বঙ্গ বিজেপির নেতারা বলেছিলেন যাঁরা বাদ পড়েছেন, তাঁরা নাকি সিব ঘুসপেটিয়া, তারা নাকি সব্বাই রোহিঙ্গা আর বাংলাদেশি। নিজেকে আরও একধাপ বেশি আরএসএস প্রমাণ করার জন্য শুভেন্দু অধিকারী বলেছিলেন, ব্রেকফাস্টে ৫৮ লাখ বাদ গেছে, লাঞ্চে ৬০ লক্ষ বাদ গিয়েছেন, এখনও ডিনার হয়নি। মানে খুব পরিস্কার তিনি দেড়-দু’কোটি ভোটারকে বাদ দিয়েই মাঠে নামার আনন্দে আত্মহারা ছিলেন। তো হয়েছে কী? ট্রাইবুনালের এই নয়া রায় আসার আগে ৯১ লক্ষ মানুষের নাম বাদ পড়েছিল, তার ৬৩ শতাংশ ছিল হিন্দু, মতুয়া, রাজবংশী, আদিবাসী। একবার হুগলি, উত্তর ২৪ পরগনাতে মতুয়া অধ্যুষিত আসনগুলোতে ঘুরে আসুন, আঁচ পেয়ে যাবেন শুভেন্দু বাবু। আর সংখ্যালঘু বাদ পড়েছে ৩৫ শতাংশের কম। ৬০ লক্ষ বিচারাধীন ভোটারদের মধ্যে শুভেন্দু বাবু জেনে নিন, ইতিমধ্যেই ৩৩ লক্ষের বেশি ফিরে এসে ডিনার খাচ্ছে। হ্যাঁ, ৬০ লক্ষ ভোটারকে গায়েব করার যে ব্যবস্থা জ্ঞানেশ কুমার করেছিলেন, সেই প্ল্যান ভেস্তে গিয়েছে। যাঁরা ফিরে এসেছেন, তাঁরা এই অসম্ভব হয়রানির বিরুদ্ধেই ভোট দেবেন। হ্যাঁ, জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে, তাঁর মালিকদের বিরুদ্ধে। অধ্যাপক, পাঁচ পুরুষের বাসিন্দা, বিদেশে পড়াশুনো করেছেন, পাসপোর্ট আছে, পরিবারের সব্বার, তাঁর পরিবার সমেত একজনেরও ভোট ছিল না, বিচারাধীন ছিলেন, তো বিচার শেষে উনি বাদ দিয়ে ওনার পরিবারের সব্বাই ফিরে পেয়েছেন দুনিয়ার সর্ববৃহত্তম গণতন্ত্রে ভোটদানের অধিকার, এখন ট্রাইবুনালের চক্কর কাটছেন। বছর চার পাঁচ উনি বিজেপির মধ্যে রাজ্যের উন্নয়নের ছবি দেখতে পাচ্ছিলেন, কেস এখন গুবলেট। হ্যাঁ, অধ্যাপক থেকে ক্ষেতমজুর একই বিপন্নতায় ভোগার পরে বুঝেছে বিজেপি আর নির্বাচন কমিশন দুই ভাই, আর সেই দুই ভাইয়ের কীর্তির চোটে মানুষ বেসামাল। কিন্তু সেই সিময়ে আবার হাজির সুপ্রিম কোর্টের রায়, এধারে ২১ পর্যন্ত ওধারে ২৭ পর্যন্ত যাঁরা ট্রাইবুনালের ছাড় পাবেন তাঁরাও ভোট দিতে পারবেন। সেটাই বিষয় আজকে, ঠাস করে এক থাপ্পড় শুভেন্দু-জ্ঞানেশ-মোদি-শাহের গালে।
যে রায় গতকাল সুপ্রিম কোর্ট দিয়েছে, তা খুব গুরুত্বপূর্ণ। কেন? কারণ রাজ্যের ‘বিবেচনাধীন’ ৬০ লক্ষ ভোটারের মধ্যে যে ২৭ লক্ষ ভোটারের নাম কাটা গিয়েছে, তা নিয়ে গত সোমবার এসআইআর নিয়ে মামলার শুনানির সময় সুপ্রিম কোর্ট তাঁদের জন্য আশার কথা শোনায়নি। বারবার আবেদন জানানো হয়েছিল, যাঁরা ভোটের আগে ট্রাইবুনালের ছাড়পত্র পাবেন, তাঁদের নাম ভোটার তালিকায় যোগ করা হোক। কিন্তু প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত যে মৌখিক নির্দেশ দিয়েছিলেন, তাতেও এ নিয়ে কোনও নির্দেশ ছিল না। বেনজির ভাবে তার তিন দিন পরে বৃহস্পতিবার দুপুরে সেই একই শুনানির লিখিত রায় এসেছে সুপ্রিম কোর্টের কাছ থেকে। সবাইকে চমকে দিয়ে অতিরিক্ত সংশোধিত ভোটার তালিকা প্রকাশের নির্দেশ দিয়েছে সর্বোচ্চ আদালত। যুক্তি খুব পরিস্কার, এসআইআর-এর কাজে নিযুক্ত বিচারকরা যদি কাউকে ভোটার তালিকায় ভুল করে ঢুকিয়ে থাকেন বা কাউকে ভুল করে বাদ দিয়ে থাকেন, সেই ভুল ঠিক করতেই তো আপিল ট্রাইবুনাল তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। যদি আপিল ট্রাইবুনাল কারও নাম যোগ করার বা কারও নাম বাদ দেওয়ার নির্দেশ দেয়, তা হলে সেই নির্দেশ ২৩ এপ্রিল ও ২৯ এপ্রিলের ভোটের আগে কার্যকর হওয়া প্রয়োজন। তাই এই রায় এসেছে।
আরও পড়ুন: Aajke | নববর্ষ থেকেই বিজেপিকে জেতাতে মাঠে রাজ্যপাল
এখন ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া ২৭ লক্ষ মানুষের মধ্যে কত জনের সুফল পাবেন, তা নির্ভর করছে ওই সময় পর্যন্ত ট্রাইবুনাল কত জনের আপিলে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেবে, তার উপরে। এবং সিইও মনোজ আগরওয়াল কিন্তু মেনেই নিয়েছেন, “যে নামগুলি ট্রাইবুনালে যোগ্য বলে বিবেচিত হবে, সেগুলি তালিকায় যুক্ত হবে। তাঁরা ভোট দিতে পারবেন। নির্দিষ্ট সফটওয়্যারে নিষ্পত্তির নাম যুক্ত হবে। মানে ওই যে নির্বাচন কমিশনের বিবৃতি, ভোটার লিস্ট ফ্রিজ হয়ে গিয়েছে, তা কিন্তু হয়নি। প্রতিদিন যতজন মানুষের আবেদন নিয়ে বিচার শেষ হবে, সেই নাম তখনই চলে যাবে নির্বাচন কমিশনে। হ্যাঁ, এটা ঘটনা যে মাত্র ১৯ জন বিচারপতির এই ট্রাইবুনাল কতজন আবেদনকারীর বিচার করতে পারবেন? না খুব বেশি নয়, কিন্তু পার্সেপশন, সারা রাজ্য জুড়ে বিজেপি যে ঘুসপেটিয়া তত্ত্ব ছড়াতে চায়, তা অনেকটা থমকে যাবে, যাবে কারণ সুপ্রিম কোর্ট এই আদেশ দিয়ে আবার সাফ জানিয়েই দিল যে যাঁরা বাদ পড়েছেন তাঁরা সব্বাই ঘুসপেটিয়া নন, তাঁরা রোহিঙ্গাও নন। কাজেই ব্রেকফাস্ট, লাঞ্চের পরে এবারে চাকা উল্টোদিকে ঘুরছে, বদহজম হবেই, স্বচ্ছ টয়লেট কোনদিকে সেটা বরং বিজেপির নেতারা দেখে রাখুন। আমরা আমাদের দর্শকদের জিজ্ঞেস করেছিলাম, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে ট্রাইবুনালে এখনও যাঁদের বিচার চলছে তাঁদের এক অংশ নিশ্চিতভাবেই ফিরে পাবেন তাঁদের ভোটাধিকার, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই রায়কে মানুষের জয় বলে জানিয়েছেন। এই রায় কি শুভেন্দু–শমীক–দিলীপ-সুকান্তকে আরও খানিক পেছনে ঠেলে দিল বলে মনে হয়? শুনুন মানুষজন কী বলেছেন।
এই রায় এক সজোরে থাপ্পড় সেই সব অপগন্ডদের গালে যাঁরা ডিনারে বসে মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নেবার স্বপ্ন দেখেন, এই রায় তাঁদের বিরুদ্ধে যাঁরা বলেছেন বাদ পড়া প্রত্যেকের দেহে বইছে বদরক্ত, এই রায় আজ হয়তো খুব সামান্য মানুষকে তাদের ভোটাধিকার ফিরিয়ে দিতে পারবে, কিন্তু আগামী দিনে এই রায় রেফারেন্স হিসেবে কাজ করবে। গণতন্ত্রে মানুষ নির্বাচিত করে তাঁদের প্রতিনিধিদের, এটাই গণতন্ত্রের অন্যতম শর্ত, কিন্তু এখন ছবিটা বদলে দিয়ে নরেন্দ্র মোদি, অমিত শাহ, জ্ঞানেশ কুমার এমন এক ব্যবস্থা তৈরি করতে চান যেখানে ওই ওনারাই আগে ঠিক করে দেবেন কে হবেন ভোটার, তারপরে সেই ভোটারদের ভোটে এক সরকার তৈরি করবেন যাকে কোনওদিনও হারানোই যাবে না। এটা এক ফাসিবাদী কায়দা, কিন্তু সমস্যা হল অসম্ভব ক্ষমতা নিয়ে জন্মানো ফাসিবাদের সমাধি আমরা দেখেছি, চিরটাকাল অত্যাচার করার লাইসেন্স কোনও রাষ্ট্র, কোনও সমাজ কাউকেই দেয় না।
দেখুন আরও খবর:








