বাংলার কত মানুষ আমিষ খান? হিসেব বলছে ৯৮.৫ শতাংশ। এখানে ট্রেন চালু করা হল, সেখানে আমিষ নেই, চাপ এল, সামনে ভোট, আমিষ এল, না মাছ নয়, ব্রয়লার মুরগি। অথচ মিডিয়ার রিপোর্ট দেখুন, যেন অসাধারণ আমিষ পদ সব আনা হয়েছে, তাঁরা লিখছেন তুলতুলে নরম মুরগির মাংস? কী করে জানলেন? পিআরও সাহেব ডেকে খাইয়েছেন? মাছ নয় কেন? ক্যাটারিং তো বাংলার বা অসমের, তাহলে মাছ নেই কেন? এসবের জবাব পাবেন না। এবারে প্রকাশ্যে মাছ, মাংস বিক্রি করা যাবে না, বিহারে এ ফতোয়া জারি করল নীতীশ কুমারের সরকার। রাজ্যের উপমুখ্যমন্ত্রী বিজয়কুমার সিন্হা ঘোষণা করেছেন, রাজ্যের কোথাও প্রকাশ্যে মাছ, মাংস বিক্রি করতে পারবেন না কেউ। নতুন নিয়ম চালু হলে শুধুমাত্র লাইসেন্সধারী দোকানদারেরাই মাছ, মাংস বিক্রি করতে পারবেন। তো বিহারে আমিষ কতজন খান? ৯২.৪৫ শতাংশ, হ্যাঁ, তথ্য তাই বলছে। শিক্ষা নেই, স্বাস্থ্য নেই, খাবার নেই সবার, দেশের সবথেকে বেশি পরিযায়ী শ্রমিক সেই রাজ্য থেকে বাইরে যায়, রিভার্স মাইগ্রেশন, মানে বিহারে পরিযায়ী শ্রমিকদের যাওয়ার সংখ্যা শূন্য। সেই বিহারে ইস্যু কী? ইস্যু হল মাছ আর মাংস। যেখানে ৯২ শতাংশ মানুষ আমিষ খায়, সেখানে এই উন্মাদেরা ফতোয়া দিচ্ছে আমিষ খবারের বিরুদ্ধে। প্রকাশ্যে গোমূত্র বা গোবর বিক্রি হবে, কিন্তু মাছ বা মাংস বিক্রি চলবে না। সেটাই বিষয় আজকে, শুভেন্দুবাবুরা ক্ষমতায় এলে মাছ, মাংস বিক্রেতাদের লাইসেন্স নিয়ে বাজারে বসতে হবে?
গত বছরের মার্চে উত্তরপ্রদেশ সরকার ধর্মীয় স্থানের ৫০০ মিটারের মধ্যে মাংস বিক্রির উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। সমস্ত জেলাশাসককে এ বিষয়ে কড়া নির্দেশ দিয়েছিল যোগী আদিত্যনাথ প্রশাসন। গত সেপ্টেম্বরে দিল্লির চিত্তরঞ্জন পার্কে মাছের বাজার বন্ধ করার হুমকি দিয়েছিল ওই হিন্দুত্ববাদী গুন্ডারা, রাজস্থানে রেস্তঁরাতে মাছ বা মাংস সার্ভ করা হলে, বাইরে দোকানের মালিকের নাম ধাম লেখার ফতোয়া জারি আছে। বাবা রামদেব থেকে জগগি বাসুদেবের মতো গডম্যানেরা ‘আমিষ খেলে পাশবিক প্রবৃত্তি বাড়ে’, এমন কথা বলেই চলেছেন। প্রধানমন্ত্রী জি-টোয়েন্টি সামিটে বিদেশি অতিথিদের খাবারের তালিকাতে একটা আমিষ পদও রাখেননি, যেন দেশের আদত জনসংখ্যার বেশিরভাগই নিরামিষ খান, তাই দেশের মধ্যে আন্তর্জাতিক মঞ্চেও নিরামিষ, কিন্তু তথ্য বলছে দেশের ৭৮-৮০ শতাংশ মানুষ আমিষভোজী। কিন্তু ২০-২২ শতাংশ মানুষের খাবারের অভ্যাসকে বাকিদের উপরে চাপানো হচ্ছে। দেখবেন উত্তর ভারতে বা বিভিন্ন জায়গাতে লেখা থাকে ‘শুদ্ধ শাকাহারী ভোজনালয়’, ট্রেনের ভেজ খাবারে লেখা থাকে ‘শুদ্ধ শাকাহারী ভোজন’। মানে খুব পরিস্কার, নিরামিষ খাবার হল ‘শুদ্ধ’, আমিষ ‘অশুদ্ধ’, ‘অপবিত্র’। দেখবেন কোথাও লেখা হয়না ‘শুদ্ধ আমিষ ভোজন’, কারণ আসলে ওই একই। নিরামিষ বা আমিষ খাবারের চয়েস এক ব্যক্তিগত ব্যাপার, কিন্তু তা ‘শুদ্ধ’, তা ‘পবিত্র’ ইত্যাদি ব্রাকেটে ফেলাটা একধরণের রাজনীতি, যা এই দুই গুজরাতির ব্যক্তিগত চয়েস, তা দেশের উপরে চাপানো হচ্ছে, বাঙালিদের উপরে চাপানো হচ্ছে।
আরও পড়ুন: Aajke | রাজ্যসভায় ৫ আসনে তৃণমূলের কারা? বিজেপির কে যাচ্ছেন?
এই ফতোয়া নিয়ে দু’টো প্রশ্নের উত্তর জানাটা খুব জরুরি- (১) এই ফতোয়া দিয়ে আরএসএস-বিজেপির লাভ কী? (২) এই ফতোয়া কি কেবল বাঙালির জন্য? এই ফতোয়ার আসল উদ্দেশ্য হাইজিন, বা দৃশ্য দূষণ ইত্যাদি নয়। যদি তাই হত, তাহলে বহু কালী মন্দিরে এখনও বলি হয়, শয়ে শয়ে ছাগল, হাঁস বলি হয়, প্রকাশ্যেই হয়, বিজেপির সাধ্য আছে সেখানে এই বলি নিয়ে একটা কথা বলার? এই খাবার নিয়ে বলার আসল কারণ হল, সেই এক হিন্দু-মুসলমান ন্যারেটিভটাকে চাগাড় দিয়ে তোলা, আমিষ মানে ‘অশুদ্ধ’, গোস্ত মানে ‘গোমাংস’, মানে মুসলমান, মানে ওই যে ওরা, কেবল গরু খায়, সেখানেই নিয়ে গিয়ে দাঁড় করাতে চায়। আর তাই খেয়াল করুন, রাজস্থানের ফতোয়া, আমিষ বিক্রি করলে বাইরে মালিকের নাম চাই, ‘ঝটকা’ না ‘হালাল’ লেখা চাই। হ্যাঁ, এগুলোই আসল লক্ষ্য। বিহারেও সেটাই করা হচ্ছে, কোথায় এই আইনের কড়াকড়িটা দেখব? দেখব সেই জায়গাগুলোতে, যেখানে মুসলমান জনসংখ্যা বেশি। যদি ভেবে থাকেন, আমাদের রাজ্যে এমন ফতোয়া আসবে না, তাহলে ভুলে যান, কারণ ৯২ শতাংশ আমিষ খায় যে রাজ্যে, সেখানে এমন ফতোয়া জারি করা গেলে, ৯৮ শতাংশ আমিষ খায় যে পশ্চিমবঙ্গের মানুষ, সেখানেও এই ফতোয়া অনায়াসে জারি করা যাবে। আমরা আমাদের দর্শকদের জিজ্ঞেস করেছিলাম, বিহারে বিজেপির সরকার ফতোয়া দিয়েছে প্রকাশ্যে মাছ, মাংস বিক্রি করা বন্ধ, মাছ, মাংস বিক্রেতাদের আগে লাইসেন্স নিতে হবে তারপরে দোকান খুলতে হবে। এটা বাংলাতে হলে আপনারা মেনে নেবেন? শুনুন মানুষজন কী বলেছেন।
নিরামিষ লাউ, কুমড়ো, উচ্ছে, মুলো প্রকাশ্যে বিক্রি হবে আর ‘মাছে ভাতে বাঙালি’কে মাংস বিক্রি করার জন্য লাইসেন্স নিতে হবে, দোকানের সামনে পর্দা টাঙাতে হবে! হ্যাঁ, সেই দিনটা নিয়ে আসতে চান এই শমীক–শুভেন্দু–দিলীপের বিজেপি। এটাকে রুখতে হবে। ‘গর্বের সঙ্গে বলো হিন্দু’, হ্যাঁ, যিনি বলেছিলেন সেই বিবেকানন্দ তাঁর গুরুভাইদের লিচু গাছের ডাল ভেঙে মাংস গেঁথে ‘কাঠি কাবাব’ খাইয়ে ছিলেন, তিনি মারা যাবার দিনে সকালে বেলুড় বাজার থেকে ইলিশ আনিয়ে নিজে রান্না করে খেয়েছিলেন, গুরুভাইদের খাইয়েছিলেন। সেই বাঙালিকে হাইকোর্ট দেখাতে এলে আমরা তাদের গঙ্গার জলে, পুকুরে, ডোবায়, নর্দমায় ফেলবো। হ্যাঁ, এটাই হবে আমাদের জবাব।
দেখুন আরও খবর:








