ওয়েব ডেস্ক: টানা নবমবার কেন্দ্রীয় বাজেট পেশ করলেন অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমন (Nirmala Sitharaman)। আর্থিক সংস্কার, কর কাঠামোয় বদল, পরিকাঠামো বিনিয়োগ, স্বাস্থ্য, কৃষি, শিক্ষা থেকে শুরু করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা—বহু ক্ষেত্রে বড় ঘোষণা এসেছে এবারের বাজেটে। ভোটমুখী রাজ্যগুলির দিকে বিশেষ নজর পড়েছে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। পশ্চিমবঙ্গের জন্য শিল্প ও ফ্রেট করিডরের মতো প্রকল্প ঘোষণা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। বাজেটে যেমন কর ছাড় ও স্বাস্থ্যখাতে স্বস্তি আছে, তেমনই তামাকজাত পণ্যে শুল্ক বাড়িয়ে মূল্যবৃদ্ধির ইঙ্গিতও রয়েছে।
বাজেটের প্রধান ঘোষণাগুলি এক নজরে:
- সিগারেট, তামাক ও পান মশলায় শুল্ক বৃদ্ধি, অতিরিক্ত আবগারি ও স্বাস্থ্য শুল্ক কার্যকর, সর্বোচ্চ ৪০% জিএসটি থাকছে।
- ক্যানসারের ১৭টি জীবনদায়ী ওষুধে আমদানি শুল্ক কমল।
- ৭টি বিরল রোগের ওষুধ ও পথ্যে ব্যক্তিগত আমদানিতে শুল্ক ছাড়।
- ব্যক্তিগত ব্যবহারের বিদেশি পণ্যে আমদানি শুল্ক ২০% থেকে কমিয়ে ১০% করার প্রস্তাব।
- ২০২৬–২৭ অর্থবর্ষে মূলধনী খাতে ১২.২ লক্ষ কোটি টাকা বরাদ্দ।
- টায়ার–২ ও টায়ার–৩ শহরের পরিকাঠামোয় বিশেষ জোর।
- দেশজুড়ে ১,০০০ ক্লিনিকাল ট্রায়াল সাইট গড়ার ঘোষণা।
- কৃষিক্ষেত্রে AI ব্যবহারে ‘ভারত বিস্তার’ প্রকল্প।
- গোষ্ঠী পরিচালিত ‘শি-মার্ট’ বিপণী তৈরির প্রস্তাব।
- বাজেট ঘাটতি জিডিপির ৪.৩% ধরা হয়েছে।
- রাজ্যগুলিকে মোট আয়ের ৪১% ফেরত—বরাদ্দ ১.৪ লক্ষ কোটি টাকা।
- ১ এপ্রিল থেকে নতুন আয়কর আইন কার্যকর।
- ১৫জি ও ১৫এইচ ফর্ম প্রক্রিয়া সহজীকরণ।
- ৩১ মার্চ পর্যন্ত কম জরিমানায় আইটি রিটার্ন সংশোধনের সুযোগ।
- গাড়ি দুর্ঘটনার ক্ষতিপূরণে আয়কর লাগবে না।
- পশ্চিমবঙ্গের দুর্গাপুরে শিল্প করিডর গড়ার ঘোষণা।
- ডানকুনি–সুরাট ফ্রেট করিডর প্রকল্প।
- বারাণসী–শিলিগুড়ি সহ ৭টি হাইস্পিড রেল করিডর।
- ৩টি নতুন অল ইন্ডিয়া আয়ুর্বেদ ইনস্টিটিউট।
- আয়ুষ ফার্মাসি ও ল্যাব আধুনিকীকরণ।
- AI-এর চাকরিক্ষেত্রে প্রভাব খতিয়ে দেখতে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি।
- কন্টেন্ট ক্রিয়েটরদের জন্য ১০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ তহবিল।
- দেশজুড়ে অ্যাকাডেমিক জোন গড়ার ঘোষণা, নারীশিক্ষায় জোর।
- মহাত্মা গান্ধী গ্রাম স্বরাজ বস্ত্র প্রকল্প চালু।
- MSME সেক্টরের জন্য ১০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ।
- আত্মনির্ভর ভারত প্রকল্পে ২ হাজার কোটি বরাদ্দ।
- শক্তি উৎপাদন ও অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধিতে জোর।
আরও পড়ুন: করদাতাদের সুবিধার্থে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার প্রস্তাব কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রীর
বাংলা কী পেল?
- স্বতন্ত্র পণ্য পরিবহন করিডর- পশ্চিমবঙ্গের ডানকুনি ও গুজরাতের সুরাতকে জুড়বে পণ্য করিডর। পণ্য পরিবহন, বাণিজ্য ও শিল্পোন্নয়নে স্বতন্ত্র ফ্রেড করিডর।
- দ্রুতগতি সম্পন্ন ৭টি উচ্চগতির রেল করিডর। ১টি পাচ্ছে বাংলা। দিল্লি থেকে শিলিগুড়ি। ভায়া-বারাণসী
- জাতীয় জলপথ পরিবহনের এক্তিয়ার বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। ২০ নতুন জাতীয় জলপথ তৈরির প্রস্তাব। যেহেতু বাংলায় জলপথ প্রশস্ত। তাই এখান থেকেও বাংলার কিছু পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
- টিয়ার ২-টিয়ার ৩ শহরের উন্নয়ন, বন্দর পরিকাঠামো উন্নয়নের মতো বিভিন্ন জাতীয় প্রকল্পগুলি থেকে বাংলা লাভবান হতে পারে। হাইওয়ে পরিকাঠামো উন্নয়নের ক্ষেত্রেও লাভবান হতে পারে।
- দুর্গাপুরে শিল্প করিডরের প্রস্তাব।
- দাম কমছে- মোবাইল ফোন, মোবাইল ফোনের চার্জার, স্মার্ট টিভি ও ডিসপ্লে বোর্ড, ফিটনেস ব্যান্ড ও স্মার্ট ঘড়ি, বিদেশ থেকে আমদানিকৃত খেলার সরঞ্জাম, সোনা-রুপো, ক্যান্সার, ডায়াবেটিস ও বিরল রোগের ওষুধ, বৈদ্যুতিন গাড়ি, ব্যাটারি, এক্স-রে মেশিন, মেডিক্যাল পরীক্ষার যন্ত্রপাতি, বিড়ি,জুতো, বিরল খনিজ যেমন, লিথিয়াম, কোবাল্ট, তামা, মাছের খাবার, আই ফোনের চার্জার ও অন্যান্য সরঞ্জাম,ইলেক্ট্রিক স্কুটার, মাইক্রোওয়েভ।
- দাম বাড়ল- মদ ও সিগারেট, বিদেশ থেকে আমদানিকৃত তৈরি গাড়ি
বাজেট ভাষণে অর্থমন্ত্রী বলেন, লক্ষ্য “বিকশিত ভারত” গড়া, পরিকাঠামো, স্বাস্থ্য, কৃষি ও প্রযুক্তিকে ভিত্তি করে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও একে উন্নয়নমুখী বাজেট বলে উল্লেখ করেছেন। বিশ্লেষকদের মতে, কর সহজীকরণ ও মূলধনী বিনিয়োগ—এই দুই স্তম্ভের উপর দাঁড়িয়ে আগামী অর্থনীতির রূপরেখা সাজানো হয়েছে।
উল্লেখ্য, রাষ্ট্রপতি ভবনে আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে সংসদে এসে ২০২৬–২৭ অর্থবর্ষের কেন্দ্রীয় বাজেট পেশ করলেন অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন। এটি তাঁর টানা নবম বাজেট এবং বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ সরকারের তৃতীয় মেয়াদের তৃতীয় বাজেট। বাজেট পেশের আগে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা এ বছরের বাজেট নথিতে অনুমোদন দেয়। বিশ্ব অর্থনীতির অনিশ্চয়তা ও অস্থিরতার আবহেই এ বছরের বাজেট পেশ করা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিও এই বাজেটকে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে। বিশেষ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভারতীয় রফতানির ওপর নতুন ট্যারিফ আরোপের সিদ্ধান্তে বাণিজ্য ও বাজারে চাপ বেড়েছে। এই প্রেক্ষাপটে প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান, মূল্যবৃদ্ধি ও বিনিয়োগ- সব দিক সামলে কেন্দ্রের আর্থিক রূপরেখা কী হয়, সেদিকেই নজর অর্থনীতিবিদ ও শিল্পমহলের।
এদিন অর্থমন্ত্রীর পোশাকও আলাদা করে নজর কাড়ে। তিনি হাতে বোনা গোলাপি রঙের কাট্টম কাঞ্চীপুরম সিল্ক শাড়ি পরেন, যাতে সোনালি-বাদামি চেক ও কফি-রঙা বর্ডারে সূক্ষ্ম সুতোয় কাজ রয়েছে—তামিলনাড়ুর ঐতিহ্যের প্রতি সম্মান জানাতেই এই নির্বাচন। ২০১৯ সালে প্রথম বাজেট থেকেই তিনি চামড়ার ব্রিফকেসের বদলে ঐতিহ্যবাহী লাল কাপড়ে মোড়া বহি খাতা ব্যবহার শুরু করেন। এবারও বাজেট সম্পূর্ণ কাগজবিহীন বা পেপারলেস পদ্ধতিতে পেশ করা হয়েছে।







