আমাদের পুরাণ, উপনিষদ, গল্প, উপন্যাসে বদ লোকেরা বিপদ দেখলে বা নিজের আসল চেহারাকে লুকোনর জন্য মাঝে মধ্যেই মুখোশ পরে। আড়াল থেকে যুদ্ধ করা, ছদ্মবেশে আসা, ইত্যাদি যা কিছু দেখবেন ওই বদ লোকেদের কারবার। মহিষাসুর, সে’ও যুদ্ধে গিয়ে নানান ছদ্মবেশ ধরে লড়াইয়ের চেষ্টা করেছে, এরকমটা পৃথিবীর মিথোলজিতে পাওয়া যায়, মানুষ নিজের চেহারা লুকিয়ে অন্য চেহারায় অন্যায় করে। বিজেপিরও অনেক মুখোশ আছে, সেও তার চেহারা লুকিয়ে রেখেই এই রাজ্যে সেই অন্যায় কাজগুলো একের পর এক করেই চলেছে। আমরা ভাবছিলাম নির্বাচন কমিশন এক সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান, এখন দেখছি সে এক্কেবারে ডাই হার্ড বিজেপি, সে সকাল থেকে রাত অবদধি যা যা করছে সবটাই বিজেপির হয়ে করছে, বিজেপির জন্যই করছে।
আমরা ভেবেছিলাম রাজ্যপাল এসেছেন, কিন্তু চুপ করে বসে আছেন কেন? তো সেই লাটের বাট রাজ্যপাল ঠিক নির্বাচনের আগেই নিজের মুখোশ খুলে এক্কেবারে বিজেপির মতোই প্রচারে নেমে পড়েছে। আহারে, বাংলার উন্নয়ন কেন হচ্ছে না? বাংলা কেন জিডিপিতে পিছিয়ে পড়ছে? তা নিয়ে এক্কেবারে কেঁদে আকুল। সেই লাটের বাট জানেই না যে, ওই সরকারি হিসেবে এখন কলকাতা দেশের তিন নম্বর মহানগর, যার জিডিপি এখন তিন নম্বরে। হ্যাঁ, বেঙ্গালুরুকেও ছাপিয়ে গিয়েছে। সেই লাটের বাট এও জানেন না যে, গুজরাত বা মহারাষ্ট্রের গোটা দশেক মোদি–শাহের কৃপা ধন্য ব্যবসায়ী গোষ্ঠির সম্পদকে বাদ দিলে গুজরাত বা মহারাষ্ট্র জিডিপির হিসেবে বাংলার তলায় চলে যাবে, মানে ওই দুই গুজরাতি দেশের ক’জন ফড়ে শিল্পপতির অ্যাকাউন্টে টাকা ভরে ভরে দেবেন, তারপরে বলবেন, ‘দেখেছো কত উন্নয়ন!’ এ রাজ্য থেকে সরকারি সংস্থা, রাষ্ট্রায়ত্ব সংস্থার হেডকোয়ার্টারগুলো সরিয়ে নিয়ে চলে যাবেন অন্য রাজ্যে। তার পরে বলছেন, ‘দেখেছো কোনও উন্নয়ন নেই!’ এবং সেই কথা কে বলছেন? এক লাটের বাট যিনি এ রাজ্যে এসেছেন ক’দিন হল, দায়িত্ব নিয়েই এসেছেন বিজেপির হয়ে প্রচার করার, দায়িত্ব নিয়েই এসেছেন এ রাজ্যের সরকারের পিছনে কাঠি করার, এসে বুকনি ঝাড়ছেন। আচ্ছা অসমেও তো নির্বাচন হল, অসমেও তো একজন রাজ্যপাল আছেন, তো তাঁকে বলতে শুনেছেন হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট ইনডেক্সে অসম ২৯টা রাজ্য আর কেন্দ্র শাসিত অঞ্চলের মধ্যে ২৪ নম্বরে। বলেছেন সেখানকার রাজ্যপাল? পার ক্যাপিটা নেট ডোমেস্টিক প্রডাক্টে ২৩-এর মধ্যে ১৮তম। গড় গ্রামীণ মজুরিতে ১৮ টা রাজ্যের মধ্যে নবম। শিশু মৃত্যুর হারে ২৯-এর মধ্যে ১৯, শূন্য থেকে পাঁচ বছরের শিশুদের মধ্যে খর্বকায় শিশুদের তালিকাতে ২৯-এর মধ্যে ২০ নম্বরে, বেসিক ভ্যাক্সিনেশন দেওয়ার তালিকাতে ২৯-এর মধ্যে ২৬-এ, জন্ম দিতে গিয়ে মায়ের মৃত্যু হারে ২৯-এর মধ্যে ১৯ তম, ১৫ থেকে ২৯ বছরের মহিলাদের শিক্ষার ক্ষেত্রে ২৯-এর মধ্যে ১৭। হ্যাঁ, এগুলো সব অসমের তথ্য, যা বের করেছে দেশের সরকার। কই অসমের রাজ্যপাল নির্বাচনের আগে এ নিয়ে একটা কথাও বলেছেন? বিহারের নির্বাচনের আগে সে রাজ্যের লাট সাহেব একটা কথাও বলেছেন? বলেননি। কেন বলেননি? কেন পশ্চিমবঙ্গেই বলছেন? বলছেন কারণ তিনি ওই লাটের বাটের মুখোশটা পরে আছেন, আসলে উনি একজন বিজেপির প্রচারক।
এরকম মুখোশ এক জায়গাতে নয়, মুখোশের ফ্যাক্টরি তো ওই উনিজির আছে। ওধারে এপস্টিন ফাইলে অভিযুক্তকে মন্ত্রিসভাতে রাখবেন, এধারে মহিলা বিল নিয়ে কেঁদে মরবেন, সেই উনিজি এসে আগে ‘ঝ্যায় শ্রী রাম’, ‘ঝ্যায় ঝ্যায় শ্রী রাম’ বলে কান ফাটানো স্লোগান দিতেন, এখন বলছেন ‘জয় মা কালী’। তার মানে কি এটা যে, উনি কালী ভক্ত হয়ে গিয়েছেন? আসলে উনি কালী ভক্তের মুখোশ পরে ভোট ভিক্ষেতে নেমেছেন। সেদিন আবার আরেক কান্ড, উনিজির কী দুঃখ, বাংলা কেন মাছে স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়, মানে এ রাজ্যে কেন অন্ধ্র, বিহার থেকে মাছ আসে। ওনার জানাই নেই গুজরাতে পেঁয়াজ মহারাষ্ট্র থেকে আসে, গুজরাতে তুলো মহারাষ্ট্র থেকে আসে, গুজরাটে তেঁতুল তামিলনাড়ু থেকে যায়, গুজরাটে ডাল মধ্যপ্রদেশ, উত্তরপ্রদেশ এমনকি বাংলা থেকেও যায়। কেন? কারণ ওনারা যা খান, ওই ধোকলা, রোটলা, পোটলা ইত্যাদি, তার চেয়ে কম ওনারা উৎপাদন করেন। কাজেই একটা রাজ্য যা খায় তা উৎপাদন না করতে পারাটা নতুন কিছু নয় অস্বাভাবিকও নয়। আমাদের রাজ্যে ‘পার হেড ফিস কনজামশন’, মাথা পিছু মাছ খাওয়ার হার সবচেয়ে বেশি, তাই আমাদের এখানে মাছের চাহিদা বেশি, বিরাট উৎপাদনের পরেও সেই মাছ আনাতে হয়। কিন্তু কথা সেটা নয়, কথা হল বাঙালির মাছ খাওয়া নিয়ে উনি চিন্তিত? সেই উনি, যার দল হামলা করে মাছের দোকান বন্ধ করে, মাংসের দোকান তুলে দেয়; সেই দল, যারা দেশ জুড়ে মানুষকে নিরামিষ খাওয়ার ফতোয়া দেয়, যারা বাঙালিদের এই আমিষ খাওয়াকে ঘৃণা করে। আসলে উনি নির্বাচনের আগে আরেকটা মুখোশ পরার চেষ্টা করছেন, উদার হবার জন্য উদার মুখোশ, এক ১০০ শতাংশ ফাসিস্ট এখন তাল বুঝে উদার হবার চেষ্টা করছেন।
আরও পড়ুন: Fourth Pillar |এত প্রচার, এত মিছিল, এত প্রতিশ্রুতি, কিন্তু এর পরেও বিজেপি কেন অনেক পিছিয়ে?
আবার ধরুন স্বপন দাশগুপ্ত, সারাটা বছর দিল্লিতেই থাকেন, এখন গলা খাঁকারি দিয়ে ‘সুনার বাংলা’ গড়ার জন্য রাসবিহারীতে নেমে পড়েছেন। নামুন, গণতান্ত্রিক অধিকার, কিন্তু তিনি নাকি অবাক, হ্যাঁ খুব অবাক, মাছ-মাংস এসব আবার নির্বাচনের ইস্যু হয় নাকি? তৃণমূল এই মাছ মাংস নিয়ে ভোটে লড়ছে? উনি নাকি সাংবাদিক! জানেনই না ওই দিল্লিতে বিজেপি হনুমান দলের গুন্ডারা সিআর পার্কের মাছের দোকানে হামলা চালিয়েছিল, উনি জানেন না যে দিল্লিতে নবরাত্রির সময়ে, মানে দুর্গাপুজোর সময়ে মাছ-মাংস, দোকান-রেস্তঁরা সব বন্ধ করে দেওয়া হয়? না, উনি ন্যাকা চৈতন্য, এসব কিছুই জানেন না। ভুল ভাবছেন উনি জানেন, উনি মুখোশ পরেছেন, এক উদার হবার মুখোশ। মাত্র এক বছর আগে বিহারে তেজস্বী যাদব মাছ খেয়েছিলেন, তাও আবার নবরাত্রির সময়ে, অন্য কেউ নয়, স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন নবরাত্রি, শ্রাবণ মাসের মতো পুণ্য দিনগুলোতেও যাঁরা আমিষ খান, তাঁদের ভোট দেবেন? বিহারে অন্য মুখোশ, বাংলাতে আরেক মুখোশ, শঠ প্রবঞ্চকেরা রোজ, ঘন্টায় ঘন্টায় মুখোশ বদলায়। প্রধানমন্ত্রী শ্রাবণ মাসে নিরামিষ খাবার কথা বলতেই পারেন, কিন্তু যাঁরা আমিষ খায় তারা পাপ করছে? তাঁর সীমাহীন অজ্ঞতার বহু কাহিনি আমরা জানি। সেই অজ্ঞতার পরিচয় আবার দিলেন। নবরাত্রি আর শ্রাবণ মাসের পুণ্য দিনে আমিষ খাবার যারা খায় তারা যে পাপী, সেই কথা বললেন। এর আগে নকড়া-ছকড়া বিজেপি আরএসএস নেতারা বলত, বিহারে সেটা প্রধানমন্ত্রী নিজেই বলেছিলেন। শুনেই আমার বিবেকানন্দের কথা মনে পড়ল, উনি বলেছিলেন, “ওই যে হিমালয় পাহাড় দেখছ, ওরই উত্তরে কৈলাস, সেথা বুড়ো শিবের প্রধান আড্ডা। ওই বুড়ো শিব ডমরু বাজাবেন, মা কালী পাঠা খাবেন, আর কৃষ্ণ বাঁশী বাজাবেন,—এদেশে চিরকাল। যদি না পছন্দ হয়, সরে পড় না কেন?” হ্যাঁ, পাঁঠা খাওয়া না পছন্দ হলে সরে পড়ুন, ফালতু কথা বার্তা বলা বন্ধ করুন।
মানুষ ভোট দিয়েছে, কাজের হিসেব দেখিয়ে ভোট চান, মানুষ কী খাবে, কী খাবে না- তা ঠিক করে দেওয়ার জ্যাঠামশাই আপনি নন। যে দেশ আপনারা চালাচ্ছেন, তার সম্বন্ধে একটু জেনে নিন। ২০২১-র হিসেব অনুযায়ী আমাদের দেশের ৭১ শতাংশ মানুষ আমিষ খায়, মাংস খায়, মানে খেতে চায়, বিরিয়ানি খেতে চায়, আর ২৯ শতাংশ মানুষ নিরামিষাষি। এবং যতই ভেজ-ভেগান এসবের কথা চলুক না কেন, আমিষ খাবারের কদর বেড়েই চলেছে। ঘরে ১০০ শতাংশ নিরামিষ মানুষ জন সন্ধ্যেতে মাটন বিরিয়ানী মেরে দেয় টুক করে। আমিষ খায় বা খেতে চায়, যারা তাদের তালিকার মাথায় তেলঙ্গানা, পশ্চিমবঙ্গ, অন্ধ্রপ্রদেশ, ওড়িশা, কেরল, একটাও আপনাদের দখলে নেই। মোটা ভাইদের দেশ গুজরাতে ১০০-তে ৬০ জন নিরামিষ আর ৪০ জন আমিষ, যোগীজির উত্তরপ্রদেশে ৫৩ শতাংশ আমিষ, আর ৪৭ শতাংশ নিরামিষ। গোটা দেশের বেশির ভাগ মানুষ আমিষ খায় বা খেতে চায় বলেই নিরামিষ খাবার নিয়ে ঠাট্টা করা যায় না, আবার বিরিয়ানি মানেই মুসলমানদের খাবার, এরকমও বলে এই ভক্তকূল। কাজেই এই বাংলাতে সেটা তো নির্বাচনী ইস্যু হবে, স্বপন দাসগুপ্ত গলা খাঁকারি দিয়ে ওসব কোনও ইস্যু না বললেও হবে, না বুঝলে ন্যাড়া বাগচীর ছবি দেখুন, তিনি মাছ ঝুলিয়ে নির্বাচনী প্রচারে নেমেছেন, আসলে একটা মুখোশ পরার চেষ্টা চালিয়েছেন, সেই উদার হবার এক চেষ্টা।
হ্যাঁ, সেই কবে থেকে বাংলা জয়ের নানান চেষ্টা করতে করতে এই ২০২৬-এ এসে বিজেপি বুঝেছেন যে বাংলা দীর্ঘ লড়াই লড়েছে সনাতনীদের বিরুদ্ধে, কনজারভেটিভদের বিরুদ্ধে, যা কিছু জ্ঞান তা শাস্ত্র গ্রন্থেই আছে আর আমরাই তার রক্ষা কর্তা, এই কথা বলা সনাতনীদের বিরুদ্ধে বাংলার নবজাগরণ এসেছিল, নতুন ভারতের কল্পনা করেছিলেন বিবেকানন্দ, যেখানে ব্রাহ্মণ্যবাদের বিরুদ্ধে একরাশ কথা আছে, রামমোহন থেকে বিদ্যাসাগর এই সনাতনীদের বিরুদ্ধেই লড়েছেন। কাজেই সেই ইতিহাস ভূমিতে এসে এবারে বিজেপির নতুন মুখোশ উদারবাদের মুখোশ। ওই যে আগেই বলেছিলাম, সমস্ত শঠ প্রবঞ্চকেরা মুখোশ পরে কার্য উদ্ধারের জন্য, রাবণ সন্ন্যাসীর ভেক ধরে নারী হরণের জন্য, মহিষাসুর ভেক বদলায় মা দুর্গাকে যুদ্ধে হারানোর জন্য, মেঘনাদ মেঘের আড়ালে থেকে আক্রমণ করে, বিজেপিও ঠিক তাই। তারা মেঘালয় থেকে নাগাল্যান্ড বা মিজোরামে গরুর মাংস নিয়ে কোনও কথা বলবে না, বলবে না গোয়াতে, কিন্তু উত্তর ভারতে তাঁদের গোরক্ষার জন্য বাহিনী আছে, মানুষকে পিটিয়ে মেরে গরু রক্ষার বাহিনী। এই বাংলা দখলে নেমে সেই মুখোশ বিজেপির অস্ত্র। হ্যাঁ, আমরা দেখছি, বাংলার মানুষ এই নওটঙ্কি দেখছেন, ৪ঠা মে’র পরে বুঝতে পারবেন হুট বলতে ঝুট দিল্লি থেকে এসে বাঙালির বুদ্ধিকে চ্যালেঞ্জ করাটা কোনও কাজের কথা নয়।
দেখুন আরও খবর:








