Monday, March 2, 2026
HomeScrollFourth Pillar | আদালতে প্রমাণিত, ইডি-সিবিআই বিজেপির হাতিয়ার
Fourth Pillar

Fourth Pillar | আদালতে প্রমাণিত, ইডি-সিবিআই বিজেপির হাতিয়ার

এই ধরনের কার্যকলাপ চললে বিচার ব্যবস্থার উপর থেকে সাধারণ মানুষের বিশ্বাসই উঠে যাবে

Written By
অনিকেত চট্টোপাধ্যায়

২০২৬ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি, তারিখটা সব্বার মনে রাখাটা জরুরি। দেশজুড়ে বিরোধীদের উপর এই লাগাতার ইডি-সিবিআই-এর হামলার জবাব দিতে গেলেই এই তারিখটার রেফারেন্স আসবে। দিল্লির রাউস অ্যাভিনিউ আদালত আবগারি দুর্নীতি মামলায় দিল্লির প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল, প্রাক্তন উপমুখ্যমন্ত্রী মনীশ সিসোদিয়া সমেত মোট ২৩ জন অভিযুক্তকে সমস্ত অভিযোগ থেকে বেকসুর খালাস করে দিয়েছে। তার মানে হল, এতদিন ধরে বিজেপির লাগাতার এক প্রচার, আবগারি কেলেঙ্কারিতে অরবিন্দ কেজরিওয়ালকে জড়িয়ে সমস্ত কথাবার্তা ছিল আসলে বোগাস, মিথ্যে। এটাকে যদি আমরা জাস্ট একটা আইনি জয় হিসেবে দেখি তাহলে ভুল হবে, এটা ভারতীয় গণতন্ত্রের আজকের চালচিত্রের সঙ্গে জুড়ে থাকা এক সাংঘাতিক প্রবণতাকে আমাদের সামনে তুলে ধরেছে—আজ আমরা গলা ফাটিয়েই বলতে পারবো, আঙুল তুলে বলতে পারবো, কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাগুলো আসলে রাজনৈতিক বিরোধীদের কণ্ঠরোধ করার, নির্বাচনে ফায়দা তোলার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে মোদি-শাহ রেজিম। আদালতের এই রায় স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে দিয়েছে যে, গত কয়েকবছর ধরে যে দুর্নীতির আখ্যান তৈরি করা হয়েছিল, তা আসলে ছিল নিছক তথ্যপ্রমাণহীন এক ষড়যন্ত্র তত্ত্ব, এক কন্সপিরেসি।

একটু শুরুর থেকে দেখা যাক, দিল্লি আবগারি নীতি ২০২১-২২ আনার মূল উদ্দেশ্য ছিল দিল্লির মদের ব্যবসায়িক কাঠামোতে, ট্যারিফ স্ট্রাকচার থেকে ডিস্ট্রিবিউশন- সবটার এক আমূল পরিবর্তন আনা। আম আদমি পার্টি সরকারের লক্ষ্য ছিল, মদের কালোবাজারি বন্ধ করা, রাজস্ব বৃদ্ধি করা, গ্রাহকদের জন্যও একটা উন্নত পরিবেশ নিশ্চিত করা। আসলে এর আগে এই পলিসিটাকে পুরোপুরি ব্যক্তিগত মালিকানাধীন মডেলের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, যেখানে সরকার রিটেল সেল থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছিল আর পুরো শহরকে ৩২টা জোনে ভাগ করে লাইসেন্স দেবার কথা বলা হয়েছিল। ভালো হোক, মন্দ হোক, এগুলো ঠিক করার অধিকার তো নির্বাচিত সরকারের আছে। কিন্তু এই নতুন পলিসি সম্ভবত বেশ কিছু বাস্তুঘুঘুর বাসায় ঘা দিয়েছিল। যার ফলে এই পলিসিকে ঘিরে খুব তাড়াতাড়ি এক খুল্লমখুল্লা আইনি আর রাজনৈতিক যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। ২০২২ সালের জুলাই মাসে দিল্লির তৎকালীন মুখ্যসচিব নরেশ কুমার লেফটেন্যান্ট গভর্নর ভিকে সাক্সেনার কাছে একটা রিপোর্ট জমা দিলেন, যেখানে অভিযোগ করা হল, এই নীতি তৈরিতেই নাকি পদ্ধতিগত ত্রুটি ছিল, এর ফলে সরকারি কোষাগারের প্রায় ৫৮০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। ব্যস, এই রিপোর্টের ভিত্তিতেই সিবিআই তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হল। তদন্তকারী সংস্থাগুলির মূল অভিযোগ, ‘সাউথ লবি’ থেকে ১০০ কোটি টাকা ঘুষ, কিকব্যাক নিয়ে এই পলিসি নির্দিষ্ট কিছু ব্যবসায়ীর জন্যই তৈরি করা হয়েছিল, আর সেখান থেকে আসা বিপুল পয়সা নাকি পাঞ্জাব ও গোয়ার নির্বাচনে ব্যবহার করা হয়েছিল। আজ এতদিন পরে আদালতের রায় এই পুরো অভিযোগটাকেই ধূলিসাৎ করে দিয়েছে। বিশেষ বিচারক জিতেন্দ্র সিং তাঁর অবজার্ভেশনে বলেছেন, সিবিআই যে কেন্দ্রীয় ষড়যন্ত্রের কথা বলেছিল, তার সপক্ষে কোনও সুনির্দিষ্ট প্রমাণ দাখিল করতে পারেনি। এমনকি আদালত সিবিআই-এর যুক্তির মধ্যে ‘অর্থনৈতিক অজ্ঞতা’র কথাও, খুব স্পষ্টভাবে বলেছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। যখন একটা রাষ্ট্রীয় তদন্তকারী সংস্থা যা নাকি আর্থিক দুর্নীতির তদন্ত করার জন্যই তৈরি হয়েছে, তারা যদি অর্থনীতির প্রাথমিক বিষয়গুলি না বুঝেই এক নীতিগত সিদ্ধান্তকে দুর্নীতি হিসেবে তুলে ধরে তার তদন্তের নামে এতদিন ধরে এত মানুষকে জেলে পুরে, হ্যারাস করার চেষ্টা করে, তখন তার পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থাকাটাই স্বাভাবিক, যা এই কদিনের বিচারের পরে বিচারকরা জানালেন, তা তাঁদের অজানা ছিল এমন তো নয়, তাঁরা প্রভুর ইচ্ছেতেই বিরোধীদের জেলে পাঠানোর, প্রতিবাদী কন্ঠস্বরগুলোকে চুপ করানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

আরও পড়ুন: Fourth Pillar | মোদি সরকারের দেশ বেচে দেওয়ার নতুন ছকবাজিটা বুঝতে হবে

কতটা নাটকীয়, কতটা অমানবিক ছিল এই ধরপাকড় আর জেলে পোরা? ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে সেই সময়ে দিল্লি সরকারের উপমুখ্যমন্ত্রী মনীশ সিসোদিয়াকে গ্রেফতার করা হয়। তিনি দীর্ঘ ১৮ মাস জেলবন্দি ছিলেন। এর প্রায় এক বছর পর, ২০২৪ সালের মার্চ মাসে লোকসভা নির্বাচনের ঠিক আগে অরবিন্দ কেজরিওয়ালকে গ্রেফতার করে ইডি। এই গ্রেফতারিগুলোর টাইমিং বা সময়কালগুলো দেখুন, সবাই বলবে এটা ছিল পরিকল্পিত চক্রান্ত, প্ল্যানড কন্সপিরেসি। বিরোধী দলের শীর্ষ নেতাদের যখন প্রচারের ময়দানে থাকা প্রয়োজন, ঠিক সেই সময়েই তাদের কারাগারে পুরে দেওয়া হয়েছিল। তৃণমূল কংগ্রেস সাংসদ মহুয়া মৈত্র এই রায়ের পর সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, সত্যের সামনে ইডি আর সিবিআই-এর মতো ‘হাতের পুতুল’ সংস্থাগুলো ধ্বংস হয়ে যাব। ডিএমকে নেতা, তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী এমকে স্ট্যালিন বলেছেন, বিজেপি সরকার স্বল্পমেয়াদী রাজনৈতিক লাভের জন্য তদন্তকারী সংস্থাগুলোর সততাকে বন্ধক রেখেছে। সারা দেশ থেকে উঠে আসা এই প্রতিক্রিয়াগুলো থেকে পরিষ্কার যে, ভারতের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোতে কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলোর নিরপেক্ষতা আজ এক চরম সংকটের মুখে। আদালতও কি কম বলেছে নাকি? বিচারক জিতেন্দ্র সিং বলেছেন যে, অভিযোগের সপক্ষে তথ্যপ্রমাণ দাখিল করতে না পারলে সরকারি প্রতিষ্ঠানের ওপর মানুষের আস্থা টলে যায়। তাঁর কথায়, সিসোদিয়ার বিরুদ্ধে এমন কোনও প্রমাণ পাওয়া যায়নি যা কোনও অপরাধমূলক আচরণের ইঙ্গিত দেয়। তদন্তকারী সংস্থাগুলো যেভাবে ‘ষড়যন্ত্র তত্ত্ব’ সাজিয়েছিল, তা ছিল স্ববিরোধিতায় ভরা। হ্যাঁ, বিচারক এই কথাগুলো বলছেন, যা দেশের বিরোধী নেতারা এতদিন ধরে বলে আসছিলেন। কারণ দিল্লির আবগারি মামলাটা তো কেবল আইনি লড়াই ছিল না, এটা ছিল ২০২৫ সালের দিল্লি বিধানসভা নির্বাচনের প্রধান রাজনৈতিক অস্ত্র। বিজেপি এই মামলাটাকে সামনে রেখে আম আদমি পার্টির বিরুদ্ধে দুর্নীতির ঝোড়ো প্রচার চালিয়েছিল। যেমনটা তারা সারা দেশেই করে, দিল্লিতে ‘শীশমহল’ বিতর্ক আর মদের দুর্নীতির অভিযোগ তুলে তারা ভোটারদের মনে আপ সরকারের জন্য এক ধরনের অনাস্থা তৈরি করতে পেরেছিল। আজ বিজেপি কি দিল্লির ভোটারদের কাছে ক্ষমা চাইবে? এখন তো এক্কেবারে পরিস্কার যে, বিজেপি দীর্ঘ ২৬ বছর পর দিল্লির ক্ষমতায় ফিরে এসেছে, ৪৬.৬ শতাংশ ভোট পেয়ে ৭০টা আসনের মধ্যে ৪৮টাতে জিতে দিল্লি দখল করেছে। সবটাই এক মিথ্যে প্রচারের উপর দাঁড়িয়ে।

গণতন্ত্র যদি এই চেহারা নেয়, শাসক দল যদি খুল্লমখুল্লা এইসব এজেন্সিকে কাজে লাগিয়ে এমনকি নির্বাচনেও জিতে আসে, তাহলে সংসদীয় গণতন্ত্রের উপরে মানুষের আস্থা কমবে বৈকি। মনে আছে? বিজেপি মুখপাত্র সুধাংশু ত্রিবেদী সেই জয়ের পরে বলেছিলেন, দিল্লির মানুষ কেজরিওয়ালকে রাজনৈতিক ময়দানে জবাব দিয়ে দিয়েছে। এটা এখন পরিস্কার যে, মামলার আইনি পরিণতির চেয়েও বিজেপিকে ক্ষমতায় ফেরানোই ছিল এই পুরো প্রক্রিয়ার আল্টিমেট গোল। রায়ে আদালত স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে, কোনও গুরুতর অভিযোগ প্রমাণ করতে হলে তা কেবল অনুমানের উপর ভিত্তি করে চললে হবে না, তার জন্য প্রয়োজন জোরালো তথ্যপ্রমাণ, যা এই মামলাতে নেই, অ্যাবসেন্ট। বিচারকদের অবজার্ভেশন, সিবিআই অনেক ক্ষেত্রেই রাজসাক্ষী ‘অ্যাপ্রুভার’দের জবানবন্দির উপর ভিত্তি করে মামলা সাজিয়েছিল, যা আইনের চোখে যথেষ্ট নয়। আদালত এমনকি তদন্তকারী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্তের সুপারিশ করেছে, কারণ তারা একজন সরকারি কর্মচারীকে অকারণে অভিযুক্ত করেছিল। হ্যাঁ, এবার এই চাকাটা উল্টোদিকে ঘোরানো দরকার, এবারে বিরোধীদের উচিত এই ইডি-সিবিআইয়ের কর্তা ব্যক্তিদের আইনের সামনে দাঁড় করানো, জেলে পোরা। কোথাও এই ভিজিলেন্স সংস্থাগুলোকে মনে করিয়ে দেওয়াটা দরকার, তারা যে প্রভুদের নির্দেশ মেনে কাজ করছে সেই প্রভুরাও তাদের জেলেযাত্রা থেকে বাঁচাতে পারবে না, আজ বা কাল তাদের এই অন্যায়ের জবাব দিতেই হবে। বিচারক বলেছেন যে, রাজসাক্ষী তৈরি করে তদন্তের ফাঁকফোকর ভরাট করার চেষ্টা করা সংবিধানের নীতির পরিপন্থী। এই ধরনের কার্যকলাপ চললে বিচার ব্যবস্থার উপর থেকে সাধারণ মানুষের বিশ্বাসই উঠে যাবে। সিসোদিয়া আর কেজরিওয়ালের ক্ষেত্রে আদালত কোনও ‘অপরাধমূলক উদ্দেশ্য’ খুঁজে পায়নি, কোনও বেআইনি সম্পদ বা টাকা উদ্ধার করতে পারেনি, যা প্রমাণ করে যে, পুরো মামলাটাই ছিল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে সাজানো একটা তাসের ঘর। সিবিআই এবং ইডি-র এই ব্যর্থতা কেবল একটা মামলার হার নয়, এটা তাদের প্রাতিষ্ঠানিক অবক্ষয়ের প্রমাণ, এক দলিল যা তাদের বিরুদ্ধে এরপর থেকে লাগাতার ব্যবহার করা হবে। আগামীদিনে ভারতের বিচারব্যবস্থার উপর এই রায়ের এক বিশাল প্রভাব নিশ্চয়ই পড়বে। এটা একটা নজির হিসেবে থেকে যাবে, কেবল রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে রাষ্ট্রীয় এজেন্সিগুলো কাউকে অভিযুক্ত করতে পারে না। তদন্তকারী সংস্থাগুলোকে তাদের পেশাদারিত্ব এবং নিরপেক্ষতা প্রমাণ করতে হবে। হ্যাঁ, এই রায় দেরিতে এল, কিন্তু এই রায় আর রায়ের দিনটা মানুষ মনে রাখবে। কেবল মাথার ওপরে ঝুলবে, ‘সত্যমেব জয়তে’, থেকে যাবে কেবল একটা স্লোগান হয়ে, তা হতে পারে না, হবেও না, সেই ভরসা দিল এই রায়।

দেখুন আরও খবর:

Read More

Latest News

toto DEPOBOS evos gaming

slot gacor

https://www.demeral.com/it/podcast https://rendez-vous.benin-ambassade.fr/profil-d/ https://www.annabelle-candy.com/about/ JUARA88 DEPOBOS idn poker 88 situs slot gacor https://www.demeral.com/it/demeral_software/ BWO99 slot 5000 poker situs slot gacor joker toto slot maxwin slot maxwin situs bola Depobos