Monday, January 19, 2026
HomeScrollAajke | মোদি আসবেন, আর ফুস মন্তরে শিল্প হবে? এদিকে ভাট বকা...
Aajke

Aajke | মোদি আসবেন, আর ফুস মন্তরে শিল্প হবে? এদিকে ভাট বকা ছাড়া কিছুই শোনা গেল না

যে পাট একসময় বাঙালির গর্ব ছিল, আজ তা দিল্লির দরবারে কেবল একটা অবহেলায় পড়ে থাকা ফাইল

Written By
অনিকেত চট্টোপাধ্যায়

প্রতিটা রাজ্যের নির্বাচনের আগে মোদিজি, মানে আমাদের নন বায়োলজিক্যাল নরেন্দ্রভাই দামোদরদাস মোদিজি হঠাৎ করেই কল্পতরু হয়ে যান। মঞ্চে দাঁড়িয়ে স্পেশ্যাল প্যাকেজের নিলাম ডাকেন, ‘কিতনা চাহিয়ে, একশ করোড়, দেড়’শ কড়োর, তিন’শ করোড়!’ বাবার সম্পত্তি নিলামে চাপানোর সময়ে ফোতো কাপ্তেনদের মুখের ভাব ভঙ্গি ঠিক এরকমই হয়। তো সামনে বাংলার নির্বাচন, উনি আসছেন, মুখস্ত করা বাংলা বলতে গিয়ে ধ্যাড়াচ্ছেন, আর প্রতিশ্রুতির পর প্রতিশ্রুতি দিয়ে যাচ্ছেন, লক্ষ কোটি টাকার প্যাকেজ আর কিছু ট্রেন চালানোর ঘোষণা। হাওড়া বা শিয়ালদহ বা কলকাতা স্টেশন থেকে বেনারস যাওয়ার গোটা সাত-আট ট্রেন আছে, তিনি একটা ট্রেন চালু করে দিলেন যেটা তিনদিন যাবে বা আসবে। কিছুদিন পরে টুক করে একটা সাতদিন চলা ট্রেনকে সপ্তাহে একদিন করে দেবেন টেরও পাবেন না। চালু করে দিলেন বন্দে ভারত ট্রেন, চলল, প্রথম দিনে নাকি আমিষ ভালো নয় তাই নিরামিষ, তো চালু হল বন্দে ভারত। আইআরসিটিসি অ্যাপ খুলুন, টিকিট কাটা যাচ্ছে না, কবে চালু হবে জানা নেই, উনি এলেন চালু করে দিলেন। এর আগে সরাইঘাট এক্সপ্রেস ছিল, বন্দে ভারত তার চেয়ে ঘন্টা দেড়েক আগে পৌঁছবে। কিন্তু এতে স্লিপার ক্লাস নেই। বেশ, সরাইঘাট এ থ্রি এসির ভাড়া ১৪১০ টাকা, বন্দে ভারতে ২৩২৩ টাকা; এসি টু-এর ভাড়া সরাইঘাটে ১৯৮৫ টাকা, বন্দে ভারতে ৩০০০ টাকা; এসি ফার্স্ট ক্লাস সরাইঘাটে ৩৩২০ টাকা, বন্দে ভারতে মাত্র ৩০০ টাকা বেশি- ৩৬৭৭ টাকা। কাদের জন্য চলছে এই ট্রেন? গরীব জনতা কে লিয়ে? আসলে ওনার এই আসা আর যাওয়া কেবল লোকজনকে বোকা বানানোর জন্য, একরাশ মিথ্যে বলে ভোট আদায়ের জন্য। সেটাই বিষয় আজকে, মোদি আসবেন, আর ফুস মন্তরে শিল্প হবে? এদিকে ভাট বকা ছাড়া কিছুই শোনা গেল না।

সেদিন সিঙ্গুর নন্দীগ্রামের জমি অধিগ্রহণের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে যে শুভেন্দু অধিকারী মমতার নেতৃত্বে জান লড়িয়ে দিয়েছিলেন, তিনি এখন সিঙ্গুরে টাটাকে আনতে চান। রাজ্য সভাপতি শমীকবাবুও সেদিন ওই জমি আন্দোলনের সমর্থনেই ছিলেন, তিনিও টাটাবাবুকে চান। তো মনে হচ্ছিল মোদিজি টাটাবাবুদের নিয়ে আসার কথাই বলতে আসবেন। কিন্তু উনি আরও অনেক গভীর জলের মাছ, টাটা-আম্বানি-আদানি তো থাকবে গুজরাতের জন্য, বাংলা থেকে উনি নেমন্তন্ন করে তাঁদের গুজরাতে নিয়ে যাবেন, বাংলাতে আনতে ওনার বয়ে গিয়েছে। কিন্তু শিল্প হচ্ছে না, বেকারদের চাকরি নেই ইত্যাদি বলতে তো হবে, তাই কিছু ভাট বকলেন। রাজ্য সরকারের জন্য নাকি জুট ইন্ডাস্ট্রি ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে, বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, বিজেপি এলেই জুট শিল্পকে নতুন করে গড়ে তোলা হবে। এমনিতে আমাদের প্রধানমন্ত্রী ১০টা কথা বললে ৯টা মিথ্যেই বলেন। কিন্তু এটা শুধু মিথ্যে নয়, শয়তানি যাকে বলে তাই।

আরও পড়ুন: Aajke | বঙ্গ বিজেপির অন্দরমহলে ধুন্ধুমার, তাপস রায়, রাজু ব্যানার্জি, সঞ্জয় সিংকে টিকিট দেওয়া হচ্ছে না

