মমতাকে হারানোর স্বপ্ন, উনি না পারলে কী হবে? বিজেপি পারুক, সেই লক্ষ্যেই কাজ করে যাচ্ছেন কমরেড সেলিম। আমরা আমাদের দর্শকদের জিজ্ঞেস করেছিলাম যে, মজিদ মাস্টার, সিপিএম এর একদা ডাকসাইটে নেতা বলেছেন বিজেপিকে হারাতে তৃণমূলকে ভোট দেব, কিন্তু সেই একই কথা সিপিএম রাজ্য সম্পাদক কমরেড সেলিম কেন বোঝেন না? শুনুন মানুষজন কী বলেছেন।
সবটাই কি সিরাজের হেরে যাওয়ার গল্প? না তা নয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, ফাসিস্ত হিটলার একের পর এক দেশ দখল করছে। ওদিকে কমিউনিস্ট রাশিয়া স্তালিন আর ইংল্যান্ডের চার্চিলের সাপে নেউলে সম্পর্ক। আমেরিকার সঙ্গেও তাই। কিন্তু হিটলারকে হারাতে মিত্র শক্তিতে এসেছিলেন কমরেড স্তালি, রাশিয়া লড়েছিল কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে, হিটলার হেরেছিল। হ্যাঁ, ফাসিস্তদের বিরুদ্ধে একসঙ্গে না লড়লে জার্মানি, ফ্রান্স হিটলারের দখলে যায়। আর একসঙ্গে লড়ে হিটলারকে হারিয়ে দেওয়া যায়, ফাসিস্তদের রুখে দেওয়া যায়, এই শিক্ষা ইতিহাসের, কমরেড সেলিমের সেই শিক্ষাও নেই।
দেখুন আরও খবর:








