ক্রমশ আমরা অভ্যস্থ হয়ে উঠছি একটা ব্যাপারে, আমাদের দেশ যুদ্ধ করলে সে যুদ্ধ থামবে কবে সেটা আমাদের প্রধানমন্ত্রী নয়, আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জানাচ্ছেন। আমাদের দেশের বাণিজ্য চুক্তি হল কি হল না, সেটাও ঐ আমেরিকান প্রেসিডেন্টই জানাচ্ছেন। এতে আবার মোদি ভক্তদের শরীরে এক আনন্দের হিল্লোল বয়ে যায়, আমাদের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, এরকম একটা ফিলিং নাকি তাঁদের জাগে। হবে হয় তো, কিন্তু আমাদের অনেকের আবার বমিও পায়। তো সেই ট্রাম্প সাহেবের ঘোষণাতেই আমরা জানতে পারলাম যে, হয়ে গিয়েছে, বাণিজ্য চুক্তি হয়ে গিয়েছে। দাদায় কইসে, ‘কিসের যেন ভাই, আনন্দের আর সীমা নাই’, জানিয়ে দিল শেয়ার বাজার, হুউউউস করে ২০০০ পয়েন্ট লাফ দিয়ে। মাথায় রাখুন এমন নয় যে ট্রাম্প সাহেব কেবল ভারত–আমেরিকা চুক্তি হয়েছে সেটাই জানাননি, শর্তগুলোও একতরফাই খোলসা করেই জানিয়ে দিয়েছেন। আমেরিকা আমাদের দেশে যা যা রফতানি করে, মানে ওদেশ থেকে যেসব জিনিষ ভারত আমদানি করে, তার উপরে এক বিরাট ট্যারিফ চাপানো হত। হ্যাঁ, সেই কারণেই ট্রাম্প সাহেব ভারতকে ট্যারিফ কিং বলেও ব্যঙ্গ করেছিলেন। তো সেই ট্যারিফ এখন জিরো, হ্যাঁ এক্কেবারে শূন্য। মানে ওনারা যদি মাখন আর চিজ পাঠান, আগে আমাদের দেশের ডেয়ারি ইনডাস্ট্রির কথা ভেবে তাতে ৭০ থেকে ৮০ থেকে ১০০ শতাংশ ট্যারিফ বসানো হত, কাজেই আমাদের দেশে সেসব মাখন বা চিজের দাম অনেকটা বেড়ে যেত, আম্বানি-আদানিরা কিনলেও আম আদমি কিনত না। কাজেই আমাদের ডেয়ারি ইনডাস্ট্রির বাজারে হাত পড়ত না। কিন্তু এবারে, সেই ট্যারিফ জিরো। মার্কিন দেশে এক লিটার জিম বিম বার্বান হুইস্কির দাম কমবেশি ৯০০ টাকা, আমরা প্রায় ১১০ শতাংশ ট্যারিফ বসাতাম, দাম হত প্রায় ২০০০ টাকা। এবারে সেটা ওই ৯০০ থেকে ১০০০ টাকাতে পাওয়া যাবে। আমাদের এখানের ডিস্টিলারিগুলো মার খাবে। এরকম আরও অনেক উদাহরণ দেওয়া যায়। বদলে কী? বদলে আমাদের দেশ থেকে যা আমেরিকাতে যায়, মানে আমেরিকা যা আমদানি করে তাতে ট্রাম্প সাহেব বেসিক ট্যারিফ আর পেনাল্টি ট্যারিফ মিলিয়ে ৫০ শতাংশ শুল্ক চাপিয়েছিলেন, এবারে সেটা ১৮ শতাংশ হয়ে যাবে। মানে আগের মতো। আর কী শর্ত? এই ট্রেড ডিলে পাঁচ বছরে ৫০০ বিলিয়ন ডলার টাকার আমেরিকান জিনিষপত্র আমদানি করা হবে, সেটা জানানো হয়েছে, মানে ভারত সেটাতে রাজি হয়েছে।
তাহলে একবার দেখে নিন গত পাঁচ বছরে ভারত কত ডলারের জিনিষপত্র আমদানি করেছিল – ২০২০-২১ -এ ২৮.৮৯ বিলিয়ন ডলার, ২০২১-২২ -এ ৪৩.৩১ বিলিয়ন ডলার, ২০২২-২৩ -এ ৫০.২৪ বিলিয়ন ডলার, ২০২৩-২৪ -এ ৪২.২০ বিলিয়ন ডলার, ২০২৪-২৫ -এ ৪৫.৩৩ বিলিয়ন ডলার। মানে পাঁচ বছরে মোট কমবেশি ২১০ বিলিয়ন ডলার। এখন কত হবে? ৫০০ বিলিয়ন ডলার। মানে আমেরিকা, মোদিজির ‘বেস্ট ফ্রেন্ড’ ডোনাল্ড ট্রাম্প সাহেব এই চুক্তিতে আমেরিকার বাণিজ্যকে দ্বিগুণ করে নিলেন। এবারে আসুন দেখে নিই ভারত কত ডলারের জিনিষপত্র রফতানি করত। পাঁচ বছরে মোট ৩৭০ বিলিয়ন ডলারের জিনিষপত্র আমেরিকা কিনত। তাহলে পাঁচ বছরের শেষে ওজন পাল্লা কেমন ছিল? ভারত পেত ৩৭০ বিলিয়ন ডলার, দিত ২১০ বিলিয়ন ডলার। তার মানে ভারতের দিকে ঝুঁকে থাকত পাল্লা, সারপ্লাস ট্রেড ভ্যালু ১৬০ বিলিয়ন ডলারের। এখন কত হবে? যদি ধরে নিই যে আমাদের রফতানি একই থাকবে, কারণ রফতানি তো হুউউস করে বাড়ানো যাবে না, তাহলে এখন আর সারপ্লাস ট্রেড ব্যালেন্স নয়, এখন ৫০০ বিলিয়ন আমদানিটা গ্যারান্টেড আর ৩৭০ বিলিয়ন ডলারের রফতানি হবে। মানে ১৩০ বিলিয়ন ডলারের ডেফিসিট ট্রেড ব্যালেন্স। পৃথিবীতে আমেরিকাই একমাত্র বড় দেশ যার সঙ্গে ভারতের বাণিজ্যে সারপ্লাস ট্রেড ব্যালেন্স ছিল, এখন সেটা আর থাকবে না।
আরও পড়ুন: Fourth Pillar | দিল্লিতে মমতা, পুলিশের বজ্জাতি, বিকাশের নোংরামি
ট্রাম্প সাহেব জানিয়ে দিয়েছেন বাণিজ্য চুক্তির শর্ত হল ভারতকে ৫০০ বিলিয়ন ডলারের জিনিস কিনতেই হবে। কী কিনবে? অন্য অনেক কিছুর মধ্যে কৃষিজ বস্তু, মানে বাদাম ফল, সবজি, ডেয়ারি প্রডাক্ট, মিট বা ফিস ইত্যাদি। হ্যাঁ, আমাদের এগ্রিকালচার সেক্টরকে সুরক্ষিত রাখতে হবে বলেই এই দরজা আগে খোলা হয়নি, এবারে এই দরজা খুলতেই হবে, খুলবেই, মিলিয়ে নেবেন। শর্ত এখানেই শেষ নয়, সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, ভারত আর রাশিয়ার থেকে তেল কিনতে পারবে না, তাকে আমেরিকান অয়েল, ভেনিজুয়েলান অয়েল কিনতে হবে। এক স্বাধীন দেশ, কার কাছ থেকে কী কিনবে, সেটা অন্য দেশের প্রেসিডেন্ট কেবল ঠিক করছে না, আগাম ঘোষণা করে জানিয়েও দিচ্ছেন। আর আমাদের ৫৬ ইঞ্চির উনিজি এই বাণিজ্য চুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছেন। আচ্ছা, একবার ভাবুন তো যে বাণিজ্য চুক্তিটা আটকে ছিল কেন? আটকে ছিল মূলত দুটো কারণে – (১) আমরা রাশিয়া থেকে তেল কিনব, সেখানে কারও নির্দেশ শুনব না, (২) আমরা আমাদের এগ্রিকালচার সেক্টরকে সংরক্ষণ দেব, সেই বাজারকে বিরাট প্রতিদ্বন্দিতার দিকে ঠেলে দেব না। হ্যাঁ, এই কারণে গত প্রায় এক বছর ধরে আমরা আমেরিকার সঙ্গে ট্রেড ডিল করে উঠতে পারিনি। এখন কী হল? ট্রাম্প সাহেবের প্রথম শর্তই হল, রাশিয়া থেকে তেল কেনা যাবে না। আর এগ্রিকালাচারাল প্রোডাক্টের জন্য বাজার খুলে দিতে হবে। কেবল তাই নয় তার উপরে বছরে ১০০ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য ওনাকে দিতে হবে। ইমপোর্ট ট্যারিফকে নামিয়ে শূণ্য করে দিতে হবে। হ্যাঁ, এই চুক্তির পরে আমেরিকার এগ্রিকালচারাল প্রোডাক্টের ব্যবসায়ীরা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন, জানাবারই কথা। তার মানে একতরফা ঘোষণাতে যে বাণিজ্য চুক্তি হল, তা আমেরিকার পক্ষে, ১০০ শতাংশ আমেরিকার পক্ষে।
এখানেই গল্প শেষ নয়, ঘোষণাতে যা আসেনি তা কিন্তু মোদিজি আগেই মাথা পেতে মেনে নিয়েছেন। ট্রাম্প সাহেব খুব পরিষ্কার করে জানিয়েই দিয়েছেন যে, ইরানের সঙ্গে যদি কোনও বাণিজ্য হয় তাহলে ১০০ শতাংশ ট্যারিফ চাপানো হবে। মোদিজি কিছুদিন আগেও ওনার উচ্ছৃষ্টভোগী সাংবাদিকদের ডেকে বলেছিলেন যে, ইরানে চাবাহার বন্দরের ফলে বাণিজ্যের দিগন্ত খুলে যাবে। হ্যাঁ, ইরান-ভারত চুক্তি অনুযায়ী ভারত চাবাহার বন্দর তৈরি করবে, আর তার বিনিময়ে বাণিজ্য জাহাজের যাওয়া আসা, বন্দর ব্যবহার করা ইত্যাদির সুযোগ পাবে। সেই বন্দর তৈরি করতে ইতিমধ্যেই ভারতের ১২০ বিলিয়ন ডলার খসে গিয়েছে। কিন্তু তিনদিন আগে পেশ করা বাজেটে নজর দিন, চাবাহার বন্দরের জন্য এক টাকারও বরাদ্দ নেই। তার মানে, সব টাকা ডুবেছে, নির্দেশ মেনেই সেখান থেকে হাত তুলেছেন মোদিজি। কিন্তু কেন? আমেরিকা ৫০ শতাংশ ট্যারিফ চাপানোর পরে তো ‘মাদার অফ অল ডিলস’ ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন আর ভারতের বাণিজ্য চুক্তি হয়েছে, আমাদের দেশের সঙ্গে আরও কিছু দেশের বাণিজ্য চুক্তি হয়েছে, আর এটাও ঘটনা যে, কিছু ক্ষতি হবে কিন্তু আমেরিকার এই বাঁদরামি সহ্য না করে আরও বিভিন্ন বিকল্প বাণিজ্যের অবস্থান খুঁজে নিলে দেশের মঙ্গলই হত। ইন ফ্যাক্ট এই কথাই আরএসএস–বিজেপির ইডিওলগরা চিন্তাশীল মানুষজনেরাও জানিয়েছিলেন, তাহলে একতরফা ট্রাম্প সাহেবের নির্দেশ মেনেই এই চুক্তি কেন? আজ নয় সেই ৫০ শতাংশ ট্যারিফ চাপানোর সময়েই আমরা এই চতুর্থ স্তম্ভে বারবার বলেছিলাম যে ট্রাম্প সাহেবের নির্দেশ মেনেই মোদিজি চুক্তি করতে বাধ্য হবেন। কারণ এমন হ্যাঁ হ্যাঁ বলা সংয়ের মেরুদন্ড বলে কিছু থাকে না, থাকার কথাও নয়, সামান্য চাপে তিনি মাথা নোয়াবেন। কিন্তু এখন যা বেরিয়ে আসছে তা আরও জঘন্য, আরও অপমানজনক আরও সাংঘাতিক। রাহুল গান্ধী সরাসরি অভিযোগ করছেন, ‘আমাদের প্রধানমন্ত্রী কি কম্প্রোমাইজড? ওনাকে কি ব্ল্যাকমেইল করা হচ্ছে? ওনার এমন কোনও দুর্বলতার খবর কি আমেরিকান প্রশাসনের হাতে আছে, যা দেখিয়ে চাপ দেবার ফলেই সাত তাড়াতাড়ি তিনি এই চুক্তি করতে বাধ্য হলেন?’
আজ নয় বহু আগে একদা বিজেপি রাজ্যসভা সদস্য সুব্রমণিয়ম স্বামী ২৫ নভেম্বরে বলেছিলেন, ‘It will be difficult for Modi to avoid the Blackmail of US and Modi, using the ugly sex revelations of Hardip Puri, Modi’s former Cabinet Minister. Modi claims to be a Brahmachari, but in truth he is a Bachelor who has had flings with women, willing or unwilling. The US agencies have the photos to blackmail. This hurts India’s national interests.’ বলেছিলেন, ‘আমাদের মোদিজিকে নারী ঘটিত বিষয় নিয়ে ব্ল্যাকমেইল করা হবে, আর সেই চাপ তিনি নিতে পারবেন না। এবং এই কথা যে অমূলক নয় তা দুটো ঘটনা থেকে আঁচ পাওয়া যাচ্ছে – (১) এপস্টিন ফাইলে নরেন্দ্র মোদির নাম, টুকরো টুকরো কিছু ছবি, মোদিজি নাকি নেচেছেন, গেয়েছেন, সাং অ্যান্ড ডান্সড, ‘The Indian Prime Minister Modi took advice and danced and sang in Israel for the benefit of the US President. They had met a few weeks ago. IT WORKED!’ ঘটনাটা আগের, কিন্তু ইনফরমেশনটা লিক হল তিন দিন আগে, (২) গৌতম আদানিকে আমেরিকার আদালত সরাসরি নাম ধরে সমন দিল আর সঙ্গে সঙ্গে আদানি সাম্রাজ্যে শেয়ারে ধস নামল, (৩) ভারত আমেরিকার ট্রেড ডিল হল, কিন্তু সেই সিজ ফায়ারের মতোই এটাও আমাদের প্রথম জানালেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। হ্যাঁ, ভারত-আমেরিকা বাণিজ্য চুক্তি হল, কিন্তু তা আমাদের দেশের স্বার্থে নয়, এই চুক্তি আসলে হয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে, হয়েছে আমেরিকার স্বার্থে, চুক্তি করেছেন মোদিজি, কেন? কিছুটা বোঝা যাচ্ছে, একদিন না একদিন সবটা বাইরে আসবে।
দেখুন আরও খবর:








