দিল্লিতে মমতা গিয়েছেন, ঘোষিত কর্মসূচি, উনি নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে দেখা করবেন, চিঠির পর চিঠি দিয়ে যাচ্ছেন। এদিকে হ্যারাসমেন্ট চলছে, এক অদ্ভুত অত্যাচার, কেন কারও জানা নেই, মাথা নেই, মুণ্ডু নেই, যাকে পারছে তাকে ডাকা হচ্ছে, আর মানুষ ক্রমশ বুঝতে পারছেন যে, এই গোটা প্রক্রিয়াটা আসলে নাম বাদ দেবার জন্য, এর সঙ্গে ভোটার লিস্ট সংশোধনের কোনও সম্পর্ক নেই। হ্যাঁ, এই কথাগুলোই বলার জন্য মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় গিয়েছেন দিল্লিতে, বলবেন মহামান্য প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে, আর সর্বোচ্চ আদালতকেও এই একই কথা জানাবেন। এবং তিনি সঙ্গে নিয়ে যাবেন এই এসআইআর প্রক্রিয়া চলাকালীন আশঙ্কায় আত্মঘাতী বা সেই একই আশঙ্কায় মৃত কিছু মানুষের আত্মীয়স্বজনকে। তাঁদের রাখা হয়েছে বঙ্গ ভবনে, দিল্লির আরও কিছু জায়গাতে। কিন্তু সেই সমস্ত জায়গাতে কড়া পাহারা বসিয়ে দিল দিল্লি পুলিশ বা বলা ভালো অমিত শাহের পুলিশ। তারা এক ব্যারিকেড তৈরি করে বসে থাকলেন, সেখানে হাজির হলেন তৃণমূল দলের এম পি ডঃ কাকলী ঘোষদস্তিদার, হাজির ছিলেন সাকেত গোখলে, পুলিশ তখনও কেবল সরছে না তাই নয়, এক চরম ঔধত্য নিয়েই তর্ক করছে। খবর গিয়েছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে, তিনি সটান রওনা দিলেন সেখানে, সঙ্গে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এবং আরও অনেকে। এবার দেখার মতো দৃশ্য, পুলিশ দেখলে যেমন চোরেরা পালিয়া যায়, যাকে বলে ‘পতলি গলি সে কট লেনা’, ঠিক সেভাবে পুলিশ বাহিনীকে কিছু বলার আগেই তারা সুড়সুড় করেই চলে যাচ্ছেন আর মমতা তাঁদের জিজ্ঞেস করছেন, “আপনারা এখানে এসেছেন কেন? আমাদের বঙ্গভবনে আপনারা হঠাৎ কেন?” এবং পুলিশ বাহিনী যাঁরা এতক্ষণ গলা তুলে তর্ক করছিল, তাঁরা চুপ করে গিয়েছেন, তাঁরা ‘বঙ্গাল কি শেরনি’র কাছে ‘ভিগি বিল্লি’, ভেজা বেড়ালের মতো চুপ করে দাঁড়িয়ে আছেন, সেখানে তাঁদের কিছু বলার সময়ে মমতা বলছিলেন, “দেখুন আপনার এভাবে হাজির হয়েছেন খবর পেয়ে আমি ঘরে যে শাড়ি পরেছিলাম, সেটা পরেই চলে আসতে বাধ্য হয়েছি।” এই ভিডিও স্বাভাবিকভাবেই ভাইরাল। কিন্তু সেই ভিডিও দেখেই আমাদের সিপিএম উকিলবাবু বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য লিখলেন, ‘মমতা দিল্লিতে গিয়েছেন রাষ্ট্রপতি শাসন আদায় করতে। পালিয়ে গিয়ে ফিরে আসার কাঁদুনি গাইবার অছিলায় রাষ্ট্রপতি শাসন চাইই। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ভিনরাজ্যের পুলিশকে প্রকাশ্যে কাপড় টেনে দেখিয়ে বলছে, দেখুন ঘরের কাপড় পরে এসেছি। এর থেকে বড়ো বেহায়াপনা আর কী হতে পারে? বাংলার মেয়েরা এত নির্লজ্জ ও বেহায়া নয়।’
বিজেপি আজ দিল্লিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে পুলিশ দিয়ে সামলানোর চেষ্টা করেছে, বিকাশবাবুদের আমলে সেই একই মমতাকে পুলিশ গুন্ডা দিয়ে সামলানোর চেষ্টা করা হয়েছিল। আজ বিকাশবাবুদের হাতে পুলিশ নেই, গুন্ডারাও কেটে পড়েছে যে যার মতো, কিন্তু সেই ঘৃণ্য মাথার ভাষাটা থেকেই গিয়েছে, তাই অনায়াসে একজন তথাকথিত শিক্ষিত মানুষের মুখ থেকে এমন নর্দমার মত ভাষা বেরিয়ে এল। আসলে এখন সিপিএম যে ভাষায় কথা বলে, তার বেশিরভাগটা মানুষ বোঝে না, মানে বোধগম্য হয় না সাধারণ মানুষের, আর বাকিটা ওই কুৎসা, নোংরা ভাষা। যে দলের নেতা লিখেছিলেন দুঃসময়, সেই দলের আজ আক্ষরিক অর্থেই দুঃসময়, যা দেখলে সত্যিই ঘেন্না লাগে, বিবমিষা জাগে, বমি পায়। উনি লিখেই দিলেন যে, মমতা গিয়েছেন দিল্লিতে রাষ্ট্রপতি শাসন যাতে লাগু হয়, তার জন্য? উকিল তো? সামান্য পড়াশুনো তো করেইছেন বলে ধরে নেওয়া যায়, কোন বইতে বলা আছে যে, বিরোধী নেত্রীর কথা শুনে শাসক দল রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করবে? আসলে ৩৪ বছরের ইঁট, বালি, চুন, সুরকি, মধুভান্ডের দখলদারি চলে যাওয়ার পরে এক উন্মাদ বিবেচনা এনাদেরকে জানিয়েছে যে, এর জন্য এক এবং এক মাত্র মমতা দায়ী, তাই এক অন্ধ মমতা বিদ্বেষ দেখবেন এই সিপিএম এর বেশিরভাগের মধ্যে, তারই বহিঃপ্রকাশ আজকে বিকাশবাবুর মন্তব্যে। যিনি ‘নুন থেকে চুন খসা’র আগে চলে যান আদালতে, সবকটার চাকরি খেয়ে নেবার কথা আরামসে ঘোষণা করেন, সেই বিকাশবাবু কিন্তু এসআইআর-এর এই বিরাট হয়রানি নিয়ে, মানুষের এই অবর্ণনীয় অবস্থা দেখার পরেও আদালতে যাননি। যাননি, কারণ উনি বা ওনাদের মতো আরও কয়েকজন বসে বসে মজা দেখার পক্ষপাতী। বিজেপিই যদি ওনাদের কাছে সবথেকে বড় শ্ত্রু হত, তাহলে ওনারা নিশ্চিতভাবেই মানুষের অভিযোগ নিয়ে আদালতে যেতেন, যাননি।
আরও পড়ুন: Fourth Pillar | পশ্চিম বাংলা কি মোদি সরকারের ‘সতীনের বাচ্চা’?
সে কথা থাক, আসুন আপাতত এই এসআইআর-এর তাণ্ডব নৃত্যটাকে একটু বোঝার চেষ্টা করি। খুব ছোট আর অত্যন্ত সাধারণ কারণেও মানুষকে ঘরবাড়ি ছেড়ে, কাজ কামাই করে নির্বাচন কমিশনের অস্থায়ী শিবিরে গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। অভিযোগ উঠছে যে, এই বিশাল কর্মযজ্ঞের আড়ালে আসলে প্রায় ৫০ লক্ষ মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার এক সুপরিকল্পিত ছক কষা হয়েছে। আগে আসুন আবার বুঝি যে, এসআইআর খায় না মাথায় দেয়? এসআইআর আসলে কী আর কেন এটা এই মুহূর্তে বাংলায় এক ভয়ঙ্কর চেহারা নিয়েছে? এমনিতে এটা এক প্রক্রিয়া, যা দিয়ে এক রাজ্যের পুরো ভোটার তালিকাকে নতুন করে তৈরি বা সংশোধন করা হবে। সাধারণভাবে এটা প্রতি নির্বাচনের আগে করা হয় না, ইন ফ্যাক্ট আগে কখনও হয়নি। ইলেকশন কমিশনের হ্যান্ডবুকেও দেশজুড়ে বা রাজ্যজুড়ে এসআইআর করার কোনও এক্তিয়ার ইলেকশন কমিশনের নেই। কিন্তু বিহারে এটা শুরু করা হল, বলা হচ্ছে ওটা ছিল ‘টেস্ট কেস’। কিন্তু তার পরেই পশ্চিমবঙ্গে এই দ্বিতীয় দফার সংশোধন শুরু হতেই শুরু হয়ে গেল চরম বিশৃঙ্খলা। নগরায়ণ, মানুষের স্থানান্তর এবং মৃত ভোটারদের নাম বাদ দেওয়া তো খুব সাধারণ ব্যাপার, কিন্তু তা নিয়েই তো বিতর্ক নয়, মূলত পশ্চিমবঙ্গের জন্য যে ‘অ্যালগরিদম’ বা কম্পিউটার প্রোগ্রাম ব্যবহার করা হচ্ছে, তা নিয়েই তৈরি হয়েছে সবচেয়ে বড় বিতর্ক। ‘ম্যাপিং’ আর ‘আনম্যাপড’— এই দুটো শব্দের মার-প্যাঁচে সাধারণ মানুষকে দিশেহারা করে দেওয়া হচ্ছে। যে ভোটাররা নিজেদের নাম ২০০২ সালের ভোটার তালিকার সঙ্গে যুক্ত করতে পারছেন না, তাঁদের ‘আনম্যাপড’ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। আর যাঁদের নাম কোনওভাবে পাওয়া যাচ্ছে, তাঁদের গায়ে সাঁটিয়ে দেওয়া হচ্ছে ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি’-র তকমা। নে এবারে কী করবি কর! সাধারণ মানুষের গলায় এক অদৃশ্য ফাঁস হল এই ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি’। নির্বাচন কমিশন বলছে যে, তাদের সফটওয়্যার নাকি কিছু এমন তথ্য খুঁজে পেয়েছে যা বাস্তবসম্মত নয়। কিন্তু এই তথাকথিত অসঙ্গতিগুলো কী কী? কমিশন পাঁচটা প্রধান বিভাগ তৈরি করেছে। প্রথমত, ‘প্রোজেনি ৬’— মানে যদি কোনঅ ভোটারের ছয় জনের বেশি সন্তান থাকে, তবে তাঁকে, তাঁর গুষ্টির সবাইকে সন্দেহের তালিকায় ফেলা হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, মা বা বাবার সাথে সন্তানের বয়সের পার্থক্য যদি ১৫ বছরের কম হয়, তাহলে মা, বাবা, সন্তান – সব্বাই লাইনে দাঁড়াও। তৃতীয়ত, যদি এই বয়সের পার্থক্য ৫০ বছরের বেশি হয়, তাহলে সব্বাই চলে এস। চতুর্থত, দাদু বা ঠাকুমার সাথে নাতি বা নাতনির বয়সের পার্থক্য যদি ৪০ বছরের কম হয়, হাজিরা দাও, নোটিস যাচ্ছে মৃত দাদুর নামেও। আর পঞ্চমত, বাবার বা আত্মীয়ের নামের বানানে কোনও অমিল থাকা। মুখার্জি মুখোপাধ্যায় হলেই কেলো!
হাসবেন না, বাজার নয়, চাকরি নয়, এমনকি খাবার, বাসস্থান, শিক্ষা বা স্বাস্থ্যও নয়, আপাতত চিন্তা এসআইআর-এর নোটিস। নামের বানানে ভুল বা সঠিক জন্ম তারিখ না থাকা কোনও অস্বাভাবিক ঘটনা নয়। কিন্তু কমিশনের ডিজিটাল সফটওয়্যার এই মানবিক ভুলগুলোকে সরাসরি ‘অসঙ্গতি’ হিসেবে ধরছে। কমিশন সুপ্রিম কোর্টে জানিয়েছে যে, কোনও কোনও ক্ষেত্রে একজন ভোটারের ১০০ বা ২০০ জন সন্তান রয়েছে বলেও নথিতে দেখা যাচ্ছে, যা বিজ্ঞানের চোখে অসম্ভব। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, এই ভুলগুলো করল কে? সেই ভোটার তো নয়, এর আগে যখন সরকারি কর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটারদের তথ্য লিখে আনতেন, তখন তাঁরাই তো এই ভুলগুলো করেছেন। অথচ সেই ক্ল্যারিকাল ভুলের শাস্তি হিসেবে এখন সাধারণ মানুষকে রোদে পুড়ে সময় নষ্ট করে ঘন্টার পর ঘন্টা দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে ওই অস্থায়ী শিবিরগুলোতে। আর এই তাণ্ডব নৃত্যে যে পরিমাণ মানুষকে চিহ্নিত করা হয়েছে, তা শুনলে যে কেউ চমকে উঠবেন। প্রাথমিকভাবে প্রায় ১ কোটি ৬৬ লক্ষ ভোটারের তথ্যে লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি পাওয়া গিয়েছিল বলে জানানো হয়েছিল। পরবর্তীকালে যাচাইকরণের পর এই সংখ্যাটি কমে বর্তমানে প্রায় ৯৫ লক্ষে দাঁড়িয়েছে। এই ৯৫ লক্ষ মানুষের মধ্যে প্রায় ৫১ লক্ষ মানুষের ক্ষেত্রে রয়েছে বাবার নামের অমিল। প্রায় ২৩ লক্ষ মানুষের ক্ষেত্রে অভিযোগ উঠেছে যে, তাদের ছয় জনের বেশি সন্তান রয়েছে। এছাড়া মা-বাবার সাথে বয়সের অসম ব্যবধানের মামলা রয়েছে প্রায় ১৩ লক্ষ। এর বাইরেও রয়েছে প্রায় ৫৮ লক্ষ মানুষের নাম বাদ যাওয়ার ঘটনা। যাঁরা মৃত, ঘর পরিবর্তন করেছেন বা শুনানিতে অনুপস্থিত ছিলেন, তাঁদের ‘ASDD’ (Absent, Shifted, Dead, Duplicate) ক্যাটাগরিতে ফেলে খসড়া তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এর সাথে আরও ৩০ লক্ষ ভোটার রয়েছেন, যাঁরা ‘আনম্যাপড’, অর্থাৎ ২০০২ সালের ভোটার তালিকার সাথে যাঁদের কোনও বংশগত যোগসূত্র খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
সব মিলিয়ে এই বিশাল জনসংখ্যার উপর যে খাঁড়া নেমে এসেছে, তা বাংলার ইতিহাসে নজিরবিহীন। সেই নজিরবিহীন এক হয়রানির বিরুদ্ধে বাংলার মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকারের স্বার্থে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় লড়ছেন। হ্যাঁ, এই লড়াইটা বিজেপি আরএসএস-এর দখলদারির বিরুদ্ধে, মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নেবার বিরুদ্ধে। মানুষ দেখছেন, হ্যাঁ, বাংলার মানুষ জানেন একজনও বৈধ ভোটারের নাম কাটা গেলে আর কেউ না থাক মমতা আছেন। হ্যাঁ, সেখানেই মমতা জিতে যান বারবার, মানুষ মমতাতে ভরসা রাখেন। কারণ মমতা মানুষের পাশে থাকেন, এই লড়াই তো লড়ার কথা ছিল বামপন্থীদের, কমিউনিস্টদের। তাঁরা সে লড়াই না লড়ে বিজেপির হাত শক্ত করছেন, মানুষ দেখছে, মানুষ বুঝছে।
দেখুন আরও খবর:








