Saturday, May 23, 2026
HomeScrollFourth Pillar | আমেরিকা-বাংলাদেশ চুক্তি, আজ না কাল ইউনুস সাহেবকে জবাবদিহি করতে...
Fourth Pillar

Fourth Pillar | আমেরিকা-বাংলাদেশ চুক্তি, আজ না কাল ইউনুস সাহেবকে জবাবদিহি করতে হবে

আমেরিকার সঙ্গে চুক্তি কি সত্যিই বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের উপর এক ধরণের বিদেশি হস্তক্ষেপ?

Written By
অনিকেত চট্টোপাধ্যায়

২০২৪-এ বাংলাদেশের জুলাই অভ্যুত্থান, এক রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থান, শেখ হাসিনাকে পালাতে হল, আক্ষরিক অর্থে প্রাণের ভয়ে। এলেন শান্তিতে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ প্রফেসর মহম্মদ ইউনুস। এক চরম সাংবিধানিক, রাজনৈতিক শূন্যতার মধ্যে দায়িত্ব নেওয়া সেই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান লক্ষ্য ছিল, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব একটা সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি করা, নির্বাচন করানো আর নির্বাচিত দলের কাছে ক্ষমতা দিয়ে সরে আসা। কিন্তু আমরা কী দেখলাম? তাঁরা ক্ষমতায় আসলেন, কিছু ছাত্রনেতা ক্ষমতায় গেলেন, কিন্তু দেশের দায়িত্বে নাকি এক তৌহিদি জনতা, এক উন্মাদ মব, মবোক্রাসির সেই ভয়ঙ্কর ছবি আমরা দেখেছি। তারপর ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে, যখন বাংলাদেশ বহুপ্রতীক্ষিত সাধারণ নির্বাচনের ঠিক দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে, তখন আমেরিকার সাথে এক বিশাল আর দীর্ঘমেয়াদী বাণিজ্য চুক্তি সই করল প্রফেসর ইউনুসের সরকার, যে সরকারের মেয়াদ তখন দশ দিনেরও কম। কেন? এক নির্বাচিত সরকার এসে কি এই কাজ করতে পারত না? ১০ দিনে কোন বিরাট ক্ষতি হয়ে যেত? নাকি যাওয়ার আগে ঘটি বাটি বেচে দেওয়ার কাজটাই করে গেলেন ইউনুস সরকার? বিশ্বজুড়ে আলোচনার ঝড় উঠছে, বাংলাদেশে এই আলোচনা শুরু হয়েছে, আর আজ হোক বা কাল, প্রফেসর ইউনুসকে এই তড়িঘড়ি চুক্তি পত্রে সই করার কারণটা জানাতেই হবে। কেন এক অন্তর্বর্তীকালীন সরকার নির্বাচনের ক’দিন আগে এমন এক নীতি নির্ধারণী চুক্তি করল যা আগামী অন্তত ১৫ বছর বাংলাদেশের অর্থনীতি ও রাজনীতিকে প্রভাবিত করবে? এই চুক্তি কি সত্যিই দেশের উপকারে আসবে, নাকি এটা সার্বভৌমত্বের উপর এক ধরণের বিদেশি হস্তক্ষেপ? আসুন সেই আলোচনাতে আসা যাক।

৫ অগাস্ট শেখ হাসিনার পদত্যাগ, বাংলাদেশে এক অভূতপূর্ব পরিস্থিতি, সংসদ ভেঙে দেওয়া হল আর সেই সাংবিধানিক শূন্যতার সময়ে বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ‘ডকট্রিন অফ নেসেসিটি’ বা প্রয়োজনীয়তার নীতি প্রয়োগ করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গড়ে তোলার রায় দেয়। ৮ অগাস্ট ডঃ ইউনুস শপথ গ্রহণ করেন আর ঢাক ঢোল বাজিয়ে শুরু হয় এক উচ্চাভিলাষী সংস্কারের কাজ। এটা ঘটনা যে, উত্তরাধিকারসূত্রে তাঁরা পেয়েছিলেন এক বিধ্বস্ত অর্থনীতি, বিরাট মুদ্রাস্ফীতি আর প্রায় তলানিতে ঠেকে যাওয়া বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। ২০২৪ সালের জুলাই থেকে ডিসেম্বর এর মধ্যে বাংলাদেশের প্রায় ২.১ মিলিয়ন কর্মসংস্থান মুছে গেল, যার মধ্যে ৮৫ শতাংশই ছিল বস্ত্রশিল্পের নারী কর্মী। বিশ্বব্যাঙ্ক বাংলাদেশের জিডিপি বৃদ্ধির পূর্বাভাস ৫.৭ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৪ শতাংশে নামিয়ে আনে। এমন এক টালমাটাল অর্থনৈতিক অবস্থায় আন্তর্জাতিক শক্তির সমর্থন আদায় আর অর্থনীতির চাকাটাকে যেভাবেই হোক সচল রাখাই ছিল ডঃ ইউনুসের প্রথম কাজ। সেই প্রেক্ষাপটেই আমেরিকার সাথে দীর্ঘ নয় মাস ধরে চলছিল আলোচনা, নাকি তারই ফলশ্রুতিতে ২০২৬ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি ওয়াশিংটনে ‘অ্যাগ্রিমেন্ট অন রিসিপ্রোকাল ট্রেড’ বা এআরটি (ART) চুক্তিটা সই করা হয়। কিন্তু প্রশ্ন তো এখনও থেকেই যাচ্ছে যে, আর পাঁচদিন পরে এক নির্বাচিত সরকারের প্রধানের নেতৃত্বে সেই চুক্তি সই করলে কোন পাহাড় ভেঙে পড়ত? না, সময়ের সেরকম কোনও বাধ্যবাধকতা ছিল না, কিন্তু সই করা হল, যা বুঝিয়ে দেয় যে, যাঁরা সই করলেন তাঁদের নির্দিষ্ট লক্ষ্য ছিল। আচ্ছা তাঁদের না হয় নির্দিষ্ট লক্ষ্য ছিল, স্বার্থ ছিল, কিন্তু আমেরিকা কেন এক তদারকি সরকারের সঙ্গে তড়িঘড়ি করে চুক্তিতে গেলেন? সেখানে কোন বাধ্যবাধকতা কাজ করল? এমন কি আছে সেই চুক্তিতে যা এত তড়িঘড়ি করে সই করানোটা জরুরি ছিল? আসুন সেটা দেখা যাক।

আরও পড়ুন: Fourth Pillar | দেশ কি একাই চালাবে বিজেপি?

আমেরিকার সাথে এই বাণিজ্য চুক্তি মূলত ‘পারস্পরিকতা’ বা রেসিপ্রোসিটি নীতির উপর ভিত্তি করে তৈরি। মানে আমেরিকা কিছু ছাড় দেবে, বিনিময়ে বাংলাদেশকেও তাদের বাজারের একটা বড় অংশ আমেরিকার জন্য উন্মুক্ত করতে হবে। চুক্তির সবচেয়ে আলোচিত দিকটা হল- শুল্ক হার। আমেরিকা বাংলাদেশি পণ্যের উপর থেকে পারস্পরিক শুল্ক (Reciprocal Tariff) ২০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৯ শতাংশ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবে এখানে একটা বড়সড় অঙ্কের ফাঁকিবাজি আছে, এই ১৯ শতাংশ শুল্কের সাথে আগের থেকেই এক্সিস্টিং ট্যারিফ ১৫ শতাংশ, মানে সাধারণ শুল্ক যোগ করলে মোট শুল্ক হার দাঁড়ায় প্রায় ৩৪ শতাংশ। সেটা যোগ হবে কিনা, তা এখনও জানা নেই। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটা হল, রেডিমেড গার্মেন্টস সেক্টরকে নিয়ে। বাংলাদেশ যদি আমেরিকার পাঠানো তুলো বা আর্টিফিসিয়াল ফাইবার দিয়ে পোশাক তৈরি করে, তবে সেই পোশাক রফতানির ক্ষেত্রে আমেরিকা ‘শূন্য শতাংশ’ পারস্পরিক শুল্ক সুবিধা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। একে বলা হচ্ছে ‘কটন-ফর-গার্মেন্টস’ মডেল। আপাতদৃষ্টিতে এটা দারুণ লাভজনক মনে হবে, আবার ভারতের তুলো ব্যবসা মার খাবে, তাহলে তো সোনায় সোহাগা! কিন্তু ভেবে দেখেছেন, এর ফলে বাংলাদেশের টেক্সটাইল খাতের সাপ্লাই চেইন পুরোপুরি আমেরিকার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হল! এখন বাংলাদেশ ভারত বা চীন থেকে কম দামে সুতো, তুলো আমদানি করে, বার্গেইন করেই দাম ঠিক করে, কিন্তু জিরো-ডিউটি সুবিধা পেতে হলে এখন থেকে আমেরিকার ঠিক করা দামে আমেরিকার তুলো কিনতে বাংলাদেশ বাধ্য হবে। আর তা না করলেই চুক্তিভঙ্গের দায়ে পড়বে বাংলাদেশ। বাণিজ্যিক বাধ্যবাধকতার তালিকায় কেবল পোশাক নেই, রয়েছে বিশাল অঙ্কের আমদানির প্রতিশ্রুতিও। এক্কেবারে ভারত মডেলে, সেখানেও মোদিজি দেশ বিক্রির জন্য প্রায় এরকম চুক্তিই করেছেন, বাংলাদেশ আগামী ১৫ বছরে প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলার মূল্যের আমেরিকান জ্বালানি পণ্য, বিশেষ করে এলএনজি (LNG) আমদানির চুক্তি করেছে, বাংলাদেশের জ্বালানি কম ছিল? এছাড়া কৃষি খাতে আগামী পাঁচ বছরে প্রায় ৩.৫ বিলিয়ন ডলারের গম, সয়াবিন, ভুট্টা এবং তুলা কেনার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এর বাইরেও বোয়িং কোম্পানি থেকে অন্তত ১৪টা উড়োজাহাজ কেনার এক বিরাট শর্ত রাখা হয়েছে, যার আর্থিক মূল্য প্রায় ২.৫ থেকে ২.৮ বিলিয়ন ডলার। এই পরিমাণ আমদানি দেশের রিজার্ভকে কোন জায়গায় নিয়ে গিয়ে দাঁড় করাবে? এবং প্রশ্নের মুখে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব। অর্থনীতিবিদ আনু মুহাম্মদ সমেত অনেক বুদ্ধিজীবী বলেছেন, এটা হল ‘অধীনতামূলক চুক্তি’, সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হল চুক্তিতে এমন কিছু ধারা রয়েছে যা সরাসরি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি আর স্বাধীন বাণিজ্যের অধিকারকে খর্ব করতে পারে। চুক্তি মানলে, বাংলাদেশ কোনো ‘অ-বাজার অর্থনীতি’ (Non-Market Economy) সম্পন্ন দেশের সাথে এমন কোনও বাণিজ্য চুক্তি করতে পারবে না, যা আমেরিকার জাতীয় বা অর্থনৈতিক নিরাপত্তার পরিপন্থী।

আমেরিকার ডেফিনেশনে চীন এবং রাশিয়া হলো অ-বাজার অর্থনীতির দেশ। মানে পরিষ্কার, বাংলাদেশ যদি ভবিষ্যতে চীন বা রাশিয়ার সাথে কোনও মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (FTA) করতে চায়, তবে আমেরিকার সাথে এই চুক্তিটা আপনা-আপনি বাতিল হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে আর আমেরিকা আবার তাদের ইচ্ছে খুশি মতন ট্যারিফ চাপাতে পারবে। প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কেনার ক্ষেত্রেও একই ব্যাপার। বলা হয়েছে, বাংলাদেশ আমেরিকার সামরিক সরঞ্জাম কেনার পরিমাণ বাড়াবে, আর একইসঙ্গে ‘নির্দিষ্ট কিছু দেশ’ মানে যাদের সাথে আমেরিকার স্বার্থের সংঘাত রয়েছে, তাদের থেকে সামরিক সরঞ্জাম হয় কিনবে না না হলে কমিয়ে দেবে। এদিকে বাংলাদেশ ঐতিহাসিকভাবে তার সামরিক সরঞ্জামের জন্য চীনের উপর অনেকখানিই নির্ভরশীল। এই চুক্তি কার্যকর হলে সেই পুরানো বন্ধুদের কাছ থেকে সরে আসতে বাংলাদেশ বাধ্য হবে, আবার দেখুন চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশ সীমান্তের ওপারে অবাধ তথ্য প্রবাহ, ‘ফ্রি ডেটা ট্রান্সফার’ করার জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, ফলে বাংলাদেশের নাগরিকদের তথ্য, ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব ঝুঁকির মুখে পড়বেই। সবচেয়ে রহস্যময়, সবচেয়ে বিতর্কিত, সবচেয়ে গোলমেলে বিষয় হলো চুক্তির সময়। ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। অথচ তার মাত্র ৭২ ঘণ্টা আগে, মানে ৯ ফেব্রুয়ারি ওয়াশিংটনে এই চুক্তি সই করা হল। কেন? কোনও উত্তর নেই।

দু-তিনটে বিষয়ে নজর দিন – (১) চুক্তির আগেই একটা নন-ডিসক্লোজার এগ্রিমেন্ট (NDA) সই করা হয়েছিল, যার ফলে চুক্তির অনেক মারপ্যাঁচ সাধারণ মানুষের অগোচরে রয়ে গিয়েছে, বাংলাদেশের মানুষ পুরোটা জানেনই না, চুক্তিতে কী কী আছে। (২) আমেরিকা থেকে যে গম বা জ্বালানি কেনার কথা বলা হয়েছে, তার দাম বিশ্ববাজারের তুলনায় অনেক বেশি হবেই, সেটা আজ পরিষ্কার। কিন্তু কেন? (৩) আমেরিকার কৃষি পণ্যের জন্য বাজার খুলে দেওয়ার ফলে এক্কেবারে ভারতের মতো বাংলাদেশের স্থানীয় কৃষকরা অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়বেন, দেশিয় কৃষি ব্যবস্থা করপোরেট পুজির হাতে বন্দী হয়ে পড়বে (৪) চীন ও রাশিয়ার সাথে সম্পর্ক খারাপ হবেই, ফলে বাংলাদেশকে তার ভারসাম্যপূর্ণ বৈদেশিক নীতি থেকে সরে আসতে হবে। এক অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পক্ষে কি এমন চুক্তি করা নৈতিকভাবে সঠিক হয়েছে? ‘ডকট্রিন অফ নেসেসিটি’ হয়তো তাদের আইনি সুরক্ষা দিচ্ছে, কিন্তু গণতান্ত্রিক ম্যান্ডেট ছাড়া এমন সিদ্ধান্ত সবসময়ই বিতর্কের কেন্দ্রে থাকবে। এখন দায়িত্বটা তো গিয়ে পড়বে নবনির্বাচিত সরকারের উপর। তারা কি এই চুক্তিগুলো মানবে, নাকি এই ‘অধীনতামূলক’ শর্তগুলো থেকে বেরিয়ে আসার জন্য নতুন কোনও কূটনৈতিক যুদ্ধের সূচনা করবে? তার জন্য হাত গুনতে হবে না, এই নতুন সরকার এই চুক্তিকে অমান্য করতে পারবে না, আর তাই এর বোঝাও বইতে হবে। কিন্তু প্রফেসর ইউনুসকে এর জবাবদিহি আজ নয় কাল করতেই হবে, বাংলাদেশের মানুষ বিশ্বাস করেছিল, সেই বিশ্বাসের মর্যাদা তিনি রাখলেন কি?

দেখুন আরও খবর:

Read More

Latest News

https://www.annabelle-candy.com/about/ JUARA88 situs slot gacor WDBOS slot gacor mix parlay idn slot https://www.annabelle-candy.com/about/ traveltoto toto slot situs toto slot gacor BWO99 poker idn poker situs slot gacor toto slot MySlot188 toto slot toto SlotPoker188 situs toto istanaslot istanaslot sohibslot tikus4d https://tikus4dlink.com situs slot gacor