নয়াদিল্লি: অমিত শাহ যখন কলকাতায় দলীয়কর্মীদের আসন্ন নির্বাচনের আসনের লক্ষ্যমাত্রা বেঁধে দিলেন। তখন দিল্লিতে গর্জে উঠলেন তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক এবং ডায়মন্ড হারবারের সাংসদ শ্রী অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় (Abhishek Banerjee)। বুধবার নয়াদিল্লিতে অভিষেক-সহ তৃণমূলের ১০ সাংসদ নির্বাচন কমিশনের ফুল বেঞ্চের সঙ্গে বৈঠকে বসেন। প্রায় পৌনে তিন ঘণ্টা ধরে চলে বৈঠক। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের (Chief Election Commissioner Gyanesh Kumar) সঙ্গে অভিষেকের ঠিক কী কথা হয়েছে? বাইরে বেরিয়ে এসে সাংবাদিক বৈঠক করে সে কথা জানান অভিষেক। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে ‘মুখোমুখি’ লড়াই বেধে গেল মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের। বৈঠকে ১০টি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তাদের সামনে তুলে ধরে। এর আগে, গত ২৮ নভেম্বরও ১০ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল দিল্লিতে গিয়ে ৫টি প্রশ্ন উত্থাপন করেছিল, কিন্তু সেগুলির কোনওটিরই সদুত্তর মেলেনি।
অভিষেক বলেন, ‘‘জ্ঞানেশ কুমার একাই কথা বলেছেন। আরও দু’জন কমিশনার ছিলেন। তাঁরা রা কাড়েননি। আমরা বলা শুরু করতেই থামিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছিল। উঁচুগলায় কথা বলে আমার দিকে আঙুল তোলেন (জ্ঞানেশ)। আমি তখন বলি, আঙুল নামিয়ে কথা বলুন। আপনি কিন্তু মনোনীত। আমি জনগণের দ্বারা নির্বাচিত। ভাববেন না, আপনি জোর গলায় কথা বললেই আমরা দমে যাব।’’বৈঠকে অভিষেক সরাসরি জ্ঞানেশকে ‘বিজেপির দালাল’ বলে আক্রমণ শানিয়েছেন। তোলা হয়েছে এসআইআর আতঙ্কে মৃত্যুর পরিসংখ্যানও। সূত্রের খবর, সেই প্রশ্নে জ্ঞানেশ বলেন, তিনি ওই বিষয়ে অবহিত।চ্যালেঞ্জ করেও বলেন, যদি হিম্মত থাকলে, তাহলে কমিশন বৈঠকের সেই সিসিটিভি ফুটেজ প্রকাশ্যে আনুক।
আরও পড়ুন: আসনের লক্ষ্য বেঁধে দিলেন অমিত শাহ
গতবারের বৈঠকেও নির্বাচন কমিশনের (Election Commission) তরফে কোনও স্পষ্ট জবাব পাওয়া যায়নি, অথচ বেছে বেছে কিছু সাংবাদিকদের জানানো হয়েছিল সব প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হয়েছে। সেই রাতেই তৃণমূল কংগ্রেস এক্স হ্যান্ডেলে ডিজিটাল প্রমাণসহ জানিয়ে দেয়, প্রকৃতপক্ষে তাদের কোনও প্রশ্নেরই সুরাহা হয়নি। এবারের বৈঠকেও ১০-১১টি প্রশ্নের মধ্যে মাত্র ২-৩টি ছাড়া বাকি বিষয়গুলিতে চরম অস্পষ্টতা ছিল। SIR সংক্রান্ত প্রশ্নগুলিকে বারবার নাগতিকত্বের ইস্যুর দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, ডিলিশন নিয়ে প্রশ্ন করা হলে ফর্ম-৭ পূরণ করার মতো দায়সারা ও পদ্ধতিগত উত্তর দেওয়া হয়েছে, কিন্তু কোনও সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা মেলেনি।প্রতিনিধি দল প্রায় ১ কোটি ৩৬ লক্ষ ভোটারের তথ্যে logical discrepancies’র বিষয়টি তুলে ধরে। এর মধ্যে বাবা-মায়ের সঙ্গে সন্তানের বয়সের অযৌক্তিক ব্যবধান, দাদু-দিদিমার বয়সের গরমিল, নাম ও পদবীর বানান ভুল এবং ঠিকানা সংক্রান্ত সমস্যা রয়েছে। তা সত্ত্বেও আজ পর্যন্ত সেই বিস্তারিত তালিকা জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়নি।
আমি বিশেষভাবে উল্লেখ করতে চাই, তৃণমূল কংগ্রেসই একমাত্র দল যারা রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক এবং জাতীয় নির্বাচন কমিশন, উভয় স্তরেই ধারাবাহিকভাবে এই সমস্যাগুলি নিয়ে সরব হয়েছে। বেআইনি অনুপ্রবেশকারীদের অভিযোগ প্রসঙ্গে প্রতিনিধি দল কমিশনের কাছে জানতে চায়, খসড়া তালিকা থেকে যে ৫৮ লক্ষ নাম বাদ গেছে, তার মধ্যে কতজন রোহিঙ্গা বা বাংলাদেশি নাগরিক? কমিশন এর কোনও বিশ্বাসযোগ্য তথ্য দিতে পারেনি। বেআইনি অনুপ্রবেশকারী চিহ্নিত করা এবং তাদের ফেরত পাঠানো সমর্থনযোগ্য হলেও, এই সংখ্যার স্বচ্ছতা ও সঠিক তথ্যের দাবি জানানো হয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গে মাইক্রো-অবজারভারদের নিয়োগ নিয়েও আমরা প্রশ্ন তুলি। দেশের একাধিক রাজ্যে যেমন তামিলনাড়ু, গুজরাত, ছত্তিশগড়, কেরল ও উত্তরপ্রদেশে SIR প্রক্রিয়া চলছে। পশ্চিমবঙ্গের তুলনায় তামিলনাড়ু (১২.৫৭%), ছত্তিশগড় (৮.৭৬%), গুজরাত (৯.৯৫%) এবং কেরলে (৬.৬৫%) নাম বাদের হার অনেক বেশি, যেখানে বাংলায় তা মাত্র ৫.৭৯%। অথচ মাইক্রো-অবজারভার এবং জেলা পর্যবেক্ষকদের শুধুমাত্র বেছে বেছে বাংলাতেই নিয়োগ করা হচ্ছে। কমিশনের যুক্তি ছিল অফিসারের অভাব রয়েছে। কিন্তু আমি পাল্টা জানাই শুনানির সময়েও ১০ জন AERO-কে বসিয়ে রাখা হয়েছে, অর্থাৎ সব আধিকারিককে কাজে লাগানো হচ্ছে না। এতেই বোঝা যায়, কমিশনের কাছে সঠিক তথ্য নেই এবং তারা বাস্তবতা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল নয়। এমনকি মুখ্য নির্বাচন কমিশনার নিজেও বাংলায় কীভাবে SIR রূপায়িত হচ্ছে, সে বিষয়ে সরাসরি যুক্ত নন বলেও মনে হচ্ছে। এসব থেকেই স্পষ্ট, উপরতলার নির্দেশে কাজ চলছে এবং তৃণমূল স্তরে সফটওয়্যারের মাধ্যমে যান্ত্রিকভাবে নোটিশ পাঠানো হচ্ছে। তা না হলে, “Found OK” মার্ক করার পরেও কেন কেসটি বন্ধ না হয়ে শুনানির নোটিশ যাবে? মাইক্রো-অবজারভারদের নিয়ে প্রশ্নেরও কোনও স্পষ্ট উত্তর মেলেনি।







