Tuesday, March 3, 2026
HomeScrollFourth Pillar | শুভেন্দু অধিকারীর মকর সংক্রান্তির বিভ্রান্তি
Fourth Pillar

Fourth Pillar | শুভেন্দু অধিকারীর মকর সংক্রান্তির বিভ্রান্তি

উত্তরায়ণ বা দক্ষিণায়নের সঙ্গে এই মকর সংক্রান্তির কোনও সম্পর্ক নেই

Written By
অনিকেত চট্টোপাধ্যায়

আজ মকর সংক্রান্তি, ছোটবেলাতে এই দিনটা ছিল নির্মল আনন্দের, পিঠেপুলি, পাটিসাপটার দিন। প্রত্যেক ঘরে, এখানে নাড়ু, তো ওখানে সরুচাকলি, তো সেখানে দুধপুলি। কিন্তু বড় হতে হতেই এই সংক্রান্তিকে জড়িয়ে নানান মিথ আর কুসংস্কার, আর তা নিয়েও রাজনীতি। কত কিছু দিয়েই যে রাজনীতি করা যায় তা দেখতে হলে চলে আসুন এই বাংলাতে। কদিন আগেই আমাদের বিরোধী দলনেতা তাঁর ক্ষোভের কথা জানিয়েছেন, রাজ্য সরকার মকর সংক্রান্তিতে ছুটি দিল না? আসলে এই সরকার তো মুসলমানদের তোষণ করে, তাই নাকি ছুটি দিল না। ওই জনসভার এক শ্রোতা পাশের জনকে জিজ্ঞেস করল, ‘হ্যাঁরে, সেন্ট্রাল গভর্নমেন্ট হলিডে দিয়েছে?’ অন্যজন ঘাড় নাড়ল, ‘না দেয়নি’। হ্যাঁ, মজাটা এইখানেই, মোদি সরকার মকর সংক্রান্তিতে ছুটি দেয়নি কিন্তু ওনারা হিন্দুত্ববাদী, আর মমতা সরকার মকর সংক্রান্তিতে ছুটি দেয়নি তাই তারা মুসলমান তোষণকারী। এবং জানা গেল যে মধ্যপ্রদেশের স্কুল আর কলেজে মকর সংক্রান্তিতে ছুটি দেওয়া হয়েছে মকর সংক্রান্তি পালনের জন্য, ওই দিনে সূর্যোদয়ের সময়েই চান করলে নাকি বিভিন্ন অসুখ সেরে যায়, তার এক বিরাট তালিকাও বের করা হয়েছে। কী নেই সেখানে! পাগলামি সেরে যাওয়া বাদ দিয়ে সব কিছু, মায় ক্যান্সারও সেরে যায় বলে দাবি করা হয়েছে।

আসলে বিষয়টা সংক্রান্তিতেই থেমে নেই, দেশকে এক মধ্যযুগে নিয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টার কথা শুরু থেকেই বলে এসেছে আরএসএস, তাদের বিভিন্ন শাখা সংগঠন। বিজ্ঞানের নামে, ইতিহাসের নামে মিথ্যের পর মিথ্যে, ঝুড়ি ঝুড়ি মিথ্যে বলেই চলেছেন। সেসব অর্বাচীন মিথ্যে নিয়ে আমরা কতককাল হেসেছি, আমোদিত হয়েছি, শৈশবে সে সব গল্প পড়ে আমরা পুলকিত হয়েছি, কিন্তু আজ সেই সব শিশুপাঠ্য রুপকথা, মিথগুলোকে আরএসএস–বিজেপির দৌলতে বিজ্ঞান করে তোলা হচ্ছে। বেশ মনে আছে, ঠাকুমার কোলে শুয়ে শুনতাম, ‘হনুমান জন্ম নিয়েছে সবে, মা অঞ্জনী দেখছেন তাঁর ছেলেকে, আর ঠিক সেই সময়ে সূর্য উঠছে, ভোরের লাল টুকটুকে সূর্য, ব্যস, হনুমান লাফালো, আপেল ভেবে সূর্যকে জাপটে ধরে বগলের তলায় পুরলো, পৃথিবীতে অন্ধকার, সূর্যদেবেরও দমবন্ধ হয় হয় অবস্থা। তখন সব্বাই মিলে অনেক বাবা বাছা করে হনুমানকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে বলার পরে হনুমান সূর্যদেবকে বগলের তলা থেকে বার করে আবার যে জায়গায় ছিল, সে জায়গায় রেখে দিয়ে বিছানায় ফিরে এল’। এই গল্প শুনতে শুনতে গোল্লা করা ভাত সবজি মাছ মুখে চলে গিয়েছে, জিজ্ঞেস করেছি তারপর? শেষ গোল্লাটা মুখে ঠেঁসে দিয়ে ঠাকুমা বলেছে পুরো খাবার খেয়ে নাও, তবে তো হনুমানের মতো শক্তি হবে। তারপর বয়স বেড়েছে, সূর্য, আহ্নিক গতি, উত্তরায়ণ, দক্ষিণায়ন, এপিথিলিয়ন, পেরিহিলিয়ন পড়েছি, হনুমানের গল্প যে এক বীর গাথা ছিল, তা বুঝেছি। কিন্তু জানি না বাঁকুড়ার প্রাক্তন সাংসদ, প্রাক্তন হাফ মন্ত্রী সুভাষ সরকারের বয়স এখনও হয়েছে কী না, নাকি তিনি এখনও শিশুটিই রয়ে গিয়েছেন। তিনি বলেছিলেন, খবরের কাগজে তা প্রকাশিতও হয়েছিল, কোট আনকোট, “এই সময় থেকে (মানে মকর সংক্রান্তি থেকে) সূর্য পৃথিবীর কাছে আসবে, তাই আরও সুন্দরভাবে সূর্যকে কাছে পাবো আমরা।” একেই বলে ‘আবালপনা’! সূর্য কাছে আসলে, সূর্যকে আরও সুন্দর ভাবে পাওয়া যায়, ভাবা যায়? একজন শিক্ষিত সাংসদ মন্ত্রী এই কথা বলছেন। সাংবাদমাধ্যম কোনও প্রশ্ন করেনি, তিনি সর্বসমক্ষে এই অবৈজ্ঞানিক, অসত্য, শিশুসুলভ কথাগুলো বলেছিলেন। তারও আগে চলুন দেখা যাক, কোন প্রসঙ্গে এই কথাগুলো বলেছিলেন।

তখন আমাদের দেশের ইউজিসি মানে ইউনিভার্সিটি গ্রান্ট কমিশনের সচিব রজনীশ সিং এবং অল ইন্ডিয়া কাউন্সিল অফ টেকনিক্যাল এডুকেশনের অ্যাসিসট্যান্ট ডিরেক্টর মনোজ সিং, তাঁরা নির্দেশ দিয়েছিলেন দেশজুড়ে উচ্চশিক্ষার পড়ুয়াদের এবার থেকে মকর সংক্রান্তি পালন করতে হবে। সেই সার্কুলার এবারেও জারি করা হয়েছে। কারণ পুরাণবিদ ও সংস্কৃত পন্ডিতদের মতে, হিন্দু ধর্মশাস্ত্র ও স্মৃতিগ্রন্থ অনুযায়ী মকর সংক্রান্তির স্নানে নাকি মানুষের পুণ্য হয়। হ্যাঁ, ওনারা কেবল পুণ্যতেই থেমেছেন। সংক্রান্তিতে সূর্য যখন মকর রাশিতে ঢোকে তখন উত্তরায়ণ হয়, আর উত্তরায়ণের এই ছ’মাস সব দেবতারা জেগে ওঠেন। তাই উচ্চশিক্ষা পড়ুয়াদের মকর সংক্রান্তি পালন করতে হবে। হ্যাঁ, তারা এই নির্দেশ দিয়েছেন, এবারে এসেছে কী না জানি না, কিন্তু গতবারে এ রাজ্যেও তা এসে পৌঁছেছিল। কিন্তু পিতৃপুরুষের অসীম সৌভাগ্য যে কিন্তু একটা শিক্ষা সংস্থা থেকে ছাত্রদের মকর সংক্রান্তি পালনের কোনও খবর পাওয়া যায়নি। এবার আসুন এই নির্দেশিকার বক্তব্য নিয়ে। উত্তরায়ণে মানে মকর সংক্রান্তির দিন থেকে, এক্ষেত্রে ১৪ জানুয়ারি থেকে ৬ মাস দেবতারা জেগে থাকবেন, তারপর ঘুমিয়ে পড়বেন। কী গেরো বলুন তো? এতদিনে বোঝা গ্যালো বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্র ‘জাগো, জাগো জাগো মা’ বলতে বলতে কাঁদতেন কেন? কারণ দেবী দুর্গা তো তখন শুয়ে, উঠছেন না। আচ্ছা তাই যদি হয়, তাহলে দেবতারা দুর্গার হাতে অস্ত্র দিলেন কি ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে? আর দেবী দূর্গা কি ঘুমিয়ে ঘুমিয়েই অসুরের সঙ্গে লড়াই করলেন? দেবতারা যদি ছ’মাস ঘুমোন, আর ছ’মাস জেগে থাকেন, তাহলে কুম্ভকর্ণ কি দেবতা ছিলেন? দেবতারা যদি ছ’মাস ঘুমিয়েই থাকেন, তাহলে সেই সময়ে এতগুলো পুজো কেন? বিশ্বকর্মা থেকে দুর্গা থেকে কালী, লক্ষ্মী, সরস্বতী এই পুজোগুলো হয় কেন? এসব প্রশ্ন উঠবে না? না, প্রশ্ন করা যাবে না, ইউজিসি আর এআইসিটিই-র নির্দেশে উচ্চ শিক্ষার ছাত্রদের মকর সংক্রান্তি পালন করতে হবে, মধ্যপ্রদেশ শিক্ষামন্ত্রীর নির্দেশে সক্কালে উঠে চান করতে হবে, তাতে নাকি হার্ট, কিডনি সব অসুখ ঠিক হয়ে যাবে। কেমন ভাবে? শিক্ষা মন্ত্রী ব্রাত্য বসু বালতি বালতি জল ঢেলে বিভিন্ন কলেজের ছত্র ছাত্রীদের পূণ্য স্নান করাবেন? নাকি অধ্যক্ষ আর অধ্যক্ষাদের উপর সেই দায়িত্ব দেওয়া হবে? তাও জানানো হয়নি। একটা অসম্পূর্ণ নির্দেশিকা, এই অবৈজ্ঞানিক নির্দেশিকা পাঠানো হয়েছিল উচ্চ শিক্ষার বিভিন্ন সংস্থায়। আমাদের ট্যাক্সের পয়সায় এই ধ্যাস্টামো চলছে।

আরও পড়ুন: Fourth Pillar | মোদিজির হলায় গলায় বন্ধু ডোনাল্ড ট্রাম্প কি এবারে ভারতকে ভাতে মারার চেষ্টা করছেন?

সেই প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে যখন শিক্ষক, অধ্যাপকেরা এই নির্দেশিকার বিরোধিতা করছেন, ঠিক তখন আমাদের বাঁকুড়ার সাংসদ, হাফ মন্ত্রী সুভাষ সরকারের এই আবালপনা আমরা শুনতে পেয়েছিলাম। তো আসুন একটু ক্লাস নেওয়া যাক, আপনাদের নয়, চতুর্থ স্তম্ভের দর্শকেরা এসব জানেন, আমি এই ক্লাস একান্তভাবেই আমাদের দেশের এই তথাকথিত হিন্দুত্ববাদী, সনাতনীদের জন্যই নেব। কারণ ওনারা ক্লাস সিক্স, সেভেন, এইটের ক্লাস করলেও এগুলো জানতেন। তো আসুন শুরু করা যাক। প্রথম কথা হল সূর্য যত কাছে আসবে ততই তা সুন্দর হবে তেমন নয়, কারণ সূর্যের বাইরের অংশের তাপমাত্রা ৫৫০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস, এবং ভক্তগণ ও শুভেন্দু বাবু, জল ফোটে ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে, আর মৃতদেহ পোড়ানো হয় যে চুল্লিতে তার তাপমাত্রা ৫০০ থেকে ১২৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। কাজেই আপনাদের প্রথম পাঠ, সূর্য কাছে এলেই সুন্দর হবে তা নয়, বগলে সূর্য নিয়ে ঘোরার গল্পটা আপাতত ভুলে যান। এরপর চলুন দ্বিতীয় পাঠে। সূর্যকে ঘিরে পৃথিবী সমেত গ্রহরা ঘোরে ঠিক গোল হয়ে নয়, উপবৃত্যাকারে, ছবিটা দেখুন বুঝতে পারবেন। এর ফলেই বার্ষিক গতি, ঋতু পরিবর্তন। পৃথিবী যত দূরে সরে যাবে তত ঠান্ডা, কাছে আসলে গরম। কিন্তু এই কাছে আসার আর দূরে যাওয়ার এক সীমা রয়েছে, মকর সংক্রান্তি হল সেই দিনটা, যেদিন সূর্য, জ্যোতিষশাস্ত্র অনুযায়ী যেদিন মকর রাশিতে ঢোকে, এতে কী হয়? কিছুই হয় না। বা বলা ভাল কিছু হয় বলে জানা নেই। তবে এরসঙ্গে উত্তরায়নের কোনও সম্পর্ক নেই। মোদিজিকেও এগুলো বোঝানোর দরকার আছে, তিনিও তো মকর সংক্রান্তি পালন করবেন ওই একই ধারণা নিয়ে। যা বলছিলাম। উত্তরায়ণ বা দক্ষিণায়নের সঙ্গে এই মকর সংক্রান্তির কোনও সম্পর্ক নেই। অনেকগুলো ব্যাপার আছে, সূর্য মধ্যে, উপবৃত্যাকার পথে, ইলাপটিক্যল পথে গ্রহগুলো ঘুরছে, ক্লাস ফোর ফাইভের ছেলেমেয়েরাও জানে তো যে, সূর্য কিন্তু গ্রহ নয়, সূর্য হল নক্ষত্র, আর চাঁদ হল উপগ্রহ, এবং রাহু কেতু এসব হল ছায়া, কোনও অস্তিত্বই নেই এদের। কিন্তু ওই জ্যোতিষ ঢপবাজিতে সবটাই গ্রহ হয়ে গিয়েছে। আবার ফিরে আসুন, পৃথিবী যেমন সূর্যের চার ধারে ঘোরে, তেমনই আবার নিজেও পাক খেতে থাকে, সেটাও আবার একটু হেলে, সোজা হয়ে নয়। এই হেলে থাকার ফলে পৃথিবীর দু’টো মেরু বছরে একবার করে সূর্যের সবথেকে কাছে চলে যায়, গরমকালে ২০ বা ২১ জুন উত্তর গোলার্ধ সূর্যের সব থেকে কাছে, তাই দিনটা বিরাট, রাতটা ছোট, আর তারপর থেকেই দক্ষিণায়ণ শুরু হয়ে যাবে, দিন ছোট হতে থাকবে, রাত বড় হতে থাকবে। এইবার ২১ বা ২২ ডিসেম্বারে দিন সবথেকে ছোট আর রাত সব চেয়ে বড় হবে, এরপর থেকে আবার দিন বড় হবে, আর রাত ছোট হবে, যাকে উত্তরায়ণ বলে। না, খ্রিস্টমাস বা বড়দিনের সঙ্গে না মকর সংক্রান্তির সঙ্গে এর কোনও সম্পর্ক নেই। এবার আসুন বুঝিয়ে বলি, ওই সূর্য কাছে আসার ব্যাপারটা, ওই যে কাছে আসলে সূন্দর হয়, সেইটা। সূর্যকে ঘিরে পৃথিবী ঘোরে কেমন ভাবে? উপবৃত্যাকার পথে, খানিকটা হাঁসের ডিমের মত চেহারা। কাজেই ঘুরতে ঘুরতে একটা সময় পৃথিবী সূর্যের সবথেকে কাছে আসে, তাকে বলে পেরিহেলিয়ন, কবে হয়? এ বছরে সেটা হয়েছে ৩ জানুয়ারি, রাত ১১টা ১৭তে, তখন সূর্য ১৪৭ মিলিয়ন কিলোমিটার দূরে ছিল। আর সবথেকে দূরে যাবে যখন, সেটা কে বলে অ্যাপহিলিয়ন। এ বছরে সেটা হবে, ৬ জুলাই, বিকেল ৪টে ৬ মিনিটে, তখন সূর্য পৃথিবীর চেয়ে ১৫২ মিলিয়ন কিলোমিটার  দূরে থাকবে।

তাহলে মজাটা দেখুন, সূর্যের কাছে থাকলেই গরমকাল আর দূরে থাকলেই শীতকাল তা কিন্তু নয়, সেটার রহস্য লুকিয়ে আছে ওই পৃথিবীর হেলে থাকার উপর। যেদিকটা হেলে থাকে সেই দিকটা দুরে থাকলে শীত, কাছে থাকলে গ্রীষ্মকাল। বোঝা গিয়েছে? আফটার অল বিজেপি নেতাদের বাড়িতেও তো স্কুল কলেজে যাওয়া ছেলে মেয়েরা আছে, বাড়িতে ছোটরা আছে, এরকম লোক হাসানো কথা বার্তা বলবেন কেন? ভাবুন না, সূর্য যখন সবথেকে কাছে এল, তখন আপনার উত্তর গোলার্ধে শীত, চলে যান অস্ট্রেলিয়ায়, এখন প্রবল গরম। এতখানি পড়াশুনো করে মাথা গরম হল? চান করে নিন, সংক্রান্তির চান টা আজকেই করুন, মাথা ঠান্ডা হবে।

দেখুন আরও খবর:

Read More

Latest News

toto DEPOBOS evos gaming

slot gacor

https://www.demeral.com/it/podcast https://rendez-vous.benin-ambassade.fr/profil-d/ https://www.annabelle-candy.com/about/ JUARA88 DEPOBOS idn poker 88 situs slot gacor https://www.demeral.com/it/demeral_software/ BWO99 slot 5000 poker situs slot gacor joker toto slot maxwin slot maxwin situs bola Depobos