উনি খুব ভালো করেই জানেন যে, জুট শিল্পের উন্নতির চাবিকাঠি ওনার সরকারের হাতেই আছে, জুট কর্পোরেশন অফ ইন্ডিয়া ওনার সরকারের অধীনে কাজ করে, বাংলা ভাগ হবার সময়ে পাট চাষ রয়ে গিয়েছিল পূর্ব বাংলায়, কারখানাগুলো থেকে গিয়েছিল পশ্চিম বাংলাতে। সমস্যা সেখান থেকেই শুরু, আজ বাংলাদেশের পাটের জিন নকশা বা জিনোম সিকোয়েন্স নিয়ে গবেষণা চালিয়ে পাটের নতুন নতুন জাত তৈরি করেছে। তারা পাট থেকে পচনশীল প্লাস্টিক ব্যাগ বা ‘সোনালি ব্যাগ’ তৈরি করার মতো অত্যাধুনিক গবেষণা করছে। অথচ ভারতে পাটের গবেষণাগারগুলো বছরের পর বছর অবহেলায় পড়ে রয়েছে। কারা চালায় সেই গবেষণাগারগুলো? রাজ্য সরকার? মিথ্যে কথা বলার আগে সামান্য খোঁজখবরও নেননি, মোদিজি! পাট থেকে যে উন্নত মানের কাপড়, কার্পেট কিংবা গাড়ির অভ্যন্তরীণ কাঠামো তৈরি করা সম্ভব, তা নিয়ে দিল্লিতে কোনও সুদূরপ্রসারী চিন্তাভাবনা নেই বললেই চলে। কেন্দ্রীয় সরকার কেবল খাদ্যশস্য প্যাকিং করার বস্তা কেনাতেই নিজেদের দায়িত্ব সীমাবদ্ধ রেখেছে। এর ফলে এই শিল্পটা হয়ে পড়েছে একটা ‘মনোকালচার’ বা একমুখী শিল্প, যেখানে নতুনত্বের কোনও জায়গাই নেই। যখনই সরকারি বিভাগগুলোর থেকে কেনার বরাত কম হয়, তখনই চটকলগুলোতে কাজ বন্ধ হয়ে যায় আর শ্রমিকদের হাহাকার শুরু হয়। উনি এসে এখানে ডাহা মিথ্যে বলছেন, ভাট বকছেন। উনি যেদিন এই মিথ্যে কথাগুলো গড়গড় করে বললেন, তার আগের দিনেই আইজেএমএ ইন্ডিয়ান জুট মিলস অ্যাসোসিয়েশন ওনার সরকারকে চিঠি লিখে জানিয়েছে যে, কাঁচা জুটের দাম বেড়ে যাচ্ছে, কাঁচা জুট যাতে বাইরে রফতানি না হয়, বা অন্য ব্যবসায়ীদের না বিক্রি করা হয়, তার ব্যবস্থা করতে। ডিসেম্বরেই কাঁচা জুটের সাপ্লাই কমেছে ১.২৫ লাখ বেল, যদিও এক কুইন্টালের দাম বেড়ে এখন দাঁড়িয়েছে ১৩ হাজার টাকায়। সেসব জানেন মোদিজি? এটাই তো প্রথম চিঠি নয়, অজস্র চিঠি আইজেএমএ দিয়েছে, কেউ পড়েও দেখে না, অথচ নির্বাচনের আগে এসে ভোটের জন্য ভাট বকছেন দেশের প্রধানমন্ত্রী। আমরা আমাদের দর্শকদের জিজ্ঞেস করেছিলাম, মোদিজি সিঙ্গুরের জনসভাতে এসে পাট শিল্পের দুর্দশার জন্য রাজ্য সরকারকে দায়ী করলেন, যদিও ঐ শিল্পের উন্নয়নের চাবিকাঠি ওনার সরকারের জুট কর্পোরেশন অফ ইন্ডিয়ার কাছেই আছে, উনি আসলে ভোটের জন্য মিথ্যে বলেই যাচ্ছেন। আপনাদের মতামত জানান।

পশ্চিমবঙ্গের পাটশিল্পের এই করুণ কাহিনী কেবল একটা শিল্পের পতন নয়, এটা একটা গোটা জাতির ঐতিহ্যের হেরে যাওয়া। যে পাট একসময় বাঙালির গর্ব ছিল, আজ তা দিল্লির দরবারে কেবল একটা অবহেলায় পড়ে থাকা ফাইল। অথচ একটু সদিচ্ছা থাকলেই এই শিল্পই হতে পারত ভারতের ‘সবুজ অর্থনীতি’র মূল স্তম্ভ। প্লাস্টিকের অভিশাপ থেকে পৃথিবীকে বাঁচাতে পাটের কোনও বিকল্প নেই। যদি কেন্দ্রীয় সরকার রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে এই শিল্পের আধুনিকায়নে বড় মাপের বিনিয়োগ করে, যদি গবেষণাগারগুলোকে সক্রিয় করে পাটের বহুমুখী ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়, আর যদি মালিকদের উপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ এনে শ্রমিকদের অধিকার সুরক্ষিত করা যায়, তবেই হয়তো এই সোনালি আঁশ আবার তার পুরানো গৌরব ফিরে পাবে। না হলে গঙ্গার ধারের এই চটকলগুলো একদিন কেবল কঙ্কাল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে, আর আমাদের উত্তরপুরুষেরা বিশ্বাসই করতে চাইবে না যে, একসময় এই বাংলা থেকেই পাটের গন্ধে ভরে উঠত সারা বিশ্বের বাজার।

দেখুন আরও খবর:

Read More

Latest News