সিনেমা, ক্রিকেট আর রাজনীতির সঙ্গে আমাদের নাড়ির সম্পর্ক। আর তার মধ্যে ক্রিকেট আমাদের কাছে কেবল একটা খেলা নয়, এটা একটা আবেগ, একটা সংস্কৃতির মেলবন্ধন। বিশেষ করে আইপিএলের মতো একটা গ্লোবাল টুর্নামেন্টে যখন বিশ্বের সেরা প্রতিভারা এক ছাদের নিচে জড়ো হয়, তখন তার আবেদন সমস্ত সীমানা ছাড়িয়ে যায়। সেই সীমাহীন আবেগের আসরে বাংলাদেশের বাঁহাতি পেসার মুস্তাফিজুর রহমানকে নিয়ে ভারতীয় ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ড যে ধরনের সিদ্ধান্ত নিল, তা জঘন্য, তা মানা যায় না। আইপিএল ২০২৬-এর নিলামে কেকেআর যখন ৯.২০ কোটি টাকার রেকর্ড দামে ‘দ্য ফিজ’কে দলে নিল, তখন আমরা ভেবেছিলাম মাঠের লড়াইয়ে হয়তো একটা নতুন মাত্রা আসবে, আমরা বাঙালিরা আরও উজ্জিবীত, বিদেশি হলেও সে বাঙালি। কিন্তু ক’সপ্তাহের মধ্যেই বিসিসিআই-এর একটা অদ্ভূত নির্দেশ এল, কেকেআর-কে বলা হল, মুস্তাফিজুরকে রিলিজ করে দিতে। ভাবুন পুরো বিষয়টা —আগে নিলামের টেবিলে তাঁকে রাখা হল, তারপর কেকেআর-এর মতো একটা ফ্র্যাঞ্চাইজিকে তাঁকে কিনতে দেওয়া হল, আর সব শেষে রাজনীতির দোহাই দিয়ে তাঁকে বাদ দেওয়া হল। এর চেয়ে বড় হাস্যকর আর গোলমেলে সিদ্ধান্ত আর কী হতে পারে? আইপিএল ২০২৬-এর নিলাম যখন আবু ধাবিতে শুরু হল, তখন মুস্তাফিজুর রহমানের নাম কিন্তু হুট করে আসেনি। তিনি আইপিএলের একজন অভিজ্ঞ খেলোয়াড়। ২০১৬ সাল থেকে তিনি ভারতের বিভিন্ন ফ্র্যাঞ্চাইজির হয়ে খেলেছেন—কখনও হায়দ্রাবাদ, কখনও মুম্বই, কখনও রাজস্থান বা দিল্লি। গত সিজনেও তিনি চেন্নাই সুপার কিংসের হয়ে দুর্দান্ত পারফর্ম করেছেন। তাঁর দক্ষতা নিয়ে কারও মনে কোনও সন্দেহ নেই। ২ কোটি টাকা বেস প্রাইস থেকে শুরু হওয়া তাঁর লড়াই যখন ৯.২০ কোটি টাকায় গিয়ে থামল এবং কেকেআর তাঁকে নিজেদের স্কোয়াডে নিল, তখন সবাই প্রশংসা করেছিল। কিন্তু প্রশ্নটা হল অন্য জায়গায়। বিসিসিআই যদি আগে থেকেই সিদ্ধান্ত নিয়েই নিয়েছিল যে, বাংলাদেশের সাথে রাজনৈতিক সম্পর্কের টানাপোড়েনের কারণে বাংলাদেশি খেলোয়াড়দের খেলানো যাবে না, তাহলে মুস্তাফিজুরকে নিলামের তালিকায় রাখা হল কেন? বিসিসিআই-এর সচিব দেবজিৎ সাইকিয়া অনেক পরে জানালেন যে ‘সাম্প্রতিক পরিস্থিতির’ কারণে কেকেআর-কে মুস্তাফিজুরকে ছেড়ে দিতে বলা হয়েছে। আচ্ছা এই ‘সাম্প্রতিক পরিস্থিতি’ মানে কী? আশ্চর্যের বিষয় হল, আইপিএল গভর্নিং কাউন্সিলের সাথে কোনওরকম আলোচনা না করেই বোর্ডের মাথা থেকে এই সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। একটা আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টের পেশাদারিত্বের জায়গায় এই ধরনের হঠকারী সিদ্ধান্ত কেবল কেকেআর ফ্র্যাঞ্চাইজিরই ক্ষতি করেনি, বরং পুরো আইপিএলের ব্র্যান্ড ভ্যালুকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। যদি একজন খেলোয়াড় নিলামের জন্য ভেরিফাইড হন, তাঁর সমস্ত কাগজপত্র ঠিক থাকে এবং ফ্র্যাঞ্চাইজি তাঁকে নিয়মের মধ্যে থেকেই কেনে, তবে পরবর্তীকালে বিসিসিআই কোন অধিকারে তাঁকে বাদ দেওয়ার নির্দেশ দেয়? এটা কি স্রেফ রাজনীতির তুষ্টির জন্য নয়? এটা কি বিজেপির সেই হিন্দু আক্রান্ত ন্যারেটিভের অংশ নয়?
২০২৪ সালের অগাস্ট মাসে বাংলাদেশে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের সময়েই শেখ হাসিনা সরকারের পতন, আর তারপরে তড়িঘড়ি, প্রায় পালিয়ে এসে তিনি ভারতে আশ্রয় নেন। এরপর থেকেই বাংলাদেশে এক ধরনের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশের বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাথে দিল্লির সম্পর্ক এখনও খুব একটা মসৃণ নয়। এর মধ্যে বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের উপর হামলার খবর ভারতের জনগণের মধ্যে এবং বিশেষ করে সোশ্যাল মিডিয়ায় তীব্র আবেগের জন্ম দিয়েছে। অনেক রাজনৈতিক নেতা এই পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশি খেলোয়াড় কেন? বাংলাদেশের ইলিশ বয়কটের মত হাস্যকর জঘন্য ডাক দিয়েছেন। কেকেআর-এর সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে বিজেপি নেতা সংগীত সোম তো কেকেআর মালিক শাহরুখ খানকে ‘দেশদ্রোহী’ পর্যন্ত বলতে ছাড়েননি। তাঁদের দাবি ছিল, যখন বাংলাদেশে হিন্দুদের উপর অত্যাচার চলছে, তখন একজন বাংলাদেশি খেলোয়াড় কেন ভারতে এসে কোটি কোটি টাকা কামাবেন? এই ধরনের ইললজিক, মূর্খের যুক্তি যখন স্পোর্টস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের উপর প্রভাব ফেলে, তখন বুঝতে হবে খেলার মাঠের বারোটা বেজে গিয়েছে। ক্রিকেট আর কূটনীতিকে একে অপরের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়েছে। আচ্ছা যদি মুস্তাফিজুরের বদলে কেকেআর লিটন দাস বা সৌম্য সরকারের মতো কোনও বাংলাদেশি হিন্দু ক্রিকেটারকে কিনত, তাহলেও কি বিসিসিআই একই সিদ্ধান্ত নিত? যদি উত্তর ‘না’ হয়, তবে আমরা কি কেবল ধর্মের ভিত্তিতে বা জাতীয়তার ভিত্তিতে একজন মানুষকে বিচার করছি? একজন খেলোয়াড় হিসেবে মুস্তাফিজুর কি বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের জন্য দায়ী? তাঁর বিরুদ্ধে কি কোনও ঘৃণা ভাষণ বা উস্কানিমূলক মন্তব্যের অভিযোগ আছে? নেই। তিনি একজন খাঁটি পেশাদার খেলোয়াড়, যিনি শুধু তাঁর খেলাটাই খেলেন। তাহলে কেন তাঁকে তাঁর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির জন্য ভিক্টিমাইজ করা হচ্ছে? পাকিস্তান হলেও তবু একটা ব্যাখ্যা থাকে, পাকিস্তান থেকে রাষ্ট্রীয় মদতে সন্ত্রাসবাদ ছড়ানো হয় বলে ভারতের একটা কড়া অবস্থান আছে, কিন্তু বাংলাদেশের সাথে সম্পর্কটা অনেক বেশি গভীর আর জটিল। সেখানে একটা নির্দিষ্ট রাজনৈতিক সংকট চলছে, যা আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে মেটানো সম্ভব। কিন্তু খেলার মাঠে খেলোয়াড়দের বয়কট করে কি সেই সমস্যার সমাধান হবে? নাকি এতে হিতে বিপরীত হবে?
আরও পড়ুন: Fourth Pillar | মোদিজির পাঁচটা গল্প, একটাও সত্যি নয়
আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একটা কথা খুব প্রচলিত—’ট্র্যাক টু ডিপ্লোম্যাসি’। যখন দুই দেশের মধ্যে সরকার সঙ্গে সরকারের, কথা বন্ধ হয়ে যায় বা সম্পর্কে বরফ জমে, তখন খেলাধুলা, গান, সিনেমা, সাহিত্য ইত্যাদি মাধ্যমগুলো সেই বরফ গলাতে সাহায্য করে। ক্রিকেট-কূটনীতি দক্ষিণ এশিয়ায় বছরের পর বছর ধরে এক বড় অস্ত্র হিসেবে কাজ করেছে। ১৯৮৭ সালে যখন ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধ প্রায় বেঁধে যাচ্ছিল, তখন পাকিস্তানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জিয়া-উল-হক হুট করে জয়পুরে ক্রিকেট ম্যাচ দেখতে এসে পরিস্থিতি শান্ত করেছিলেন। ২০০৪ সালের ‘ফ্রেন্ডশিপ সিরিজ’ বা ২০১১ সালের মোহালি বিশ্বকাপে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর একসাথে খেলা দেখা—এগুলো তো শুধু বিনোদনের জন্য ছিল না, ছিল সম্পর্কের সেতুবন্ধন। আর ভারত আর বাংলাদেশের সংস্কৃতি তো প্রায় এক। আমরা একই ভাষায় কথা বলি, একই ধরনের খাবার খাই, একই সিনেমা দেখি। আইপিএলে মুস্তাফিজুর বা শাকিবদের খেলা দেখা মানে হল, বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের সাথে ভারতের একটা আত্মিক যোগাযোগ তৈরি হওয়া। কিন্তু বিসিসিআই যখন তাঁদের রাজনৈতিক কারণে বাদ দেয়, তখন সেই সুতোটা ছিঁড়ে যায়। আর এটা তো স্বাভাবিক যে, ভারত যদি বড় মনের পরিচয় না দেয় আর সব প্রতিবেশিকে একে একে ত্যাগ করতে শুরু করে, তাহলে এই অঞ্চলে ভারত একলা হয়ে পড়বে, খানিকটা সেলফিস জায়েন্টের মতোই। খেলাধুলা তো হওয়ার কথা ছিল উত্তাপ কমানোর হাতিয়ার, কিন্তু সেটাকেই যদি উত্তাপ বাড়ানোর কাজে লাগানো হয়, তবে ক্ষতিটা সবার। স্বাভাবিকভাবেই মুস্তাফিজুরকে বাদ দেওয়ার পর বাংলাদেশে যে প্রতিক্রিয়া আমরা দেখছি, তা ভারতের জন্য আর যাই হোক সুখবর তো নয়। বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা আসিফ নজরুল এই সিদ্ধান্তকে ‘চরম অপমানজনক’ বলেছেন আর এর পাল্টা জবাব হিসেবে বাংলাদেশ সরকার তাদের দেশে আইপিএল-এর সমস্ত সম্প্রচার অনির্দিষ্টকালের জন্য নিষিদ্ধ করে দিয়েছে। এটা ভারতের স্পোর্টস ইন্ডাস্ট্রির জন্যও এক বড় অর্থনৈতিক ধাক্কা। বাংলাদেশের মতো একটা ক্রিকেট পাগল দেশে আইপিএলের বিশাল দর্শক সংখ্যা ছিল। সেই মার্কেটটা এখন ভারতের হাতছাড়া হল।
শুধু তাই নয়, বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) এখন আগামী ২০২৬ সালের টি-২০ বিশ্বকাপ নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। ভারতের মাটিতে সেই বিশ্বকাপ হওয়ার কথা থাকলেও, বিসিবি এখন আইসিসি-র কাছে জানিয়েই দিয়েছে যে, নিরাপত্তার অভাব আর বর্তমান পরিস্থিতির কারণে তাদের ম্যাচগুলো যেন শ্রীলঙ্কায় সরিয়ে নেওয়া হয়। যদি সত্যি একটা বিশ্বকাপের আয়োজক দেশ হিসেবে ভারত তার কোনও প্রতিবেশিকে নিরাপত্তা দিতে না পারে বা তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে না পারে, তবে বিশ্বমঞ্চে ভারতের ভাবমূর্তির কী হবে? পাকিস্তান তো এমনিতেই ভারতের মাটিতে খেলে না, এখন যদি বাংলাদেশও সেই পথে হাঁটে, তবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ভারত একঘরে হয়ে পড়ার ঝুঁকি থেকে যায়। আর এটাও তো ঘটনা যে, আইপিএল একটা কর্পোরেট লিগ যেখানে কয়েকশ কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হয়। কেকেআর-এর মতো একটা ফ্র্যাঞ্চাইজি যখন মুস্তাফিজুরকে ৯.২০ কোটি টাকায় কেনে, তখন তারা অনেক কিছু মাথায় রেখে এই বিনিয়োগ করে। মুস্তাফিজুরের মতো একজন ডেথ ওভার স্পেশালিস্টের অভাব পূরণ করা কেকেআর-এর জন্য খুব কঠিন হবে। বিসিসিআই বিকল্প খেলোয়াড় নেওয়ার অনুমতি দিলেও, মুস্তাফিজুরের স্কিল বা দক্ষতা অন্য কারও মধ্যে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। শাহরুখ খানের মতো একজন আন্তর্জাতিক আইকনকে যখন রাজনীতির কারণে ব্যক্তিগত আক্রমণ সইতে হয়, তখন তা বিদেশের বিনিয়োগকারীদের কাছেও ভুল বার্তা পাঠায়, পাঠাচ্ছে। আমরা তো মুস্তাফিজুর বনাম কোহলি বা মুস্তাফিজুর বনাম ধোনির লড়াই দেখার জন্য বসেছিলাম, তার যে আকর্ষণ ছিল, রাজনীতি সেটা কেড়ে নিল। বিসিসিআই-এর এই সিদ্ধান্ত আসলে একটা একশ শতাংশ রাজনীতি, বিজেপির ন্যারেটিভ বাজারে আনার জন্যই এইভাবে বিসিসিআইকে কাজে লাগানো হল। কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে বা আন্তর্জাতিক সংস্থা পরিচালনার ক্ষেত্রে আবেগের চেয়ে যুক্তি বেশি জরুরি। বাংলাদেশের সাথে ভারতের যে হাজার বছরের সাংস্কৃতিক টানাপোড়েন বা মিল আছে, তাকে ক্রিকেট দিয়ে আরও মজবুত করা যেত। কিন্তু সেই সুযোগটা হাতছাড়া করলাম আমরা।
এখন আমরা কী বলব? খুব বেশি কিছু নয়, খেলার মাঠকে রাজনীতির দাবার বোর্ড বানাবেন না। যখন একজন খেলোয়াড় মাঠে নামেন, তখন তাঁর পিঠে কোনও রাজনৈতিক পতাকার ছাপ থাকে না, থাকে তাঁর দেশের সম্মান এবং তাঁর ব্যক্তিগত প্রতিভা। মুস্তাফিজুর রহমান বাংলাদেশের প্রতিনিধি হতে পারেন, কিন্তু আইপিএলে তিনি একজন ‘গ্লোবাল ক্রিকেটার’। তাঁর ওপর ক্ষোভ ঝেড়ে বা তাঁকে বাদ দিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির এক ইঞ্চিও পরিবর্তন হবে না। বরং দুই দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে যেটুকু সম্প্রীতি টিকে ছিল, তা আরও নষ্ট হবে। ক্রিকেট হল বন্ধুত্বের ভাষা। মুস্তাফিজুরকে ফিরিয়ে দেওয়া মানে হল সেই বন্ধুত্বের হাতটাকে ফিরিয়ে দেওয়া। রাজনীতি আসবে-যাবে, সরকার পরিবর্তন হবে, কিন্তু গ্যালারির যে আনন্দ আর মাঠের যে লড়াই—তাকে যেন কলুষিত না করা হয়। খেলার মাঠে রাজনীতিকে ঢুকিয়ে দিলে আখেরে বড় ক্ষতিটা আমাদেরই হবে, কারণ সংস্কৃতিই হল সেই শেষ সুতো যা আমাদের মতো বিভক্ত পৃথিবীকে এক সুতোয় বেঁধে রাখে।
দেখুন আরও খবর:








